মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধেই লিবিয়ায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা

প্রকাশিত : ২৩ মে ২০১৫
  • পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিক পাঠানো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত

তৌহিদুর রহমান ॥ বাংলাদেশের অনুরোধের প্রেক্ষিতে লিবিয়া সরকার নতুন করে সেদেশে শ্রমিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। এক বছর আগেই বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে লিবিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। তবে সে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না হওয়ায় এবার লিবিয়া সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে আবার নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। লিবিয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সেদেশে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, চার বছর আগে লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফি সরকারের পতনের পর দেশটির রাজনীতি দুই ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে সেখানে দুটি সশস্ত্র গ্রুপের সরকার রয়েছে। দুই গ্রুপই নিজেদেরকে দেশটির মূল সরকার বলে দাবি করে আসছে। একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে হামলা-পাল্টা হামলা করছে। শুধু তাই নয়, মিলিশিয়া বা বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীও একে অপরের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করছে। এ প্রেক্ষিতে গত বছর ৩১ মে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে লিবিয়ার পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত কর্মী পাঠানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। একই সঙ্গে দেশটিতে ভ্রমণ না করতেও বাংলাদেশী নাগরিকদের পরামর্শ দেয়া হয়।

বাংলাদেশ সরকার থেকে লিবিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও সেদেশে বিভিন্নভাবে শ্রমিক যাচ্ছিলেন। তবে সেসব শ্রমিক লিবিয়া যাচ্ছিলেন ইউরোপে যাওয়ার উদ্দেশে। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর হয়ে এসব শ্রমিক ইউরোপে পাড়ি জমিয়ে থাকেন। কারণ মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির পতনের পর গৃহযুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়া এখন ইউরোপমুখী মানবপাচারের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এ প্রেক্ষিতে গত ১৬ মে লিবিয়া সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাংলাদেশী শ্রমিকদের লিবিয়ায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেশটির অভিযোগ লিবিয়ার কোম্পানিতে বাংলাদেশীরা চাকরি নিয়ে আসে। কিন্তু তারপর অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে। অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে লিবিয়া সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসাবেই এ নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

লিবিয়া সরকার বাংলাদেশী শ্রমিক প্রবেশে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিলেও এই আদেশ তারা বাস্তবায়ন করতে পারবে কেবল দেশের পূর্বাঞ্চলের জল, স্থল ও আকাশসীমার ক্ষেত্রে। দেশের কেবল ওই অংশটিই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত লিবীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে ত্রিপোলিসহ লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে বিদ্রোহীদের একটি পক্ষ, যারা নিজেরাই সেখানে সরকার চালাচ্ছে। নৌকায় করে অবৈধ অভিবাসীদের ইতালিতে পাঠাতে ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী লিবিয়ার ওই অঞ্চলটিই মানবপাচারকারীরা নিজেদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, লিবিয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এক বছর আগেই সেদেশে শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেও অনেক শ্রমিক লিবিয়া গেছেন। আবার লিবিয়ায় এসব শ্রমিক কোন সমস্যায় পড়লে উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হয়। সে কারণে সরকার থেকে ওই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। তবে সে নিষেধাজ্ঞা অনেকেই উপেক্ষা করে সেদেশে যাচ্ছিলেন। সে কারণে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারির জন্য লিবিয়া সরকারকেই অনুরোধ করা হয়। সূত্র জানায়, লিবিয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। দেশটিতে দেশী-বিদেশী সকলেরই নিরাপত্তা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে গত এক বছরে লিবিয়ায় কমপক্ষে চার বাংলাদেশী নিহত হয়েছেন। এছাড়া গত তিন মাসে মুক্তিপণ দিয়ে দেশটির সন্ত্রাসী বাহিনীর হাত থেকে দুই বাংলাদেশী মুক্তিলাভের ঘটনা ঘটেছে। লিবিয়া-বাংলাদেশ উভয় দেশের এক শ্রেণীর দালালচক্র বাংলাদেশী নিরীহ মানুষদের বিভিন্ন প্রলোভনের মাধ্যমে লিবিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার টোপ দেয়। এমন পরিস্থিতির শিকার বাংলাদেশী অনেকের সঙ্গে আলাপ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানতে পেরেছে, দালালচক্র লিবিয়া পর্যন্ত যাওয়ার জন্য এক বাংলাদেশীর কাছ থেকে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা নেয়। আবার লিবিয়া পৌঁছার পর ওই বাংলাদেশীদের জিম্মি করে ইউরোপ যাওয়ার জন্য আরও ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা নেয়।

সূত্র জানায়, লিবিয়া উপকূল দিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসীই ইউরোপে পাড়ি জমিয়ে থাকে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর সাড়ে ৫ মাসেই ৬০ হাজারের বেশি লোক ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। এ ধরনের যাত্রায় দুর্ঘটনায় পড়ে এ বছর অন্তত ১ হাজার ৮০০ লোকের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ গুণ বেশি। গত মাসে লিবিয়া উপকূল থেকে রওনা হয়ে ইতালির সীমান্তবর্তী দ্বীপ ল্যাম্পেডুসায় যাওয়ার পথে নৌকাডুবে প্রায় ৯০০ অভিবাসী নিহত হন।

২০১১ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরুর পর লিবিয়া থেকে প্রায় ৩৬ হাজার বাংলাদেশীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে অনেকেই সঙ্কটের মধ্যেও দেশটিতে থেকে যান। পরবর্তীতে দেশটির অচলাবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে বাংলাদেশ থেকে কর্মী পাঠানো শুরু হয়। তারপর বাংলাদেশ থেকে কিছু কিছু শ্রমিক লিবিয়া গেলেও দেশটির পরিস্থিতি গত বছর থেকে আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে উঠে। এ প্রেক্ষিতে গত বছর ৩১ মে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে লিবিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

প্রকাশিত : ২৩ মে ২০১৫

২৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: