রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জুনিয়র এ্যাথলেটিক্সের নানা ঘটনা

প্রকাশিত : ২৭ মে ২০১৫
  • শেখ শাহ্রিন আক্তার চাঁদনী

গত ২২ ও ২৩ মে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় ‘একেএম শামসুজ্জোহা স্মৃতি জাতীয় জুনিয়র এ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতা।’ স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত ভাষা সৈনিক একেএম শামসুজ্জোহার নামে অনুষ্ঠিত এই প্রতিযোগিতা যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার প্রধান অতিথি হিসেবে উদ্বোধন করেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান। প্রতিযোগিতার সমাপনী দিনে যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয় প্রধান অতিথি হিসেবে প্রতিযোগিতার সমাপনী ঘোষণা করেন।

শেখ কামালের নামে এ্যাথলেটিক্স একাডেমি ॥ এর ক’দিন আগে এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয় বছরের সব এ্যাথলেটিক্স আসরেই বাংলাদেশ এ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনকে পৃষ্ঠপোষকতা দেবে একেএম শামসুজ্জোহা ফাউন্ডেশন। প্রতিযোগিতায় বালক-বালিকা, কিশোর-কিশোরী এই চার বিভাগে ১৯ ইভেন্ট ছিল। দেশের ৬৪ জেলার প্রায় ৫ শতাধিক ক্ষুদে এ্যাথলেট এতে অংশ নেয়। প্রতিযোগিতার বাজেট প্রায় ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে শামসুজ্জোহা ফাউন্ডেশন দেয় ৫ লাখ টাকা। সংবাদ সম্মেলনে এ্যাথলেটদের জন্য স্টেডিয়াম ও একাডেমি নির্মাণের ঘোষণা দেন শামীম ওসমান। একাডেমি হতে পারে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে প্রায় ২৭ বিঘা সরকারী জমির ওপর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে শেখ কামালের নামে হতে পারে স্টেডিয়াম ও একাডেমির নাম।

বিকেএসপি এবারও চ্যাম্পিয়ন ॥ এবারের জাতীয় জুনিয়র এ্যাথলেটিক্সে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)। তারা অর্জন করে মোট ৩৩ স্বর্ণপদক। এর মধ্যে স্বর্ণ ২২, রৌপ্য ৮ এবং তাম্রপদক ২টি। গত বছর ১৬ স্বর্ণ, ৯ রৌপ্য ও ২ তাম্রপদক (২৭ পদক) নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা।

সাফে স্বর্ণ জেতার প্রত্যয় তামান্নার ॥ জাতীয় জুনিয়র এ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় ও সমাপনী দিনে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে সবচেয়ে ‘হট ইভেন্ট’ ১০০ মিটার স্প্রিন্ট কিশোরী বিভাগে স্বর্ণজয় করে সে। গতবারের আসরেও এই ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছিল তামান্না। এবার মোট পাঁচ ইভেন্টে প্রথম স্থান অধিকার করে। বাকি চারটি হলো ২০০ ও ৪০০ মিটার দৌড়, লংজাম্প ও হাইজাম্প। সুনামগঞ্জের মেয়ে তামান্না হচ্ছে দেশের সাবেক প্রখ্যাত এ্যাথলেট ও কোচ কিতাব আলীর নাতনি হচ্ছে। এবার ১০০ মিটারে উচ্চ মাধ্যমিকে দ্বিতীয় বর্ষে পড়া তামান্নার টাইমিং ১৩.৩৬ সেকেন্ড। ২০০৯ সালে বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়া তামান্না ভাল হ্যান্ডবলও খেলে থাকে। তার ভবিষ্যত লক্ষ্য সাফে ১০০, ২০০ ও ৪০০ মিটারে স্বর্ণ জেতা। শিরিন আক্তার ও শেলি এ্যান-ফ্রেজারকে আদর্শ এ্যাথলেট মানা তামান্না এ জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে পিছপা হবে না বলে জানায়। এর আগে ২০১২ সালে এ আসরে বালিকা বিভাগে ২০০ মিটারেও সোনা জিতেছিল তামান্না।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য চায় সাইফুল ॥ সাইফুল ইসমাইল খান সানি। বিকেএসপির এ্যাথলেট। কিশোর বিভাগে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে এবারের স্বর্ণপদকধারী। এই ইভেন্টে এবারই প্রথম সর্বোচ্চ সাফল্য কুড়িয়ে নিল সাইফুল। ১০.৫৩ সেকেন্ড সময় নিয়ে জাতীয় রেকর্ড গড়েছে সাইফুল, ‘অসম্ভব খুশি লাগছে। এ নিয়ে তিনটিতে স্বর্ণ জিতলাম। বাকিগুলো হচ্ছে ২০০ ও ৪০০ মিটারে। কোচ মেহেদী হাসানের নিবিড় প্রশিক্ষণেই আমার এ সাফল্য।’

গত বছর জুনিয়র এ্যাথলেটিক্সে ১০০ মিটারে সাফল্য পায়নি সাইফুল। ‘আমি সেবার পুরোপুরি সুস্থ ছিলাম না। তারপরও ২০০ মিটার স্প্রিন্টে প্রথম হয়েছিলাম।’ সাইফুলের স্মৃতিচারণ। ‘এবার ১০০ মিটারে রেকর্ড গড়ে প্রথম হওয়ায় সৃষ্টিকর্তাকে জানাই অশেষ শুকরিয়া। ছোটবেলা থেকেই এ্যাথলেটিক্সই বেশি টান তো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলের কালীগচ্চ নিবাসী সাইফুলকে। তার আদর্শ এ্যাথলেট দেশে প্রয়াত মাহবুব আলম ও মেজবাহ উদ্দিন, বিদেশে উসাইন বোল্ট, ইয়োহান ব্ল্যাক ও টাইসন গে। সাইফুলের ভবিষত লক্ষ্য, ‘আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেভাবেই হোক আমাকে সাফল্য পেতেই হবে।’

পুরনো রাজকন্যা আয়েশার লক্ষ্য ॥ ‘২০১৩ সালে ১০০ ও ২০০ মিটারে দৌড়ে স্বর্ণ জিতেছিলাম। কিন্তু হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে ২০১৪ আসরে অংশ নিতে পারিনি। এ জন্য খুব হতাশ হয়েছিলাম। এবার ১০০ মিটারে আবারও স্বর্ণ জেতে সেই হতাশা দূর করেছি।’ কথাগুলো আয়েশা সিদ্দিকা কেয়ার। এবারের জাতীয় জুনিয়র এ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতার প্রথমদিনে ১০০ মিটার স্প্রিন্ট বালিকা ইভেন্টে স্বর্ণপদক পায় বিকেএসপির এ্যাথলেট আয়েশা। তার টাইমিং ছিল ১২.৭৫ সেকেন্ড।

লালমনিরহাটের মেয়ে আয়েশা ছোটবেলায় তবে দৌড়াতে ভালবাসত। ২০০৮ সালে স্কুল ও আন্তঃস্কুল এ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় ১০০ ও ২০০ মিটার দৌড়ে প্রথম হয়। এই দুটি ইভেন্ট ছাড়াও লংজাম্পও খেলত উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আয়েশা। ব্যবসায়ী বাবা আমিনুর রহমান এবং ফুটবলার ফুপা মোঃ আজিজুলের উৎসাহেই এ্যাথলেটিক্স ক্যারিয়ার বেছে নিয়েছে আয়েশা। তাদের দুজনের আগ্রহেই সে বিকেএসপিতে ভর্তি হয় ২০০৯ সালে।

মুদি দোকানদের ছেলে আশরাফের ট্র্যাক জয় ॥ ১০০ মিটারের বালক ইভেন্টে স্বর্ণপদকধারী বিকেএসপির স্প্রিন্টার আশরাফুজ্জামান। টাইমিং ১০.৯০ সেকেন্ড। ২০১৪ সালেও এ প্রতিযোগিতার একই ইভেন্টে স্বর্ণপদক জিতেছিল সে। বাগেরহাটের ছেলে আশরাফ। বাবা মুদি দোকানদার। স্প্রিন্টে তার আদর্শ ওসাইন বোল্ট এবং দূরপাল্লার দৌড়ে মোহাম্মদ ফারাহ্। ছোটবেলায় স্কুলে দৌড়ের ইভেন্টে নিয়মিত সাফল্যই তাকে নিয়ে আসে বিকেএসপিতে। ভবিষ্যত লক্ষ্য? ‘সাফ গেমসে হতে চাই দ্রুততম মানব।’

দিশার কান্না ॥ বালিকা লংজাম্প ইভেন্টে অন্যতম শিরোপা প্রত্যাশী হয়েও ন্যূনতম তাম্রপদকও পায়নি মানিকগঞ্জের মেয়ে, সুদর্শনা দিশা। ফলাফল ঘোষণার আগেই বুঝে ফেলে সে কি হতে যাচ্ছে। হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে সে। উদভ্রান্তের মতো বসে পড়ে ট্র্যাকে। দেখাচ্ছিল ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। চোখ বেয়ে গড়াচ্ছে অঝোড় অশ্রুধারা। সতীর্থরা এগিয়ে যায় তার দিকে। চেষ্টা করে সান্ত¡না দেয়ার। কিন্তু কিছুতেই তাতে স্বাভাবিক হয়নি দিশা। বাধা মানেনি আবেগ। বেড়ে যায় কান্নার দমক।

একটু পরেই দিশার আরেকটি ইভেন্ট শুরু হবে। ৪ গুণিতক ১০০ মিটার রিলে। সব প্রতিযোগী ট্র্যাকে দাঁড়িয়ে অবস্থান নিয়ে। মাইকে বার বার উচ্চারিত হচ্ছে দিশার নাম। সতীর্থরা উদ্বিগ্ন হয়ে দিশাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে ট্র্যাকে পাঠানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু দিশা কিছুতেই কারুর কথা শুনছে না।

এক পর্যায়ে খবর পেয়ে ব্যস্ত হয়ে দিশার কাছে ছুটে যান দেশের সাবেক প্রখ্যাত এ্যাথলেট এবং বর্তমানে বিকেএসপির উপ-পরিচালক (প্রশিক্ষণ) শামীমা সাত্তার মিমু। দিশা তাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে। মিমু দিশাকে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন। সেই সঙ্গে দিলেন সান্ত¡নার বাণী, ‘তোমার এ কান্নাই একদিন তোমাকে জেতাবে। এ শোকই হবে জয়ের শক্তি। এটা তোমার হার নয়, এটা হবে তোমার জেদ!’

মাইকে দিশার নাম বলা হচ্ছে। মিমুও পারলেন না দিশাকে ট্র্যাকে পাঠাতে। ট্র্যাকে না গিয়ে দিশা কাঁদতে কাঁদতে তার ট্রাউজার্স পড়ে ফেলল। মিমু বুঝতে পারলেন দিশার মনের অবস্থাটা, ‘আসলে এ অবস্থায় ও দৌড়ালে রেজাল্ট ভাল হবে না। থাক তাহলে।’

এ আসরে ২০১৪ সালে ১০০ মিটার বালিকা ইভেন্টে স্বর্ণপদক পেয়েছিল দিশা। তার টাইমিং ছিল ১৩.২০ সেকেন্ড। কোচ আবদুল্লাহ্-হেল-কাফি ও ফৌাজিয়া হুদা জুঁইয়ের নাম উল্লেখ করে সে তাদের অবদানের কথা তখন জানিয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই এ্যাথলেটিক্স ভালবাসত ও স্কুলের খেলাগুলোতে নিয়মিত ভাল রেজাল্টও করত দিশা এ জন্য দ্বিতীয় কোন খেলা বেছে নেয়ার কথা ভাবেনি সে।

দিশা যখন অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী, তখন বিকেএসপিতে ভর্তি হয়। গত বছর ১০০ মিটার স্প্রিন্টে জিতে সে বলেছিল, ‘সাফল্যের জন্য পর্যাপ্ত অনুশীলনের বিকল্প নেই। ক্যারিয়ার নিয়ে ভবিষ্যত লক্ষ্য হচ্ছে সাফ গেমসে দেশের হয়ে খেলতে এবং দেশের জন্য সোনা জেতা।’ এখন দেখার বিষয়, শোককে শক্তিতে পরিণত করতে পেরে আগামীতে দিশা অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারে কি না।

প্রকাশিত : ২৭ মে ২০১৫

২৭/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: