রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

কাল ব্যাঙ্ককে ১৭ দেশের বৈঠক ॥ আন্দামান সাগরে এখনও ভাসছে আড়াই হাজার

প্রকাশিত : ২৮ মে ২০১৫
  • ৩৬ গডফাদার গ্রেফতারে জোর অভিযান
  • মালয়েশিয়ায় আরও গণকবর ও বন্দীশিবির

মোয়াজ্জেমুল হক/এইচএম এরশাদ ॥ মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের তাড়া খাওয়া আড়াই সহস্রাধিক অবৈধ অভিবাসী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী নাগরিক এখনও আন্দামান সাগরে ভাসছে। সর্বশেষ বুধবার জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন নৌযানে ভাসমান এ অভিবাসীদের দালাল চক্র ও নৌযান চালকরা ফেলে পালিয়েছে। এদিকে, মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় পেরলিস প্রদেশে গণকবর ও বন্দীশিবির আবিষ্কারে সে দেশের পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর জোরালো তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে ধারণা দেয়া হচ্ছে ইতোমধ্যে আবিষ্কৃত ১৩৯টি গণকবর ও ২৮টি বন্দীশিবির ছাড়াও গভীর জঙ্গলে আরও এ ধরনের কবর ও শিবির থাকার আশঙ্কা রয়েছে। অপরদিকে, দেশের কক্সবাজার অঞ্চলের টেকনাফে বুধবার আরও ৫ দালাল গ্রেফতার হয়েছে। এর পাশাপাশি মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত শীর্ষ ৩৬ গডফাদারকে গ্রেফতারে র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির অভিযান জোরদার করা হয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকাজুড়ে বিজিবি প্রহরা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের তৎপরতা বর্তমানে থমকে গেছে। কক্সবাজারের মহেশখালি থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত যে সমস্ত পয়েন্ট দিয়ে এতদিন পর্যন্ত দেদারছে মানবপাচার হয়েছে সেসব পয়েন্ট এখন খাঁ খাঁ করছে। পাচারে ব্যবহৃত ছোট ছোট ইঞ্জিন নৌকাগুলো পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। অন্যদিকে মানবপাচার ঠেকাতে দেশের ৭ বিভাগে মানবপাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনার কথা ঘোষণা দিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। এর পাশাপাশি মানবপাচার প্রতিরোধ ও অভিবাসীদের উদ্ধার করে দ্রুত প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আগামী ৬ থেকে ৭ জুন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকালে। আগামীকাল থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মানবপাচারের ঘটনা নিয়ে আহূত সতের দেশীয় বৈঠকে বাংলাদেশ অংশ নিচ্ছে। এ বৈঠক থেকে মানবপাচার রোধে এবং উদ্ধারকৃত অবৈধ অভিবাসীদের পুনর্বাসনে একটি সুন্দর সিদ্ধান্ত বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিবিসি, রয়টার, এপি, এএফপিসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মিডিয়া ও সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় নিরীহ অভিবাসীদের বন্দীশিবির ও গণকবর নিয়ে প্রতিনিয়ত চাঞ্চল্যকর নতুন নতুন খবর প্রচারিত হচ্ছে। যা নিয়ে তোলপাড় চলছে বিশ্বের সর্বত্র। বর্তমান সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ অভিবাসী সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় অভিবাসীদের যে গণকবর ও বন্দীশিবিরের সন্ধান মিলেছে তা বিশ্ব বিবেককে শিহরিত করেছে। অমানবিক এ ঘটনা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানানোর কারণে জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী অবৈধ অভিবাসীদের প্রতি নির্দয় না হয়ে সদয় আচরণের মাধ্যমে তাদের যথাযথ আশ্রয় ও খাদ্য, চিকিৎসা সহায়তা দেয়ার একের পর এক আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছে।

এদিকে ইন্দোনেশিয়ায় এ পর্যন্ত উদ্ধারকৃতদের মধ্যে শুধু শিশুর সংখ্যা রয়েছে ১৭০। ইন্দোনেশিয়া সরকার বলেছে, তারা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের সে দেশে আশ্রয় দেবে। তবে বাংলাদেশীদের ফেরত পাঠাবে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের ইন্দোনেশিয়ার ভাষার পাশাপাশি ইংরেজী ভাষা শেখানোর তৎপরতাও শুরু হয়ে গেছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মিয়ানমার, থাইল্যান্ডে, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া শুরুতে অভিবাসীদের সাগর থেকে তাড়ানোর সিদ্ধান্তে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হওয়ার পর দ্রুত সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে তল্লাশি ও উদ্ধার তৎপরতা শুরু করলেও গত সপ্তাহখানেকের মধ্যে অভিবাসীদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, ভীতসন্ত্রস্ত অভিবাসীরা একদিকে অনাহারে অর্ধাহারে থেকে অর্ধমৃত অবস্থায় যে যেখানে পারে সেখানে কূল ধরেছে। এখন এদের কি অবস্থা তা এখনও কারও জানা নেই।

জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য ॥ আন্দামান সাগরে অভিবাসী প্রত্যাশী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী নাগরিকদের ব্যাপারে বুধবার জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও আইওএমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্দামান ও বঙ্গোপসাগরে অসহায় অবস্থায় এখনও আড়াই হাজারেরও বেশি অভিবাসন প্রত্যাশী মানুষ ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। ঘোষণায় বলা হয়েছে, মে মাসের প্রথমার্ধে থাইল্যান্ডের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। এরপর মিয়ানমারের কয়েক হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ বাংলাদেশী অভিবাসীরা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার তীরে নামার চেষ্টা করে। কিন্তু এদেশগুলো তাদের কাছে ভিড়তে দেয়নি। এ অবস্থায় এদের বহনকারী নৌযানগুলোর চালক, মাঝিমাল্লা ও দালাল চক্র তাদের মাঝ সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় রেখে পালিয়ে যায়। ইউএনএইচসিআর ও আইএমও বুধবার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সাতটি নৌকায় অতিরিক্ত বোঝাই হয়ে এসব অভিবাসী অসহায় হয়ে আন্দামান ও বঙ্গোপসাগরে ভাসমান রয়েছে। ভাসমানরা সাগর বক্ষে অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এদের অনেকেই গুরুতর অসুস্থ।

৭ হাজার না আড়াই হাজার ॥ এদিকে আন্দামান সাগরে ভাসমান অবৈধ অভিবাসীর সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। ইতোপূর্বে ইন্দোনেশিয়ার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সংস্থার বরাত দিয়ে জানানো হয়েছিল ভাসমান অভিবাসীর সংখ্যা সাত হাজার। এ সংখ্যা জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় আশ্রিত অভিবাসীদের তথ্য অনুযায়ী ভাসমানদের সংখ্যা দুই সহস্রাধিক বলে জানানো হচ্ছে। ইতোপূর্বে আইএমও’র এশিয়া-প্যাসিফিক মুখপাত্রও বলেছেন, ভাসমান অভিবাসীদের সংখ্যা কমপক্ষে আট হাজার। এর আগে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা আন্দামান সাগরে এগার ভাসমান অভিবাসীকে দেখতে পেয়েছে। এ খবরটি ইন্দোনেশিয়া সরকারের কাছে জানানো হলে তারা এদের খোঁজার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। তবে বিভিন্ন সাহায্য সংস্থার পক্ষ থেকে ভাসমানদের সংখ্যা আরও বহু বেশি বলে জানানো হয়েছে। কিন্তু বুধবার পর্যন্ত মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী নতুন করে কোন ভাসমান খুঁজে পায়নি। এর ফলে উদ্ধার তৎপরতা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে দেশ দুটির সরকার।

কাল ব্যাঙ্ককে সতের দেশীয় বৈঠক ॥ সাগর পথে অবৈধ অভিবাসী নিয়ে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আগামীকাল শুক্রবার ব্যাঙ্ককে সতের দেশীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আঞ্চলিক এ বৈঠকে অভিবাসীদের ভবিষ্যত নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্যানোট প্রিচাইনুড বুধবার বলেছেন, ভাসমান অভিবাসীদের কিভাবে সামাল দেয়া হবে বৈঠকে তা নিয়ে আলোচনা হবে।

পেরলিসে আরও মরদেহ ॥ বুধবার পর্যন্ত মালয়েশিয়ার পেরলিস প্রদেশের জঙ্গলে পরিচালিত অভিযানে গণকবর থেকে আরও বেশকিছু গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পেরলিসের পেদাং পেসার ও ওয়াং কেলিয়ান এলাকার জঙ্গলে পুলিশ ও সেনা অভিযানে এ পর্যন্ত ১৩৯টি গণকবর ও ২৮টি বন্দীশিবির আবিষ্কৃত হয়েছে। কিন্তু অভিযানে অংশগ্রহণকারীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিশাল জঙ্গলের বিভিন্ন এলাকায় আরও গণকবরের চিহ্ন মিলছে। পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে বন্দীশিবিরও। এসব বন্দীশিবির পরিত্যক্ত। এখানে যে মানুষ আটকে রাখা হয়েছিল তার বিভিন্ন প্রমাণাদি মিলছে। কিন্তু গণকবরসমূহ থেকে ঠিক কি পরিমাণ মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে তার সংখ্যা বলতে পারছে না মালয়েশিয়া সরকার। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, উদ্ধারকৃত অধিকাংশ মনুষ্য কঙ্কাল ও হাড়গোড় ও গলিত লাশ। অনেককে জীবন্ত অবস্থায় মাটিচাপা দেয়া হয়েছে বলে সেদেশের ফরেনসিক বিভাগের কর্মকর্তারা প্রমাণ পেয়েছেন। যা একটি রোমহর্ষক ঘটনা বলে চিহ্নিত হয়েছে।

আশ্রিতদের জন্য ২৬ মিলিয়ন ডলার সাহায্য চাওয়া হয়েছে ॥ মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় আশ্রিত অভিবাসীদের জন্য আইএমও’র পক্ষ থেকে ২৬ মিলিয়ন ডলার সাহায্য সহায়তা চাওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, আইএমও’র মতে, এ দুটি দেশে এখন আশ্রিত অভিবাসীর সংখ্যা এখন তিন সহস্রাধিক। তবে এখন পর্যন্ত এ দুটি সরকারের পক্ষ থেকে আশ্রিতদের খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা চালানো হচ্ছে।

প্রকাশিত : ২৮ মে ২০১৫

২৮/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: