রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

দেশে বাড়ছে নারী উদ্যোক্তা

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫
  • অঞ্জন আচার্য

স্বল্প সুদে জামানত ছাড়া ঋণ পাওয়ায় বাড়ছে নারী উদ্যোক্তা। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও বৃদ্ধি পাচ্ছে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা। এদিকে সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারী উদ্যোক্তা বাড়াতে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিটি শাখাকে ন্যূনতম তিনজন নারী উদ্যোক্তাকে খুঁজে বের করে প্রশিক্ষিত করার মাধ্যমে ঋণ নিশ্চিত করতে হবে। এ তিন নারী উদ্যোক্তা এমন হবেন, যারা ইতিপূর্বে কোন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কোন প্রকার ঋণ গ্রহণ করেননি। একই সঙ্গে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা আরও বাড়াতে পারলে সংশ্লিষ্ট শাখাকে প্রশংসিত করা হবে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীর কাছে পাঠিয়েছে।

নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি ও ক্ষমতায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন ব্যবস্থায় অধিকতর প্রবেশ নিশ্চিতকরণে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকিং খাতে নারী উদ্যোক্তাদের বিশেষত নতুন নারী উদ্যোক্তার অনুকূলে ঋণের প্রবৃদ্ধি ও উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নানাবিধ পদক্ষেপ ও কার্যক্রম গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিপত্রে নারী উদ্যোক্তার পছন্দ অনুযায়ী তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং প্রতি বছর ন্যূনতম একজন নারী উদ্যোক্তাকে কুটির, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র খাতে ঋণ প্রদানের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া নতুন নারী উদ্যোক্তাদের প্রদত্ত ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল সহায়তা এবং এ ধরনের ঋণ কার্যক্রমের সাফল্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ক্যামেলস রেটিংয়ে প্রতিফলিত করার বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, নির্বাচিত নারী উদ্যোক্তাদের তাদের পছন্দ অনুযায়ী শিল্প বা সেবা অথবা ব্যবসা কার্যক্রম নির্বাচন, মূলধন সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায় পরিচালনা, উৎপাদিত পণ্যসামগ্রিক সেবা বাজারজাতকরণ, ব্যাংকে হিসাব খোলা ও লেনদেনের পদ্ধতিসহ সার্বিক বিষয়ে সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে অথবা আঞ্চলিক পর্যায়ে কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে ব্যাংক বা ব্যাংক বহির্ভূত প্রতিষ্ঠানসমূহ, বিসিক, এসএমই ফাউন্ডেশন, মহিলা বিষয়ক অধিদফতর, জাতীয় মহিলা সংস্থা, যুব উন্নয়ন অধিদফতর, স্মল এ্যান্ড কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, বিভিন্ন ব্যবসায়িক চেম্বার ও এ্যাসোসিয়েশন, নারী উদ্যোক্তা চেম্বার বা এ্যাসোসিয়েশনসহ অনুরূপ সংস্থার সহায়তা গ্রহণ করতে পারে। এজন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের মধ্যে প্রয়োজনীয় সমঝোতা চুক্তিও স্বাক্ষরিত হতে পারে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ৪ বছরে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বেড়েছে ২১৫ দশমিক ১০ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক এসএমই এ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রাম বিভাগ চালু করে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে নারীসহ অন্যান্য উদ্যোক্তা তৈরি এর উদ্দেশ্য। ২০১০ সালের ডিসেম্বর শেষে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ হাজার ২৪০ জনে। যা ডিসেম্বর ২০১৩ শেষে দাঁড়ায় ৮৯ হাজার ১৮ জন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সেবা, ব্যবসা এবং শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া হয়। ২০১০ সালের ডিসেম্বর শেষে এ খাত তিনটিতে ঋণ দেয়া হয়েছিল ১ হাজার ৮০৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ঋণ বিতরণ করা হয় ৯ হাজার ৪২৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা। সে হিসেবে বিগত ৪ বছরে এসএমইতে নারী উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ বেড়েছে ৮৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল অর্থাৎ ৪ বছরে সেবা খাতে ৬ হাজার ৯৮৪ জন নারী উদ্যোক্তা ৯১৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা বিনিয়োগ নিয়েছেন। ব্যবসা খাতে ৬৩ হাজার ৭০২ জন নারী উদ্যোক্তা নিয়েছেন ৫ হাজার ৮৩২ কোটি ১০ লাখ টাকা। এবং শিল্প খাতে ১৮ হাজার ৩৩২ জন নিয়েছেন ২ হাজার ৬৮২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। সর্বশেষ প্রতিবেদন অর্থাৎ চলতি মার্চ মাস শেষে দেখা গেছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে মোট নারী উদ্যোক্তা ঋণ নিয়েছেন ৫ হাজার ৩৬৭ জন। ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সেবা খাতে ৭৩১ জন বিনিয়োগ নিয়েছে ১১৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ব্যবসা খাতে ৩ হাজার ৪৮০ জন বিনিয়োগ নিয়েছে ৪০৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং শিল্প খাতে ১ হাজার ১৫৬ জন বিনিয়োগ নিয়েছে ৩০৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অন্যদিকে ২০১০ সালের ডিসেম্বর শেষে দেখা যায়, ১৩ হাজার ২৪০ জন নারী উদ্যোক্তা মোট বিনিয়োগ গ্রহণ করেছেন ১ হাজার ৮০৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সেবা খাতে ১ হাজার ২৯৫ জন নারী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ নিয়েছে ১৭১ কোটি ২২ লাখ টাকা। ব্যবসা খাতে ৯ হাজার ১৪০ জন নিয়েছে ১ হাজার ২৫৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা। এবং শিল্প খাতে ২ হাজার ৮০৫ জন নিয়েছে ৩৭৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

২০১১ শেষে ১৬ হাজার ৬৯৭ জন নারী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ নিয়েছেন ২ হাজার ৪৮ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে (২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ সালে) নারী উদ্যোক্তা বেড়েছে ৩ হাজার ৪৫৭ জন বা ২৬ দশমিক ১১ শতাংশ। এবং বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা বা ১৩ দশমিক ৪৮ শতাংশ। এর মধ্যে সেবা খাতে ১ হাজার ১৯৯ জন নারী উদ্যোক্তা ১৯৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা বিনিয়োগ নিয়েছেন। ব্যবসা খাতে ১১ হাজার ৯৩৬ জন নিয়েছে ১ হাজার ১৬০ কোটি ৪ লাখ টাকা। এবং শিল্প খাতে ৩ হাজার ৫৬২ জন বিনিয়োগ গ্রহণ করেছে ৬৮৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে ১৭ হাজার ৩৬২ জন নারী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ নিয়েছেন ২ হাজার ২২৪ কোটি ১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সেবা খাতে ১ হাজার ৮২ জন বিনিয়োগ নিয়েছেন ২৩০ কোটি ২১ লাখ টাকা। ব্যবসা খাতে ৯ হাজার ২৩ জন নিয়েছেন ১ হাজার ৩৫২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এবং শিল্প খাতে ৭ হাজার ২৫৭ জন বিনিয়োগ গ্রহণ করেছেন ৬৪১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

প্রতিবেদনে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দেখা গেছে, ৪১ হাজার ৭১৯ জন নারী উদ্যোক্তা বছরব্যাপী ৩ হাজার ৩৫১ কোটি ১৭ লাখ টাকা বিনিয়োগ গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ ২০১২ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে নারী উদ্যোক্তা বেড়েছে ২৪ হাজার ৩৫৭ জন বা ১৪০ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং বিনিয়োগ বেড়েছে ১ হাজার ১২৭ কোটি ১৬ লাখ বা ৫০ দশমিক ৬৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সেবা খাতে ৩ হাজার ৪০৮ জন নারী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ নিয়েছেন ৩১৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ব্যবসা খাতে ৩৩ হাজার ৬০৩ জন নারী উদ্যোক্তা বিনিয়োগ গ্রহণ করেছেন ২ হাজার ৬১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এবং শিল্প খাতে ৪ হাজার ৭০৮ জন বিনিয়োগ নিয়েছেন ৯৭৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই এ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রাম বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মাসুম পাটোয়ারী বলেন, ‘প্রতি বছরই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে গ্রাম পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তা তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামের নারীদের এ ক্ষেত্রে আগ্রহী করার জন্য আমরা প্রতি বছরই সচেতনতামূলক বিভিন্ন প্রচারাভিযানের ব্যবস্থা করে থাকি।’

তিনি বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে তাদের মোট বরাদ্দের ৫৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগের ব্যবস্থা রয়েছে। তাছাড়া পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে রয়েছে ৫১ শতাংশ। সম্প্রতি এডিপির ১০০ কোটি টাকার একটি স্কিমে সবচেয়ে নারীদের বেশি অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে।

মাসুম পাটোয়ারী বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য শিল্পক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি নজর দিচ্ছেন। চলতি বছরে নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে আন্তর্জাকিতমানের পণ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করবেন। সেখানে কমপক্ষে ২টি দেশী-বিদেশী দাতাগোষ্ঠী থাকবে। ঋণখেলাপি প্রসঙ্গে এ মহাব্যবস্থাপক বলেন, বর্তমানে সর্বক্ষেত্রে ঋণখেলাপি রয়েছেন ৮ শতাংশ। কিন্তু এসএমইতে ঋণখেলাপির পরিমাণ ৩ শতাংশ। শাখা, আঞ্চলিক ও প্রধান কার্যালয়ে তাঁরা মনিটরিং করে থাকেন। এ ছাড়া মোবাইল মনিটরিং করা হয়। ফলে অনিয়ম বা দুর্নীতির সম্ভাবনা কম। তারা উদ্যোক্তা তৈরির জন্য ডিসিসিআইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছেন। আশা করেন ভবিষ্যতে আরও অনেক উদ্যোক্তা বাড়বে। সমৃদ্ধশালী হবে দেশের অর্থনীতি।

নারীরা এ ঋণ নিয়ে বিশেষ করে বাঁশের তৈরি জিনিস, মাটির তৈরি তৈজসপত্র, ব্লক-বুটিকের কাজ ইত্যাদি নানা ক্ষেত্রে তাদের অর্থ লগ্নি করছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি এসব শিল্পের ক্রমাগত প্রসারে এসব শ্রমজীবী নারীর অবদান দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখছে। বেকারত্ব দূরীকরণের পাশাপাশি বৃদ্ধি পাচ্ছে নারীর সক্ষমতা।

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫

২২/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: