কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘এইবার হামারা একটা দেশের মানসি’

প্রকাশিত : ২৪ মে ২০১৫

‘এইবার হামরা একটা দেশের মানসি (মানুষ) হয়ে নিজের পরিচয়টা দিবা পারিমো। কহিবা পারিমো হামারও একটা দেশ আছে। এতদিন শ্যাওলার নাখাতি (মতো) খালি ভাসে বেড়াছিনো। ভারত-বাংলাদেশ যেইখানে যাও হামার পরিচয় হামরা ছিটের লোক। ছিটে বাড়ি হওয়ায় হামারলাক মানসিই মনে কইরতো না। পৃথিবীত সবার জন্য দেশ থাকলেও হামার কুনহ দেশ নাই।’ দুঃখ ও কষ্টভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন পঞ্চগড় সদর উপজেলার অভ্যন্তরে থাকা ভারতীয় গারাতি ছিটমহলের ষাটোর্ধ বৃদ্ধা রহিমা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ছিটমহলগুলো ভারতের হলেও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা নেই, সীমানা নির্ধারণে তেমন কোন চিহ্ন না থাকলেও কোন কোন এলাকায় এক-দুটি সিমেন্ট দিয়ে তৈরি ব্রিটিশ আমলের খুঁটি চোখে পড়ে। একটি দেশের অভ্যন্তরে স্থায়ীভাবে বাস করলেও ছিটের মানুষের কোন দেশ নেই। চারপাশ থেকে তারা বন্দী জীবনযাপন করে ছোট্ট একটি ভূখ-ে। যোগাযোগের সড়ক বলতে ক্ষেতের আল ধরে পথচলা। জলাভূমির ওপর বাঁশের সাঁকোই পারাপারে ভরসা। তাদের নেই ন্যূনতম কোন নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। ছিটমহলবাসীরা উভয় দেশের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা বা রাষ্ট্র কর্তৃক প্রাপ্য নাগরিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে আসছে। বিশ্ব যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিষয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনও তারা আদিযুগের বিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের পরিচয়- তারা ছিটের মানুষ।

কিশোরী রুম্পি আকতার আইরিন পঞ্চগড় সরকারী মকবুলার রহমান কলেজে ইতিহাস বিষয় নিয়ে অনার্সে পড়ছে। রুম্পির বাড়ি শালবাড়ি ছিটমহলে। ছিটের মেয়ে হয়ে কী করে কলেজ পর্যন্ত পড়াশোনা করছ- এ প্রশ্নের উত্তরে জানা যায়, ছিটের মানুষ তো নাম-পরিচয়হীন। তাই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের পরিচয়ে পড়াশোনা করতে হয়। শুধু রুম্পিই নয়, এ রকম হাজারো ছিটের ছেলেমেয়ে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করছে।

শেখের বেটির আল্লা ভালা করুক

বেহুলাডাঙ্গা ছিটমহলের বাসিন্দা বৃদ্ধা আছিয়া বালা (৭০) বলেন, ‘লোকরা কয়ছে শেখের বেটি পোরধান মন্ত্রীর (প্রধানমন্ত্রী) জন্যই হামরা ছিটের মাইনসি বাংলাদেশী হয়ে গেলাম। আল্লা তাঁর ভালা করুক। মোর ছিটে জন্ম, ছিটে বিয়া। এতদিন হামারলার কোন পরিচয় ছিল না, এখন হইছে। ছিটের মাইনসি খারাপ, কেউ আর হামাক কইতে পারবে না।’ ওই গ্রামেরই সোলেমান (৫৮) বলেন, জাতির জনকের স্বপ্ন ছিল ৪৭-এ ব্রিটিশরা যা করতে পারেননি, তিনি তা করবেন। এজন্য ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষরও করেন। ৭৫-এর ১৫ আগস্ট তার হত্যার পর স্বপ্ন আর বাস্তবায়ন হয়নি। কিন্তু তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় ছিটের বন্দীদশা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারছি। ছিটের তাবত মানুষ আমরা প্রধানমন্ত্রীর জন্য দোয়া করছি, মহান আল্লাহপাক যেন ওনাকে সুস্থ রাখেন।

জন্মস্থান ত্যাগ করবে না ওরা

ভারতের ছিটমহলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অবস্থান হলেও তারা বাংলাদেশের আলো-বাতাসে বড় হয়েছে। অনেকে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে লেখাপড়া শিখেছে বাংলাদেশেরই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। তাই ছিটমহল বিনিময়ের পর তারা নিজ দেশ ভারতে যাওয়ার সুযোগ পেলেও থেকে যাবেন এ দেশেই- এমনটাই দাবি ছিটমহলবাসীদের। কালিয়াগঞ্জ কাজলদীঘি ছিটমহলের অধিবাসী জয় প্রকাশ বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশে জন্ম তার।

তাই সুযোগ পেলেও তিনি কখনও ভারতে যাবেন না। শালবাড়ি কাজলদীঘি বেহুলাডাঙ্গা ছিটমহলের নাগরিক কমিটির চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘পঞ্চগড়ে অবস্থিত ভারতের ৩৬টি ছিটমহলের সকল নাগরিকই বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে থাকতে চায়। কোন ছিটমহলবাসী বাংলাদেশের সুবিধা ছেড়ে ভারতে যাওয়ার অনুমতি চাইবে না।’

প্রকাশিত : ২৪ মে ২০১৫

২৪/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: