কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পরিবারে বয়স্কদের যত্ন নিন

প্রকাশিত : ২৫ মে ২০১৫
  • মো. আবু হাসান তালুকদার

নাটক-উপন্যাসে প্রায়ই দেখা যায়, বাবা-মাকে সংসারের ঝামেলা মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসে। তাদের দুঃখ-কষ্ট বঞ্চনার কথা অনেকে জানে। কিন্তু যে সব বৃদ্ধ নিজগৃহে পরবাসী তাদের কথা ভাবুন। তাদের খোঁজ কয়জনে রাখে। সারাজীবনে তিলে তিলে গড়ে তোলা তার নিজস্ব ঘরেই তো তার অধিকার সীমিত। ছেলে, বউদের দয়ায় কোন রকমে বেঁচে আছে। সংসারে সে অপাঙ্ক্তেয়, অচল। সে ব্যাক ডেটেড, তার মতামতের কী মূল্য আছে। তাদের সময় দেয়ার সময় কোথায় অন্যদের। অনেক বৃদ্ধকে আক্ষেপ করে বলতে শুনেছি, সারাজীবনের সঞ্চয় রিটায়ারমেন্ট বেনিফিটের টাকা পাওয়ার পর পরই ছেলেমেয়েরা যে যার প্রয়োজন দেখিয়ে সব টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। বৃদ্ধ বয়সে তার আবার টাকার প্রয়োজন কী? সে এখন কপর্দকহীন। তার এখন আয়ের উৎস নেই, তাই সে মূল্যহীন অথচ কিছুদিন আগে তার উপার্জনেই সবকিছু চলত।

আজকের বয়োজ্যেষ্ঠরা কেমন আছে? বয়োজ্যেষ্ঠ মানে বৃদ্ধ বাবা-মা, দাদা-দাদি, চাচা-চাচিসহ সকল আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজের সকল বয়স্কের সঙ্গে আমরা কেমন আচরণ করছি? তাদের সুখ-দুঃখ, চিন্তা-ভাবনা, সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে আমরা কতটুকু ভাবছি? বাবা-মা দুইজনের একজন মারা গেলে অপরজন যে কতটা অসহায়, কতটা একা, তা কি আমরা গভীর ভাবে ভাবী? অনেকেই হয়ত বাবা-মার জন্য অনেক কিছু করেন। তাদের মুবারকবাদ দেই। তারা তো ভাগ্যবান। তারা নবী করিম (দ) যাদের ধ্বংস কামনা করেছেন, তাদের অন্তর্ভুক্ত নন। কিন্তু সবাই কি?

অনেকেই মা-বাবার জন্য করেন বা করার চেষ্টা করেন। কিছু একটা করতে পেরে তৃপ্তি বোধও করেন। আসলে কতটা করি? মনে পড়ে ছোট বেলায় পড়া সেই পঙ্ক্তিমালা যা ভাব-সম্প্রসারণ করতাম, ‘শৈবাল দীঘিরে কহে, উচ্চ করি শির, লিখে রেখো, এক বিন্দু দিলাম শিশির।’ আমাদের মা-বাবা দীঘির মতন। আমরা তাঁদের উপরেই বেঁচে থাকা ক্ষুদ্র শৈবাল মাত্র। আর যা কিছু তাঁদের জন্য করি তা ওই শিশির বিন্দুর মতোই ক্ষুদ্র।

মা-বাবা সন্তানের জন্য যা কিছু করেন তা নিঃস্বার্থভাবেই করেন। কোন লাভ-লোকসানের হিসাব করেন না। কিন্তু সন্তান যখন করে তখন মা-বাবার জন্য এই করলাম, সেই করলাম, এ রকম একটা ভাব থাকে। অর্থাৎ যা করেন তার হিসাব আছে। খরচ হিসেবে বিবেচিত হয়। মা-বাবা মারা যাওয়ার পর অনেকেই আক্ষেপ করেন, বেঁচে থাকতে মা-বাবার মর্ম বুঝি নাই। আবার যদি পেতাম। সেই আবার তো আর সম্ভব নয়। তবে যাদের মা-বাবা বা অন্য বয়োজ্যেষ্ঠ আত্মীয় জীবিত আছেন তাদের কিন্তু সে সুযোগ আছে। কিভাবে? আসলে ভালবাসা বা দায়িত্ব বোধের বিষয়ে কোন টিপস দেয়া যায় না। এটা উপলব্ধির বা দায়িত্ববোধের বিষয়। তারপরও আমাদের বাবা-মা বা বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য কী করা উচিত সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যায়।

প্রধানতম কাজ হচ্ছে তাদের ভালবাসা। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা সন্তানের কাছে ভালবাসার কাঙ্গাল। তারা শিশুর মতো হয়ে যায়। শিশুরা সৌভাগ্যবান, তারা না চাইতেই অফুরন্ত ভালবাসা পায়। আর বৃদ্ধরা সেই সন্তানের কাছে চেয়েও তা পান না।

কর্মস্থলে যাওয়ার আগে তাঁদের কাছে বলে যান। ছোট বেলায় আপনি যেমন কোথাও যাওয়ার আগে বলে যেতেন। বাবা-মা যেন মনে করে ছেলে বড় হলেও শুধু বউকে না, বাবা-মাকে না বলেও কোথাও যায় না।

এক সঙ্গে খেতে বসুন। এটা সেটা খাবার উঠিয়ে দেয়ার চেষ্টা করুন। গল্পগুজব করুন। সে কথা বললে মনোযোগ দিন।

মাঝে মাঝে তাদের নিয়ে বেড়াতে বের হন। কোথাও দাওয়াতে গেলে সঙ্গে নেয়ার চেষ্টা করুন। তারা যাক বা না যাক, আপনি বলুন।

কোন সিদ্ধান্ত হয়ত আপনিই নিবেন। তবুও তাদের সঙ্গে পরামর্শ করুন। এতে তাঁরা মনে করবে সন্তানের কাছে তাঁর এখনও গুরুত্ব আছে। আর একটা কথা ভুললে চলবে না, তাঁর বয়স কিন্তু আপনার চেয়ে অনেক বেশি। বয়স মানে অভিজ্ঞতা, আর অভিজ্ঞতার অপর নাম জ্ঞান। এই জ্ঞান কিন্তু আপনার চেয়ে তাঁর বেশি, তা আপনি যত শিক্ষিত হোন না কেন।

মাঝে মাঝেই তাঁর শরীরের খোঁজখবর নেন। কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করুন।

টাকা-পয়সা এমন একটা জিনিস যা মৃত্যুর আগপর্যন্ত তার প্রয়োজন আছে। আপাত দৃষ্টিতে মনে না হলেও বৃদ্ধদেরও কিন্তু টাকার প্রয়োজন। তাঁদের দান-খয়রাত, বাচ্চাদের বা নিজের জন্য কিছু কেনা বা মসজিদ-মাদ্রাসা ইত্যাদি সামাজিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছে করে। সুতরাং প্রতিমাসে তাদের কিছু পকেট মানি দিন।

ঈদ বা কোন অনুষ্ঠানে তাঁরা যেন ছোটদের সালামি বা উপহার দিতে পারে সে ব্যবস্থা করুন।

প্রতিবেশী বা সমাজের সর্বত্রই বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান দিন, ভাল আচরণ করুন। ভাববেন এই বয়োজ্যেষ্ঠরা কিন্তু আপনার বাবা- মায়ের মতো।

বয়োজ্যেষ্ঠদের জন্য আপনার সহযোগিতার হাত প্রসারিত রাখুন। মনে রাখতে হবে এই রকম বয়স এবং অবস্থা সবারই হবে। সবাই বলে সংসারে মুরব্বিরা মাথার ওপর ছাদ। কিন্তু এই ছাদের আমরা কতটুকু যতœ নেই। এই ছাদ যখন মাথার ওপর থেকে সরে যাবে তখন আর আক্ষেপ করে লাভ কী। বাবা-মায়ের হক এবং দায়িত্ব বিষয়ে কোরান ও হাদিসে বার বার বলা হয়েছে। অন্যান্য ধর্মগ্রন্থেও বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ তা’লা মা-বাবাকে অত্যন্ত মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন। সূরা বনী ইসরাইলের ২৩নং আয়াতে বাবা-মার বিষয়ে আল্লাহ তা’লা বলেছেন, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে; তাদের একজন বা উভয়ই বৃদ্ধ হলে তাদের প্রতি উহ্ শব্দ পর্যন্ত বলবে না এবং তাদের ধমক দেবে না; তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলবে। মা-বাবার জন্য দো’য়া করার পদ্ধতিও আল্লাহ তা’লা শিখিয়েছেন। সূরা বনী ইসরাইল এর ২৪নং আয়াতে তা উল্লেখ করেছেন ‘রব্বির হাম হুমা কামা রব্বা ইয়ানি ছোগীরা’ অর্থাৎ হে রব, তাদের প্রতি রহম কর, যেরূপ তারা আমাকে শৈশবে লালন-পালন করেছেন।

আসুন আজ থেকেই আমরা বয়োজ্যেষ্ঠ বা যাদের পিতা-মাতা জীবিত আছে তারা পিতা-মাতার সেবা করে রাসূলুল্লাহ (দ) যাদের ধ্বংস কামনা করেছন তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই।

প্রকাশিত : ২৫ মে ২০১৫

২৫/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: