মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ভাটায় আসে ঘুম জোয়ারে ভাঙে

প্রকাশিত : ২৩ মে ২০১৫

চরের জীবন মানেই ভিন্নতর এক জগত। যেখানে মূলধারার অনেক কিছুই মেলে না। এখানে বেঁচে থাকা মানে পদে পদে টিকে থাকার লড়াই। প্রতিটি মুহূর্ত কাটে কঠোর সংগ্রামে। এখানকার লড়াই বৈরী প্রকৃতির বিরুদ্ধে। প্রভাবশালী, জোতদার, মহাজন, রাজনৈতিক নেতা, পুঁজির মালিকসহ উচ্চ শ্রেণীর মানুষের বিরুদ্ধে। প্রতিদিন লড়াই করেই এখানে থাকতে হয়। যারা এ লড়াইয়ে হেরে যায়, চরের মাটিতে তাদের পা রাখার জায়গা মেলে না। তাদের স্থান হয় শহরের বস্তিতে। উদ্বাস্তু জীবনে। অনিশ্চিত জীবন।

দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি চর-দ্বীপ পটুয়াখালী জেলায়। সরকারী কাগজপত্রে এক শ’য়ের বেশি দ্বীপ বা চর রয়েছে, যে গুলোতে মানুষ বাস করে। বাস্তবে চর-দ্বীপ অনেক বেশি। এরমধ্যে আবার সাগরপাড়ের রাঙ্গাবালী ও গলাচিপা উপজেলায় চর-দ্বীপের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ অঞ্চলে দু’ধরনের চর-দ্বীপের দেখা মেলে। নদীর একপাড় ভেঙে অপর পাড়ে মূল ভূখ- লাগোয়া চর যেমন আছে, আবার সাগর বা নদীর বুক চিরে কাছিমের পিঠের মতো জেগে ওঠা বহু দ্বীপ রয়েছে। দ্বীপগুলোর চারপাশে নদী বা সাগরের আদিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশি। পটুয়াখালী জেলার চর-দ্বীপাঞ্চলে বসবাসরত মানুষের সঠিক সংখ্যা কারও জানা নেই। তবে ধারণা করা হয়, এ সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থার জরিপে দেখা গেছে, চরাঞ্চলে বসবাসকারীদের মধ্যে ৯০ ভাগেরও বেশি মানুষ নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারা। এরমধ্যে পটুয়াখালীর পাশাপাশি বরগুনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, খুলনা, ভোলা অঞ্চলেরও বহু মানুষ রয়েছে। এসব জরিপে দেখা গেছে, চরবাসী হওয়ার নেপথ্যে সরকারী এক টুকরো খাসজমি বন্দোবস্ত পাওয়া এবং সেখানে ঘরবাড়ি তৈরিসহ বাকি জমিতে চাষাবাদ করে কোনমতে জীবনধারণের আকাক্সক্ষা সবচেয়ে বেশি তীব্রভাবে কাজ করে। চরাঞ্চলের সরকারী খাসজমি বিলিবণ্টনে ভূমিহীন কৃষকদের অগ্রাধিকারের কথা নীতিমালায় সবার আগে বলা হয়েছে। বাস্তবে চরবাসীদের ৭০-৮০ ভাগ মানুষ আজও সে অধিকার পায়নি। চরাঞ্চলের অধিকাংশ জমি বিভিন্ন শ্রেণীর প্রভাবশালীরা নামে বেনামে বন্দোবস্ত নিয়ে দখল করে বসে আছে। বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা স্পিডট্রাস্ট ২০১০ সালে পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা, রাঙ্গাবালী, দশমিনা ও বাউফল উপজেলার মাত্র ১২টি চরে সরেজমিন জরিপের মাধ্যমে দুই হাজার একটি পরিবারকে চিহ্নিত করেছিল, যাদের নিজস্ব মাথা গোজার ঠাঁই পর্যন্ত নেই। অর্থাৎ এরা সবাই উদ্বাস্তু। মহাজনের জমিতে ঝুপড়ি তুলে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এক হাজার ২৫৩টি পরিবার নদী ভাঙ্গনে সর্বস্ব হারিয়ে চরবাসী হয়েছে। ১০ শতকের কম জমি আছে এমন পরিবারের সংখ্যা ২ হাজার ৫৬টি। বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্ত নারী প্রধানের পরিবার ১৭০টি। জেলার অন্যান্য চরে জরিপ চালানো হলে এসব সংখ্যা নিঃসন্দেহে কয়েকগুণ ছাড়িয়ে যাবে।

চরের খাসজমির মালিকানা প্রভাবশালীদের হাতে চলে যাওয়ায় চরবাসীদের জীবন মানেই অনিশ্চিত অবস্থায় এসে দাঁড়ায়। মহাজনের দেয়া জমিতে ঘর বাঁধার কারণে যখন তখন জারি হয় উচ্ছেদের হুমকি। হতে হয় মহাজনের আজ্ঞাবহ দাস। মেনে নিতে হয় আদেশ-নির্দেশ। আর সে নির্দেশের আওতায় বহু পরিবারের নারীকে সম্ভ্রম পর্যন্ত হারাতে হয়। চোখের সামনে ক্ষেত ভরা ধান। যে ধানের ডগায় লেগে আছে ভূমিহীন কৃষকের বিন্দু বিন্দু ঘাম। কিন্তু সে ধানে নেই কৃষকের অধিকার। মওসুমে মহাজন পা রাখে জমিতে। ধান চলে মহাজনের গোলায়। কৃষকের দীর্ঘশ্বাস শুধুই ভারি হয়। এমনকি নিজ হাতে ফলানো ফলমূলেও নেই তার অধিকার। সবই মহাজনের। এরসঙ্গে যোগ হয়েছে রক্তচোষা এক শ্রেণীর সুদখোর মহাজন আর এনজিও। যারা চরাঞ্চলে সুদের ব্যবসা জমাজমাট করে তুলেছে। ঋণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে প্রতি বছর অসংখ্য পরিবার হচ্ছে দেশান্তরি। হচ্ছে শহরের বস্তি বাসিন্দা। চরের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি আর মাছধরা। কৃষির মতোই মৎস্য খাতেও ভূমিহীনরা চরম উপেক্ষিত। মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালগুলো বন বিভাগের দখলে। সেগুলো বন্দোবস্ত নেয় প্রভাবশালীরা। ফলে সেখানেও চরবাসীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। গবাদিপশু পালনেও নিতে হয় মহাজনের আজ্ঞা। উপকূলের বেশির ভাগ চর-দ্বীপ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নেই স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার সুযোগ। গত কয়েক বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হলেও তা চরাঞ্চলের মানুষদের শতভাগ আওতাভুক্ত করতে পারেনি। এখনও রাঙ্গাবালীর চরলতা, চরকাশেম, চরহেয়ার, চরআন্ডার মতো বহু চর-দ্বীপ রয়েছে, যেখান হাজার হাজার শিশু শিক্ষালাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এসব শিশুর জীবন শুরু হয় নদী-খালে মাছ ধরে। গরু-মহিষ চড়িয়ে। নৌকার হাল ধরে। চরাঞ্চলে চিকিৎসার নেই পর্যাপ্ত ব্যবস্থা।

রাঙ্গাবালী উপজেলা সদরেই নেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। চরাঞ্চল থেকে প্রায়ই চিকিৎসার অভাবে প্রসূতি নারীর মৃত্যুর খবর আসে। পুষ্টিহীনতায় ভুগছে নারী ও শিশুরা। তথ্যহীনতা চরাঞ্চলের মানুষকে রেখেছে অধিকারবঞ্চিত। সরকারী অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাদের কাছে পৌঁছে না। এমনকি অনেক সময় ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আগাম তথ্যও তারা পায় না। বিনোদনেও চরাঞ্চলবাসী অনেক পিছিয়ে। নেই রাজনৈতিক সচেতনতা। বাল্যবিয়ে চরাঞ্চলে নিয়মিত প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাঙ্গাবালীর একটি মাত্র দ্বীপ চরগঙ্গায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক বছরে এখানে অন্তত ২০টি বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে। ১২-১৩ বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। অন্যান্য চর-দ্বীপগুলোতেও হরহামেশা ঘটছে বাল্যবিয়ে। প্রকৃতির বৈরী আচরণ চরাঞ্চলের মানুষের কাছে আরেক আপদ। নদী-সাগরের জোয়ার-ভাটার মতোই উত্তাল জীবন। জোয়ারের শব্দে যেমন ঘুম ভাঙ্গে। ভাটার নিরবতায় ঘুম আসে। তেমনি সাগরের গর্জনে বুকের ভেতরে শুরু হয় হাতুড়ি পেটা। এ এক নিত্যকার জীবন। বেড়িবাঁধবিহীন চর-দ্বীপ বাসিন্দাদের বর্ষার ৬ মাস জোয়ারে ডুবতে হয়। আবার ভাটায় ভাসতে হয়। সামান্য দমকা বাতাসেই এলিয়ে পড়ে খড়ের ঘর। প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে চরের মানুষ। পটুয়াখালীর অধিকাংশ চর-দ্বীপে গড়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। এটি যেমন কিছুটা হলেও চরের মানুষকে সুরক্ষা দিচ্ছে। আবার তা দুর্ভোগেরও সৃষ্টি করেছে। হিংস্র জন্তু আর সাপের কামড়ে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। চরের জীবন মানে অনিশ্চিত জীবন।

নদী ভাঙ্গনে ভিটিসহ ভাসাইয়া লইয়া যায়

আমি তো মাটি কিনতাছি না, পানি কিনতাছি পানি। গত ’৮০-এর দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশ টেলিভিশন থেকে প্রচারিত নদীভাঙ্গন ও চরের জীবনের ওপর ধারবাহিক নাটক ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’র একটি সংলাপ। নদী তীরের এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তির চরিত্রে অভিনয় করা শক্তিশালী অভিনেতা হুমায়ুন ফরিদীর কণ্ঠে ছিল এই সংলাপ। গল্পটি ছিল এ রকমÑ চর জেগে ওঠার আগেই প্রভাবশালীরা এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সহযোগিতায় কখনও কেনে নদী ভূমি, কখনও কেনে জেগে ওঠা চর। তারাই তখন জমির মালিক। প্রকৃত জমির মালিক হয়ে পড়ে প্রজা, কেউ নিজের ভূমিরই মজুর। এই গল্প এতটাই জীবন ঘনিষ্ঠ যা আজও দৃশ্যমান যমুনা পদ্মা মেঘনার চরে। চর জেগে উঠছে প্রতিটি নদীতে। প্রকৃতিবাদী পরিবেশবিদ ও ভূতাত্ত্বিকগণ বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তনে নদীগুলো তার নাব্যতা হারাচ্ছে! বেড়েছে ভাঙ্গন। নদীর নিয়মানুযায়ী একূল ভেঙ্গে ওকূল গড়ছে। অর্থাৎ চর পড়ছে। নদী যখন পাড় ভেঙে দেয় তখন বসতভিটা সবই চলে যায় নদীগর্ভে। সকালেই যারা ছিল বড় কৃষক, পাড় ভেঙে যাওয়ার সঙ্গেই তারা হয়ে পড়ে নিঃস্ব। নদী ভাঙন নিয়ে রচিত হয়েছে গান। যা এতটাই পরিচিতি পেয়েছে যে সুর ভেসে উঠলেই মনে পড়ে ‘......সকাল বেলায় আমির রে ভাই ফকির সন্ধ্যা বেলা...’।

ষাটের দশকের এক নেতা জনসভায় বলেছিলেন, ‘বান তুফান আইলে ঘরবাড়ি জিনিসপত্রের কিছু পাওয়া যায়। আগুনে পুড়লে ভিটির ওপর ছাই পাওয়া যায়, নদী ভাঙ্গনে কিছুই পাওয়া যায় না। ভিটিসহ ভাসাইয়া লইয়া যায়..’। নদী ভাঙা এই মানুষরা অবস্থান নেয় নদীর কাছাকাছি ভূমিতে। কেউ আশ্রয় নেয় বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে। কেউ বা কোন চরে। বংশ পরম্পরায় এদের লক্ষ্য থাকে কোন চর জেগে উঠলে ফিরে পাবে তারা সেই বসতি! বগুড়া, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, যমুনা নদী তীরে এমন অনেক মানুষ বসতি গড়েছে। বন্যানিয়ন্ত্রণ ও নদী ভাঙ্গন রোধে ষাটের দশকের শুরুতে কুড়িগ্রামের কাউনিয়া থেকে পাবনার বেড়া পর্যন্ত প্রায় আড়াইশ’ কিলোমিটার যে বাঁধ নির্মিত হয়েছিল তার বেশিরভাগই টেকেনি। এই বাঁধের সামনে-পেছনে অনেক বেড়িবাঁধ নির্মিত হয়েছে। তারপরও ভাঙ্গন ঠেকানো যায়নি। বগুড়ার সারিয়াকান্দি ও সিরাজগঞ্জে পনি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যে হার্ড পয়েন্ট রিভেটমেন্ট বানিয়েছে তা দিয়ে ভাঙ্গন কিছুটা ঠেকলেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এক সময় হার্ড পয়েন্টেই ধস নামে। পানি বিজ্ঞানীরা বলেন, বাংলাদেশের নদনদীর মধ্যে একমাত্র যমুনা আনপ্রেডিক্টেবেল নদী। এই নদী বয়ে চলার ধারা মেয়েদের চুলের বেণির মতো। বাড়তি পলি ও জলপ্রবাহ অনেক বেশি। ফলে ভাঙ্গনও বেশি। আবার চরও বেশি। একটা সময় বলা হতো চরে যারা বাস করে তারা হতদরিদ্র শ্রেণী। বর্তমানে সেই দিন ফুরিয়েছে। চর জেগে ওঠার সঙ্গেই প্রথমে দখল নেয়ার লড়াই শুরু হয়। এরপর প্রভাবশালীর দখলে থাকে চর। চরের ভূমিতে যারা বসতি গড়ে তারা হয়ে পড়ে প্রভাবশালীর প্রজা। আবাদ কার্যক্রম নৌকা বাইয়ে নিয়ে যাওয়া সবই চরকে ঘিরে। চরের মধ্যে পথঘাট, গাছগাছালি, হাটবাজার, স্বাস্থ্যসেবা, স্কুল কোথাও কলেজ কোথাও পাকা সড়ক সবই চোখে পড়ে। চরে প্রবেশের পর মনে হবে না নদী বক্ষের কোন গ্রাম। আর দশটা শুকনো ভূমির গ্রামের মতোই এক গ্রাম। ধান, পাট, গম, মরিচ, ভুট্টা, শাকসবজি সবই ফলছে। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে সফলতা আসেনি। অল্প বয়সে বিয়ে অর্থাৎ বালিকা বধূ হয়ে যাওয়ায় প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত পরিবারের সদস্যরা। বগুড়ার কাজলা চরের আবদুল গফুর বললেন, ‘ম্যেয়েছ্যলে (মেয়ে) একটুক সোন্দর হলে চ্যাংরাররা (ছেলেরা) এমন লাইন লাগে যে বাপমায়ে বিয়্য না দিয়ে আর পারে না। উপযুক্ত পাত্র পাওয়া গেলেই বিয়ে পড়ে দেয়। তারপর যা হয়....।’ এই অবস্থায় বালিকা বধূর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। সন্তান সম্ভবা হয়।

প্রকাশিত : ২৩ মে ২০১৫

২৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: