মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
৯ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সাহিত্যের অনির্বাণ জ্যোতি

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫
  • পৃথ্বীশ চক্রবর্ত্তী

‘আমি যুগে যুগে আসি, আসিয়াছি পুনঃ মহাবিপ্লব হেতু এই স্রষ্টার শনি মহাকাল ধূমকেতু’ -বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্ভবত নজরুলের ‘ধূমকেতু’ কবিতা পড়ে অথবা তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা দেখেই লিখেছিলেন-

‘আয় চলে আয়রে ধূমকেতু

আঁধারে বাধ অগ্নিসেতু

দুর্দিনের ঐ দুর্র্গশীরে

উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।’

সত্যি সত্যিই ভারতবর্ষের ঘন-কালো অন্ধকার আকাশে আলোকোজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক ‘ধূমকেতুুর মতো যাঁর আবির্ভাব তিনি আমাদের বাংলাসাহিত্যের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি একাধারে কবি, ছড়াশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক, নাট্যকার, নাট্যাভিনেতা, বংশীবাদক, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক, গল্পকার, দার্শনিক, সাংবাদিক, সম্পাদক ও সৈনিক।

তাঁর বৈশিষ্ট্য তিনি রাজনীতিবিদ, মানবপ্রেমিক, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষানুরাগী, অসাম্প্রদায়িক ভারতবর্ষের রূপকার, সজীব-প্রাণবন্ত, সহজ-সরল, সুন্দর ও মুক্তমনের মানুষ। লেখালেখির ক্ষেত্রে সবকিছু ছাড়িয়ে তাঁর কবিতা ও গান বাংলাসাহিত্যের এক বিশাল স্থান দখল করে নিয়েছে। কবিতা ও গানে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ তাঁর সমকক্ষ নন বললেও অত্যুক্তি হবে না। তাঁর কবিতা ও গান হৃদয় অনুরণনের। তাঁর কবিতা ও গান মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের। তাঁর কবিতা ও গান প্রেমের। তাঁর কবিতা ও গান ভাবের। তাঁর কবিতা ও গান বিদ্রোহের। তাঁর কবিতা ও গান ভক্তিতত্ত্বের। তাঁর কবিতা ও গান অসাম্প্রদায়িকতার।

তাঁর কবিতা ও গান জালেম শাসক ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে রচিত। তাঁর কবিতা ও গান পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙ্গার। তাঁর কবিতা ও গান স্বাধীনতার। তাঁর কবিতা ও গান মুক্তির। তাঁর কবিতা ও গানে নিরীহ, নির্যাতিত, নিপীড়িত ও নিষ্পেষিত দুর্বল মানুষগুলো পায় শক্তি, সাহস ও বল। তাঁর কবিতা ও গান অন্যায়ের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে। তাঁর কবিতা ও গানে সৃষ্টি করে প্রেমানুভূতি। তাঁর কবিতা ও গান মনুষ্যত্ব বোধের। তাঁর কবিতা ও গান বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের ও বিশ্বের সকল সুন্দরের, সকল মানুষের।

নজরুল কবিতা লেখেননি এমন কোন বিষয় নেই। তবে তিনি সব বিষয়ে কবিতা লিখলেও বাংলাসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে তিনি স্বীকৃত। তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিই তাঁকে মূলত বিশ্বে পরিচিত করেছে। তাঁর অসাধারণ এ কবিতাটি পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত এবং আলোচিত ও সমালোচিত।

বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম মার্কিন সমালোচক হেনরি গ্লাসি তাঁর বিবেচনায় শ্রেষ্ঠ কবিতা সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন- ‘আমার কাছে বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ দুটি কবিতার একটি ড.ই.ণবধঃং-এর দঞযব ঝবপড়হফ ঈড়সসরহম’ এবং অন্যটি কাজী নজরুল ইসলামের দঞযব জবনবষ’।

মুজফ্ফর আহমদ তাঁর স্মৃতিকথায় জানিয়েছেন- ‘বিদ্রোহী’ কবিতা কলকাতার ৩/৪ সি তালতলা লেনের বাড়িতে রচিত হয়েছিল।’ ওই ঘরে নজরুল ও তিনি ভাড়া থাকতেন। নজরুল রাতে এই কবিতাটি লিখেছিলেন। রাত ১০টার পর কবিতাটি লেখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রথম শ্রোতা মুজফ্ফর আহমদ। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি (শুক্রবার, ২২ পৌষ ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি তৎকালীন ‘বিজলী’ পত্রিকায় সর্বপ্রথম প্রকাশিত হয়। কবিতাটি ছাপা হওয়ার পর পত্রিকার চাহিদা এতই বেড়েছিল যে, ‘বিজলী’ কাগজ সপ্তাহে দু’বার ছাপা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ‘মোসলেম ভারত’ ও ‘প্রবাসী’ পত্রিকায়ও ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি ছাপা হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকেও সে সময় এ কবিতাটি মুগ্ধ করেছিল। তবে কবিতাটি বিশিষ্টজনের প্রশংসা লাভ করলেও সমালোচিতও কম হয়নি।

‘কা ারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় ভারতভূমির স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে তীব্রকণ্ঠে কবি ঘোষণা করলেনÑ

‘হিন্দু না ওরা মুসলিম, ওই জিজ্ঞাসে কোনজন?

কা ারী বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’

‘কুলি মজুর’ কবিতায় অসাম্প্রদায়িক কবি সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানালেন এভাবেÑ

‘সকল কালের সকল দেশের সকল মানুষ আসি

এক মোহনায় দাঁড়াইয়া শোনো এক মিলনের বাঁশি।’

অধ্যাপক আলী আশরাফ নজরুলের কাব্য মূল্যায়নে বলেন, ‘সঞ্চিতার সবগুলো কবিতা পড়ে দেখতে পাই যে, নজরুলের ভাষা ও ভাবধারায় হিন্দু প্রভাবই প্রবল। সাধারণভাবে আরবি, ফারসি শব্দ ব্যবহার করলেও নিজস্ব মনোভাব ও অনুভূতি প্রকাশের জন্য তিনি আশ্রয় খুঁজেছেন হিন্দু উপকথা থেকে সংগৃহীত উপমা ও চিত্রে। তিনি সাহায্য নিয়েছেন সাধারণ হিন্দু সমাজের ও এই শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিম সমাজের ভাষার...।’

ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য সব সম্প্রদায়কে ঐক্যবদ্ধ করতে কবি তাঁর দৈনিক নবযুগ পত্রিকায় লিখলেনÑ ‘এস ভাই হিন্দু। এস মুসলমান। এস বৌদ্ধ। এস ক্রিশ্চিয়ান। আজ আমরা সব গি কাটাইয়া, সব সঙ্কীর্ণতা, সব মিথ্যা, সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করিয়া প্রাণ ভরিয়া ভাইকে ভাই বলিয়া ডাকি। আজ আমরা আর কলহ করিব না। চাহিয়া দেখ, পাশে তোমাদের মহাশয়নে শায়িত ঐ বরি ভ্রাতৃগণের শব। ঐ গোরস্থান- ঐ শ্মশান ভূমিতে শোন শোন তাহাদের তরুণ আত্মার অতৃপ্ত ক্রন্দন।’ সম্পূর্ণ অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনায় সারা ভারতবর্ষের মানুষকে স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য জাগিয়ে তোলাই ছিল তাঁর ওই বক্তব্যের মূল সুর ও উদ্দেশ্য। মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ, জাতিতে জাতিতে বিভেদ, সম্প্রদায়গত দাঙ্গা-সংঘাত বিশেষ করে হিন্দু-মুসলিম জাতিগত দ্বন্দ্বে নজরুল সংক্ষুব্ধ ও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন। তাই সকল সাম্প্রদায়িকতার উর্ধে উঠে তিনি ঘোষণা করলেন- ‘গাহি সাম্যের গান

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি

সব দেশে সব কালে ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’ (মানুষ)

তিনি দেখতে চেয়েছিলেন ভারতবর্ষের সব সম্প্রদায়ের মানুষের মহামিলন এবং একতা। আর তাই তিনি সব ধর্মের বিভেদ ঘুচিয়ে অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়- ‘গাহি সাম্যের গান

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান,

যেখানে মিশেছে

হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান।’ (সাম্যবাদী)

শুধু তাই নয়, তিনি ইসলামী গজল-গান রচনার পাশাপাশি অসংখ্য শ্যামাসঙ্গীত, কীর্তন ও দেবস্তুতিমূলক সঙ্গীত রচনা করে হিন্দু-মুসলিমের সমান ভালবাসায় সিক্ত হন।

অন্যায়, শোষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘোষণা করেছিলেন বলেই ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বার বার জেলে পুরেছে। কিন্তু জেল থেকেও তাঁর বিপ্লবী চেতনা দমে যায়নি। বরং তাঁর কবিতা ও গান আরও বিদ্রোহের আগুনে জ্বালাময়ী হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ সরকারের পোষা ও আজ্ঞাবহ কারারক্ষী নরপিশাচদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি অনশন শুরু করলে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে অনুরোধ করে লিখলেনÑ

‘এরাব টঢ় ঐঁহমবৎ ঝঃৎরশব.

ঙঁৎ খরঃবৎধঃঁৎব ঈষধরসং ুড়ঁ.’

নজরুলের বিল্পবী চেতনা পরাধীন ভারতে স্বাধিকার চেতনার স্ফুরণ ঘটালো। নজরুল ভারতবাসীকে জেগে ওঠার জাদুমন্ত্র কাব্যিক ভাষায় উপস্থাপন করলেনÑ

‘দেব শিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবকদের দিচ্ছে ফাঁসি

ভূ-ভারত আজ কসাইখানা আসবি কখন সর্বনাশী!’

বিদেশী, বিজাতি, বিভাষী ব্রিটিশ শাসন-শোষণ থেকে স্বদেশের স্বাধীনতা অর্জন করাই ছিল তাঁর কবিতার উদ্দেশ্য। তাই তিনি ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য করে লিখলেন- ‘এদেশ ছাড়বি কি না বল?

নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।’

অন্যদিকে হিন্দু-মুসলিম কুসংস্কারপূর্ণ কিছু ধর্মান্ধ মানুষের সমাজ ব্যবস্থাকে ভেঙ্গে নতুন সমাজ গড়তে চেয়েছিলেন। তাই তিনি বললেনÑ

‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নতুন সৃজন বেদন

আসছে নবীন জীবনহারা অসুন্দরের করতে ছেদন।’

‘আমার সুন্দর’ প্রবন্ধে নজরুল বলেছেন, ‘আমি মানুষকে ভালোবাসতে পেরেছি। জাতি-ধর্ম-ভেদ আমার কোন দিনও ছিল না, আজও নেই আমাকে কোন দিন তাই কোন হিন্দু ঘৃণা করেননি। ব্রাহ্মণেরাও ঘরে ডেকে আমাকে পাশে বসিয়ে খেয়েছেন ও খাইয়েছেন।’

যেখানে মানবতা ভূলুণ্ঠিত সেখানে তাঁর ‘বিষের বাঁশি’ বেঁজে উঠেছে এবং মানবতার সুর তুলেছে। ব্রিটিশ শাসকের প্রতি কবির অভিশাপ এবং ক্ষুব্ধ উচ্চারণÑ ‘প্রার্থনা করো, যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস

যেন লেখা হয়, আমার রক্ত লেখায় তাদের সর্বনাশ।’

‘ভাঙার গান’ কবিতায় কবির শৃঙ্খল মুক্তির প্রতিবাদ মুখর ঝাঁঝালো সেøাগান আমরা শুনতে পাইÑ ‘কারার ঐ লৌহ কপাট

ভেঙে ফেল কররে লোপাট

রক্ত জমাট

শিকল পূজার পাষাণ বেদী’

অন্যত্র বলেছেনÑ ‘মোদের প্রাপ্য আদায় করিব, কব্জি শক্ত কর

গড়ার হাতুড়ি ধরেছি, এবার ভাঙার হাতুড়ি ধর।’

‘ওঠরে চাষী’ শীর্ষক কবিতায় কবি সুবিধাবঞ্চিত ও লাঞ্ছিত চাষীদের শোষকদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে লিখলেনÑ তোর পাঁজরার ওই হাড় হবে ভাই যুদ্ধের তলোয়ার।

অন্যায্য, অসাম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কবির দৃপ্ত উচ্চারণÑ ‘কেন রহি মোরা বস্তিতে, অস্বস্তিতে চিরদিন

কেন এ অভাব, রোগ, দারিদ্র্য, চিত্তগ্লানি-মলিন?

দরিদ্র, অসহায়, নির্যাতিত ও সুবিধাবঞ্চিত জনসাধারণের কথাই এ কবিতাটিতে বিধৃত হয়েছে।

শ্রমজীবী-মেহনতি মানুষের প্রতি কবির শ্রদ্ধা ও ভালবাসা প্রস্ফুটিত হয়েছে তাঁর নিম্নোক্ত কবিতাটিতেÑ

‘গাহি তাহাদের গান/ধরণীর হাতে দিল যারা/আনি ফসলের ফরমান/শ্রমকিনাক্সক কঠিন যাদের/নির্দয় মুঠি তলে/ত্রস্তা/ধরণী নজরানা দেয়/ডালি ভরা ফুলে-ফলে।

নজরুল তাঁর লেখায় ভ -ধর্মব্যবসায়ীদের আঘাত হেনেছেন তীব্রভাবেÑ

‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে আমরা রয়েছি বসে

বিবি তালাকের মাছলা খুঁজি হাদিস, কোরান চষে।’

বিশ্বে নারীবাদী লেখকদের মধ্যে যাঁদের নাম স্থান পেয়েছে আমার ধারণা নজরুলের নাম তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তবে নারীর মর্যাদার ব্যাপারে নজরুলসম কেউ আছে বলে মনে হয় না। নারীর প্রতি এত শ্রদ্ধা, এত দরদী মন, এত ভালবাসা নজরুল ছাড়া দ্বিতীয়টি কেউ আছে বলে মনে হয় না। তাঁর ভাষায়Ñ

‘বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি, চির-কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।

...

কোন কালে একা হয়নি কো জয়ী পুরুষের তরবারি

প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষ্মী নারী।’ (নারী)

সভ্যযুগে এসেও মধ্যযুগীয় আচরণ অহরহ হচ্ছে আমাদের মা-বোনের সঙ্গে। মানুষরূপী নরপশুদের লালসার শিকার এ সমাজের নারীরা।

কিন্তু ভদ্র সমাজ না বুঝেই আমাদের এসব নারীকে কটাক্ষ করতে দ্বিধাবোধ করে না। বাঁকাচোখে দেখার তো একটা অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। কিন্তু কবি নজরুল তাঁর ‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় লিখলেনÑ

‘কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে দেয় থুতু ও-গায়ে?

হয়তো তোমায় স্তন্য দিয়েছে সীতাসম সতী মায়ে।’

আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীদের পক্ষপাতমূলক লেখা একমাত্র নজরুলের পক্ষেই সম্ভব। নজরুলই একমাত্র কবি যিনি নারী-পুরুষের সমতা নিয়ে অর্থাৎ পুরুষের সমান মর্যাদায় নারীর আসন প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। নারী এবং পুরুষকে তিনি সমানভাবেই দেখেছেন। ‘নারী’ কবিতায় লিখেছেনÑ

‘সাম্যের গান গাই

আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী

কোন ভেদাভেদ নাই।’

নজরুলের বিদ্রোহী ভাবের আড়ালে হৃদয়ে প্রবাহিত হতো প্রেমের ঝর্ণাধারা। প্রেম ও রোমান্সে নজরুল সৃষ্টি করেছিলেন কাব্য ও সঙ্গীত জগতে নিজস্ব ধারার। নজরুলের প্রেম ও বিরহের গান বাংলা সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছে অতি দুর্লভ। ‘মোর প্রিয়া হয়ে এস রাণী/দেব খোঁপায় তারার ফুল’, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়/সে কি মোর অপরাধ’, ‘রুমু-ঝুমু রুমু-ঝুমু নূপুর পায়ে/আসিল রে প্রিয় আসিল রে’, ‘প্রিয় এমন রাত, যেন যায় না বৃথা’, ‘শাওনও রাতে যদি, স্মরণে আসে মোরে’, ‘লাইলী তোমার এসেছে ফিরিয়া/মজনু গো আঁখি খোলো’, ‘কে বিদেশী মন উদাসী, বাঁশের বাঁশি বাজাও বনে’, ‘আমায় নহে গো, ভালোবাসো শুধু/ ভালোবাসো মোর গান’, ‘আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন’, ‘নয়ন ভরা জল গো তোমার/আঁচল ভরা ফুল’, ‘বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে/ঝরা বন গোলাপের বিলাপ শোনে’, ‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে/কুড়াই ঝরা ফুল একেলা আমি’Ñ এরূপ তাঁর অসংখ্য প্রেম ও বিরহগীতি, যা তাঁকে সঙ্গীত জগতে অমরত্ব দান করেছে। প্রেমের চিরন্তন পরিণতি যে বিরহ, তা নজরুলের ক্ষেত্রে ভিন্ন মাত্রায়, ভিন্ন সুরে ধরা পড়েছে। যেমন কবি লিখেছেনÑ ‘তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিব না

কোলাহল করি সারা দিনমান কারো ঘুম ভাঙিব না।’

নজরুলের বিরহের কবিতা মানেই আমাদের নিজেদেরই প্রেমের আর্তনাদ মূর্ত হয়ে ফুটে ওঠে। কবি যখন বলেনÑ ‘এক জ্বালা, এক ব্যথা নিয়া তুমি কাঁদো আমি কাঁদি, কাঁদে মোর প্রিয়া।’Ñ তখন সবার মনেই হাহাকার জাগে, হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটে।

প্রেম ও বিরহের কবি হিসেবেই তিনি বাংলার মানুষের মন-মন্দিরে স্থান করে নিয়েছেন। তাঁর বিরহের কবিতাগুলো অসাধারণ।

‘নাইবা পেলাম আমার গলায়, তোমার গলার হার

তোমায় আমি করব সৃজন এ মোর অহংকার।’

ছোটদের উপযোগী তাঁর একটি আকর্ষণীয় ছড়া ‘ঝিঙেফুল’-এর কয়েকটি পঙ্ক্তিÑ

‘ঝিঙেফুল ঝিঙেফুল

সবুজ পাতার দেশে

ফিরোজিয়া ফিঙে-কুল-

‘ঝিঙেফুল।’

গুল্মে পর্ণে/ লতিকার কর্ণে/ঢল ঢল স্বর্ণে

ঝলমল দোলো দুল/ঝিঙেফুল।’

‘শিশু-সওগাত’-এ অনাগত শিশুকে ধরণীতে আহ্বান জানিয়েছেন এভাবেÑ

‘তোর দিন অনাগত, শিশু তুই আয়,

জীবন-মরণ দোলে তোর রাঙা পায়।

‘নতুন খাবার’ তাঁর আরেকটি হাসির ছড়া। ছড়াটি হলোÑ ‘কম্বলের অম্বল/কেরোসিনের চাটনি/চামচের আমচুর/খাইছ নি নাৎনি?

আমড়া-দামড়ার/কান দিয়ে ঘষে খাও/চামড়ার বাটিতে/ চটকিয়ে কষে খাও।...’

এরকম আরও কত ছড়া-কবিতা তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য রেখে গেছেন তা বলে শেষ করা যাবে না।

সব ধরনের অন্যায়, অসত্য, গ্লানি ও জরা-জীর্ণতাকে নজরুল পৃথিবী থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিলেন। ন্যায়, সততা, উদারতা ও ভালবাসা দিয়েই সাজাতে চেয়েছিলেন আমাদের সুন্দরী ধরিত্রীকে। আর তাই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিদ্রোহী। তবে নজরুল বিদ্রোহের সংজ্ঞা প্রদান করেছেন তাঁর ‘ধূমকেতুর পথ’ রচনায়। তিনি বলেছেন, “বিদ্রোহ মানে কাউকে না মানা নয়, বিদ্রোহ মানে যেটা বুঝি না, সেটাকে মাথা উঁচু করে ‘বুঝি না’ বলা।”

নজরুলকে নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনা হয়েছে। মুসলমানরা তাঁকে কাফের বলেছে আর হিন্দুরা করেছে ভর্ৎসনা। মৌলবাদী মুসলিমরা তাঁকে বলত হিন্দু কবি। এ বিষয়ে নজরুলের বক্তব্যÑ ‘বাংলার অশিক্ষিত মুসলমানরা গোঁড়া এবং শিক্ষিত মুসলমানরা ঈর্ষাপরায়ণ। এ আমি একটুও বানিয়ে বলছিনে। মুসলমান সমাজ কেবলই ভুল করেছে আমার কবিতার সঙ্গে আমার ব্যক্তিত্বকে জড়িয়ে। আমি মুসলমান- কিন্তু আমার কবিতা সকল দেশের, সকল কালের এবং সকল জাতির। কবিকে হিন্দু-কবি, মুসলমান-কবি ইত্যাদি বলে বিচার করতে গিয়েই এত ভুলের সৃষ্টি।’

(চিঠি, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৩৩২, আন্ওয়ার হোসেনকে লিখিত)

কবি এভাবে নিজেকে এবং তাঁর লেখনীকে কোন সম্প্রদায়, জাতি, গোষ্ঠী, দল, দেশ, ধর্ম কোনকিছুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। আর তাই তিনি হয়ে উঠেছেন সকল কালের, সকল জাতির, সকল দেশের, সকল মানুষের সর্বোপরি সমগ্র বিশ্বের। ব্যক্তি মানুষ হিসেবে উদার ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি লালনকারী নজরুল হয়েছিলেন সকল শ্রেণী ও জাতির মিলন দূত। আর তাই তো কবি অন্নদা শংকর রায় নজরুলকে নিয়ে লিখেছেনÑ

‘ভুল হয়ে গেছে বিলকুল/আর সব কিছু/ভাগ হয়ে গেছে/শুধু ভাগ হয়নি কো/ নজরুল।’

কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে, ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কাজী

বংশে। তাঁর ডাকনাম ছিল দুখু মিঞা। তাঁর বাবার নাম ফকির আহমেদ এবং মায়ের নাম জাহেদা খাতুন। ১৯৪২ সালে গুরুতর অসুস্থ হয়ে বাকশক্তিহীন ও স্মৃতিভ্রষ্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত মাত্র ২২-২৩ বছরের সাহিত্য জীবনে নজরুল অনেক বই রচনা করেন। তাঁরমধ্যে কবিতা ও গানের বই : ‘অগ্নিবীণা’, ‘দোলনচাঁপা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয়শিখা’, ‘ছায়ানট’, ‘চন্দ্রবিন্দু’, ‘সুর-সাকী’, ‘জুলফিকার’, ‘বনগীতি’, ‘গুলবাগিচা’, ‘মরু ভাস্কর’, ‘পূবের হাওয়া’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘ফণিমনসা’, ‘সিন্ধু-হিন্দোল’, ‘বুলবুল’, ‘জিঞ্জীর’, ‘চক্রবাক’, ‘সন্ধ্যা’, ‘চোখের চাতক’, ‘নতুন চাঁদ’, ‘মহুয়ার গান’, ‘গানের মালা’, ‘গীতি শতদল’, ‘শেষ সওগাত’ ইত্যাদি। গল্প-উপন্যাস : ‘বাঁধনহারা’, ‘ব্যথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘কুহেলিকা’ ইত্যাদি। প্রবন্ধ-অভিভাষণ : ‘যুগবাণী’, ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’, ‘দুর্দিনের যাত্রী’, ‘রুদ্র-মঙ্গল’ ইত্যাদি। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর কাব্যগ্রন্থ : ‘ঝিঙেফুল’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘সঞ্চয়ন’, ‘পিলে পটকা’, ‘ঘুম জাগানো পাখি’, ‘ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি’ এবং নাটক : ‘পুতুলের বিয়ে’, ‘ঝিলিমিলি’, ‘আলেয়া’, ‘মধুমালা’ ও গল্প : ‘শিউলি মালা’ ইত্যাদি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবিকে সপরিবারে ভারত থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় এবং সরকারীভাবে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস ও ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা এবং নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। ১৯৭৫ সালে কবিকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। কবি একটি গানে উল্লেখ করেছিলেনÑ ‘মসজিদেরই পাশে আমায়/কবর দিও ভাই।’ আর তাই তো ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কবি সবাইকে কাঁদিয়ে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করলে কবির ইচ্ছা পূরণের জন্য তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে দাফন করা হয়।

নজরুলের বিদ্রোহী ধাঁচের কবিতা, গান ও প্রবন্ধ এক সময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে এবং ভারতের স্বাধীনতা লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অপরদিকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর- ‘চল চল চল’ (যা বাংলাদেশের জাতীয় রণসঙ্গীত), ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’, ‘এই শিকল পরা ছল’, ‘কা ারী হুঁশিয়ার’, ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’, ‘ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি’, ‘একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী জননী’ প্রভৃতি গান ও কবিতা এ দেশের মানুষের এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। আর তাই কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতীয় কবি।

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫

২২/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: