রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দহনকথা ও বিভেদের বিরুদ্ধে বয়ান

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫
  • সিরাজুল এহসান

রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যদি মানুষের কল্যাণ বয়ে না এনে অমানবিক বা দানবীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে, সে সিদ্ধান্ত যে ভুল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যুগে যুগে রাজনীতির মধ্যে অপ কিংবা কূপম-ূকতা ঢুকেছে ছদ্মবেশে। পরিশেষে তাদের থাবার বিস্তার এতটাই বিস্তৃত ও গভীর হয়েছে যার ফল ভোগ করতে হয়েছে মানুষকেই। কখনো জীবন দিয়ে, কখনো ভিটেবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র অস্থায়ী বাসিন্দা আবার একেবারে শিকড় উপড়ে উদ্বাস্তু হয়ে। এ চিত্র আমরা দেখেছি দেশে দেশে। মূলে কিন্তু বলা হয় মানুষের কল্যাণেই এসব সিদ্ধান্ত। আমরা হয়ত প্রকাশ্যে দেখি এর ইতিবাচক দিকটি। তবে কার্যত তা নয়। কেননা একটা গোষ্ঠী এর ফল ভোগ করে। তারা হয়ত উপকৃত হয় কিন্তু আরেকটি গোষ্ঠী পড়ে বিপর্যয়ের মুখে। ক্ষেত্র বিশেষে নিশ্চিহ্ন হওয়ার দৃষ্টান্তও আছে। ভূ-খ- ভেঙে টুকরো হওয়ার উদাহরণও আমাদের সামনে দৃশ্যমান। তাহলে সামগ্রিক মানুষের যে কল্যাণ হচ্ছে না এ কথা বলা যায়। এই ভুল সিদ্ধান্তের মধ্যে যা নিহিত তা স্পষ্ট হয় এমনরূপে- স্বাধীনতালিপ্সা বা জাতীয়তাবাদের স্রোতরোধে ভাগ কর-শাসন কর, ধর্মীয় পক্ষপাতিত্ব, সাম্প্রদায়িকতার বিষ রোপণ, মৌলবাদের সঙ্কীর্ণ চিন্তার অনুপ্রবেশ, উগ্রবাদী অপদর্শনের প্রয়োগ, বর্ণবাদ ইত্যকার নানা নেতি অনুষঙ্গ। এসব কোনকালেই মানবকল্যাণ বয়ে আনেনি। সঙ্কীর্ণ স্বার্থান্বেষী মহল, শাসকদের স্বার্থসিদ্ধি হিসেবে এসব ব্যবহৃত হয়েছে জেনেও আমাদের এ উপমহাদেশে ভিনদেশী বেনিয়া শাসকরা ‘যথার্থই’ কাজে লাগিয়েছে। শুধু তারাই বা কেন স্বজাতি-স্বগোষ্ঠী কম কিসে!

শাসকের শাসনসিদ্ধির জন্যই ১৯০৫ সালে যে রাজনৈতিক সিদ্ধাদ্ধ নেয় ইংরেজ শাসক এ উপমহাদেশে তা কখনই কল্যাণকর ছিল না আমাদের জন্য। মানুষে মানুষে যে ভ্রাতৃবন্ধন হাজার বছর ধরে ছিল সেখানে ঢুকে গেল অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব, জীঘাংসা। এই বিষবীজ রোপণের ফল তারা ভোগ করেছিল ভালভাবেই। ধর্মের ভিত্তিতে হয়ে গেল দুটি রাষ্ট্র। অখ- ভারতের সেই খ- হওয়া শুরু। পক্ষান্তরে কী হলো তা ইতিহাসের আলোচিত অধ্যায়। একদল মানুষ হয়ে পড়ল বিপন্ন। নিজের স্বভূমি মুহূর্তেই হয়ে পড়ল পর, যে হাত ছিল পড়শি ও বান্ধবের তা হয়ে গেল অবিশ্বাস বা ঘাতকের। শিকড় উপড়ে গেল। বিপর্যস্ত ললাটে জুটল ‘উদ্বাস্তু’র তিলক। আশ্রয় আর নিরাপত্তা হয় অনিশ্চিত। যেখানে আশ্রয় মিলল সেখানটাও কি নিরাপদ? একটু দেখা যাক বিবরণÑ ‘‘... একদিন এক নাছোড়বান্দা গরুকে সামলাতে বাবা নিরুপায় হয়ে তার মাথায় আঘাত করে বসলেন, গরুটা ঘুরে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে কচিকণ্ঠে এক তীক্ষè চিৎকার, ‘ও রহম কাকা ও করম কাকা, শিগগির আসো, রিফুজি আমাগো গরু মারে ফেলালো।’ ওরা তখন ‘রিফুজি’ শব্দটাকে গালির মতো ব্যবহার করত। ছেলেটার চিৎকার বুলেটের মতো কাজ করল। ভোজবাজির মতো পনেরো বিশজন ছেলে যুবা বুড়ো কোথা থেকে যে ছুটে এলো বলা কঠিন। প্রায় সবার হাতে পাচন, মুখে গালিগালাজ...”। এই বাস্তবতা তখন দেশ ছেড়ে আসা এ ভূখ-ে আবাস গড়ার প্রচেষ্টায় এক পরিবারের। পরিবারটি এখানেও অসহনীয় ও দুর্দশা অবস্থার মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে পাকিস্তান রাষ্ট্রও তাদের করে না বিশ্বাস। যদিও তাদের পারিবারিক ধর্মীয় পরিচয় ইসলাম। তারা ধার্মিক মুসলমান। ভারত থেকে আসাটা যেন তাদের অপরাধ। তাই রাষ্ট্রের এমন বৈষম্য ও বৈরী আচরণ।

উদ্বাস্তু হওয়ার ঘটনা নিয়ে সাহিত্য, চলচ্চিত্র কম হয়নি। একাত্তরের স্বাধীনতার পর নতুন প্রজন্মের কাছে এমন ঘটনা ও ইতিহাস খুব একটা স্পষ্ট নয়, কিংবা অনুভব করারও কথা নয়। যে ঘটনা উদ্ধৃত করা হলো তা ’৪৭-এ বাংলাভাগের শিকার এক পরিবারের। সেই বয়ান লিখেছেন ওই পরিবারেরই এক সদস্য সৈয়দ মনোয়ার আলী তার ‘সাতচল্লিশের বঙ্গভঙ্গ, উদ্বাস্তু সময় এবং আমাদের মিনা পরিবার’ নামের গ্রন্থে। দৃশ্যত পারিবারিক ইতিহাস মনে হলেও তা শেষ পর্যন্ত দেশভাগ, সাম্প্রদায়িকতা, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি, সঙ্কীর্ণতার শেকলবন্দী জীবন, মানুষের উদ্বাস্তু হওয়া ও পরবর্তী দুঃসহ জীবনচিত্র, সে সময়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক আবহ ফুটে উঠেছে এ গ্রন্থে। লেখক সেসময়ে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সাংস্কৃতিক কর্মকা-েও রেখেছেন সম্পৃক্ত। যে কারণে অনেক ছোট ছোট বিষয় তাঁর কলমে পেয়েছে ভিন্ন দ্যোতনা, পেয়েছে ইঙ্গিতময়। ছোট বিষয়ের মধ্যে বড় ব্যাপার লুকিয়ে থাকার বিবরণ হয়েছে বিবৃত। এ সঙ্গে উঠে এসেছে বিভিন্ন জায়গার স্থানীয় ইতিহাস। এ গ্রন্থ পশিচমবঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা একটি পরিবারের স্থায়ী হওয়া, সচ্ছল ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের আর্থিক দৈন্য কাটিয়ে উঠতে জীবন সংগ্রামে টিকে থাকা, নিরাপত্তা প্রত্যাশার বিবরণই নয়; ওই সময়ের শিকার সব মানুষেরই প্রতিনিধিত্বকারী লেখচিত্র এ গ্রন্থ। নতুন প্রজন্মের কাছে সে ইতিহাস ও বাস্তবতা তুলে ধরার জন্য লেখক ধন্যবাদ প্রত্যাশা করতে পারেন। বইটি হতে পারে সাহিত্য প্রকাশের উল্লেখযোগ্য প্রকাশনার একটি। সম্ভ্রান্ত ও প্রগতিশীল প্রকাশক মফিদুল হক বইটি প্রকাশ করে যথারীতি তাঁর দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। চমৎকার ও প্রতীকী প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী অশোক কর্মকার। সাবলীল ও ঝরঝরে গদ্যে রচিত বইটি রাজনৈতিক-সামাজিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক উপাদানের কারণে পাঠক সমাদৃত হবে বলে আশা করা যায়।

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫

২২/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: