মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নজরুল তীর্থ ত্রিশাল ভক্ত-অনুরাগীদের পদচারণায় মুখর

প্রকাশিত : ২৪ মে ২০১৫
নজরুল তীর্থ ত্রিশাল ভক্ত-অনুরাগীদের পদচারণায় মুখর
  • তিন দিনের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠান কাল থেকে

বাবুল হোসেন ॥ জাতীয় কবির বাল্য স্মৃতিবিজড়িত ময়মনসিংহের ত্রিশাল এখন নজরুল তীর্থ। কবির স্মৃতিবিজড়িত এই স্থান এখন তাঁর ভক্ত-অনুরাগীদের পদচারণায় মুখর। নজরুল চর্চার অন্যতম গবেষণা কেন্দ্র ও পর্যটন নগরী এটি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ভেতরে বাইরে, ত্রিশালের ঘরে ঘরে চলছে এই চর্চা। ত্রিশালের কাজির শিমলা গ্রামের দারোগা রফিজ উল্লাহর বাড়ি, নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া বেপারী বাড়ি, বটতলা ও কবি নজরুলের বাল্য স্মৃতিবিজড়িত স্কুল দরিরামপুর একাডেমি মাঠসহ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বছরজুড়ে ঢল নামছে নজরুল প্রেমিক ভক্ত অনুরাগী ও গবেষকসহ পর্যটকদের। কাজির শিমলা গ্রামের দারোগা রফিজ উল্লাহর বাড়ি ও নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া বেপারীর বাড়িতে দেশী-বিদেশী নজরুল গবেষক ও পর্যটকদের এই ঢল আরও বেশি। নজরুল গবেষণার চারণভূমি ত্রিশাল নজরুল চর্চারও কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে এখন। প্রতিবছর ত্রিশালে নজরুল জন্মজয়ন্তীর উৎসব ও নজরুল মেলার আয়োজন এই চর্চা ও গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলছে। এ নিয়ে দারুণ খুশি ও গর্বিত ত্রিশালের মানুষ।

জাতীয় কবির স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালের নামাপাড়ার বটতলায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। শেষ হয়েছে নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্মাণ কাজ। কাজির শিমলা গ্রামের দারোগা রফিজ উল্লাহর বাড়িতে নির্মাণ করা হয়েছে কবি নজরুল পাঠাগার ও স্মৃতি কেন্দ্র কাম জাদুঘর। নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া বেপারী বাড়িতে করা হয়েছে কবি নজরুল স্মৃতি কেন্দ্র ও কবি নজরুল আর্কাইভ। ত্রিশাল দরিরামপুর একাডেমিতে করা হয়েছে নজরুল মঞ্চ ও নজরুল রেস্ট হাউস। ত্রিশাল দরিরামপুর একাডেমি হয়েছে এখন নজরুল একাডেমি। ত্রিশালের নানা এলাকা ছাড়াও নজরুল প্রেমিক ভক্ত অনুরাগীরা জেলার নানা জায়গায় নজরুলের নামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। এসব কিছুই করা হয়েছে তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখতে। এসব কারণে এক সময়কার অজপাড়াগাঁয়ের ত্রিশাল আজ নজরুল প্রেমিক ও গবেষকদের কাছে তীর্থস্থান। কবি নজরুল গবেষণার চারণভূমি ও পর্যটনের নগরী। ত্রিশালের এসব উন্নয়ন পরিবর্তনে সরকারের সঙ্গে উদার সাহায্য-সহযোগিতায় শরিক হয়েছেন নজরুল প্রেমিক স্থানীয় জনগণ। আর তাই ত্রিশালে নজরুল কেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিবর্তনে এলাকাবাসী আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত। আগামী ২৫ থেকে ২৭ মে ত্রিশাল উৎসবমুখর হয়ে উঠবে কবি নজরুলের ১১৬তম জন্মজয়ন্তীর ৩ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালাকে ঘিরে। এ উপলক্ষে গোটা ত্রিশালে বিরাজ করছে এখন উৎসবের আমেজ। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সোমবার শুরু হওয়া এই জন্মজয়ন্তীর উৎসব চলবে বুধবার পর্যন্ত। একই সঙ্গে দরিরামপুর একাডেমি মাঠ ছাড়াও নজরুল ডিগ্রী কলেজ মাঠে বসছে বাহারি সব পণ্যসামগ্রী নিয়ে নজরুল মেলা। এবারের মেলায় নাগরদোলা ও পুতুল নাচ ছাড়াও ৫ শতাধিক স্টল থাকছে। এছাড়া একাডেমি মাঠে বরাবরের মতো বইমেলা তো থাকছেই। সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টায় একাডেমি মাঠের নজরুল মঞ্চে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. গওহর রিজভী। উদ্বোধনী পর্বে সভাপতিত্ব করবেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী। দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার সকাল ১০টায় প্রধান অতিথি থাকবেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, এতে সভাপতিত্ব করবেন ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার, তৃতীয় দিবসের সমাপনীতে বুধবার সকাল ১০টায় প্রধান অতিথি থাকবেন ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান।

ভারতের আসানসোলের রুটির দোকান থেকে কিশোর নজরুলকে ১৯১৪ সালে দারোগা রফিজ উল্লাহ নিয়ে এসেছিলেন ময়মনসিংহের ত্রিশালের কাজির শিমলা গ্রামের নিজ বাড়িতে। কবি নজরুলকে ভর্তি করে দেন ত্রিশাল উপজেলা সদরের দরিরামপুর একাডেমি স্কুলের সপ্তম শ্রেণীতে। এখান থেকে কবি নজরুলের স্কুল যাত্রা শুরু হলেও পরে বর্ষাকালে দারোগা তাঁকে যাতায়াতের সুবিধার জন্য জায়গীর করে দেন নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া বেপারী বাড়িতে। ত্রিশাল উপজেলা সদর থেকে তিন কিমি দূরে নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া বেপারীর বাড়িতে থেকে বটতলা হয়ে কিশোর নজরুল দরিরামপুর একাডেমি স্কুলে পড়তেন। কবি নজরুলের সেই বাল্য স্মৃতিকে ধরে রাখতে এই গ্রামেরই বটতলা নামক স্থানে স্থানীয় জনগণের দান করা জমিসহ ২৫ একর জমিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য, সঙ্গীত, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল এই চারটি বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু করে। পরে পাঁচটি অনুষদের আওতায় ব্যবসায় প্রশাসন, সামাজিক বিজ্ঞানসহ বাংলাদেশের সমৃদ্ধ লোকসাহিত্য, লোক সংস্কৃতির উন্নয়ন ও গবেষণারও উদ্যোগ নেয়া হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩টি বিভাগে প্রায় ৪ হাজার শিক্ষার্থী পড়ালেখা করার সুযোগ পাচ্ছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও নজরুল গবেষক অধ্যাপক ড. মোহিত উর রহমান জানান, ত্রিশালে নজরুল কেন্দ্রিক উন্নয়ন পরিবর্তন গোটা এলাকার শিক্ষা ও যোগাযোগ অবকাঠামোসহ ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীসহ নজরুল প্রেমিক ভক্ত অনুরাগী ও গবেষকদের কাছে ত্রিশাল এখন নজরুল গবেষণার চারণভূমি ও পর্যটনের নগরী। নজরুল জন্মজয়ন্তীর উৎসব ও এ উপলক্ষে আয়োজিত নজরুল মেলায় হাজারও মানুষের ঢল নজরুলের প্রতি ভালবাসারই জানান দিচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন নজরুল প্রেমিক এই শিক্ষাবিদ। নজরুল ইনস্টিটিউট নজরুল চর্চা ও গবেষণায় আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে দাবি এই উপাচার্যের।

এদিকে নজরুলের শেকড় নামাপাড়া গ্রামের বিচুতিয়া বেপারী বাড়ির আঙ্গিনায় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র ও নজরুল আর্কাইভ। বিচুতিয়া বেপারীর যে ঘরে নজরুল থাকতেন সেই শোবার ঘরটির ভিটি পাকা করে করা হয়েছে নজরুল আর্কাইভ। ৩ তলার স্মৃতি কেন্দ্রের নিচতলায় রয়েছে ২০০ আসনের অডিটরিয়াম, ২য় তলায় অফিস ও ৩য় তলায় জাদুঘর কাম পাঠাগার। নজরুল জন্মজয়ন্তীকে সামনে রেখে বরাবরের মতো এবারও সাজানো হয়েছে এই স্মৃতি কেন্দ্রটি। বিচুতিয়া বেপারীর বংশধর আব্দুল বারেক বেপারী জানান, নজরুল কেন্দ্রিক উন্নয়নে তিনি খুশি। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পরিবারের জমি দানের কথা উল্লেখ করে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচুতিয়া বেপারীর নামে একটি হলের নামকরণের দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে স্মৃতিকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত সরবরাহ রাখার দাবি জানান তিনি। নজরুলের বাল্য স্মৃতিবিজড়িত কাজির শিমলা গ্রামের দারোগা রফিজ উল্লাহর বাড়িতে করা হয়েছে কবি নজরুল স্মৃতি কেন্দ্র ও পাঠাগার। দু’তলার এই ভবনের নিচতলায় রয়েছে সেমিনার কক্ষ। দু’তলায় রয়েছে রিডিংরুম কাম রেস্ট হাউস। নজরুলের দুর্লভ সব ছবি, নজরুল সংগ্রহ, বেশ কিছু বই ও একটি পুরনো খাট রয়েছে এখানে। ভবনের সামনের পুকুরটি সংস্কার করে পাকা করা হয়েছে এর ঘাট। দারোগা বাড়ির বংশধর কাজী শাহাদত হোসেন কাজির শিমলা গ্রামে সরকারের এই উদ্যোগের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নজরুল স্মৃতি কেন্দ্রের পাশে একটি খেলার মাঠ করার দাবি করেছেন। স্মৃতি কেন্দ্রের কেয়ারটেকার আজিজুল হক জানান, স্মৃতি কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারত, শ্রীলঙ্কা, দুবাই ও অস্ট্রেলিয়াসহ দেশ-বিদেশের নানা স্থানে নজরুল প্রেমিক ভক্ত অনুরাগী ও গবেষকরা আসছেন নজরুলের শেকড় অনুসন্ধানে। অথচ স্মৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার এক দশকেও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগসহ এর কোন সংস্কার ও মেরামত কাজ করা হয়নি।

প্রকাশিত : ২৪ মে ২০১৫

২৪/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: