কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

চিঠি মানুষকে আপন করে

প্রকাশিত : ২৬ মে ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

হাশেম আলীর বয়স পঁয়ষট্টি পার হয়েছে বছর দুয়েক আগে। এই বয়সে এসেও তিনি বেশ চনমনে। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ঘড়ি দেখে ঝাড়া ত্রিশ মিনিট হাঁটেন। নিজের হাতে বাগানের পরিচর্যা করেন। সেই বাগানে মরিচ, টমোটো, ধনেপাতা, ভেন্ডির আবাদ করেন। আশপাশের মানুষজন হাশেম আলীর এমনতরো কর্মকা- দেখে চোখ কপালে তুলে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, বুড়ো পারেও বটে! এই বয়সে এসেও তরুণদের হার মানায়। গ্রামের বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে বেশ সুখেই আছেন। অবসরে প্রচুর বই পড়েন। বই পড়তে ভাল না লাগলে ডায়েরি লেখেন। তাতে ফেলে আসা দিনের কথা লেখেন। অভিজ্ঞতার কথা লেখেন।

হ্যাঁ, হাশেম আলীর নিজেও তা-ই মনে হয়। হাশেম আলী নিজেকে এখনও সাতষট্টি বয়সের তরুণই মনে করেন। বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। বিদেশী এক ফার্মে কাজ করে। মোটা অঙ্কের বেতন। ছেলের বউ একটা এনজিওতে কাজ করে। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে ভরা সংসার। ছেলেটা বড়। মেয়েটা ছোট। ছেলে ব্যবসায় প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর মেয়েটা ক্লাস নাইনে। দুজনই তাদের বাবার মতো মেধাবী।

হাশেম আলী যখন তাঁর ছেলের বাড়িতে এসে পৌঁছলেন তখন ঠিক দুপুর। বেশ গরম পড়েছে। তিয়াস বাড়িতেই ছিল। দাদাকে দেখে চোখ কপালে তুলে ও বলল, আরে দাদা তুমি! উইদাউট নোটিশে চলে এলে? একটা মেসেজ, না হয় একটা ফোন দিলেও তো পারতে-

হাশেম আলী তিয়াসের কথায় হাসলেন। হাশেম আলীর দেখাদেখি তার স্ত্রীও হেসে ফেললেন, পোলার বাইতে আমু, হেইডাও আগে থিকা মেসেজ, আর টেলিফোনে জানান দিতে হইবো?

দাদি তুমি যে কী বলো? এখন তথ্যপ্রযুক্তির যুগ- তিয়াস কথাগুলো বেশ স্মার্টলি বলার চেষ্টা করছিল। কিন্তু হাশেম আলী নাতিকে আর কথা বলার সুযোগ দিলেন না। তিয়াসের মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে তিনি বললেন, আরে রাখ তোদের তথ্যপ্রযুক্তির যুগের কথা। তথ্যপ্রযুক্তি-তথ্যপ্রযুক্তি বলতে বলতে মানুষ যে কোথায় যাচ্ছে-

কোথায় যাচ্ছে মানে? দাদা হোয়াট ডু ইউমিন বাই-

তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের আবেগ-টাবেগ সব হারিয়ে যেতে বসেছে। মানুষগুলো সব কেমন যন্ত্রের মতো হয়ে যাচ্ছে। সব গোল্লায় চলে যাচ্ছে।

দাদার কথায় তিয়াস একটু ভিরমি খায়। বলে কী! আমতা-আমতা করে তিয়াস জবাব দেয়, বলে, দাদা তুমি কী তাহলে ডিজিটাল জগতকে ডিনাই করছ?

তিয়াসের কথা শুনে হাশেম আলী যারপর নাই বিস্মিত হয়ে যান, তোদের এসব ভারি ভারি কথা-বার্তা আমার পছন্দ হয় না। আমাদের সময়ে আজকের মতো এতসব সুবিধাদি ছিল ন।া তাই বলে আমরা কী মূল ধারা থেকে বেলাইনে চলে গিয়েছি? হাশেম আলীর কথায় তাঁর স্ত্রী মাথা নেড়ে সায় দেন।

তার মানে আমরা কী সবাই বেলাইনে আছি? তিয়াসের চোখে মুখে একটা অসহায়ের ছাপ লেগে রয়েছে।

শোন, চারদিন আগে আমি আর তোর দাদি তোকে আর তৃষ্ণাকে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। পাসনি?

এবার তিয়াসের মনে পড়ল। তৃষ্ণা তো গতকালই তাকে চিঠির কথা বলেছিল। লজ্জায় নিজেই নিজের জিভ কাটল সে তৃষ্ণা আমাকে চিঠির কথা বলেছিল, কিন্তু আমি যে তোমাকে ফোন করে জানাব সেটা একদম ভুলে গেছি। স্যরি দাদা, স্যরি দাদি-

তা তো ভুলবিই- এখন তো তোরা ই-মেইল, ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, পিন্টারেস্ট লিংকভইন আরও কত সিস্টেমে চলাফেরা করস। দাদা-দাদির চিঠির কথা কী আর তোদের মনে থাকবে?

তিয়াস ওর ভুল বুঝতে পারে। সে আর কথা বাড়ায় না।

আমরা মানে তোরা যাদের বুড়ো-হাবড়া মনে করিস, আমরা এখন থেকে ঠিক করেছি, নিজেরা নিজেদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখব চিঠিপত্রের মাধ্যমে। নিয়ম করে চিঠি লিখব। যে যেখানেই থাকুক যোগাযোগ হবে চিঠির মাধ্যমেÑ

দাদা, এ যুগে কী কেউ চিঠি লেখে! তিয়াসের বিস্ময় আরও গাঢ় হয়।

কেন চিঠি লিখবে না? অভ্যাস করলেই হলো-

ও মাই গড! আমার পক্ষে কখনই সম্ভব নয় কাগজ-কলম নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা চিঠি লেখা।

শোনরে তিয়াস, চিঠি লিখলে মনের ভেতর টান বাড়ে। আবেগটা ভালভাবে প্রকাশিত হয়। আর যার কাছে চিঠি লিখবি তাকে খুব কাছের মানুষ বলে মনে হয়। আর চিঠি লিখলে বানান, সঠিকভাবে বাক্য লেখার প্র্যাকটিসটাও হয়ে যায়।

দাদার কথা শুনে তিয়াস অবাক না হয়ে পারে না।

হ্যাঁ, বাবা আপনি ঠিকই বলেছেন। সারাদিন পড়াশোনার বাইরে ল্যাপটপ, ইনবক্স, ফেসবুক, টুইটার নিয়ে ভাইবোন পড়ে থাকে। বলতে বলতে ভেতরে ঘর থেকে মা এসে দাদা-দাদির পা ধরে সালাম করছেন।

মায়ের কথা শুনে তিয়াস দাদা-দাদির দিকে এমনভাবে তাকাল যে, মনে হলো এই প্রথমবার সে তাঁদের দেখছে।

প্রকাশিত : ২৬ মে ২০১৫

২৬/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: