মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ১৬.১ °C
 
১৭ জানুয়ারী ২০১৭, ৪ মাঘ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

হাতিরঝিলে সৌন্দর্যের হাতছানি

প্রকাশিত : ২৫ মে ২০১৫
  • মাহবুবা সুলতানা

ইট-পাথরের কংক্রিটের এই শহরে মানুষের জীবনযাত্রাটাও কেমন যেন একঘেয়ে হয়ে যাচ্ছে। ছোট একটু বাসা, এক চিলতে ছাদ, ছোট একটা ঝুল বারান্দা- এ যেন কল্পনা মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য। আর এরপর অবকাশ যাপনের জন্য সুন্দর কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা তো চিন্তাই করা দায়। আমাদের এই ঘন বসতিপূর্ণ ঢাকা শহরে জায়গাটাই বা কোথায়? চারদিকে বড় বড় বিল্ডিং, এ্যাপার্টমেন্ট, এখানে সেখানে শপিং মল, শব্দ দূষণ, বায় দূষণের মধ্যে যাব তো কোথায় যাব? এইরকম দম বন্ধ করা সময়ে নগরবাসী যখন অস্থির, তখন এই নগরবাসীর বিনোদনের জন্য এক অনন্য নাম ‘হাতিরঝিল’। ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি নগরবাসীর জন্য যা কিনা উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। ঢাকা শহরের কেন্দ্রে উপস্থিত এই মনোরম এই স্থানটির চারপাশের এলাকাগুলো হলো তেজগাঁও, গুলশান, বাড্ডা, রামপুরা, নিকেতন, মগবাজার। তার মানে আপনি ঢাকা শহরের যেই প্রান্তের-ই বাসিন্দা হন না কেন, আপনার জন্য হাতিরঝিল আসাটা একদম-ই সহজ। হাতিরঝিল যে শুধু এর আশপাশের লোকজনের যাতায়াতের সুবিধা করে দিয়েছে তা নয়, ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থাতেও হাতিরঝিলে যাতায়াত করা খুবই সহজ। মূলত পূর্ব ও পশ্চিম ঢাকাকে এক করে ঢাকা শহরের রাস্তার ট্রাফিক জ্যাম কমানোর উদ্দেশে তৈরি করা এ রাস্তাটি, যেখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে রক্ষা করার দিকে জোর দেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে এটি নগরবাসীর বিনোদনে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে।

ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে উঁচু উঁচু দেয়ালের ভিড়ে স্বস্তির শ্বাস নেয়াটা যেখানে দুষ্কর সেখানে খোলা হাওয়ায় মনোরম পরিবেশে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ সত্যিই এক বিরাট পাওয়া। হাতিরঝিলকে যেন ছবি বলে মনে হয়, পুরো শহর থেকে আলাদা জ্যামহীন, পরিচ্ছন ফুটপাথ, আধুনিক ব্রিজ, লেকের চারধার ঘিরে প্রশস্ত হাঁটার রাস্তা আমাদের যেন ভুলিয়ে দেয় সেই ঢাকাকে, যেই ঢাকা আমার প্রতিদিন দেখে অভ্যস্ত। লেকটাকে কেন্দ্র করে ১৬ কিলোমিটার রাস্তা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে চারটা বড় ও চারটা ছোট ব্রিজ এবং পথচারীদের জন্য রয়েছে অসংখ্য ওভারপাস। আর লেকের পাড়ে রয়েছে অসংখ্য বসবার বেঞ্চ। হাতিরঝিল পুরোটাই যেন সবুজ দিয়ে ঘেরা। ব্রিজগুলোর গায়ের সবুজ গুল্ম, চারপাশের গাছ, লেক আর এর প্রাকৃতিক বিশুদ্ধ বাতাস, পুরো প্রোজেক্টের নয়নাভিরাম দৃশ্যÑ সব মিলিয়ে হাতিরঝিল আপনাকে এবং আপনার প্রিয়জনদের দেবে নির্মল আনন্দ।

এত গেল দিনের সৌন্দর্যের কথা। এবার আসি হাতিরঝিলের রাতের রূপের বর্ণনায়। ৩০২ একরের হাতিরঝিল রাতে যেন সেজে উঠে এক অপরূপ সাজে। এক উৎসব মুখর পরবেশের সৃষ্টি হয় এখানে। প্রতিটি ব্রিজের চোখ ধাঁধানো আলোর সৌন্দর্যের বর্ণনা দেয়াটা খুবই কঠিন। চোখে না দেখলে যেন এর সৌন্দর্য বোঝা যাবে না। দিনের চেয়ে রাতে হাতিরঝিল বেশি মুখর হয়ে উঠে দর্শনার্থীদের পদচারণায়। প্রশস্ত ব্রিজে, কিনবা ছোট ব্রিজের উপরে, অথবা লেকের পাড়ের বেঞ্চগুলোতে যেখানেই যেখানেই বসুন না কেন, পুরাটা হাতিরঝিল আপনার কাছে মনে হবে স্বর্গীয়।

শুধু ঘোরাফেরা নয়, সাইক্লিংয়ের জন্যও হাতিরঝিল খুবই ভাল জায়গা। জ্যামমুক্ত এলাকাতে আপনি একটু সাইক্লিং করে নিতে পারেন এখানে। দিন কিংবা রাত, দুই সময়েই হাতিরঝিলের আবেদন অন্যরকম। আপনার প্রাত ভ্রমণ কিংবা সান্ধ্য ভ্রমণের জন্যও এটি উপযুক্ত স্থান। নিরিবিলি পরিবেশে লেকের পাড় ঘিরে আপনার হাঁটার কাজটি আপনি সেরে নিতে পারেন। নীরব, শান্তিপূর্ণ এবং একই সঙ্গে সুন্দর জায়গার বড় অভাব এই ঢাকা শহরে। সেইখানে হাতিরঝিল একদমই ব্যতিক্রম জায়গা। শুধু ঢাকারই নয়, হাতিরঝিলের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেশের দূর-দূরান্ত থেকেও লোকজন আসে। নগরবাসীর দাবি, এর মতো আর অনেক জায়গা তৈরি করা উচিত শহরে। যাতে করে নগরজীবন আরও একটু স্বস্তি পায়।

পাঠকদের সুবিধার জন্য জানিয়ে রাখি, হাতিরঝিলের কাজ এখনও পুরোপুরিভাবে শেষ হয়নি। পুরো কাজটি তদারকি করছে বাংলাদেশ আর্মি এবং স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন। থিয়েটার, পার্ক, বাগানসহ আরও অনেক প্রোজেক্টের কাজ এখনে বাকি আছে। লেকের মগবাজারের দিকটাতে একটি ওয়াটার প্লাটফর্ম করার প্লান আছে যেখান থেকে উঠে পুরো লেকে ঘোরা যাবে। লেকে আরও থাকবে ওয়াটার ট্যাক্সি যেটি গুলশান-১ পর্যন্ত যাবে এবং পরবর্তীতে রুটটা গুলশান-২ পর্যন্ত বর্ধিত করা হবে। লেকের বাড্ডা-পশ্চিম রামপুরার দিকটাতে একটি ইকো সেন্টার যেখানে বিভিন্ন রকমের প্রাণী ও উদ্ভিদের সমারোহ থাকবে। ধারণা করা যায় পুরো পরিকল্পনাগুলো যদি বাস্তবায়িত হয় তবে হাতিরঝিল হয়ে উঠবে আরও আকর্ষণীয়।

কিভাবে যাবেন

এবারে জানিয়ে দেই কেমন করে আপনি যাবেন হাতিরঝিলে। আপনি যদি মোহাম্মদপুর এলাকার বাসিন্দা হয়ে থাকেন তাহলে আপনি বিজয়সরণী হয়ে তেজগাঁও লিংকরোড হয়ে সমকাল অফিসের সামনে দিয়ে হাতের ডানে গেলেই হাতিরঝিল কিংবা লিংকরোড পার হয়ে আপনি সোজা চলে যেতে পারেন ঠিক মগবাজার রেলক্রসিংয়ের আগেই হাতের বামে পড়বে হাতিরঝিলে প্রবেশের রাস্তা। আপনি যদি মিরপুরের বাসিন্দা হয়ে থাকেন তাহলে আপনি বিজয়সরণী হয়ে তেজগাঁও ঘুরে যেমনি আসতে পারেন তেমনি বিজয়সরণী-ফার্মগেট হয়ে কাওরানবাজার দিয়ে যেতে পারেন হাতিরঝিলে। আবার চাইলে ধানমি ৩২ নম্বর হয়ে পান্থপাথ ঘুরে বসুন্ধরা মার্কেটের সামনে দিয়ে কাওরানবাজার পার হয়ে চলে যেতে পারেন হাতিরঝিল দেখতে। যদি আপনি বনানি-গুলশান এলাকার বাসিন্দা হন তাহলে তো কোন কথাই নেই। গুলশান আড়ংয়ের পাশ দিয়ে অথবা গুলশান পুলিশ প্লাজার পাশের রাস্তাটা বেছে নিবেন হাতিরঝিলে যাওয়ার জন্য। আর যদি আপনি বাড্ডা-রামপুরা এলাকার লোক হয়ে থাকেন তাহলে তো আপনি ভীষণ ভাগ্যবান, সোজা টিভি ভবনের সামনে দিয়ে ঢুকে পরবেন আপনার জন্য অপেক্ষায় থাকা হাতিরঝিলে। তবে মনে রাখবেন আপনি যেই প্রবেশ পথটাই বেছে নিননা কেন আপনাকে পুরো পথটা ঘিরেই ফিরতে হবে, কেননা পুরো হাতিরঝিলটাই ওয়ানওয়ে। জাদের নিজস্ব বাহন আছে, তাদের জন্য হাতিরঝিল ঘোরাটা তুলনামুলকভাবে বেশি সহজ।

কী কী দেখবেন

আপনি তেজগাঁ হয়ে হাতিরঝিলে প্রবেশ করলেই দেখবেন শুরু হয়ে

গেছে ছবির মতো সুন্দর করে অঁাঁকা হাতিরঝিল। হাতের ডান দিকে সারি সারি ফুলের গাছ, বসার বেঞ্চ, ওভারপাসগুলো আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছে হাতিরঝিলকে আরেকটু ভাল করে দেখতে। আপনি চাইলে ২য় ব্রিজে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে পারেন হাতিরঝিলের সৌন্দর্য। এই ২য় ব্রিজ থেকে পশ্চিমে তাকালে চোখে পড়বে ১ম ব্রিজ, পূর্বে ৩য় ব্রিজের দৃশ্যসহ ছোট ছোট ব্রিজগুলোর সৌন্দর্য। তবে ৩য় ব্রিজ থেকেই আপনি খুব সহজেই দেখে নিতে পারবেন গোটা হাতিরঝিল। পশ্চিমে ২য় ব্রিজ, আর পূর্বে রামপুরার অংশের ৪র্থ ব্রিজটির দৃশ্য। যদি দিনের সময়টা এড়িয়ে সন্ধ্যা বা রাতে যেতে চান, তাহলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি ব্রিজগুলোর আলোর খেলা আপনাকে দিবে অনাবিল আনন্দ। আর সবশেষে রামপুরার ব্রিজটাতো রইলই। আর যদি একটু উপর থেকে হাতিরঝিলকে দেখতে চান, তবে ছোট ছোট ব্রিজগুলোতে চলে যেতে পারেন, বড় ব্রিজগুলোর ভিড়ই যে শুধু এড়ানো যাবে তাই নয়, ওখানে লেকের বাতাস যেমন আপনার শরীর জুড়াবে, তেমনি এর সৌন্দর্য জুড়াবে আপনার চোখ আর মন। সম্প্রতি হাতিরঝিলের রামপুরা ব্রিজ থেকে একটি মাইক্রো সার্ভিস চালু করা হয়েছে যেটি রামপুরা ব্রিজ থেকে শুরু করে পুরো হাতিরঝিল ঘুরে আপনাকে আবার রামপুরাতেই নামিয়ে দিবে। এই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারলে আপনি অনায়াসেই ঘুরে নিতে পারবেন পুরো হাতিরঝিল।

কী খাবেন

যেহেতু হাতিরঝিল পুরো প্রজেক্টটাই ওয়ানওয়ে, সুতরাং আপনি তেজগাঁও, গুলশান, রামপুরা বা মগবাজার যেই পাশ দিয়েই প্রবেশ করুন না কেন আপনাকে পুরো হাতিরঝিলই ঘুরতে হবে ফিরতে হলে। এত ঘোরাঘুরিতে না হয় আপনার মন ভরল, কিন্তু ঘুরতে ঘুরতেই যদি ক্ষিদে লেগেই যায়, তাহলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। পুরো লুপেই কিছুক্ষণ পর পর পেয়ে যাবেন বেশ কিছু রেস্তোরাঁ। সেখানে চিকেনগ্রিল, কাবাব, নান, লাচ্ছিসহ পাবেন আপনার পছন্দের খাবার। হাতিরঝিলের মতো এত সুন্দর জায়গায় এই খাবারগুলো আপনার অপছন্দ হবে না আশাকরি। তবে এর জন্য আপনাকে হয়ত বা নিয়মিতের চেয়ে একটু চড়া দাম গুনতে হতে পারে।

এই ব্যস্ত জীবনে জানি সময় বের করা খুবই মুশকিল, তবুও একটু সময় নিয়ে ঘুরে আসুন না হাতিরঝিলে আপনার প্রিয়জনদের বা প্রিয়জনকে নিয়ে। দেখবেন ভাল লাগবে। কংক্রিটের মতো জমে যাওয়া আমাদের এই জীবনকে স্বাভাবিক করতে হাতিরঝিল না হয় একটু ভূমিকা রাখুক।

প্রকাশিত : ২৫ মে ২০১৫

২৫/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ:
যমুনায় নাব্য সঙ্কট ॥ বগুড়ার কালীতলা ঘাটের ১৭ রুট বন্ধ || আট হাজার বেসরকারী মাধ্যমিকে প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামো নেই || সেবা সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য পদক পাচ্ছেন ১৩২ পুলিশ সদস্য || দু’দফায় আড়াই লাখ টন লবণ আমদানি, সুফল পাননি ভোক্তারা || বাংলাদেশের আর্থিক খাত উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক রোডম্যাপ করছে || নিজেরাই পাঠ্যবই ছাপানোর চিন্তা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের || গণপ্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটেছে, প্রমাণ হয়েছে বিচার বিভাগ স্বাধীন || নিহতদের স্বজনদের সন্তোষ ॥ রায় দ্রুত কার্যকর দাবি || আওয়ামী লীগ আমলে যে ন্যায়বিচার হয় ৭ খুনের রায়ে তা প্রমাণিত হয়েছে || নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ৭ খুন মামলার রায় ॥ ২৬ জনের ফাঁসি ||