আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

হলো না আকাশ দেখা

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

ছোটবেলা, থেকেই আকাশে ওড়ার খুব ইচ্ছে ছিল তামান্না রহমান হৃদির। বাবা মার কাছে আদরের হৃদি। নীল আকাশে বন্ধনহীন ওড়াউড়ির নিরন্তর বাসনা নিয়ে বেড়ে উঠতে লাগল তার ইচ্ছে। ইচ্ছের ডালপালা। দিন যতই গড়িয়ে যেতে থাকল তামান্নার ইচ্ছেগুলো প্রজাপতির মতো রঙ্গিন হয়ে উঠতে লাগল। তামান্নার বাবা-মা চেয়েছিলেন তাদের মেয়ে বড় হয়ে নাম করা ব্যারিস্টার হবে। কিন্তু মেয়ের জেদ বড় হয়ে সে পাইলট হবে। তার এ জেদের কাছে শেষমেশ বাবা-মাকে হার মানতে হয়। তারপরও পরিবার থেকে তাকে বার বার বোঝানো হয়েছিল পাইলটের পেশা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আর বাঙালী মেয়েদের সামাজিক বাস্তবতা, সংসার জীবনের ঝুঁকি-ঝামেলা পেরিয়ে পাইলট হিসেবে পেশাকে ধরে রাখা খুব দুরূহ ব্যাপার। তামান্না এসব বাধা-নিষেধ, অনুশাসন, কুসংস্কারকে মোটেও পাত্তা দেয়নি। চ্যালেঞ্জিং পেশাকে নিজের পেশা হিসেবে গ্রহণ করে সে দেখতে চেয়েছিল মেয়ে হয়ে যে কোন পেশাকে পেশা হিসেবে নেয়া যায়। মেয়ের ইচ্ছেকে সহজভাবেই মেনে নিয়েছিলেন বাবা-মা। একমাত্র মেয়ে বলে কথা!

তামান্না রহমান হৃদি ছোট বেলা থেকেই ভীষণ মিশুক আর হাসিখুশি স্বভাবের। তামান্না তার স্বপ্ন পূরণের জন্য ২০১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমিতে ভর্তি হয়। ফ্লাইং ক্লাবে ভর্তির পর তামান্না হয়ে ওঠে মনোযোগী প্রশিক্ষণার্থী। দীর্ঘদিন তত্ত্বীয় ক্লাস, প্রশিক্ষকের সঙ্গে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা আকাশে উড্ডয়নÑ এরপরই আসে সলো ফ্লাইংয়ের সুযোগ। ফ্লাইংক্লাবে ভর্তি হওয়ার পর সব পাইলটের মতো এই সলো ফ্লাইংয়ের অপেক্ষায় ছিলেন তামান্নাও।

তারপর ইচ্ছে পূরণের দিন এলো তামান্নার। ১ এপ্রিল বুধবার ২০১৫। স্থান রাজশাহীর হয়রত শাহ মখদুম (র.) বিমানবন্দর। সিঙ্গেল ইঞ্জিন বিশিষ্ট সেসনা বিমানে করে তামান্নার সলো ফ্লাইংয়ে প্রশিক্ষক হিসেবে তার পাশে ছিলেন ক্যাপ্টেন সাঈদ কামাল। প্রশিক্ষক হিসেবে তিনি তামান্নার উড়োজাহাজ চালনা, তাত্ত্বিক ক্লাস, আলোচনা, বিশ্লেষণÑ সবকিছুতেই ভীষণ সন্তুষ্ট ছিলেন। প্রশিক্ষণ উড়োজাহাটি নিয়ে রানওয়ে থেকে মাত্র পাঁচশ’ ফুট ওপরে উড্ডয়নের দুই মিনিট পরই ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়। ত্রুটি দেখা দেয়ার পর ইঞ্জিনটি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। তখন তামান্না নিজেই আবার অবতরণ করার চেষ্টা করেন। এ রকম ইঞ্জিন ত্রুটি দেখা দিলে জরুরী অবতরণে যেসব নিয়ম ও কৌশল অনুসরণ করার কথা তামান্না সেটা করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু স্বাভাবিক অবতরণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তামান্না সোজা বামে ৬০ ডিগ্রী কৌণিকে বাঁক নিয়ে রানওয়েতে উড়োজাহাজটি অবতরণের চেষ্টা চালান। কিন্তু তাতে করে উড়োজাহাজটি রানওয়েতে আঁছড়ে পড়ে তাতে আগুন ধরে যায়। এ সময় তামান্নার পাশে থাকা প্রশিক্ষক সাঈদ কামাল কোনরকমে বেরিয়ে আসতে পারলেও দুর্ভাগ্যক্রমে তামান্না ভেতরে আটকা পড়ে যান। আগুনের ভেতরে যখন তামান্না পুড়ছিলেন তখন সে চিৎকার করে বলছিল, বাঁচাও, বাঁচাও। এ সময় রানওয়ের পাশে দু’জন গ্রামবাসী তামান্নাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসতে চাইলে রানওয়ে কর্তৃপক্ষ তাদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেয়নি। পরে প্রশিক্ষক সাঈদ কামালও কয়েকদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে পরাজিত হন।

তামান্নার এই অনাকাক্সিক্ষত ও অবহেলাজনিত মৃত্যু আমাদের অপরাধী করে তোলে। তামান্নার বাবা ডা. আনিসুর রহমান, মা রেহানা ইয়াসমীন এই মর্মান্তিক ঘটনার পর ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিন, ফায়ার সার্ভিসের সীমাহীন গাফিলতি, প্রশিক্ষকের যথাযথ ভূমিকায় ব্যর্থতা ও উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিকেই দায়ী করেছেন। একমাত্র কন্যা হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে এক জীবনে সম্ভব নয় বলে তারা সংবাদপত্রে জানিয়েছেন। তামান্নার মৃত্যুর ঘটনায় মানুষের মধ্যে ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার জন্ম নিয়েছে। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ববোধ ও অনিয়মের দিকে আঙ্গুল তুলে প্রশ্ন করেছেন, কর্তৃপক্ষের গাফিলতি আর দায়িত্বহীনতায় তামান্নার মতো মেধাবী পাইলটদের যদি এভাবে আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে করুণ মৃত্যুর দিকে ধাবিত হতে হয়, তাহলে এ ধরনের চ্যালেঞ্জিং পেশায় মেয়েদের আসা কী চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে?

সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণের সময় রানওয়েতে সব সময় ফায়ার সার্ভিসের স্ট্যান্ডবাই থাকার কথা। তামান্নার বিমানটি যখন রানওয়েতে জ্বলছিল তখন শাহ মখদুম (র.) বিমানবন্দরে বাংলাদেশ ফ্লাইং একাডেমি এ্যান্ড সিভিল এ্যাভিয়েশন লিমিডেটের নিজস্ব দমকল বাহিনী রহস্যজনকভাবে নীরব ভূমিকা পালন করে। এ যেন অনেকটা ‘রোম যখন পুড়ছিল সম্রাট নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল’ প্রবাদের মতো। রাজশাহী ফ্লাইং ক্লাবের প্রধান প্রকৌশলী মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে এ ব্যাপারে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এসেছে। ইঞ্জিনের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা থাকলে তামান্নাকে এ ধরনের দুর্ঘটনার শিকার হতে হতো না। বিমানটির ইঞ্জিন বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তামান্নার পাশে বসে থাকা প্রশিক্ষক ক্যাপ্টেন সাঈদ কামাল কন্ট্রোল টাওয়ারে মেণ্ডডে বলে বিপদ সঙ্কেত দেন। প্রশিক্ষকের এই বিপদ সঙ্কেত পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে যদি প্রধান প্রকৌশলী ফায়ার সার্ভিসকে প্রস্তুত করে দুর্ঘটনা স্থলে পাঠাতেন তাহলে তামান্নাকে এই করুণ মৃত্যুকে বরণ করতে হতো না।

বিমান দুর্ঘটনার পর সঙ্গে সঙ্গে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। আর দশটি তদন্ত কমিটির মতো এই দুর্ঘটনার তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনও হয় তো একদিন আলোর মুখ দেখবে কিন্তু তা যেন নামকাওয়াস্তে, তদন্তের নামে শুধুমাত্র আইওয়াশ। তামান্নার মতো আর কাউকে যেন আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে আকাশ দেখার স্বপ্নকে ছারখার করতে না হয়।

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫

২২/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: