মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

সাদা-কালো দিনগুলো এবং ঢাকার মেয়র আনিসের কথা

প্রকাশিত : ২৬ মে ২০১৫
  • কারমাইকেল শতবর্ষ
  • শরীফা খন্দকার

রংপুর কারমাইকের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের শতবর্ষের সুমধুর স্মৃতিচারণে লেখিকার কলমে সততই উঠে এসেছে সে সময়ের পারিপার্শ্বিকতা, পরিবেশ-পরিস্থিতি, রাজনীতি, ’৬৯-এর গণআন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে অনিবার্যভাবে উঠে এসেছে মেধাবী সহপাঠী আনিসুল হকের কথাও। ২৫ মে’র পর আজ পড়ুন তৃতীয় কিস্তি...

কিন্তু সেদিন স্যার অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে শুরু করেছিলেন পাঠের বাইরে দীর্ঘ এক ভাষণ- ‘অসুন্দর দিয়ে কোন মেয়ের মন জয় করা যায় না আর এমন সেন্সটুকু না থাকায় তোমরা কেউ কেউ নুইসেন্সের মতো কাজ শুরু করেছ! শোনো হে, জীবনটা তো সবে শুরু, লেখাপড়া শেষ করতে অনেক পথ বাকি। তোমরা জান কি এই শহরে কিছু ব্যাচেলর তরুণ ছেলে ম্যাজিস্ট্রেট, এসডিও এসব লুক্রেটিভ পদে যোগদান করেছে? আর নৈশ আহারে অভিজাত কোন না কোন বাড়িতে প্রতিদিনই এদের নেমতন্ন থাকে? এটা জেনে ঈর্ষান্বিত হবে যে, সেসব গৃহে রয়েছে সুন্দরী কোন অবিবাহিত কন্যা। এমনটি যদি হতে পারো তবে শুধু মেয়েরা নয়, মেয়ের বাবারা সুদ্ধ তোমাদের পেছনে ছুটবে।’

এ মতো জ্ঞানার্জনের পর সরলমতি ফচকেগুলো সত্যি সত্যি খুবই চুপচাপ হয়ে বেশ মন দিয়েছিল পাঠে।

আমরা প্রথম দিন লজিক ক্লাসে এমন এক শিক্ষককে পেয়েছিলাম, যিনি পোশাকে চালচলনে সে সময়ের স্মার্ট অধ্যাপকদের থেকেও একেবারে ব্যতিক্রমধর্মী। তিনি ফিলোসফির প্রধান কলিমুদ্দিন আহমেদ। হাঁটুর অনেক নিচে পাঞ্জাবির ঝুল, মুখের দাড়িটিও বেশ লম্বা। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। শ্মশ্রুম-িত হাস্যোজ্জ্বল মুখটি ছিল প্রশান্ত এক দার্শনিকের। প্রথম ক্লাসেই কলিম স্যার লজিক থেকে চলে গিয়েছিলেন তার কলকাতার ছাত্রবেলার গল্পে। আমরা আশ্চর্য হয়ে শুনলাম, সে সময় তার সবচেয়ে প্রিয় অভ্যাস ছিল খ্রীস্টানদের সমাধিস্থানে ঘুরে বেড়ানো। কারণ সমাধিপ্রস্তরে লেখা ইংরেজী কথামালা ও কবিতাছত্র দুর্বার আকর্ষণে যুবক কলিমুদ্দিনকে টেনে নিয়ে যেত সেখানে। একদিন তিনি সেই প্রান্তরে হাঁটতে হাঁটতে দর্শন পেয়েছিলেন বাংলা ভাষায় লেখা রতœসম এক কবিতা দিয়ে আকীর্ণ সমাধিস্তম্ভ।

‘দাঁড়াও, পথিক-বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল!

এ সমাধিস্থলে (জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি বিরাম )

মহীর পদে মহানিদ্রাবৃত

দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!’

বাংলা ভাষার একমাত্র মহাকবি মধুসূদন দত্ত নিজ সমাধির জন্য লিখে গিয়েছিলেন যে কবিতা তা আমরা স্কুলের শেষ বর্ষেই পড়েছিলাম। অথচ সেটা মুখস্থ ছিল না। কিন্তু সম্পূর্ণ কবিতাটি কী অবলীলায় আবৃত্তি করে গেলেন স্যার ! দ্বিপ্রহরের আহার ও নামাজ শেষ করে তিনি আসতেন অনার্স সাবসিডিয়ারির ফিলোসফি ক্লাসে। তারপরই হয়ত পড়াতে শুরু করতেন হিন্দু ফিলোসফি- ব্যাখ্যা করতেন বেদ-বেদান্তের।

প্রবাস জীবনের শুরুর দিকে বসন্তের প্রথম দিনে কর্মস্থলের লবিতে এক ফুলওয়ালীকে দেখেছিলাম হলুদ রঙয়ের ড্যাফোডিল কুঁড়ি বিকোতে। ফার্স্ট ইয়ারের কবিতার ফুলকে সেদিনই আমার প্রথম দর্শন। প্রথম বর্ষে ওয়ার্ডসওয়ার্থের ড্যাফোডিল ফুলের অদেখা রূপ আমাদের অন্তরে যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকতেন সাইফুল ইসলাম স্যার। তিনি ছিলেন সম্ভবত কলেজের সবচেয়ে তরুণ ও মেধাবী অধ্যাপক। তখন জানতাম না স্যার ছিলেন কলকাতা প্রেসিডেন্সির ছাত্র। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস (সিএসপি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি চলে গিয়েছিলেন শিক্ষকতা ছেড়ে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের সচিব যখন তখন সৌভাগ্যক্রমে প্রবাসেই দেখা। কিন্তু মাঝখানে পেরিয়ে গেছে দু’যুগের বেশি। কেউ পরিচয় করিয়ে না দিলে চেনা ছিল দুঃসাধ্য। কিন্তু তাকে সত্যই চিনেছিলাম যখন নিউইয়র্কে স্যারের একমাত্র শপিং ছিল রবীন্দ্রনাথের গান। তিনি এরপর হয়েছিলেন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি ) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। অবসর নিয়ে ঢাকার নিকুঞ্জে বাড়ি বানিয়ে আমাদের ড্যাফোডিল পড়ানো শিক্ষক ই-মেইলে লিখলেন- ‘বাড়ির দেওয়াল ঘেঁষে লাগিয়েছি প্রতিটি ঋতুতে ফুটবে এমন ছটি সুগন্ধি ফুলের চারা।’

ষাট ও সত্তরের দশকে কলেজের ক্রীড়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রতিযোগিতার দিনগুলো ছিল উৎসবের দিন। কলেজ অঙ্গন ছাড়িয়েও সেগুলো সাড়া জাগাত সমগ্র শহরজুড়ে। এছাড়া ক্যাম্পাসে বছরে একদিন অনুষ্ঠিত হতো ওয়ানডে ক্রিকেট প্রতিযোগিতা- শিক্ষক বনাম ছাত্র একাদশ। ছাত্ররাই মাঠে দখলদারি করবে এমনটিই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটনা ঘটত উল্টো, স্যাররাই সাধারণত জিততেন। কারণ ছিল রাজপুত্র স্যার এবং সুনীলবরণ স্যারের অসাধারণ জুটি। কেমিস্ট্রির আজিজুর রহমান দেখতে ছিলেন খুবই হ্যান্ডসাম। সায়েন্সের মেয়েরা সে কারণে লুকিয়ে তার নাম দিয়েছিল রাজপুত্র। সুনীলবরণ ছিলেন কাঞ্চন বর্ণের আর এক সুপুরুষ। প্রতি বিকেলে নিয়মিত টেনিসও খেলতেন। তাদের ব্যাটিংয়ে যখন ঝড় উঠত মনে হতো একজন গ্যারি সোবার্স, অন্যজন পতৌদির নবাব।

উচ্চ মাধ্যমিক শেষে বাংলা সাহিত্যে অনার্স নিয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই এলো ছাত্র সংসদের নির্বাচন। ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল নির্বাচনী প্রচারণার ঢেউ। এমনি একদিন ক্যারম খেলছিলাম কমন রুমে। হঠাৎ জানালাপথে কানে এলো বহু কণ্ঠের গগনবিদারী স্লোগান। এক ছুটে বাইরে এসে দেখি কলেজের ছেলেরা দিক্দিগন্ত প্রকম্পিত করে ধ্বনি তুলছে অনন্য এক ভাষায়- ‘জয় বাংলা’! সমাবেশের নেতৃত্বে দেখেছিলাম আমাদের সিনিয়র ও সহপাঠীদের মধ্যে যারা মেধাবী বলে পরিচিত সেইসব ছাত্রকে। (চলবে)

লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী লেখিকা

sharifa.k@outlook.com

প্রকাশিত : ২৬ মে ২০১৫

২৬/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: