কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পিন্টুর চিকিৎসায় জেল কিংবা রামেক কর্তৃপক্ষের ত্রুটি ছিল না

প্রকাশিত : ২০ মে ২০১৫
  • তদন্ত কমিটির রিপোর্ট

মশিউর রহমান খান ॥ কারাভ্যন্তরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক এমপি নাসির উদ্দীন পিন্টুর মৃত্যুতে কারা কর্তৃপক্ষ বা রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল (রামেক) কর্তৃপক্ষের কোন ত্রুটি বা গাফিলতি খুঁজে পায়নি তদন্ত কমিটি। এমনকি পিন্টুর চিকিৎসার জন্য কারাগারে গেলেও কারা কর্তৃপক্ষ রামেক হাসপাতালের চিকিৎসক রইচ উদ্দীনকে চিকিৎসা করতে দেননি এমন অভিযোগও তদন্ত কমিটির রিপোর্টে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে বলে জানা গেছে। ৩ মে পিন্টুর মৃত্যুর পর কারাভ্যন্তরে চিকিৎসা সম্পর্কে পরিবার ও বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ তদন্তে গঠিত কমিটির রিপোর্টে এমন সব তথ্য উঠে এসেছে। কারা মহাপরিদর্শক জনকণ্ঠকে তদন্ত রিপোর্টের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। রিপোর্টে বলা হয় পিন্টুর মৃত্যুতে কারা ও রামেক কর্তৃপক্ষের কোন ত্রুটি নেই। সব ধরনের নিয়ম সঠিকভাবে মেনেই পিন্টুকে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। কারাগার ও রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসা সংক্রান্ত নির্ধারিত ডাক্তারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের লিখিত বক্তব্য গ্রহণ ও মৌখিক সাক্ষাতকার গ্রহণ শেষে সার্বিক পর্যালোচনার পর তদন্ত কমিটি এ রিপোর্ট প্রদান করে।

কারা সূত্র জানায়, নাসির উদ্দীন পিন্টু মৃত্যুর দিন সুস্থ ছিলেন। সকালে তিনি স্বাভাবিক খাবার গ্রহণ করেন ও সবার সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই কথা বলেন। বেলা সাড়ে এগারোটার দিকে তিনি তার চুলে কলপ লাগাচ্ছিলেন। এমন সময় হঠাৎ করে তার বুকে ব্যথা অনুভব হয়। সঙ্গে সঙ্গেই পাশে থাকা একজন বন্দীকে তিনি বুকে ব্যথার কথা জানালে সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বরত কারারক্ষী উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জানান। কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গেই রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতালের বন্দীর চিকিৎসায় নিয়োজিত কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার যিনি একইসঙ্গে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চাকরিরত তার কাছে নিয়ে যান। কারা কর্তৃপক্ষ উক্ত ডাক্তারের পরামর্শক্রমে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সঙ্গে সঙ্গেই রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। এরপর রামেক হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে বেলা ১২টা ১২ মিনিটে মৃত ঘোষণা করেন। পিন্টু দীর্ঘদিন বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন।

কারা সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা বিভাগের ডিআইজি প্রিজন্স গোলাম হায়দারের নেতৃত্বে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি প্রিজন্সের সিনিয়র জেল সুপার মিজানুর রহমান ও ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আনোয়ারুল কবির চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। কমিটি অতি সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত করেন।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, নাসির উদ্দীন পিন্টু একজন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য হওয়ায় কারা কর্তৃপক্ষ সতর্কতার সঙ্গে প্রাপ্য সকল কারা সুবিধা প্রদান করতেন। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসা প্রদান করা হতে থাকে। পূর্ব নির্ধারিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা বিএসএমএমইউ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের তারিখ ছিল ২৬ এপ্রিল। তিনি রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী থাকায় চিকিৎসা প্রদানকে গুরুত্ব দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। ফলে উক্ত কারাগার থেকে পিন্টুকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা নেয়ায় বন্দীর নিরাপত্তা বিঘœ হতে পারে এমন আশঙ্কায় কারা কর্তৃপক্ষ রামেক হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট রোগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রদান করে কারাভ্যন্তরে চিকিৎসা প্রদানে ২৩ এপ্রিল চিঠি দেয়। চিঠিতে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে কার্ডিওলজি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকসহ কারাভ্যন্তরে এসে পিন্টুকে চিকিৎসা প্রদানের বিশেষ অনুরোধ করা হয়।

চিঠি প্রদানের পর ২৫ এপ্রিলের মধ্যে পিন্টুর চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে কারাগারে কোন চিকিৎসক আসেননি। বন্দীর সুচিকিৎসার কথা ভেবে কারা কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে ২৬ এপ্রিল রামেক হাসপাতালে নিয়ে যান। পাশাপাশি ডেন্টাল চিকিৎসার জন্য ১১ মে নির্ধারিত তারিখের ডেন্টাল চিকিৎসাসহ ৪টি রোগের কার্ডিওলজি, সার্জিকেল ও অর্থোপেডিকস বিশেষজ্ঞদের দেখানো হয়। উক্ত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ তাকে নতুন কোন প্রকার ওষুধ প্রদান না করে বিএসএমএমইউ এর চিকিৎসকদের ওষুধ খেতে পরামর্শ দেন। এরপর থেকে ডাক্তারের কথা অনুযায়ী পিন্টু সুস্থ ছিলেন বলে জানা গেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২৬ এপ্রিল কারাগারের পাঠানো চিঠি পান। চিঠি প্রাপ্তির পর হাসপাতালের পরিচালক বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য ’প্লিজ ডিসকাস’ লিখে উক্ত হাসপাতালের ডক্টরস এ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ (ড্যাব) সমর্থিত বলে পরিচিত সহযোগী অধ্যাপক রইচ উদ্দীনকে বিষয়টি দেখার নির্দেশ দেন। ড্যাব সমর্থিত উক্ত চিকিৎসক জরুরী নির্দেশ সত্ত্বেও ২৬ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত বিষয়টির প্রতি কোন গুরুত্বই দেননি। এমনকি পরিচালকের সঙ্গে পিন্টুর চিকিৎসার ব্যাপারে কোন আলোচনাও পর্যন্ত করেননি। এমতাবস্থায় কারা কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগেই রামেক হাসপাতালে এনে পিন্টুর চিকিৎসা করান। হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, উক্ত চিকিৎসক বেশিরভাগ সময় কর্মস্থল ছেড়ে ঢাকায় অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে উক্ত সময় (৫ দিন) তিনি কোথায় ছিলেন বা কেন বিষয়টির প্রতি কোন প্রকার গুরুত্ব দেননি তা জানা সম্ভব হয়নি। ফলে বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসকের এ গুরুত্বহীনতার বিষয়টি রহস্যই থেকে গেছে।

এমতাবস্থায় চিকিৎসক রইচ উদ্দীন পরিচালকের দেয়া লিখিত ঐ নির্দেশনা ও কোন প্রকার পরামর্শ ছাড়াই হঠাৎ করে ২ মে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পিন্টুর চিকিৎসা প্রদান করবেন মর্মে কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির সদস্যরা পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছেন নির্দেশনা প্রদান করলেও উক্ত চিকিৎসক হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে কোন প্রকার আলোচনা পর্যন্ত করেননি। কোন প্রকার পূর্বালোচনা ও কাগজ ছাড়াই কারাগারে গেলে কারা কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসক না আসায় বন্দীর সুচিকিৎসার কথা ভেবে পিন্টুকে নিজ উদ্যোগেই রামেক হাসপাতালে নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে বলে উক্ত চিকিৎসককে জানান। এরপর ডাঃ রইচ কোন প্রকার কথা না বলে চা খেয়ে চলে আসেন।

কিন্তু উক্ত চিকিৎসক রইচ উদ্দীন ৩ মে পিন্টুর মৃত্যুর পর বিভিন্ন টিভি ও প্রিন্ট মিডিয়ার কাছে বলেন যে কারা কর্তৃপক্ষ পিন্টুর চিকিৎসা করার জন্য কারাগারে গেলেও তাকে প্রবেশ করতে দেননি। যা তদন্ত কমিটির রিপোর্টে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। অপর একটি সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটি বিভিন্ন মিডিয়ার কাছে দেয়া মিথ্যা সাক্ষাতকার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি মিডিয়ার কাছে এমন কথা বলিনি। তদন্ত কমিটি উক্ত ড্যাব সমর্থিত চিকিৎসকের কাছ থেকে নির্দেশ সত্ত্বেও ২৬ এপ্রিল থেকে ১ মে পর্যন্ত পিন্টুর চিকিৎসার জন্য কারাগারে আসেননি ২ মে এসেছেন এমন কথা কাগজে লিখিত নেয়। এ সময় তদন্ত কমিটির এক সদস্য উক্ত চিকিৎসককে বলেন যে, মিডিয়ার কাছে এসব মিথ্যা অভিযোগ করেননি তা লিখিত দেন। এ সময় তিনি মিডিয়ায় সাক্ষাতকারের কথা মৌখিকভাবে অস্বীকার করলেও এ সংশ্লিষ্ট কোন লিখিত দিতে রাজি হননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দীন বলেন, কারাভ্যন্তরে বা হাসপাতালে নাসির উদ্দীন পিন্টুর চিকিৎসায় কোন প্রকার অবহেলা হয়েছে কি না তা বের করতে ঢাকা বিভাগের ডিআইজি প্রিজন্সকে প্রধান করে ৩ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি রিপোর্ট প্রদান করেছে। চিকিৎসা প্রদানে কারা কর্তৃপক্ষ বা রাজশাহী মেডিক্যাল হাসপাতালের কোন ত্রুটি বা গাফলতি পায়নি তদন্ত কমিটি। সংশ্লিষ্ট সকলের মৌখিক ও লিখিত আকারে তথ্য গ্রহণ করা হয়েছে। সমস্ত নিয়ম-কানুন মেনেই পিন্টুর চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। পিন্টুর চিকিৎসার জন্য কারাগারে গেলেও কারা কর্তৃপক্ষ তাকে প্রবেশ করতে দেননি মিডিয়ার কাছে রামেক হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের দেয়া সাক্ষাতকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অভিযোগটি সঠিক নয়। তদন্তে তা প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি উক্ত চিকিৎসক মিডিয়ার কাছে পিন্টুর চিকিৎসা সংক্রান্ত এমন কোন কথা বলেননি বলে তদন্ত কমিটির কাছে মৌখিকভাবে স্বীকার করেছেন। আদালতের নির্দেশ ও কারা বিধি পরিপূর্ণভাবে মেনেই তাকে চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। চিকিৎসা প্রদানে কোন প্রকার অবহেলা করা হয়নি।

প্রকাশিত : ২০ মে ২০১৫

২০/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: