কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

শিশুদের জন্য রাজধানীতে চাই পার্ক

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫
  • মেধা নম্রতা

আজকাল সন্তানদের বিপক্ষে মা-বাবাদের খুব নালিশ বেড়েছে। কেননা একেবারে কুঁচোটাও কম্পিউটারের সামনে গেম খেলতে বা কার্টুন দেখতে সারাক্ষণ বসে থাকে। নাওয়া-খাওয়ার ঠিক নেই, জামা-কাপড়ের দিকে নজর নেই, কোনরকমে স্কুলের পড়াটা শেষ করেই বসে পড়ে কম্পিউটার নিয়ে বা টিভি দেখতে। কিশোর বা তরুণরা সারারাত জেগে ভোরে উঠতে পারছে না সময়মতো। কেউ কেউ বেঢপ মোটা হয়ে পড়ছে, আবার কেউ কেউ শুকিয়ে কাঠি হচ্ছে। এদের জীবনে ভোর দেখার সৌভাগ্য নেই। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী ভোরের ক্লাস মিস করছে। সকালের নাস্তা খাচ্ছে বেলা এগারোটা-বারোটায়। আবার ফ্যাশন করে বলছে, ব্রাঞ্চ করছি। অর্থাৎ একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট এবং লাঞ্চ করে নিচ্ছে। কিন্তু কেন এই ঘরবন্দী হয়ে পড়ছে সমাজের শিশু, কিশোর, তরুণরা?

একটা সময় ছিল পাড়ায় পাড়ায় ছেলেমেয়েরা ফুটবল, ক্রিকেট খেলত। প্রতিযোগিতা হতো পাড়াওয়ারী। যারা খেলত তাদের সঙ্গে জুটে যেত পাড়ার অন্য ছেলেমেয়েরাও। বিকেল থেকে সন্ধ্যা চুটিয়ে খেলে ঘরে ফিরে আসত ওরা। শরীর সুস্থ রাখতে প্রতিদিনের এই খেলাধুলা প্রচুর কাজে লাগত। কম্পিউটার এসে ছেলেমেয়েদের এই খেলাধুলা বন্ধ করে দেয়। প্রথম প্রথম মনে হতো বেশ আছে। নিজের ছেলে নিজের ঘরে বসে খেলছে, অন্তত নিশ্চিন্ত তো থাকা গেল। বাইরে কতরকমের গণ্ডগোল হচ্ছে। তাতে তো ছেলেমেয়েরা জড়াচ্ছে না।

কিন্তু দেখা গেল, এই ঘরে বসে থাকার বিরাট এক খারাপ দিক রয়েছে। ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা ছাড়াও একটি সামাজিক জীবন গড়ে ওঠার এক ব্যাপক সুযোগ ছিল। অপরিচয়ের বাধা পেরিয়ে ছেলেমেয়েদের অনেক জড়তা কেটে যেত শৈশব-কৈশোরে। অনেকের সঙ্গে পরিচিতি বাড়ত, নতুন বন্ধুত্ব হতো, শেয়ার করা শিখত, বিপদে একে অন্যের জন্য ছুটে যেত। এভাবে পারিবারিকভাবে পরিচিত হয়ে উঠত বিভিন্ন পরিবার। একটি সুন্দর উষ্ণ সামাজিক বন্ধন তৈরি হতো। এখন যে এই সম্পর্কগুলো সৃষ্টি হচ্ছে না তা নয়, তবে তা কেমন যেন যান্ত্রিক। এখনকার সম্পর্কে আড়ম্বরতা থাকে প্রচুর, কিন্তু তাতে প্রাণের ছোঁয়া নেই বললেই চলে।

আসলে এই সময়ের ছেলেমেয়েরা প্রাণ পাবে কোথা থেকে? আগে প্রতিটি পাড়ায় ফাঁকা মাঠ ছিল। ছোট হোক বা বড় ওই মাঠে বিকেল হলেই হৈচৈ শোরগোল পড়ে যেত। কী আনন্দে উদ্ভাসিত থাকত ওদের মুখ। অপরিচিতজন মুহূর্তে আপন হয়ে যেত। বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি, শ্রদ্ধা করতে শিখত পাড়ার সমবয়সী ছোট-বড় সকলকে। এখন মাঠ বলতে কিছু নেই। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী কেবল নয়; ছোট ছোট শহরগুলোতেও এখন মাঠ পাওয়া দুষ্কর। প্রতিটি শহরের ইঞ্চি ইঞ্চি জায়গা চলে যাচ্ছে ভূমিখোরদের কবলে। সেখানে গড়ে উঠছে অট্টালিকা। আম, জাম, আতা, শিরীষ, পেয়ারা, বরই, আমলকি, রয়েল গাছ এই প্রজন্মের মফস্বলের ছেলেমেয়েরাও চেনে না। আগে মফস্বলের প্রতিটি বাড়িতে বড় গাছের সঙ্গে নানারকমের ফুলের গাছ থাকত। জুঁই, কামিনী, গন্ধরাজ, স্থলল্পদ্ম, হাসনাহেনা, রক্তকরবী, কৃষ্ণচূড়া, কদম, জবা গাছে ভরে থাকত বাগান। উঠানে বেলি, গোলাপ, মোরগঝুঁটি, সন্ধ্যাফুল আর সীমানাপ্রাচীরের পাশে লিলিফুল ও মরিচজবার বেড়া এখন দেখা যায় না। কী করে প্রাণ আসবে এসব ফুলের মতো শিশুদের মনে? আগামীতে হয়ত আমাদের শিশুরা ডিকশনারি ঘেঁটে বা গুগুল সার্চ দিয়ে দেখে নেবে ‘উঠান’ শব্দের মানে এবং উঠানের ছবি।

ঢাকা শহর আক্ষরিক অর্থেই কেবল নয়, বাস্তবেও এখন অট্টালিকায় ঢাকা। কোথাও সবুজ নেই। নেই মাঠ বা এক টুকরো ফাঁকা জায়গা। অপরিকল্পিত উদ্যোগে গড়ে উঠেছে দালানকোঠা, ফ্ল্যাটবাড়ি। সামান্য জায়গাও ছাড়তে রাজি নয় কেউ। এমনকি অসুস্থ হলে এ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত বাড়িতে আসতে পারে না। আবাসিক এলাকায় বা বস্তিতে আগুন লাগলে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঢুকতে না পারায় অসহায়ভাবে আগুনের সর্বনাশ দেখে সাধারণ মানুষ। এরকম একটি ঢাকা শহরে এই মাত্র কিছুদিন আগে হয়ে গেল সিটি মেয়র নির্বাচন। নির্বাচিত হয়ে কাজেও হাত দিয়েছেন সন্মানিত মেয়রদ্বয়। ঢাকাকে উত্তর এবং দক্ষিণে বিভক্ত করে সুষ্ঠু ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রতি দেয়া হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। মেয়রদ্বয়ের কাছে সবিনয়ে অনুরোধ রইল, ঢাকা শহরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিশু-কিশোরদের ‘শৈশব বাঁচাও’ নামে সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে।

জীবনযাপনের ক্ষেত্রে ঢাকা শহর এখন স্পষ্টত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। এই বিভক্তি মোটা দাগে চোখে পড়ে। রাস্তাঘাট, ফ্ল্যাটবাড়ি, ক্লাব, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বিনোদনের ক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর অনেক ঝকঝকে ঢাকা দক্ষিণ থেকে। আধুনিক ঢাকার চেহারা সুন্দর করে দেখা যায় ঢাকা উত্তরে। শিশু-কিশোরদের জন্য স্বল্প হলেও কিছু পার্ক আছে। কিন্তু ঢাকা দক্ষিণ যেন জনচাপে দম ফেলতে পারছে না। প্রতিটি রাস্তায় তীব্র যানজট। সকাল থেকে শুরু হয় শিশু-কিশোরদের স্কুলে যাওয়া নিয়ে রাস্তার সংগ্রাম। আবার স্কুল ছুটির পরও সেই সংগ্রাম করেই ঘরে ফেরে। বিভিন্ন স্কুল-কলেজেও নেই পর্যাপ্ত খেলাধুলা করার মাঠ। নেই বিনোদনের জন্য কোন পার্ক। শিশুদের সঙ্গে অনেক বয়স্ক নারী-পুরুষ বিকেল সন্ধ্যায় এমনকি ছুটির দিনেও একটু দম ফেলে ঘুরে বেড়াবে, তার কোন উপায় নেই।

বিশেষ করে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর অবস্থা বেশি করুণ। এসব স্কুলের ছেলেমেয়েরা একেকটি বড় বড় বাড়ির মধ্যে ক্লাস করে। কোন কোন স্কুলের ভেতর প্রশস্ত উঠান ছাড়া খেলার কোন ব্যবস্থা নেই।

বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের শৈশব রক্ষার জন্য শহরগুলোতে ইমিডিয়েটলি ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করা প্রয়োজন। আধুনিক নগরায়নের প্রথম এবং প্রধান শর্ত হচ্ছে শিশুদের মানসিকতা বিকাশের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া। বিশ্বের প্রতিটি উন্নত দেশে নগরায়নে রাষ্ট্রের সম্পদ শিশুদের কথা মাথায় রেখেই মেগাসিটিগুলো তৈরি হচ্ছে। ভারতেও প্রতিটি শহরে শিশুদের জন্য খোলা মাঠ বা পাড়ায় ছোট করে হলেও একটি পার্ক রাখার নিয়ম রাখা হয়েছে। কেবল ঢাকা শহরের পাড়ায় পাড়ায় শিশুদের জন্য নেই কোন খোলা জায়গা বা পার্ক। নবনির্বাচিত মেয়রদের কাছে সনির্বন্ধ অনুরোধ, শিশুদের জন্য ছোট করে হলেও প্রতিটি পাড়ায় গাছপালাবেষ্টিত প্রাকৃতিক আবহে একেকটি পার্ক গড়ে তুলুন। এই শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যত। শৈশব-কৈশোরের স্বাভাবিক খেলাধুলা একটি শিশুর সুন্দর মনকে গড়ে তুলতে পারে। সুতরাং ভাবুন এবং যতœশীল জ্ঞানী নগরপিতার মতো শিশু-কিশোরদের জন্য এই অট্টালিকায় সাজানো তিলোত্তমা নগরীতে কিছু খোলামেলা জায়গা রাখুন। শিশুরা স্বপ্ন দেখতে শিখুক পাখা মেলে, কল্পনার জগতে, উন্মুক্ত আকাশে।

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫

২২/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: