কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জীবিকার সংগ্রামে চরজীবন

প্রকাশিত : ২৩ মে ২০১৫

নানা দুর্যোগে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে চরের মানুষ বেঁচে থাকে। অতি বন্যা, ভাঙ্গন আর খরতাপে চরের মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিসহ হয়ে ওঠে। প্রতি বছরই এর মাত্রা বাড়ছে। তবে তারা কখনও পিছপা হয় না। পরিস্থিতি মানিয়ে তারা জীবিকা নির্বাহ করে। ষড়ঋতুর এই দেশে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চরের মানুষের পেশাও বদল হয়। বর্ষায় তারা নৌকার মাঝি, শুকনো মৌসুমে কৃষক। কখনও জেলে আবার কখনও ঘাটের কুলি। অভাব-অনটন আর শত সহস্র সমস্যা বুকে আগলে ধরে চরের মানুষ পড়ে থাকে চরে। সারাদিনের পরিশ্রান্ত শরীর এলিয়ে যমুনার বালিয়াড়িতে তৈরি ছনের ঘরে পরম সুখে ঘুমায়। প্রকৃতি আর নদী ভাঙ্গনের সঙ্গে লড়াই করে চরের মানুষ বেঁচে আছে যুগ যুগ ধরে। স্থায়ী সমতল ভূমি চরের মানুষকে আকর্ষণ করে না। চরই তাদের আসল ঠিকানা। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যমুনাসহ নদ-নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়। তবে গত পাঁচ বছরে চরের জীবনযাত্রায় আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। তারা অনেকেই টিনের ঘরে বসবাস করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও পাকা হয়েছে। সোলার বিদ্যুত ব্যবহার করে। ঘরে রয়েছে টেলিভিশন ও মোবাইল ফোন।

পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র আর আগের মতো নেই। নদী দেখে মনে হয় না, এইখানে একদিন প্রবল স্রোতস্বিনী উত্তাল নদী ছিল। হারিয়ে গেছে ছোটবড় সহস্রাধিক নদী। এই নদীর পাড় আর নদীর চরে বাস করে এক কোটিরও বেশি মানুষ। কোটি মানুষ প্রতিনিয়ত নদীর সঙ্গে লড়াই করছে। লড়াই করছে নদীর নিষ্ঠুর ভাঙ্গনের সঙ্গে। বিশাল পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্রের চরসহ নদী পাড়ে বসতি এসব মানুষ নদীর গতি-প্রকৃতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেঁচে থাকতে চায়।

অভাব-অনটন-ক্ষুধার যন্ত্রণা থাকলেও চরের মানুষ চর ছাড়তে চায় না। নদীর টানেই চরের মানুষ আশায় বুক বেঁধে পড়ে থাকে ভাঙা জীর্র্ণ কাশের ঘরে। বুক ভরা আশা, যে নদী দিনের পর দিন তাদের সর্বস্ব গ্রাস করেছে সে নদীই একদিন ফিরিয়ে দেবে বাপ-দাদার জমি জিরাত। বুক ভরা আশা, যদি হারিয়ে যাওয়া জোত জমি আবার জেগে ওঠে। এই আশা নিয়ে মৌসুমে মৌসুমে নদী আর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেছে চরের মানুষ। শত দুঃখ যন্ত্রণা নিয়ে অভাব-অনটন নিয়ে চরের মাটিকেই আঁকড়ে ধরে আছে। তাদের মনে বদ্ধমূল ধারনা, ভাঙা-গড়াই নদীর খেলা। নদী পাড়ের মানুষ আর চরবাসী মনে করে, জোত জমি গেছে, গেছে ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি তাতে দুঃখ নেই। রাক্ষসী নদী সব কেড়ে নিয়েছে। নদীর সঙ্গেই তারা যুদ্ধ করছে। নদীতেই তারা মরণ চায়। তাদের প্রত্যাশা তবুও নদী বেঁচে থাকুক। আগের মতো উত্তাল হয়ে উঠুক। বর্ষাকালে উত্তাল নদীর স্রোতধারার সঙ্গে নদীবক্ষে বয়ে আনবে উর্বর পলি। শুষ্ক মৌসুমে জেগে ওঠা সেই নরম পলিতে ফসল ফলাবে।

পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা নদীর পাড়ের বগুড়া, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী জেলার ছোটবড় চার সহস্রাধিক চরে ৭০ লাখেরও বেশি মানুষের বাস। বর্ষাকালে উত্তাল নদীতে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে। অনেকে শুধুই মাছ ধরে। আবার একদিন ছিল, যেদিন তারা ঘাটের কুলি মজুরের কাজ করে জীবন কাটিয়েছে। বিশাল পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা নদীর এক সময় স্রোতধারা হারিয়ে যায়। জেগে ওঠে বিশাল বিস্তীর্ণ চর। এই চরে এসে মানুষ বসতি গড়ে তোলে। জেগে ওঠা এসব চরের বিভিন্ন নামকরণ করা হয়। চরের নাম ডাকাতমারা, কাউয়াহাগা, চিলমারী, মানুষমারা, ইন্দুরমারা, ছোনপচা, আটারপর, ভাঙ্গারচর, কাওয়াখোলা, মহিষাবান, শিয়ালমারী ইত্যাদি। বগুড়ার সারিয়াকান্দি, ধনুট, সোনাতলা, সিরাজগঞ্জ কাজীপুর, বেলকুচি, চৌহালি, রংপুরের কাউনিয়া, গঙ্গাচরা, পীরগাছা, গাইবান্ধার ফুলছড়ি, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ, কুড়িগ্রামের চিলমারী, রৌমারী, রাজীবপুর, নীলফামারীর ডোমার, ডিমলা, উপজেলার নদীপাড়ের বেশির ভাগ এলাকাই চর হিসেবে গণ্য। এসব দুর্গম চরের মানুষ ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে পেশা পরিবর্তন করে জীবিকা নির্বাহ করে।

চরের মানুষ বর্ষাকালে নৌকা চালিয়ে আর নদীতে মাছ ধরে জীবন চালায়। শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠা নদীর চরে ধান, পাট, চিনা, কাউন , বাদাম, তিল, তিষি চাষ করে। চরের মানুষ জেগে ওঠা চরের জমির অধিকার পায় না। চরগ্রাসী দস্যুরা তাদের লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে জেগে ওঠা চর দখলে নেয়। জমিহারা চরের মানুষ আবার সেই জমি বর্গা চাষ করে। লাঠিয়াল বাহিনী তাদের চাষ করা জমির ফসল কেটে নিয়ে যায়। শুকনো মৌসুমে চর থেকে চরে যাতায়াতের মাধ্যম হেঁটে চলা, বাইসাইকেল এবং কোন কোন ক্ষেত্রে চরের বালিতে চলছে ঘোড়ার গাড়ি ও ভ্যান। চরের মানুষ মরিচ, সবজি, পাট, ধান, কাউন কলাই চাষ করে।

প্রকাশিত : ২৩ মে ২০১৫

২৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: