আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জাহেদা খাতুন ॥ তাঁর মা

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫
  • জোবায়ের আলী জুয়েল

নজরুলের পিতা কাজী ফকির আহমাদের সঠিক জন্ম তারিখ পাওয়া যায় না। তিনি বাংলা ১৩১৪ সালের ৭ চৈত্র ইংরেজী ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে পরিণত বয়সে পরলোক গমন করেন। বয়স হয়েছিল ষাট বছর। তিনি আরবি, ফারসি জানতেন, তবে তাঁর বাংলা ও উর্দু ভাষার ওপর রীতিমতো দখল ছিল। তাঁর হস্তাক্ষর ছিল অতীব সুন্দর। চুরুলিয়া অঞ্চলের নামকরা দলিল লিখিয়ে ছিলেন তিনি। উচ্চাঙ্গের মিলাদ পাঠক বলেও তাঁর সুনাম ছিল। কাজী ফকির আহমদের পিতার নাম কাজী আমিনুল্লাহ।

কাজী ফকির আহমদ সুপুরুষ ছিলেন। পিতার ওয়ারিশ সূত্রে প্রায় চল্লিশ বিঘার মতো চাষের জমি পেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ বয়সে এক বসতবাড়ি ছাড়া তাঁর বিষয় সম্পত্তি বলতে কিছুই ছিল না। তবে বিষয় সম্পত্তি হাত ছাড়া হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল পাশা খেলা। এই খেলা তাঁকে প্রবলভাবে পেয়ে বসেছিল। তাঁর এই পাশা খেলার অন্যতম জুড়ি ছিলেন মহানন্দ আশ নামক এক বণিক, তার কাছেই কাজী ফকির আহমদ তাঁর বেশির ভাগ সম্পত্তি হেরেছেন পাশা খেলায়।

কাজী ফকির আহমদের প্রথম স্ত্রীর নাম কাজী সৈয়দা খাতুন। তিনি চুরুলিয়া গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন। তাঁর গর্ভে একমাত্র কন্যা সাজেদা খাতুন। সৈয়দা খাতুনের মৃত্যুর পর ফকির আহমদ বিবাহ করেন জাহেদা খাতুনকে। তিনি চুরুলিয়ার পার্শ্ববর্তী ভুড়ি গ্রামের উচ্চ বংশজাত মহিলা ছিলেন। তিনি অতি দয়াবতী রমণী ছিলেন। জাহেদা খাতুনের গর্ভে তিনপুত্র এবং এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। কাজী সাহেবজান, কাজী নজরুল ইসলাম, কাজী আলি হোসেন ও বোন উম্মে কুলসুম। কাজী সাহেবজান পিতার দারিদ্র বশত উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ পাননি। পিতার মৃত্যুর পর অন্ন সংস্থানের জন্য রানীগঞ্জের কয়লা খনিতে চাকরি নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন কয়লা খনিতে নিযুক্ত থাকায় তাঁর স্বাস্থ্য ভঙ্গ হয় এবং অসুখে ভুগে পঞ্চাশ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন। কাজী সাহেব জানও অবসরে দলিল লেখকের কাজ করতেন।

কাজী আলি হোসেন পড়াশোনা করেন কাজী পাড়ায় মক্তবে। পারিবারিক সূত্রে দলিল লেখকের কাজে পরবর্তীকালে নিযুক্ত হন এবং আইন আদালত বিষয়ে পাকাপোক্ত হয়ে ওঠেন। এলাকার কৃষক শ্রমিকদের হয়ে সমাজ সেবকের কাজ করতে গিয়ে গ্রামের তৎকালীন জমিদার, জোতদারদের রোষানলে পড়েন এবং ১৯৫১ সালের ৭ জানুয়ারি নিজ গ্রামে প্রকাশ্যে খুন হন।

কাজী নজরুল কিশোর বয়সে সেই যে গৃহত্যাগ করলেন তারপর মায়ের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর দীর্ঘ প্রায় দশ বছর পর পল্টন থেকে ফিরে ১৯২০ সালে চুরুলিয়ায় গেলে। সেখানে সপ্তাহ কাল ধরে অবস্থান করেন তিনি। এই সময় মায়ের সঙ্গে তাঁর নানা বিষয়ে অনেক আলাপ হয়। শেষে কথায় কথায় ভীষণ ঝগড়া বেধে যায়। এই ঝগড়ার কারণ জানা যায়নি। নজরুলও পরবর্তীকালে এ বিষয়ে কাউকে কিছু বলেননি। ঝগড়ার পর তিনি বাড়ি ছেড়ে কোলকাতায় চলে আসেন। এরপর তার মা যতদিন জীবিত ছিলেন কত অনুরোধ করেছেন, কত আব্দার ধরেছেন ছেলেকে এক নজর দেখার জন্য কিন্তু নজরুলের ঝেদ আর অভিমান এতটা তীব্র ছিল যে মায়ের অনুরোধ তিনি রাখেননি। ইহকালে মায়ের ও আর ছেলের মুখ দেখা হয়নি।

শোনা যায় নজরুলের মা জাহেদা খাতুন ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী। সে সময় তাঁর বয়স ও ছিল কম। একজন কম বয়স্কা সুন্দরী বিধবা রমনী সম্মানের সঙ্গে নিজের ইজ্জত আব্রু রক্ষা এবং নিজের ও সন্তানদের ভরণ পোষণের নিশ্চয়তার জন্য যদি মৃত স্বামীর ভাইকে বিয়ে করেই থাকেন তাহলে অবস্থঅর প্রেক্ষাপটে সেটাকে কোন অন্যায় বলা চলে না। তাছাড়া ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের বিয়েকে বরং উৎসাহিতই করা হয়েছে। তবে একথা মিথ্যে নয় যে, উভয় বঙ্গের গ্রামীণ পরিবেশের প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা এতটা অনুদার যে, সম্পূর্ণ বৈধ হলেও এ ধরনের বিয়েকে অনেকে কিছুটা হেয় চোখেই দেখে থাকে। সম্ভবত নজরুল ও সেই মানসিকতার উর্ধে উঠে মায়ের দ্বিতীয় বিয়েকে মেনে নিতে পারেননি। এমনও হতে পারে নজরুলকে তাঁর মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে কেউ হাসি মসকরা করেছিল যা তার শিশু মনে গেঁথে গিয়েছিল এবং যা’ তিনিই কখনই ভুলতে পারেননি।

তবে মায়ের সঙ্গে নজরুলের ঝগড়া এবং অভিমানের কারণ জানা না গেলেও অনুমান করা শক্ত নয় যে, মায়ের কোন আচরণে নজরুল একটা প্রচ- মানসিক আঘাত পেয়েছিলেন যার দরুন আর কোনদিন চুরুলিয়া ফিরে যেতে রাজি হনান। এমনকি ১৯২৮ সালের ৩০ মে চুরুলিয়ায় মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়েও নজরুল গ্রামের বাড়িতে যাননি। শেষবারের মতো মায়ের মুখ খানি দেখেননি। অবশেষে এক বুক কষ্ট নিয়ে জাহেদা খাতুন এ পৃথিবী থেকে চির বিদায় গ্রহণ করেছেন। মা’ জাহেদা খাতুন পুত্র নজরুলকে এক নজর দেখার জন্য অন্তিম বাসনা প্রকাশ করেছিলেন। জাহেদা খাতুনের মাতৃ হৃদয়ের এই অতৃপ্ত হাহাকার কি নজরুল জীবনে কোনই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি? জীবদ্দশায় কবি কখনই এ সম্পর্কে মুখ খোলেননি। ফলে নজরুলের জীবনে এটি আজো অমীমাংসিত অধ্যায় হিসেবেই রয়ে গেছে। অভিমান বশেম ায়ের সাথে নজরুল সম্পর্ক ছিন্ন করলেও পরবর্তী সময়ে নজরুলের বুভুক্ষু মন কিন্তু সর্বদা কাঙালের মতো কেঁদে ফিরেছে মাতৃস্নেহের সামান্যতম পরশ পাওয়ার জন্য। তাই আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন সময়ে কতিপয় মহিয়সী নারীকে তিনি প্রাণ ভরে মা’ বলে সম্বোধন করেছেন। তাঁদেরকে কবি যেমন মায়ের মতোই অন্তর দিয়ে ভক্তি শ্রদ্ধা করেছেন তেমনি তাঁরাও তাকে পুত্রবৎ স্নেহ করেছেন।

নজরুলের ‘মা’ সম্বোধনে যারা ধন্যা হয়েছিলেন তাদের মধ্যে দৌলতপুরের আলী আকবরের খানের মেজোবোন নার্গিসের খালা আম্মা এখতারুন্নেসা খানম, বিপ্লবী হেমপ্রভবা দেবী, হুগলির মিসেস এম রহমান, কুমিল্লার বিরজা সুন্দরী দেবী এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের স্ত্রী বাসন্তী দেবী অন্যতমা। নজরুল নার্গিসের বিয়ের ব্যাপারে যখন খাঁ পরিবারের সকলেই ছিলেন গররাজি তখন এই এখতারুন্নেসাই সকলেরও পরে প্রভাব বিস্তার করে সেই বিয়েকে সম্ভব করে তুলেছিলেন। ১৯২১ সালের ১৭ জুন নজরুলের সঙ্গে নার্গিস আক্তার খানম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন (বিয়ে নিয়ে অনেক মতানৈক্য আছে)। এই এসময় এখতারুন্নেসা খানম মায়েরমতোই নজরুলের সকল আব্দার পূরণ করতেন। এখতারুন্নেসা ছাড়া আর কাউকে কবি পাত্তাই দিতেন না। নজরুলকে তিনি এতটা আপন করে নিয়েছিলেন যে, ভাইদের কাছে প্রাপ্য তিনি তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি নজরুলের নামে লিখে দেয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান।

বহু নারীর মাতৃস্নেহ-আদর, মমতা, শ্রদ্ধা ও ভালবাসা পেয়েছেন কবি। এমনি ধরনের আরেক বিপ্লবী অগ্নিকন্যা হেমপ্রভাকে নজরুল ‘মা’ বলে ডাকতেন। এই হেমপ্রভাকে নিয়ে কবি রচনা করেন ‘হেমপ্রভা’ কবিতাটি। ১৩৩২ এর ২৯ ফাল্গুন কবি মাদারিপুরে মৎস্যজীবী সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। প্রগতিশীল শান্তি আন্দোলন ও নারী জাগরণের অগ্রসেনানী হেমপ্রভা ও ঐ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন। কবি এই মহীয়সী নারীকে নিয়ে ১৯২৬ সালে রচনা করেন হেমপ্রভা কবিতাটি

কোন অতীতের আঁধার ভেদিয়া

আসিলো আলোক জননী।

প্রভায় তোমার উদিল প্রভাত

হেম-প্রভ হলো ধরণী॥

প্রমিলা নজরুলের বিয়ে হয় ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল। তাঁদের যখন বিয়ে হয় তখন প্রমীলার বয়স ১৪ আর নজরুলের ২৩। মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার ঐতিহ্যবাহী তেওতা গ্রামে প্রমীলঅ সেনগুপ্তার জন্ম।

’াতেই তিনি গিরিবালা দেবীকে বিয়ে করেছিলেন। গিরিবালা দেবীর জা ছিলেন বিরজা সুন্দরী দেবী।

প্রমীলার জ্যেঠী বিরজা সুন্দরী দেবীকে সে নজরুল ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন সে কথা তো সকলেরই জানা। তিনিই নজরুলকে হুগলী জেলে নিজ হাতে লেবুর রস পান করিয়ে দীর্ঘ ৩৯ দিনের অনশন ভঙ্গ করিয়েছিলেন। সেদিন নজরুলের অনশন ভাঙ্গিয়ে জেল থেকে বাইরে এসে অপেক্ষামান জনতার উদ্দেশ্যে বিরাজ সুন্দরী দেবী বলেছিলেন-“ খ্ইায়েছি পাগরকে। কথা কি শোনে বলে, না, অন্যায় আমি সইব না। শেষ পর্যন্ত আমি হুকুম দিলাম, অমি ‘মা’। মার আদেশি সব ন্যস্ত অন্যায়দ বোধের ওপরে। লেবুর রস খাইয়ে এসেছি।” ১৯২৬ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হয় কবির বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ” সর্বহারা করি এই গ্রন্থটি বিরজা সুন্দরী দেবীকে উৎসর্গ করেন।

হুগলীরত এক মহিয়সী নারী বিশিষ্ট সমাজ সেবিকা এবং লেখিকা মিসেস এম রহমানকে ও নজরুল অপরিসীম শ্রদ্ধা ভক্তি করতেন। তাঁকেও তিনি “মা” বলে ডাকতেন। তাঁর প্রকৃত নাম মুসাম্মত মাসুদা খাতুন। জন্ম ১৮৮৪ সালে। হুগলির সরকারী উকিল খান বাহার্দুর মজহারুল আনওয়ার চৌধুরীর কন্যা এই মিসেস এম, রহমান নজরুল ইসলামকে বিশেষ স্নেহ করতেন। তাঁর স্বামী ছিলেন স্বনামধন্য বিখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মজিবর রহমান। সে কালে যা’ ছিল অস্বাভাবিক চিন্তা হিন্দু মেয়ে প্রমিলা ও মুসলমান ছেলে নজরুলের মধ্যে বিসে। বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে নজরুল প্রমীল ার ক্ষেত্রে তিনি তাই বাস্তবায়ন করেন।

কলকাতায় নজরুল প্রমিলার বিয়ে হয় ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল। বিয়ের পর নবদম্পতির বসবাসের জন্য তিনিই হুগলিতে নজরুলকে বাসা ভাড়া করে দেন। এই বিদ্যুষী মহিলা ১৯২৬ সারের ২০ ডিসেম্বর ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে শোকাহত নজরুল রচনা করেন মিসে এম রহমান” নামের বিখ্যাত কবিতাটি।

এখানে উল্লেখ্য নজরুল যখন একজন পাতানো মায়ের মৃত্যুতে শোকের বন্যাি বইয়ে দিচ্ছেন তখন গর্ভ ধারিনী, মায়ের কোন খোঁজ খবর রাখারও প্রয়োজন মনে করছেন না। এই সময়ে কবির নিজের মা জীবিত ছিলেন। নজরুলের ‘মা’ জাহেদা খাতুন মারা যান ১৯২৮ সালের ৩০ মে।

এই সময় আরেকজন মহিয়সী নারীকে তিনি প্রাণভরে ‘মা’ বলে সম্বোধন করতেন। তিনি হচ্ছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সহধর্মিনী বাসন্তী দেবী। তিনি ও তাকে সন্তানতূল্য স্নেহ করতেন। দেশ বন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের (জন্ম ১৮৭০ খ্রিঃ মৃত্যু ১৬ জুন ১৯২৫ খ্রিঃ) বাড়িতে গেলে বাসন্তী দেবী নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করে কাছে বসে কবিকে খাওয়াতেন।

খেয়ালী কবি নজরুলের খামখেয়ালী তো আর কম ছিল না। কে জানে মায়ের সাথে বিরোধ জিইয়ে রেখে মাকে কষ্ট দিয়ে নিজে কষ্ট পেয়ে অন্য মহিলাদের প্রাণ ভরে ‘মা’ ডেকে তাঁর বুভূক্ষ হৃদয়ের মাতৃস্নেহের তৃষ্ণা মেটানোর বিষয়টিও তেমনি খেয়ালীপনা ছিল কিনা। চির ক্ষুব্ধ, চির অভিমানী খেয়ালী নজরুল নিজের মায়ের থেকে দূরে সরে গিয়ে মাতৃস্নেহ পাবার জন্যে উন্মাদের মতো ছুটে বেরিয়েছেন এবং যার কাছেই সে স্নেহটুকু পেয়েছেন তাঁকেই হৃদয়ের সবটুকু শ্রুদ্ধা,ভালোবাসা উজাড় করে দিয়ে প্রবল আবেগে আঁকড়ে ধরেছেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও এই পাতানো নকল মায়েরা কি মাতৃস্নেহের কাঙাল কবির মায়ের অভাব সবটুকু পূরণ করতে পেয়েছেন কি?

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫

২২/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: