কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

টিভি নাটক সমস্যা এবং সম্ভাবনা নিবিড় লতিফুল বারী

প্রকাশিত : ২৮ মে ২০১৫

শুভ্র সরকার, বুয়েট থেকে পাস করা প্রকৌশলী। স্বপ্ন ফিল্ম বানাবেন, তাই নাটক দিয়ে হাত পাকানোর ইচ্ছা। দীর্ঘদিন থিয়েটার দেখে দেখে, ফিল্ম এ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করে এবং সিনেমাটোগ্রাফির নানাবিধ ওয়ার্কশপ পাড়ি দিয়ে নামলেন প্রথম নাটক নির্মাণে। নিজেদের টাকা খরচ করে বানানো শেষও হলো। যদিও তাদের আর্টিস্ট ম্যানেজ করতে পোহাতে হয়েছে বিবিধ ঝক্কি ঝামেলা। মিডিয়া হাউসগুলোতে নিজেদের পছন্দের আর্টিস্ট পাওয়ার জন্য ধরনা দিলেও তারা চেষ্টা করে নিজেদের পছন্দের আর্টিস্ট চাপিয়ে দিতে। শেষে যেটা হলো কোন চ্যানেলই তাদের নাটক প্রচারে রাজি হলো না। কারণ হিসেবে শুভ্র সরকার বললেন চ্যানেলগুলো কিছু নির্দিষ্ট পরিচালকের বাইরে অন্য পরিচালকদের কাজ গ্রহণ করতে চায় না। তারা গল্পের গভীরতা বিচার করে না বরং তারা খোঁজে গল্প রোমান্টিক নাকি কমেডি, সেই সঙ্গে তারা খোঁজে ধীরগতির নাটক, যেন অসংখ্য বিজ্ঞাপনের মাঝেও দর্শক কাহিনী হারিয়ে না ফেলে, কারণ নাটকে তো ছেদ পড়ছে বার বার।

আদিযুগ

পুরো পরিবার তড়িঘড়ি করে ঘরের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে না, বাড়ির ছেলেমেয়েগুলো কালকের স্কুলের পড়া আগেভাগে শেষ করছে না টিভি দেখার জন্য। রাস্তা-ঘাট এখন আর খালি হয়ে যায় না ঘরে ফিরে নাটক দেখার জন্য। পরদিন অফিস আদালতে, চায়ের দোকানের আড্ডায় কাল রাতের নাটকের পর্যালোচনা এখন ডুমুরের ফুল। সবচেয়ে বড় কথা, এখন দর্শকদের আর এক সপ্তাহ বা ১৫ দিন ধরে নাটকের পর্বগুলোর জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হচ্ছে না, প্রতিদিনই তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে ডেইলি সোপ, তবে নাটকের ফাঁকে ফাঁকে বিজ্ঞাপন নাকি বিজ্ঞাপনের ফাঁকে ফাঁকে নাটক সেই প্রশ্নও রয়ে যায়। একসময় নাটক মানেই ছিল বিটিভির অন্ধকার সেটে শূটিং, যেখানে দিনরাত আলাদা করার উপায় ছিল না, ছিল একই রকম সেটে অনেক নাটকের দৃশ্যায়ন। তবুও মানুষ কেন অপেক্ষায় থাকত প্রিয় নাটকের জন্য? কারণ বলার অপেক্ষা রাখে না, নাটকের গল্প। তৎকালীন নাটকের গল্পগুলো আমাদের শহুরে মধ্যবিত্তের মন ছুঁয়ে যেত। দর্শক নাটকের মাঝে আবিষ্কার করত নিজেদের জীবনকে। বঞ্চিত হতো না গ্রামের দর্শকরাও। তাদের কথা মাথায় রেখেও নাটক নির্মিত হয়েছে সেই সময় বিটিভির সীমাবদ্ধ যুগে। এছাড়াও ছিল এক ঝাঁক পরীক্ষিত ও নিবেদিত প্রাণ নাট্যকর্মীর নিরলস প্রয়াস যারা কিনা নিজেদের ব্যক্তিগত কর্মজীবনের বাইরেও মঞ্চ নাটকের মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ করে টিভি নাটকে নিজেদের সক্রিয় রেখেছিলেন।

মধ্যযুগ

একসময় বিটিভি প্যাকেজ নাটকের চল শুরু করল। দর্শক অন্ধকার যুগ পেরিয়ে আলোর মুখ দেখল, বিভিন্ন লোকেশনে শূটিং শুরু হলো, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এলো গল্পে। আগের চাইতেও অনেক বিচিত্র গল্প উঠে এলো নাটকে। সেগুলো জনপ্রিয়ও হলো। ধীরে ধীরে বাংলাদেশে স্যাটেলাইট চ্যানেলের যাত্রা শুরু হলো, তবে বিটিভিই ছিল এগিয়ে নাটকের গুণগত মান বজায় রাখার জায়গা থেকে।

বর্তমান যুগ

পরিবর্তনটা এলো ২০০০ সালের পর থেকে যখন স্যাটেলাইট চ্যানেলের পরিমাণ বেড়ে গেল বহুলাংশে। দর্শকদের সামনে কিছু একটা হাজির করা চাই-ই চাই। সুতরাং প্রয়োজন অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক। আর এই প্রতিযোগিতায় গা ভাসাতে যেয়ে নাটকের মানের বিপর্যয় পরিলক্ষিত হলো। অল্প বাজেট ও সময় নিয়ে নির্মাণ, গল্পের পেছনে গুরুত্ব না দেয়া, দুর্বল চিত্রনাট্য এবং সর্বোপরি অপাঙ্ক্তেয় অভিনেতা অভিনেত্রীর উপস্থিতি, যাদের পূর্বে অভিনয় নিয়ে কোন প্রশিক্ষণ বা মঞ্চে সরাসরি কাজের অভিজ্ঞতা নেই। ফলে বিশ্বায়নের যুগে হয়ত টিভি নাটকে কাজ করার সুযোগ মিলছে, কিন্তু স্কিল ও প্যাশনের অভাবে হারিয়েও যাচ্ছে তারা অকালেই। দর্শকরাই বিশেষ মনে রাখছে না তাদের। আর গল্পের গভীরতার অভাব তো রয়েছেই। এত চ্যানেল, এত নাটক, দর্শকের মনে স্থান করে নিতে অবশ্যই গল্পের মান হতে হবে সেই পর্যায়ের। তা না হয়ে শুধুমাত্র কমেডিনির্ভর নাটকের চল শুরু হলো বাংলাদেশে, অকারণে সুড়সুড়ি দিয়ে দর্শক হাসানোর চেষ্টা, সস্তা স্ক্রিপ্ট আর যেনতেন প্রকারে সবার পরিচালক হয়ে উঠা যেখানে পরিচালনার গুণ একটা সুদীর্ঘ সাধনা পেরিয়ে অর্জন করতে হয়। কলাকুশলীর ভেতর থেকে অভিনয় বের করে আনার একটা ক্ষমতা থাকতে হয়, যা বর্তমান সময়ের পরিচালকদের মাঝে অনুপস্থিত। আর এই শূন্যস্থান বাঙালী দর্শক এখন পূরণ করছে ভারতীয় বাংলা চ্যানেলে প্রচারিত বিভিন্ন সিরিয়াল দেখে। ফলে একসময় বাংলাদেশের নির্মাতারাও নিজেদের ধারা ভেঙ্গে সেই স্টাইলে নাটক বানানো শুরু করল এবং ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগল চিরায়ত বাংলা খ ও ধারাবাহিক নাটকের ঐতিহ্য। নতুন শিল্পী আসে আবার হারিয়ে যায়, কেউ কেউ টিকে থাকতে না পেরে হারিয়ে যায়, কেউ কেউ নিজেদের গুটিয়ে নেয়। একই অবস্থা পরিচালকদের। ফলে বাংলাদেশের টিভি নাটকের ইতিহাসে এসব দিনরাত্রি, কোথাও কেউ নেই, রূপনগর, তথাপি, সংশপ্তক, অয়োময় এমন মানসম্পন্ন নাটক আর তৈরি হচ্ছে না। বাংলা নাটকের বর্তমান হালচাল নিয়ে আমরা কথা বলেছি কজন নির্মাতার সঙ্গে।

মেজবাউর রহমান সুমন

নাটক ও বিজ্ঞাপন নির্মাতা

গত প্রায় বছর তিনেক যাবত আমি নাটক বানাচ্ছি না। এমনকি ঘরে ফিরে টিভিতে নাটক দেখাও হয় না। কারণ মানসম্পন্ন এমন কোনো কাজ হচ্ছে না যে, কোন বিশেষ নাটক আমাকে টিভিতে একটি নির্দিষ্ট চ্যানেলে আটকে রাখবে। গল্পে কোন ভিন্নতা নেই, ৫-৬ বছর আগে যেমন গল্প নিয়ে কাজ হয়েছে সেই গল্পগুলোই ঘুরে ফিরে বার বার আসছে। আর যাদের হাত ধরে নাটকের গল্প চেঞ্জ হয়েছিল, তারা এখন মিডিয়ার অস্থিরতার কারণে নাটক বানানো থেকে দূরে আছেন বিধায় নতুন পরিচালকদের উদ্বুদ্ধ হওয়ার কোন উপকরণ নেই। অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে কোন যৌথ উদ্যোগ চোখে পড়ে না আমার। আর শিল্পীদের ক্ষেত্রে বলা যায় যে, ভাল অভিনয় ডেলিভারি দেয়ার জন্য যে মঞ্চ ব্যাকগ্রাউন্ড থাকতেই হবে এমন নয়, পৃথিবীর অনেক বড় বড় আর্টিস্ট থিয়েটার ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসেননি, অভিনয় সক্ষমতা নির্ভর করে পরিচালকের সঙ্গে বোঝাপড়াটা কেমন এবং আন্তরিকতার ওপর। আর নবীন পরিচালকদের আর্টিস্ট নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটা ঝামেলা পোহাতে হয়।

মাহমুদ দিদার- নাট্য নির্মাতা

সঙ্কটটা তিন রকমেরÑ গল্প, বাজেট, বিজ্ঞাপন। অধিকাংশ গল্পই নিষ্প্রাণ আমি তুমি মার্কা চটুল চুটকিতে ভরা। দিন দিন সব কিছুর দাম বাড়ছে, শূটিং হাউস থেকে শুরু করে টি বয়ের পারিশ্রমিক সব বাড়ছে, কিন্তু মূল বাজেট কমছে। এজেন্সি একটা মধ্যসত্বভোগীর জায়গা নিয়েছে যেখানে আড়াই লাখ টাকার নাটক সে এক লাখ সত্তর বা আশি হাজার টাকা দিয়ে তারা বানায় বাকিটা তার মুনাফা। এছাড়া চ্যানেলের মুনাফা করতে হয় সেজন্য চাপিয়ে দেয় অসংখ্য বিজ্ঞাপন। ফলে অডিয়েন্স নিশ্চয়ই এত সব সঙ্কট মাথায় রেখে টিভি দেখবে না, সে স্রেফ এন্টারটেইনমেন্ট চায়। কিন্তু অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন আর বস্তা পচা চুটকি গল্প তার বিনোদন আকাক্সক্ষাকে নষ্ট করে দেয়। সে বসে থাকে না চলে যায় ভারতীয় সিরিয়ালে। কি ভয়াবহ একজন গায়ক হঠাৎ করে অভিনেতা হয়ে গেল মেয়েলী স্বভাবের লুক আর কথা দিয়ে, সে নাকি ৬০-৭০ হাজার টাকা পেমেন্ট নেয়। আর একজন তথাকথিত অভিনেতা আছে যে সারা জীবন রাস্তা, গলির মোড়ে, ছাদে, বাসে অভিনয়ের নামে একই জিনিস করে লাখ লাখ টাকা কামালো, কামিয়েই যাচ্ছে । অতএব, এটা থেকে উত্তরণের উপায় হলো, যা সঙ্কট তার সলিড সমাধান করলেই হয়, একটু রুচির পরিবর্তন দরকার আর কি।

রাকেশ বসু- নাট্য নির্মাতা

সব নাটক ভাল হচ্ছে না, কেউ কেউ ভাল কিছু করার চেষ্টা করছে, যেখানে নাটকের বাজেট একটা অনেক বড় ব্যাপার। সব কিছুর দাম বাড়ে, শুধু নাটকের দাম কমে। ফলে অনেক মেধাসম্পন্ন মানুষ কাজ করতে পারছে না। তাছাড়া আর্টিস্ট ক্রাইসিস তো আছেই। ভাল কোন কাজের জন্য সেই আগের পুরোনো অভিজ্ঞদের দরকার হয়। সব মিলিয়ে আমার সাজেশন হলো নাটকের জন্য নতুন চিন্তা-ভাবনাকে সাপোর্ট দেয়া উচিত, আর্টিস্ট তৈরি করতে হবে। চ্যানেলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে, এজেন্সিগুলোকেও নতুন করে নাটকের জন্য মার্কেট পণ্য করতে হবে।

প্রকাশিত : ২৮ মে ২০১৫

২৮/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: