কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘বল ছোঁয়ার সাহস দেখিও না’

প্রকাশিত : ২৭ মে ২০১৫
  • মোঃ মামুন রশীদ

ক্রিকেট শুধু মাঠের খেলা নয়, এর অনেকাংশ জুড়েই থাকে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। ২২ গজের উইকেটে এবং পুরো মাঠে অনেক ধরনের খেলাই চলে। তবে যত খেলাই চলুক না কেন, অভদ্রতা এবং অসভ্য আচরণবিধি থেকে সবসময়ই মুক্ত ক্রিকেট। বরাবরই ভদ্রলোকের খেলা হিসেবে সর্বজনবিদিত এ খেলাটি। প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ সবসময়ই ক্রিকেটকে করেছে আকর্ষণীয় এবং চমকপ্রদ। তবে সেই মনোভাবগুলো একজন তরুণ ক্রিকেটারের মধ্যে গড়ে উঠতে থাকে ধীরে ধীরে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নবাগত কোন ক্রিকেটার যখন অভিজ্ঞ ও পরিণত হয়ে ওঠেন তখন তিনি স্বীয় বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল হতে থাকেন নিজ ও প্রতিপক্ষ দলের কাছে। এভাবেই হয়ে ওঠেন কোন একজন ক্রিকেটার একদিন কিংবদন্তি। ১৯৯২ সালের জানুয়ারি, তখনও শচীন টেন্ডুলকর ‘লিটল মাস্টার’ তকমাটাও কুড়োতে পারেননি। বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষও সেভাবে তাকে চিনতে শুরু করেননি। ১৯ বছরের তরুণ শচীন। গোফ-দাড়ি গজিয়েছে সবেমাত্র। আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পার করেছেন তখন তিন বছর। আহামরি এমন কিছু করেননি যে বিশ্বময় নামডাক হয়ে যাবে। এ সময়টাতে অস্ট্রেলিয়া সফর করছিল ভারতীয় দল। শচীনের প্রথমবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে খেলতে যাওয়া। সেবার সিরিজের তৃতীয় টেস্টে নতুন এক শিক্ষা পেয়েছিলেন তরুণ শচীন। অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক এ্যালান বোর্ডার উচ্চৈঃস্বরে তার প্রতি চেঁচিয়ে কথা বললেও যতদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন সে কথাটিকে শিক্ষা হিসেবে নিয়েছেন। সিডনি টেস্টে ব্যাটিংয়ের সময় হাত দিয়ে বল ধরতে গিয়েছিলেন এবং বোর্ডার হুঙ্কার দিয়ে উঠেছিলেন, ‘খবরদার, বল ছোঁয়ার সাহস দেখিও না।’ শচীনের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’ থেকে এই ঘটনাটি আজ তুলে ধরা হবে দৈনিক জনকণ্ঠের পাঠকদের জন্য

এশিয়ার বাইরে উপমহাদেশের যে কোন ক্রিকেট দলকেই খেলতে গিয়ে অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। এটাই যুগ-যুগান্তরের ইতিহাস। আর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে উপমহাদেশের কোন দলের জন্য ভাল করাটা একেবারেই বিরল ঘটনা। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া সফররত ভারতীয় ক্রিকেট দলের জন্যও বরাবরের মতো ছিল যাচ্ছেতাই অবস্থা। প্রথম দুই টেস্টে একেবারে নাজেহাল হতে হয় মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় দলকে। ব্রিসবেন ও মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত সিরিজের প্রথম দুই টেস্টে ১০ ও ৮ উইকেটের বড় পরাজয় দেখে ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে যায় ভারতীয় দল। এ দুই টেস্টেই ব্যর্থ ছিলেন শচীন। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ব্যাট চালানো কতটা দুরূহ সেটাও যেন শিখছিলেন তিনি। পুরো সফরটাই বড় এক শিক্ষা হয়ে উঠছিল তরুণ শচীনের জন্য। ব্রিসবেন টেস্টে ১৬ ও ৭ রানে আউট হওয়ার পর মেলবোর্নে করতে পেরেছিলেন ১৫ ও ৪০ রান। তবে এরপরও সিডনি টেস্টে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা জেগে উঠেছিল ভারতীয় শিবিরে। কারণ বরাবারের মতো তখনও ব্যাটিং শক্তিতে ভরপুর ছিল ভারত। আর তৃতীয় টেস্টের ভেন্যু সিডনি ছিল ব্যাটিং সহায়ক। সিডনি টেস্ট শুরু হওয়ার পর ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা আরও উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন। কারণ অস্ট্রেলিয়াকে প্রথম ইনিংসে ৩১৩ রানেই গুটিয়ে দিতে সক্ষম হন ভারতীয় বোলাররা। এ সিরিজে তরুণ সৌরভ গাঙ্গুলীও ভারতীয় দলে ছিলেন। কিন্তু স্কোয়াডে জায়গা হয়নি। তিনি শচীনের সঙ্গে একই কক্ষে ভাগাভাগি করে ঘুমাতেন। কিভাবে ব্যর্থতা কাটিয়ে ভাল ব্যাটিং করবেন সেটা নিয়ে দিনরাত চিন্তায় মগ্ন থাকতেন শচীন। এর মধ্যেই একদিন সৌরভ গভীর রাতে ঘুম থেকে জেগে দেখেন খালি হাতেই দাঁড়িয়ে ব্যাটিংয়ের ভঙ্গি করছেন শচীন। জানালা চুইয়ে আসা বাইরের আলোয় শচীনের সেই ছায়াটা সৌরভ হঠাৎ জেগে ভয়কাতুরে চোখে চেয়ে দেখছিলেন। পরে ধাতস্থ হয়ে তিনি শচীনকে জিজ্ঞেস করেন, ‘এত রাতে তুমি জেগে জেগে কি করছ এসব?’ তখন শচীন উত্তর দেন, ‘আমি আসলে বোঝার চেষ্টা করছি ক্রেইগ ম্যাকডারমট এবং অন্য অসি বোলারদের কিভাবে মোকাবেলা করব!’ পরদিন বেশ ক্লান্ত ছিলেন শচীন। দারুণ ব্যাটিং করছিলেন ওপেনার রবি শাস্ত্রী। কিন্তু ঘুমে ঢুলুঢুলু হয়ে আসা চোখকে সামাল দিতে না পেরে খাবারের কক্ষে ঘুমাতে যান শচীন। তার ৬ নম্বরে ব্যাটিং করতে নামার কথা। সৌরভকে তিনি ঘুমাতে যাওয়ার আগে বলেন, ‘আরেকটা উইকেট পরলে আমাকে ঘুম থেকে ডেকে দিয়ো।’ আজহার আউট হয়ে যাওয়ার পর শচীনকে ডেকে দেন সৌরভ। ২০১ রানে ৪ উইকেট হারিয়েছে ভারত এবং সফরে প্রথমবার ভারতের ড্রেসিং রুমের অবস্থা বেশ উজ্জীবিত ছিল। ব্যাটিংয়ে নামেন শচীন। এদিন তিনিও দারুণ ব্যাটিং করছিলেন। ১৪৮ রানের অপরাজিত একটি ইনিংস উপহার দেন তিনি। দ্বিতীয় ইনিংসে আর ব্যাটিং করতে হয়নি তাকে। ৪৮৩ রানে প্রথম ইনিংস শেষ হওয়া ভারতের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইনিংসে অসিরা ৮ উইকেটে ১৭৩ রান তোলার পর ম্যাচ ড্র হয়ে যায়। চতুর্থ টেস্টে আবারও ব্যর্থ হন শচীন। প্রথম ইনিংসে ৬ রানেই সাজঘরে ফেরেন। কিংবদন্তি স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যানের ঘরোয়া ভেন্যু এ্যাডেলেইডে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল এ টেস্ট। দ্বিতীয় ইনিংসেও ১৭ রান করতে পেরেছিলেন। ৩৮ রানে এ ম্যাচ হেরে যায় সফরকারী ভারতীয় দল। তবে পঞ্চম টেস্টে আরেকটি সেঞ্চুরি পেয়ে যান শচীন। পার্থে অনুষ্ঠিত সিরিজের শেষ এই টেস্টে অভিষেক হওয়ার পর প্রথমবার চার নম্বরে ব্যাট হাতে নামেন তিনি প্রথম ইনিংসে। পার্থের গতি ও বাউন্সিময় উইকেটে অসি পেসারদের বিরুদ্ধে ভাল ব্যাটিং করা বেশ দুষ্কর। কিন্তু শচীন তেমন সমস্যা অনুভব করেননি। দারুণ ব্যাটিং করে ১১৪ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। শর্ট অব লেন্থের বলগুলো একেবারে শেষ সময়ে খেলছিলেন শচীন। পায়ের পাতায় উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে হালকা করে ব্যাট ছুঁয়ে দিয়েছেন। এভাবেই খেলছিলেন সব বল। গালিতে ফিল্ডিং করছিলেন অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক বোর্ডার। রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে এভাবেই একটি বল খেলার পর সেটা শচীনের সামনেই থেমে গিয়েছিল। শচীন ভদ্রতা দেখানোর কথা ভেবে বলটি তুলে অসি ফিল্ডারদের ফেরত দেয়ার জন্য ঝুঁকেছিলেন। কিন্তু বল ছোঁয়ার আগেই বোর্ডার গর্জে উঠলেন এবং শচীনকে সতর্ক করে বললেন, ‘খবরদার, বল ছোঁয়ার সাহস দেখিও না।’ এরপর আর কখনই বল ধরতে যাননি শচীন। পুরো ক্রিকেট ক্যারিয়ারেই মনে রেখেছেন ঘটনাটি। সব সময়ই বোর্ডারের সেই হুঙ্কার কানে বেজেছে বল খেলার পর সামনে পড়ে থাকলে। কিন্তু আর কখনই হাত দিয়ে বল ধরার প্রচেষ্টা চালাননি।

তথ্যসূত্র- শচীন টেন্ডুলকরের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’

প্রকাশিত : ২৭ মে ২০১৫

২৭/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: