কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রোহিঙ্গা নিপীড়ন ॥ বিপন্ন মানবতা

প্রকাশিত : ২৭ মে ২০১৫
  • কামরুল হাসান

দারিদ্র্য, রাজনীতি ও গুম হওয়ার মতো ঘটনা বাধ্য করছে হাজারো রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়তে। ভয়াল সাগরের দুর্বিষহ নৌযাত্রাও নিতান্ত মামুলি ঠেকছে তাদের। মিয়ানমারের নিকটবর্তী দেশসমূহে আশ্রয় নিতে হতভাগ্য এমন মানুষের শেষ ঠিকানা হচ্ছে এখন গণকবর। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মানব পাচারকারীদের এমন নিষ্ঠুরতার অনেক নিদর্শন এখন উঠে আসছে খবরের পাতায়। অন্যদিকে সাগরে ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ শুনতে যখন প্রতিবেশী দেশসমূহ অনীহা প্রকাশ করছে, তখন মানবতার টানে এগিয়ে আসছে স্থানীয় জেলে কিংবা অধিবাসীরা। জাতিসংঘ, ইইউ কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ নিয়ে উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এমন গণহত্যার দায় বহন না করে বরং ক্রমাগত উন্নাসিকতাই প্রকাশ করছে।

রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নিগৃহীত জাতি, যারা ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার। পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের অধিবাসী এসব মানুষকে রাষ্ট্র নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এমনকি রাষ্ট্রের ১৩৫ নৃগোষ্ঠীর তালিকাতেও তাদের স্থান নেই। বিগত কয়েক যুগ ধরে এসব মুসলিমকে রাষ্ট্রীয় কোন নিরাপত্তা দেয়া হয় না, যার ফলে রাখাইনের মুসলিমবিরোধী জনগোষ্ঠী, সামরিক সরকারের বিশেষ বাহিনী ও বৌদ্ধ ধর্মের একটি অংশ নির্বিচারে রোহিঙ্গা নিধনে উৎসাহী হচ্ছে। মিয়ানমারের সরকার কিংবা অন্য নৃগোষ্ঠীর রোহিঙ্গাদের প্রতি এমন ঘৃণার অন্যতম কারণ তাদের বাঙালী পরিচয়। মুসলিম নয় বরং বাঙালী পরিচয়ের কারণেই তাদের প্রতি মিয়ানমারের এমন ঘৃণা। মিয়ানমারের প্রতিটি জনগোষ্ঠী তাদের ঘৃণাভরে বাঙালী ডাকতেই পছন্দ করে।

২০১২ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্যাতন চালানো হয়। ধর্মীয় নেতাদের নির্দেশে হত্যাসহ তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়। ফলে রাখাইন রাজ্যের ১.১ মিলিয়ন রোহিঙ্গার মধ্যে এক লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়। এমনকি তাদের দেশ ছাড়ার অনুমতিও দেয়া হয়নি। আশ্রয় শিবিরের অমানবিক জীবন থেকে মুক্তি পেতে তখন অনেকেই সাগর পাড়ি দিয়ে প্রতিবেশী দেশে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে আশ্রয় নেয়। কেবল এ বছরই আনুমানিক ২৫ হাজার রোহিঙ্গা অবৈধ উপায়ে সাগর পাড়ি দেয়। তাদের লক্ষ্য বর্ষা মৌসুমের আগে দেশত্যাগ করা। কারণ বর্ষা এলেই উত্তাল সাগরে নৌকা পাড়ি দেয়া বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। জানুয়ারি থেকে মার্চ অবধি এমন অবৈধ উপায়ে দেশ ছাড়তে গিয়ে প্রাণ হারায় ৩০০’র বেশি রোহিঙ্গা। এছাড়া যে হারে গণকবরের সন্ধান মিলছে, তাতে এ সংখ্যা হাজার ছাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ১৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ হারুন একজন সাংবাদিককে তার এমন দুর্বিষহ যাত্রার বর্ণনা দেয়। হারুন জানায়, সে ও তার পরিবারের সাত সদস্য জনপ্রতি ৫০০ ডলারের বিনিময়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার লক্ষ্যে দালালদের শরণাপন্ন হয়। দালালচক্র এই টাকার বিনিময়ে একটি ছোট নৌকায় সাগরের গভীরে তাদের বড় নৌকায় পৌঁছে দেয়। বড় নৌকায় তাদের আবারও জনপ্রতি ২০০০ ডলার প্রদান করতে হয়। দরিদ্র রোহিঙ্গাদের কাছে এ পরিমাণ অর্থ বিশাল ব্যাপার। বড় জাহাজে আনুমানিক ৩০০ রোহিঙ্গা মালয়শিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমায়। তাদের জাহাজে তখন কোন খাদ্য কিংবা পানি কিছুই ছিল না। অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মাঝপথে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর টহল দল জাহাজটিকে পুনরায় দেশে ফিরিয়ে নেয় এবং পুনরায় তাদের শরণার্থী শিবিরে স্থান হয়। হারুন জানায়, সে নিজ দেশে ফিরে এসে আনন্দিত। তবে সে অত্যন্ত আগ্রহভরে পুনরায় দেশত্যাগের চেষ্টা করবে। সাগরের উত্তাল প্রকৃতির চেয়ে বরং ভূমিদস্যুদের মোকাবেলা করাই যেন কঠিন।

২০১২ সালের পর রোহিঙ্গারা কখনই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেনি। তাদের বসতভিটা দখল করা হয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। স্বাভাবিক জীবন ছেড়ে বাধ্য করা হয় শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে। অধিকাংশ রোহিঙ্গা কৃষি কিংবা মৎস্য শিকার করে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কারণে এখন কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসাই দুষ্কর হয়ে উঠেছে। ফলে বাধ্য হয়ে সাগরে পাড়ি জমাচ্ছে এসব রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের এমন বিচ্ছিন্ন রাখার পেছনে কর্তৃপক্ষের যুক্তি, ভবিষ্যত হামলা হতে রক্ষা করতেই সরকারের এমন ব্যবস্থা। রাখাইন অঞ্চলের অন্যান্য নাগরিকের মতো তারা কোন সুবিধা ভোগ করে না। বিগত তিন বছর ধরে রোহিঙ্গা ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনুমতি দেয়া হয় না। কেবল জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণেই হাসপাতালে ভর্তির অনুমতি পাওয়া যায়। এমনকি আদমশুমারিতেও তাদের বাঙালী হিসেবে অন্তুর্ভুক্ত করা হয় এবং নাগরিকত্ব বাতিলের হুকুম দেয়া হয়। এর প্রতিবাদে অধিকাংশ রোহিঙ্গা আদমশুমারিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করতে অনীহা দেখায়। মিয়ানমানের বর্তমান সরকারের এমন বাঙালি বিদ্বেষের পেছনের কারণ কেবল ভোটের রাজনীতি। সেনাবাহিনীর একটি অংশ ও ক্ষমতাসীন সরকার নিজ তাগিদেই এমন বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ শাসকগোষ্ঠী জানে, বাঙালি বিদ্বেষ তাদের ভোটের রাজনীতিতে অনুকূল প্রভাব ফেলবে। এমনকি নোবেলজয়ী অং সান সুচি, যিনি দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের মানবাধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন, তিনিও এ বিষয়ে নিশ্চুপ রয়েছেন। কারণ ভোটের হিসাব-নিকাশ তাঁর কাছেও জানা। সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সংখ্যগুরুর রায় হারাতে চান না এই নোবেলজয়ী নেত্রী। তাঁর এমন নির্লিপ্ততা সেনাবাহিনীকে রোহিঙ্গা নিধনে আরও উৎসাহ যোগাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা শতাব্দী ধরে বসবাস করা ভূমি ছেড়ে অগত্যা সাগর পাড়ি জমাচ্ছে। বর্ষা মৌসুম শেষ হয়ে সমুদ্র কিছুটা শান্ত হলে এমন সাগর পাড়ি দেয়ার ঘটনা তখন আরও বৃদ্ধি পাবে।

প্রকাশিত : ২৭ মে ২০১৫

২৭/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: