কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

অবৈধ অভিবাসন, বুড়ো জাতি ও শেয়ারবাজার

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫
  • ড. আরএম দেবনাথ

এই মুহূর্তে আমার বিবেচনার মধ্যে তিনটি বড় অর্থনৈতিক ঘটনা আছে, যার ওপর আলোচনা হওয়া উচিত। প্রথমটি শ্রমবাজার বা অবৈধ অভিবাসনের ওপর। দ্বিতীয় খবরটি যুবসমাজের ওপর। তৃতীয় ঘটনাটি শেয়ারবাজার সম্পর্কিত। অবৈধ অভিবাসনের ওপর লোমহর্ষক সব খবর ছাপা হচ্ছে প্রতিদিন। এতদিন আমরা অবৈধ অভিবাসনের যে খবর পেতাম তা ঘটত ইউরোপ, আমেরিকা ইত্যাদি খুবই উন্নত দেশে। এবার এসব খবর আসছে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে।

হাজার হাজার বাংলাদেশী সমুদ্রে ভাসছে। এসব বাংলাদেশীর সিংহভাগ চট্টগ্রামের বাসিন্দা। এরমধ্যে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারাও আছে যাদের জায়গা ওই দেশে নেই, বাংলাদেশেও নেই। এসব লোকের সবাই চাকরিপ্রার্থী। প্রলোভন দেখিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের বিশাল শক্তিশালী একটা বা একাধিক সিন্ডিকেট দিনের পর দিন ওই কাজ করছে। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের বন-জঙ্গলে বাংলাদেশীদের গণকবর পাওয়া যাচ্ছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া এসব খবর যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করছে। জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে অনেক দেশই ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারকে হাজার হাজার ভাসমান বাংলাদেশীকে তাদের সমুদ্র উপকূলে নৌকা ভিড়ার অনুমতি দিতে আহ্বান জানিয়েছে। কোন লাভ হচ্ছে না। ডুবে মরুক এই অভিবাসীরা, তবু তারা কূলে ভিড়তে দেবে না। তারা বলছে ‘জায়গা নেই’ জায়গা নেই। না খেয়ে মরছে শত শত লোক সমুদ্রে, গভীর সমুদ্রে। এসব লোমহর্ষক ঘটনা দেখে আমাদের লেখক/কলামিস্টরা বলছেন এটা এক মানবিক বিপর্যয়। এই সমস্যা আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমস্যা। কেউ কেউ বলছেন শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হওয়ার কারণেই তা ঘটছে। আমার এসব ব্যাপারে কোন বক্তব্য নেই। আমি মনে করি বিষয়টিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা দরকার। আমরা গত কয়েক বছর যাবত ৬ শতাংশের ওপরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ঘটাচ্ছি এবং তা কোনক্রমেই ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের অর্থনৈতিক উন্নতির তুলনায় কম নয়। দেশের দারিদ্র্যও হ্রাস পাচ্ছে। অনেক অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচক ওই সব দেশের তুলনায় ভাল। তদুপরি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার বাংলাদেশের এমন এক অঞ্চল যা দেশের অনেক অঞ্চল থেকেও উন্নত। চট্টগ্রামের বহু লোক বিদেশে চাকরি করে। দেশে টাকা পাঠায়। এমতাবস্থায় নিজেদের প্রশ্ন করা দরকার- কেন মানুষ জীবনের এত বড় ঝুঁকি নিয়ে আলোচ্য দেশগুলোতে পাড়ি দিতে চাইছে। কিসের আশায়? ওই সব দেশে কি বাংলাদেশ থেকে মজুরি বেশি এবং তা ঝুঁকি সত্ত্বেও অধিকতর লাভজনক? বাংলাদেশে কি মজুরি খুবই নিচু পর্যায়ের? এসব প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্ন আরও একটা নিজেদের করতে হয়। তাহলে কি আমাদের উন্নয়ননীতিতে কোন ‘কমতি’ আছে? তবে কি আমাদের অনুসৃত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে কোন সমস্যা আছে? তবে কি উন্নয়নের ফসল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না যার কারণে মানুষ দেশ ছেড়ে যেতে চাইছে। প্রশ্ন করা দরকার আমাদের জনসংখ্যানীতিকেও। দেশের অনেক অর্থনীতিবিদ বিশ্বাস করেন আমাদের লোকসংখ্যা বাড়া দরকার। উন্নত দেশগুলোর লোকের দরকার হবে। আলোচ্য দেশগুলোতে লোকের দরকার হবে, চীনেও লোকের দরকার হবে। ওই সব দেশে আমাদের উদ্বৃত্ত থেকে লোক সরবরাহ করব। এ ধরনের ভাবনা আজকের ঘটমান মানবিক বিপর্যয়ের পর দারুণ প্রশ্নের সম্মুখীন নয় কি? সব দেশে তাদের দুয়ার বৈধ ও অবৈধভাবে যে খোলা রাখবে না তার ইঙ্গিত নয় কি বর্তমান ঘটনা! আমি অন্যান্য দেশের কথা আনছি না। মালদ্বীপে অবৈধ অভিবাসী আছে। ভারত ও পাকিস্তানে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে আছে। ইউরোপের দেশগুলোতে আছে। আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় আছে। বৈধ অভিবাসনের ব্যাপার বাদ দিলাম। বাদ দেব কেন? ওই সুযোগও কিন্তু দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। অবৈধ তো দূরের কথা; মালয়েশিয়া, সৌদি আরবসহ বহু দেশে শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হচ্ছে। আসলে সকল দেশ সব সময় সমানভাবে এগোয় না। এমতাবস্থায় বৈধ ও অবৈধ অভিবাসন- এই উভয় বিষয় সম্পর্কেই আমাদের ভাবতে হবে। দেশের বাজার বড় করতে হবে। দেশের অর্থনীতির শক্তি বাড়াতে হবে। গার্মেন্টসের বাজার আমাদের নিজেদের নয়। শ্রমশক্তির বাজার- এটাও বিদেশের বাজার। আমাদের যা কিছু হচ্ছে তা বিদেশী ক্রেতানির্ভর। এই নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে অভিবাসী সমস্যার সমাধান করতে হবে। নতুবা মানবিক বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে। বাংলাদেশী মানুষ একটু ভাল থাকার আশায় প্রলোভনের কাছে নতিস্বীকার করে সাগরে, বন-জঙ্গলে, পাহাড়ে ও খালি রাস্তায় অকারণে প্রাণ দেবে।

দ্বিতীয় যে সমস্যাটির কথা তুলেছি সেটি যুবশক্তি। কিছুদিন আগে যুবশক্তির ওপর লিখেছি। আমরা গর্ব করে বলি আমাদের গড় আয়ু বাড়ছে। দৃশ্যত এটা ভাল খবর। কিন্তু এ খবরের ভেতরেই যে খারাপ খবরটি নিহিত সে সম্বন্ধে ভাবছি না। কিন্তু ভাবার কারণ আছে। এ কথাই গত সপ্তাহে এক সেমিনারে বলা হয়েছে। আমাদের যে তরুণ বা যুবশক্তি আছে তা আমাদের সম্পদ। কিন্তু এই তরুণরা চিরকাল তরুণ থাকবে না। তারাও বুড়ো হবে। গড় আয়ু বাড়তে থাকলে যুবকরা বুড়ো হবে। এই করতে করতে এক সময় বাংলাদেশও বুড়োদের দেশে পরিণত হবে। চিকিৎসা খরচ বাড়বে। হাসপাতাল লাগবে। ওষুধ কোম্পানি লাগবে। বুড়োদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী লাগবে। তারা যেহেতু সিনিয়র সিটিজেন হবেন তাই তাদের জন্য অনেক ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাদের প্রতি যতœশীল হতে হবে। বহু হ্যাপা বুড়োর দেশ হবে। আশার কথা, আগামী ১৫ বছর পর এই সমস্যা থাকবে না। ২০৩১ সালের পর বুড়ো মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকবে। অতএব একটি সাম্প্রতিক সেমিনারে বলা হয়েছে, এর মধ্যেই যুবশক্তিকে পুরোপুরি ব্যবহার করতে হবে। তাদের সুশিক্ষা, প্রশিক্ষণ দরকার। যে ধরনের বিবিএ, এমবিএ এখন করা হচ্ছে এ দিয়ে কোন কাজ হওয়ার সম্ভাবনা কম। ঘরে ঘরে বিশ্ববিদ্যালয় দরকার নেই। দরকার শিক্ষার গুণগতমান বৃদ্ধি। দরকার টেকনিক্যাল এডুকেশন। বিএ, এমএ, বিবিএ, এমবিএ- এসব ডিগ্রীর ডিগ্রী প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভাবতে হবে নতুন করে। এক ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ যে ক্ষতি আমাদের শিক্ষাজীবনে করে গেল তার ধকল সামলাতে বহুদিন লাগবে। আশার কথা হলো, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সমস্যাটি উপলব্ধি করেছেন এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে বিকেন্দ্রীকরণের পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারকে অনুরোধ করব আর বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি না দিতে। বড় সস্তা হয়ে যাচ্ছে ডিগ্রী। একচ্ছত্র বাংলা ও ইংরেজী যে ছেলেমেয়েরা লিখতে পারে না সেই শিক্ষার কোন প্রয়োজন আছে কি? অতএব দরকার দ্রুত প্রশিক্ষিত ও শিক্ষিত যুবশক্তি যারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কাজ করবে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। পনেরো-বিশ বছর বেশি সময় নয়। দেখতে দেখতে এই সময় পেরিয়ে যাবে। অতএব সাধু সাবধান।

তৃতীয় যে ইস্যুটির কথা উল্লেখ করেছি তা শেয়ারবাজার সম্পর্কিত। কাগজে দেখলাম শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট সংগঠনের লোকেরা সরকারের কাছে কয়েকটি দাবি তুলে ধরেছেন। একটা মজার তথ্য তারা দিয়েছেন তাদের দাবি উত্থাপনকালে। তথ্যটি কী? দেশের ব্যাংকগুলোর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বিনিয়োগের একটা সীমা করে দিয়েছে। এর বেশি অর্থাৎ সীমাতিরিক্ত বিনিয়োগ ২০১৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিতে হবে। সীমাতিরিক্ত বিনিয়োগের পরিমাণ কত? বলা হয়েছে এর পরিমাণ হবে ৬-৭ হাজার কোটি টাকা সকল ব্যাংক মিলিয়ে। শেয়ারবাজারের নেতারা বলছেন, এই ৬-৭ হাজার কোটি টাকার শেয়ার যদি ব্যাংকগুলো বিক্রি করে দিতে শুরু করে তবে নাকি বাজারে ধস নামবে। কেন? কারণ এত টাকার শেয়ার কেনার মতো বিনিয়োগকারী নাকি বাজারে নেই। এর অর্থ লোকের হাতে টাকা নেই। আর এতবড় শেয়ারবাজারের জন্য ৬-৭ হাজার কোটি টাকা কোন টাকা? লালি সাহেব বলেন, শেয়ারবাজারে স্বনামধন্য একজন নেতা আছেন। তিনি বলতেন, বাজার টাকায়-টাকায় সয়লাব। তার কথা সত্য হলে এই সামান্য পরিমাণ শেয়ার কেনার গ্রাহক পাওয়া যাবে না কেন? প্রকৃত ঘটনা হচ্ছে আমাদের শেয়ারবাজারটিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর প্রাধান্য। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীর টাকা কম। আছে কালো টাকার মালিকদের টাকা। তাদের টাকা আছে। কিন্তু তারা এখন হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন। এমতাবস্থায় করণীয় কী? করণীয় এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে। সমস্যাটি ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১’-এর সৃষ্টি। ওই আইন বলেছিল ব্যাংকের আমানতের ১০ শতাংশ ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে। এটি ছিল ভুল পদক্ষেপ। এই ভুল বুঝতে সময় লেগেছে ২৪ বছর। অতএব তা শোধরানোর সময় কম হলে চলবে কী করে? আমি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বলব এ বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে। ব্যাংকগুলো তাদের সীমাতিরিক্ত হোল্ডিংয়ের শেয়ার বিক্রি করবে। তবে এর জন্য সময়সীমা বাড়ানো দরকার। নতুবা অহেতুক সকল মার্চেন্ট ব্যাংক লোকসান গুনবে, বাজারটা সঙ্কটে পড়বে। অতএব ধীরে ধীরে ‘এ্যাডজাস্টমেন্টের’ সময় দেয়া উচিত। গবর্নর সাহেব বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে আশা করি। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের কত বিনিয়োগ শেয়ারে আছে তার এ্যাকাউন্টিং সমস্যারও সুরাহা দরকার। ‘গিট্টু’ দরকার, ‘টাইট’ দেয়া দরকার, কিন্তু ‘গিট্টু’তে যদি রোগীই মরে যায় তাহলে কার লাভ?

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও সাবেক শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশিত : ২২ মে ২০১৫

২২/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: