রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

প্রাণভিক্ষা চেয়েও বাঁচতে পারল না নিরপরাধ কলেজছাত্র চঞ্চল

প্রকাশিত : ২৩ মে ২০১৫
প্রাণভিক্ষা চেয়েও বাঁচতে পারল না নিরপরাধ কলেজছাত্র চঞ্চল
  • খুনের হোতা ভূমিদস্যু এখনও গ্রেফতার হয়নি

গাফফার খান চৌধুরী ॥ ভাল চাকরি করে সংসারে সচ্ছলতা আনা হলো না মিরপুরের বঙ্গবন্ধু কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের মেধাবী ছাত্র আব্দুর রহমান চঞ্চলের। জমি সংক্রান্ত বিরোধে মারামারির মধ্যে পড়ে জীবন দিতে হয়েছে নিরীহ এই কলেজ ছাত্রকে। চঞ্চলের বাড়িতে চলছে মাতম। কোন কিছুতেই তা থামছে না। ঘটনার পর থেকে পিতা পাগল প্রায়। একমাত্র ছোট ভাই খুনের পর পাগলের মতো ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করে উ™£ান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অথচ ঘটনার ৮ দিন পরেও সন্দেহভাজন তিনজন গ্রেফতার হলেও হত্যাকা-ের মূল হোতা ভূমিদস্যু মোমিন বক্স গ্রেফতার হয়নি। এ নিয়ে এলাকায় চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। বঙ্গবন্ধু কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ ও মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচী পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

গত ১৪ মে রাজধানীর পল্লবী থানাধীন উত্তর কালশীতে ঘটনাটি ঘটে। ভূমিদস্যুরা প্রতিপক্ষ ভেবে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে দুপুর বারোটার দিকে পৈশাচিকভাবে চঞ্চলকে হত্যা করে। চঞ্চল বহুবার বিরোধের ঘটনার পক্ষের বা বিপক্ষের কেউ নয় বলে চিৎকার করে হাতজোড় করে খুনীদের কাছে জীবন ভিক্ষা চেয়েছে। কে শোনে কার কথা। চঞ্চলের কথায় বিশ্বাস না করেই খুনীরা দৌড়াতে দৌড়াতেই পিছন থেকে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। পুলিশ বলছে, মূল হোতাসহ হত্যাকারীদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে।

ঘটনার দিন দুপুর বারোটা। ঘটনাস্থল রাজধানীর পল্লবী থানাধীন উত্তর কালশীর মিরপুর সিরামিক ফ্যাক্টরি এলাকা। সেদিন প্রচ- গরম ছিল। চঞ্চল কালশীর ‘প’ ব্লকের ১ নম্বর সড়কের ৫৭৪ নম্বর একতলা নিজ বাড়ির অদূরে কাঁঠাল গাছের ছায়ায় বসে আরাম করছিল। সামনের ঢালুতে নানা বয়সী ছেলেরা প্রচ- গরমের মধ্যেই সকাল থেকেই ক্রিকেট খেলছিল। দুপুর বারোটার দিকে আচমকা চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ ভেসে আসতে থাকে। চঞ্চল স্বাভাবিক কারণেই ঘটনা দেখার জন্য সামনে যায়। এ সময় একদল যুবক ধারালো চাপাতি, হকিস্টিক ও চাইনিজ কুড়াল নিয়ে দৌড়াচ্ছিল। সশস্ত্র যুবকরা দৌড়ে ঢালের উপরের দিকে আসতে থাকে। তাই দেখে চঞ্চল খানিকটা ভয় পেয়ে দ্রুত হেঁটে পাশেই থাকা সিরামিক ফ্যাক্টরির দেয়ালঘেঁষা প্রকা- পাকুড় গাছের তলায় দাঁড়ায়। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই যুবকরা চঞ্চলকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করতে থাকে। চঞ্চল বার বার বলছিল, ভাই আপনারা যাকে খুঁজছেন, আমি তাদের কেউ নই। কে শোনে কার কথা। খুনীরা ধারালো চাপাতি দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে।

প্রাণে বাঁচতে সে মিরপুর সিরামিক ফ্যাক্টরির প্রাচীরের ভাঙ্গা জায়গা দিয়ে দৌড়ে ফ্যাক্টরির ভেতরে ঢুকে। খুনীরাও তার পিছু নেয়। দৌড়াতে গিয়ে প্রাচীর দেয়ালের কাছেই ফ্যাক্টরির ভেতরে পরিত্যক্ত সিরামিকের ইটের ভাঙ্গা অংশ আর সেখানে থাকা বটগাছের শেকড়ে পা আটকে পড়ে যায়। পড়ে যাওয়ার পর সেখানেই খুনীরা এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে চঞ্চলকে হত্যা করে। হত্যার সময় চঞ্চল বহুবার খুনীদের কাছে জীবন ভিক্ষা চেয়েছে। বার বার বলেছে তিনি জমি সংক্রান্ত ঘটনায় সৃষ্ট বিরোধের পক্ষ বা বিপক্ষের কেউ নয়। হত্যার পর খুনীরা সিরামিক ফ্যাক্টরির সামনের দিকে থাকা খোলা গেট দিয়ে পালিয়ে যায়। চঞ্চলের নিথর দেহ পড়ে থাকে সেখানেই। এমন পৈশাচিক রোমহর্ষক ঘটনায় পুরো এলাকায় আজও শোকের মাতম চলছে।

নিহত চঞ্চলের পিতার নাম মোহাম্মদ হারেস আলী (৫৫)। ছোটখাটো ব্যবসায়ী। মা লিলি বেগম (৪২) বছর পাঁচেক আগে মারা গেছেন। তিন ভাই এক বোন। সবার বড় ভাই মাত্র আট মাস বয়সে মারা যায়। একমাত্র বোন হাসিনা বেগম (৩৫) সবার বড়। এরপর মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম (৩২)। তিনি বাড়িতেই ঢাকা কমার্শিয়াল এ্যান্ড মোবাইল হাসপাতাল নামে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালান।

চঞ্চল সবার ছোট। তার জন্ম ১৯৯৭ সালের ১ অক্টোবর। ২০১২ সালে উত্তর কালশী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে। আর ২০১৪ সালে মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে। ভর্তি হয় বাড়ির পাশের সিরামিক ফ্যাক্টরি সংলগ্ন বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। সেখানেই বাণিজ্য বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষে পড়াশুনা করছিল।

এ ব্যাপারে গত ১৬ মে চঞ্চলের ভাই সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মমিন বক্সসহ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। বাদী সাইফুল ইসলাম জনকণ্ঠকে বলেন, মিরপুর ডিওএইচএস সংলগ্ন জায়গাটি বুড়িরটেক হিসেবে পরিচিত। তবে ডিওএইচএসের সঙ্গে জায়গাটির কোন সম্পর্ক নেই। জায়গাটি ডিওএইচএস এলাকার সীমানা প্রাচীরের বাইরে। ডিওএইচএসের সংলগ্ন হওয়ায় জায়গাটির প্রতি নজর পড়ে ভূমিদস্যু মোমিন বক্সের। তিনি একের পর এক আশপাশের জায়গা দখল করে বিভিন্ন ডেভেলপার কোম্পানির কাছে বিক্রি করে আসছিলেন। জমি সংক্রান্ত বিরোধে তারা পক্ষ বা বিপক্ষ কোন দিকেই নেই। তারপরও দুইপক্ষের মারামারির মধ্যে পড়ে আমার ভাইকে খুন হতে হয়েছে। আমি আমার ভাই হত্যার বিচার চাই।

সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা ও বুড়িরটেকের বুড়ির ছেলে সুরুজ মিয়া (৫৪) জনকণ্ঠকে বলেন, ঢালুতে তাদের প্রায় আট একর পৈত্রিক সম্পত্তি রয়েছে। জায়গাটি নানাভাবে দখলের চেষ্টা করছে স্থানীয় ভূমিদস্যু মোমিন বক্স। তিনি আশপাশের প্রায় সব জমি ভুয়া মালিকানায় দখলে নিয়ে সস্তায় প্রভাবশালীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। এ নিয়ে গত দশ বছর ধরে মারামারি-দাঙ্গা হাঙ্গামা চলে আসছে। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরধরে গত পাঁচ বছর ধরে ব্যাপক মারামারি হচ্ছে। জমি দখলে নিয়ে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেন। মোমিন বক্স জমি দখলের পর তা বিক্রি করে দেন। ঘটনাস্থলে হ্যাভোল প্রপার্টিজের আলীনগর প্রকল্প নামে একটি প্রজেক্টের সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে। ঢালুর অনেক জমি দখল করে সেখানে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়ে আনসার ক্যাম্প বসানো হয়েছে হ্যাভোল প্রপার্টিজের নামে। তারা সাইনবোর্ড লাগালেই খুলে ফেলে দেয়া হয়। এ নিয়েই মূলত দীর্ঘদিন ধরে গ-গোল চলছে। ঘটনার দিনও জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরধরে জমির মালিক ও ভূমিদস্যুদের সঙ্গে মারামারি হয়। দখলকারীদের ক্যাডাররা চঞ্চলকে প্রতিপক্ষের লোক মনে করে নির্মমভাবে এলোপাতাড়ি ছুরিকঘাতে হত্যা করে। আসলে চঞ্চল বা তার পরিবারের সঙ্গে ভূমিদস্যুদের কোন শত্রুতা নেই। কারণ তাদের সেখানে কোন জায়গা জমি নেই। ছুরিকাঘাতের সময় চঞ্চল এসব বিষয় হত্যাকারীদের বললেও তা বিশ্বাস করেনি খুনীরা। যার ফলে নিরীহ চঞ্চলকে নির্মমভাবে খুন হতে হয়েছে। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরধরে এর আগে আব্বাস নামে একজনকে হত্যা করে ভূমিদস্যুরা। আর তাকে বহুবার ষড়যন্ত্র করে জেলে পাঠিয়েছে ভূমিদস্যু ও তাদের লোকজন।

এ ব্যাপারে পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বিপ্লব কিশোর শীল জনকণ্ঠকে বলেন, ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যেই রাজীব, মিনাল ও মোহাম্মদ আলী নামে সন্দেহভাজন তিন হত্যাকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। চঞ্চল খুনের ঘটনায় তার ভাই সাইফুল ইসলামের দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি মমিন বক্সসহ এজাহারনামীয় ১২ জন ছাড়াও অজ্ঞাত আসামিদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান চলছে।

প্রকাশিত : ২৩ মে ২০১৫

২৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: