মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

তারুণ্যের প্রতীক

প্রকাশিত : ২৬ মে ২০১৫
  • অঞ্জন আচার্য

নতুন সহস্রাব্দের প্রথম দশক পেরিয়ে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম বিভিন্ন বিষয়ে কী ভাবে- এ নিয়ে একটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ব্রিটিশ কাউন্সিল। প্রতিবেদনটিতে ফুটে ওঠে আজকের তারুণ্যের ভাবনা। ডেটা ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের সঙ্গে অংশীদারিত্বে ব্রিটিশ কাউন্সিল পরিচালিত ওই জরিপে যেসব বিষয়ে তরুণদের ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে, তার মধ্যে আছে মূল্যবোধ, দায়িত্ব-কর্তব্য, পরিচয়ের স্বকীয়তা, সামাজিক দায়বদ্ধতা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সাফল্য ইত্যাদি। জরিপটিতে তরুণদের আদর্শ ব্যক্তিত্ব (রোল মডেল) হিসেবে দুটি নাম রয়েছে শীর্ষে। তাঁরা হলেন- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি, আর হাতে রণতূর্য’Ñ নজরুলের জীবনের মতোই বৈচিত্র্যে ভরা নজরুল সাহিত্য ও নজরুলসঙ্গীত। এ সবই হয়ত টানে তরুণ প্রজন্মকে। তাঁদের পছন্দের তালিকায় নজরুল কেন? নজরুল গবেষক রশীদ হায়দার বলেন, ‘কারণ জানতে একটু ইতিহাস টানতে হয়। যে পরিবেশ-পরিস্থিতিতে নজরুল বেড়ে উঠেছেন, এ জন্য তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিশোরবেলায় মাতৃভূমি ছেড়ে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুরে তাঁকে আসতে হয়েছিল। জীবিকার জন্য কখনও লেটো দলে গান গেয়েছেন, কখনও রুটির দোকানে কাজ করেছেন। কিশোরকাল পেরিয়ে তিনি যুদ্ধে গেলেন। যুদ্ধের ভয়াবহতা তাঁর জীবনে রেখাপাত করল। এ সময় কামালপাশার মতো ‘হিরো’র প্রভাব পড়ে নজরুলের জীবনে।’ তাঁর মতে, ‘ব্রিটিশ শাসনামলে পরাধীনতা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন নজরুল। বিদ্রোহের চেতনার শুরু তখন। আজ থেকে ৯৪ বছর আগে ১৯২১ সালে তিনি লেখেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। এ কবিতা ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা-আন্দোলনের জন্য ছিল একটা বাঁক। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তব্য যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য একটা বাঁক, সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তেমনই ইংরেজবিরোধী গণজাগরণ জাগিয়ে তোলে। এত বছর পর এসেও আমাদের শরণাপন্ন হতে হয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতার।’ রশীদ হায়দার বলেন, ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এখনও তাঁকে জাগায়। ভবিষ্যতেও জাগিয়ে যাবে। অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার থাকবেই। তাই ‘বিদ্রোহী’ চিরকালের এক কবিতা। আর এসব কারণে আজও তরুণদের পছন্দের তালিকায় থাকেন নজরুল। নজরুলের যে অসাম্প্রদায়িক, মানবতাবাদী দর্শন বা জীবনাচরণ- সেসবই আকৃষ্ট করে আজকের তারুণ্যকে। তরুণ প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে

নজরুলকে

কীভাবে

মূল্যায়ন করেন?- জানতে চাইলে গণমাধ্যমকর্মী জোবায়ের ইকবাল বলেন, ‘নজরুলকে বলা হয় বিদ্রোহী কবি। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় বিদ্রোহের আগে তাঁকে অভিমানী কবি বলা উচিত। কারণ তাঁর সকল বিদ্রোহে নীরব-সরব ও নিরপেক্ষ অভিমানের উসকানি, সম্মতি ও নিয়ন্ত্রণ স্পষ্টতই পরিলক্ষিত হয়। কবি ও অকবি যা-ই বলা হয়েছে, মুখ বুঁজে তা-ই সয়েছেন তিনি, কিন্তু তাঁর কলমের ধৈর্য বোধ হয় তাঁর মুখের মতন এতটা সহনশীল ছিল না। জীবনের প্রতিটা সংগ্রামে যতগুলো আঘাত তিনি পেয়েছেন, কলমের দেহের কালি দিয়ে কাগজের বুকে প্রতিটি আঘাতের ছবি তিনি এঁকেছেন।’ তাঁর মতে, ‘মানুষকে মানুষ হিসেবেই মূল্যায়ন ও সম্মান করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা নজরুলের ছিল, বিষয়টা যতটা সহজ আমরা মনে করি না কেন, তাঁর মতো এভাবে মনে প্রাণে ধারণ করার মতো বোধ বা শিক্ষা আজও আমাদের হয়নি। মানুষকে মানুষ ভাবার একটা সমস্যা হলোÑ মানুষের সকল অপমান, সকল আঘাত খুব আপন হয়ে নিজের বুকে লাগে। তাই তিনি বার বার সাম্যের গান গেয়েছেন, মানুষের সঙ্গে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর কাব্যসাহিত্য হয়ে উঠেছে প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী।’

জোবায়ের বলেন, ‘মানুষের পক্ষে গান গাইতে গিয়ে রীতিনীতি সমাজ ধর্মের বিরুদ্ধে তলোয়ারের মতোই কলম চালিয়েছেন। আবার সেই রীতিনীতি সমাজ ধর্মের ভেতর থেকে মানুষের পক্ষের নির্যাসটুকুও বের করে এনে বলেছেন, ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’।

নজরুল প্রসঙ্গে তরুণ সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিককর্মী মৌমিতা জান্নাত বলেন, ‘আমার কাছে নজরুল আর তারুণ্য সমার্থক একটি ব্যাপার। তারুণ্যের আবেদন যেমন তীব্র, নজরুলের প্রকাশও তেমনি তীব্র আর শক্তিশালী। তাই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যাদের একটু হলেও পাঠাভ্যাস আছে, দিক নির্দেশনার জন্য তারা নজরুলের শরণাপন্ন হতেই পারে। বিপ্লব-বিদ্রোহ যেমন তারুণ্যের স্বভাবজাত বিষয়, তেমনি প্রেমও তারুণ্যের বর্ণময় একটি অংশ। আর প্রেম ও বিপ্লবের আশ্চর্য নান্দনিক সমাবেশ ঘটেছে নজরুলের সব সাহিত্যকর্মে।’

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় নজরুলের অপূর্ব কীর্তি তাঁর গান। কবিতার মধ্যে যেমন কবির রাজনৈতিক, বৈপ্লবিক কিংবা সাম্যবাদ দর্শন প্রকটভাবে এসেছে, তেমনি গানের মধ্যে সর্বাগ্রে দেখা দেন প্রেমিক নজরুল। যতদূর জানি প্রায় তিন হাজার গান রচনা করেছেন বিস্ময়কর এই গীতিকার। শুধু বাংলা ভাষায় না, সারা পৃথিবীতে সম্ভবত সর্বোচ্চসংখ্যক গানের রচয়িতা তিনি। আর গানগুলোতে কতই না বিচিত্র রাগের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। ‘কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট’, কিংবা ‘চল চল ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’-এর মতো আগুনমুখী গান যেমন আছে, তেমনি ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানি’ অথবা ‘তুমি হাতখানি যবে রাখো মোর হাতের পরে’-এর মতো প্রেম বৈভবে পরিপূর্ণ সব গান। এছাড়া অসাম্প্রদায়িক একজন মানুষ একই সঙ্গে কতটা ভক্তিবাদী হতে পারেন, তার উদাহরণ কবির ভক্তিমূলক গানগুলো। কি অসাধারণ সব গজল আর শ্যামাসঙ্গীত প্রেম আর করুণাধারায় পরিপূর্ণ। সুরের ক্ষেত্রে যেহেতু নানা ধরনের রাগ আর তালের সমাবেশ ঘটিয়েছেন, তাই গানগুলো আমাদের খুবই মেলোডিয়াস মনে হয়। আর তরুণদের তো মেলোডির প্রতি আগ্রহ বরাবরই বেশি। প্রায় আড়াই হাজার গানের স্বরলিপি নজরুল নিজে এবং তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে হয়েছিল বলে জানি। নজরুল একাডেমির সংগ্রহে এগুলো আছে শুনেছি। তারপরও আমরা ঘুরে ফিরে নজরুলের মাত্র এক দেড়শ’ গান শুনতে পাই। যারা নজরুলের গান নিয়ে গবেষণা করেন তাদের কাছে অনুরোধ থাকবে কবির অন্য গানগুলোকে সাধারণের কাছে পরিবেশন করার জন্য।’

মৌমিতা আরও বলেন, ‘একজন নারী হিসেবে নজরুল আমার কাছে অপরিহার্য আরও একটি কারণে। নজরুল সাহিত্যে যে সাম্যবাদের ঘোষণা দিয়েছেন, সেখানে বার বার উচ্চকিত হয়েছে নারী পুরুষের সাম্য। মোল্লা-পুরুততন্ত্রের সেই যুগে কি আশ্চর্য নির্ভীকতায় উচ্চারণ করেছেন হাতে রুলি পায়ে মল মাথায় ঘোমটা ছিড়ে ফেলো নারী, ভেঙে ফেলো ও শিকল যে ঘোমটা তোমায় করিয়াছে ভীরু, ওড়াও সে আবরণ দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন যেথা যত আভরণ। তাই এই প্রজন্মের একজন নারী হিসেবে আমি ব্যক্তিগতভাবে নজরুলের কাছ থেকে শক্তি পাই। নজরুলের ব্যক্তিজীবনটাও আমার কাছে বিস্ময় আর রহস্যে পূর্ণ মনে হয়। নিতান্তই গরিব ঘরের একজন বালক জীবনের প্রথমভাগে যাকে মসজিদের মোয়াজ্জিন, রুটির দোকানের কর্মচারী, লেটো দলের গানের বালক কিংবা যুদ্ধ সৈনিকের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, পূর্ণ বয়সে সে কি করে এত বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হয়! ব্যক্তিজীবনে যাকে প্রতি মুহূর্তে দারিদ্র্য আর স্বজন হারানোর বেদনার মধ্য দিয়ে পার করতে হয়েছে, সৃষ্টিজীবনে কি করে এত উচ্ছ্বাস আর দুর্নিবার অগ্রগামিতার উৎসে পরিণত হন তিনি?

প্রকাশিত : ২৬ মে ২০১৫

২৬/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: