রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ছিটমহলে নতুন সূর্য

প্রকাশিত : ২৪ মে ২০১৫

ব্রিটিশ আইনজীবী মি. সিরিল র‌্যাডক্লিফ ১৯৪৭ সালে অখ- ভারতকে খ- করার সময় যে সঙ্কট সৃষ্টি করে গেছেন, তার সমাধানের চেষ্টা শুরু হয় এক দশক পর থেকেই। প্রথম উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৫৮ সালে। ওই বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহেরু ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নুন সীমান্ত সমস্যা সমাধানে একটি চুক্তি করেন। নেহরু-নুন চুক্তিতে ছিটমহল বিনিময়ের একটা চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ভারতের কারণেই কার্যকর হয়নি। ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় নেহরু-নুন চুক্তি অকার্যকর হয়ে যায়। এরপর ১৯৭৪ সালে ভারতে কংগ্রেস ও বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ আমলে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একই বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত আরও সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে ১৯৭৪ সালের ১৬ মে নয়াদিল্লীতে এ সীমান্ত চুক্তি সই হয়। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এতে সই করেন, যা ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি নামে পরিচিত।

চুক্তিটি সইয়ের পর পরই তা বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে অনুসমর্থন করা হয়েছিল। এই চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশ আলাদা আলাদাভাবে ছিটমহলের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে। কিন্তু দুই পক্ষের তালিকায় দেখা দেয় গরমিল। এরপর অবশ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়ে যায়। নির্মমভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ফলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। একই ভাবে ভারতেও বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়, যে কারণে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ফলে ঝুলে যায় দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় তথা সীমান্ত সমস্যার সমাধান।

জিয়া এবং এরশাদের সামরিক শাসনের পর সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ১৯৯১ সালে দেশ আবার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফেরে। তখন আবার উদ্যোগ শুরু হয় সীমান্ত সমস্যা সমাধানে। এ পর্যায়ে ১৯৯২ সালে ভারত সরকার প্রস্তাব দেয় ছিটমহল ও অপদখলীয় এলাকার পরিমাপ করে একসঙ্গে পুরো চুক্তিটি রেটিফিকেশনের জন্য ভারতীয় পার্লামেন্টে যাতে তোলা যায়, সে ব্যবস্থা করে নিতে। কিন্তু বাংলাদেশের তখনকার সরকার তাতে রাজি হয়নি। তারা বলে দেয়, ছিটমহল ও অপদখলীয় এলাকা পরিমাপ করার কোন প্রয়োজন নেই। অযথা সমস্যা বাড়বে। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে এসে স্থলসীমানা চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ জোরেশোরে শুরু হয়। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত অনেকগুলো দ্বিপক্ষীয় মিটিং হয়েছে, বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের অবস্থান পরিবর্তন করা যায়নি।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত সমস্যার জট দ্রুত খুলতে থাকে, যার ফলশ্রুতিতে ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নে দুই দেশের মধ্যে প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়। ছিটমহল ও অপদখলীয় ভূমি বিনিময় এবং সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমান্ত চিহ্নিত করাই ছিল এর লক্ষ্য। ঐ প্রোটোকল স্বাক্ষরের ধারাবাহিকতায় একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দুই দেশের অভ্যন্তরে থাকা ছিটমহলের প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য যৌথ জরিপ কাজ শুরু হয়। ভারতীয় প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ভারতীয় ছিটমহলগুলোর জরিপ করে আর বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল ভারতের ভেতরে থাকা ছিটমহলগুলোর জরিপ করে। জরিপ রিপোর্ট প্রতিনিধি দল যার যার নিজ দেশের সরকারের কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু জরিপ কাজ শেষে তৎকালীন ইউপিএ সরকার স্থলসীমান্ত চুক্তি লোকসভায় তুলতে ব্যর্থ হয়। তবে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়ার আগে এই জোট রাজ্যসভায় চুক্তিটি বিল আকারে উত্থাপন করে যায়। কিন্তু তখন বিজেপি এই চুক্তির বিরোধিতা করে। ফলে বিল পাস হয়নি।

মোদি সরকার ক্ষমতায় এসে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতি সবচেয়ে বেশি জোর দেয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় নরেন্দ্র মন্ত্রী ও শেখ হাসিনার সাক্ষাত হয়। প্রথম সাক্ষাতেই দুই নেতা দুই দেশের মধ্যে চলমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন। শুধু তাই নয়, নরেন্দ্র মোদি দু’বার শেখ হাসিনাকে সীমান্ত চুক্তি নিয়ে কথা দেন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ও কাঠমান্ডুতে সার্কের আসরে। এ ধারাবাহিকতায় মোদি সরকার ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত মুজিব-ইন্দিরা স্থলসীমান্ত চুক্তি নতুন করে রাজ্যসভা ও লোকসভায় উত্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এ সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এ ব্যাপারে তাঁর আপত্তি প্রত্যাহার করে নেন। ফলে স্থলসীমান্ত চুক্তি ভারতীয় সংসদে অনুমোদনের পথ সুগম হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বাদ সাধে অসম বিজেপি। তারা ওই চুক্তি থেকে অসমকে বাদ দেয়ার দাবি জানায়। এই চুক্তির ফলে অসম ২৬৮ দশমিক ৪ একর জমি হারাবে, এই অজুহাত তোলে তারা। ফলে বিজেপি সরকার ওই চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া থেকে অসমকে সাময়িকভাবে বাদ দিতে চায়। কিন্তু এই উদ্যোগে বাদ সাধে কংগ্রেস। কংগ্রেস শাসনাধীন অসমের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি লিখে জানান যে, চুক্তির ফলে অসমের লাঠিটিলা-ডুমাবাড়ি এলাকায় ৭১৪ একর জমি ভারতের পাওনা হবে। অন্যদিকে ধুবড়ির কলাবাড়ি এলাকায় ১৯৩ দশমিক ৮৫ একর ও করিমগঞ্জ এলাকার পাল্লাখালে ৭৪ দশমিক ৫৫ একর জমি বাংলাদেশে যাবে। এই আদান-প্রদানের নিট লাভ হবে অসমের, ৪৪৫ দশমিক ৬ একর জমি। অতএব বিজেপি ২৬৮ দশমিক ৪ একর জমি হারানোর যে দাবি জানাচ্ছে, তা অসত্য। শেষ পর্যন্ত সবপক্ষের মধ্যে সমঝোতা হওয়ায় বিলটি অপরিবর্তিত রেখেই মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। অসমকে রেখেই রাজ্যসভায় সীমান্ত বিল উত্থাপন করে মোদি সরকার এবং তা সর্বস্মতিক্রমে পাস হয়। একই ভাবে লোকসভায়ও বিলটি পাস হয় কোন বিরোধিতা ছাড়াই।

প্রকাশিত : ২৪ মে ২০১৫

২৪/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: