রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

১১৬ অনুচ্ছেদ কার্যকর না হওয়ায় চাপে থাকে বিচার বিভাগ

প্রকাশিত : ১৭ মে ২০১৫
  • বার ও বেঞ্চের ভূমিকা বিষয়ক আলোচনায় বললেন প্রধান বিচারপতি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ মাসদার হোসেন মামলার রায়ের পর দেশের বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের বিষয়টি সুস্পষ্ট নির্দেশনা পায়। এরপর পার হয়ে গেছে ১৪ বছর। এই ১৪ বছর পরেও বার ও বেঞ্চের এক সভায় ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধান বিচারপতির প্রশ্ন, ১৪ বছর পার হলেও কী পেলাম! কার্যকর হলো না এখনও সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ। এই কার্যকর না হওয়ার ফলে এখনও চাপের মধ্যে থাকে বিচার বিভাগ।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছেন, নির্বাহী থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের ১৪ বছরে আমরা কী পেলাম? মাসদার হোসেন মামলার বারোটি নির্দেশনার মধ্যে প্রধান প্রধান নির্দেশ এখনও কার্যকর হয়নি। নিম্ন আদালতের বিচারকদের স্বাধীনতা বিষয়ে সংবিধানের ১১৬ ও ১০৯ অনুচ্ছেদের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সংবিধানের ১১৬ কার্যকর না হলে বিচার বিভাগ তথা নিম্ন আদালত স্বাধীনভাবে কোনদিন কাজ করতে পারবে না। বিচার বিভাগ সব সময় চাপের মধ্যে থাকে। বিচার বিভাগ কিছু বললে প্রত্যেকেই বিমাতাসুলভ আচরণ করেন। আমরা অনেক কিছু সহ্য করে যাই। তিনি আরও বলেন, আইনজীবীদের ত্রুটির কারণেই বিচারপ্রার্থীরা সুবিচার থেকে বঞ্চিত হন। এছাড়া আইনজীবীদের উদাসীনতার কারণেই বিচারপ্রার্থীরা ৬০ থেকে ৭০ ভাগ মামলায় হেরে যান। একজন আইনজীবী একজন আর্কিটেকচার (কারিগর)। আইনজীবী মামলার স্টেটমেন্ট এমনভাবে তৈরি করবেন যেন বিচারক প্রশ্ন করলেই উত্তর পাওয়া যায়। বিচার বিভাগে মামলা জট নিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। উচ্চ আদালত আর নিম্ন আদালতে ৩০ লাখ মামলা বিচারাধীন এই বদনামের ভার থেকে মুক্তি চাই। লাখ লাখ মামলা বিচারাধীন রেখে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বিচারক ও আইনজীবীসহ প্রত্যেকে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। শনিবার সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে হিউম্যান রাইটস এ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ আয়োজিত ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বার ও বেঞ্চের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এসব কথা বলেছেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, মামলা সম্পর্কে বিচারকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন না অনেক আইনজীবীই।

একজন আইনজীবী একজন আর্কিটেকচার (কারিগর)। আইনজীবী মামলার স্টেটমেন্ট এমনভাবে তৈরি করবেন যেন বিচারক প্রশ্ন করলেই উত্তর পাওয়া যায়। বিচার বিভাগে মামলা জট নিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। অসংখ্য মামলার ভার আমাদের বহন করতে হচ্ছে। এছাড়া সবাই আইনের শাসন চাইলেও বিচার বিভাগের চাহিদা তুলে ধরা হলে বিমাতাসুলভ আচরণ পাওয়া যায় বলেও মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি। আইনের শাসন বলতে আমি বুঝি, প্রথমে আমি আমার দায়িত্ব পালন করি তারপর আরেকজনকে বলি।

এইচ আরপিবি প্রেসিডেন্ট এ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন সুপ্রীমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ন, বিচারপতি আওলাদ আলী, বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, সিনিয়র আইনজীবী আব্দুল বাসেত মজুমদার প্রমুখ। সেমিনারে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বার ও বেঞ্চের সম্পর্কোন্নয়নে কয়েক দফা প্রস্তাব তুলে ধরে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ব্যারিস্টার মইন ফিরোজী।

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার বত্তৃতায় বলেন, বিচারকদের স্বাধীনতা বলতে সংবিধানের ১১৬ কার্যকর না হলে বিচার বিভাগের তথা নিম্ন আদালতের স্বাধীনতা থাকবে না। পৃথিবীতে যত মহান ব্যক্তি পেয়েছি তাঁরা প্রত্যেকেই আইনের ছাত্র ছিলেন। এই উপমহাদেশে মহাত্মা গান্ধী, মতিলাল নেহরু, জওহরলাল নেহরু, জিন্না সাহেব তখনকার দিনে প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী ছিলেন। বর্তমানের ওবামা, ইংলান্ডের প্রধানমন্ত্রী আইনের চর্চা করেন না, কিন্তু তারা সবাই আইনের ছাত্র। এরা রাজনীতিতে চলে গেছেন। পৃথিবীর যত বিখ্যাত বিচারক তারা সবাই আইনজীবী ছিলেন। প্রকৃত মানুষ হতে হলে আইন চর্চা করতে হবে। তা তারা করছেন। বেঞ্চ কি ভূমিকা নেবে সেটা নির্ভর করে আইনজীবীদের উপর। একজন আইনজীবী হিসেবে আমাকে চিন্তা করতে হবে কতটুকু দায়িত্ব পালন করেছি।

তিনি আরও বলেন, এখন নবীন আইনজীবীরা কোন সিনিয়র চেম্বারে এটেন্ড করেন না। এই সিস্টেমটি উঠে গেছে। আমাদের জীবনে প্রথম পাঁচ বছরে জামিনের জন্য কোর্টে দাঁড়াতে সাহস পাইনি। সিনিয়রদের ডিক্টেশন লিখতে লিখতে হাতে কড়া পড়ে যেত। এখন তো সহজ হয়ে গেছে। সিনিয়র আইনজীবীরা জুনিয়রদের যদি কোন ডিক্টেশন (নির্দেশনা) না দেন তাহলে জুনিয়ররা শিখবে কী ভাবে।

নিম্ন আদালতে দুপুরের পর কোর্টে কোন আইনজীবীই থাকেন না। জুনিয়রদের দিয়ে শুধু সময় নেন। আবার কড়া কোন বিচারপতি পড়লে তাকে তাড়ানোর জন্য বার থেকে বিভিন্নভাবে আন্দোলন শুরু করে দেন আইনজীবীরা। এভাবে চললে তো মামলার জট বাড়তেই থাকবে।

প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, একজন আইনজীবীর সনদ পেতে হলে সিনিয়রের সার্টিফিকেট লাগে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে দেখবেন কোন নবীন আইনজীবী সিনিয়রের চেম্বারে গেলে তাকে নেয়া হয় না। আজ যারা নবীন আইনজীবী আসছেন তাদের মধ্যে থেকেই বিচারপতি নিয়োগ করব। পৃথিবীর সব জায়গায় আইন বিভাগে কি হবে এটা নির্ধারণ করে বার কাউন্সিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে কি শিক্ষা কারিকুলাম হবে এটা নির্ধারণ করবে বার কাউন্সিল। বার কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মানতে বাধ্য। আপনারা আপনাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ান তারা মানতে বাধ্য হবে। আগে আমাদের নিজেদের সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নিজে যদি গণতন্ত্র না মানি তাহলে আরেকজনকে কিভাবে বলব। বার কাউন্সিলকে ঠিকমতো পদক্ষেপ নিতে হবে। এবার ২২ হাজার এমসিকিউ পরীক্ষা দিল। অনেককে বাদ দিতে হবে। মাত্র ৫ হাজার থাকল অন্যদের বিদায় নিতে হলো। আপনারা এ পরীক্ষাটাও ঠিকমতো নিতে পারেননি। আমি যে দায়িত্বে আছি সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, বার ও বেঞ্চের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থা বিচার বিভাগের জন্য খুবই প্রয়োজন। সংবিধান অনুযায়ী আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব সুপ্রীমকোর্টের ওপর ন্যস্ত আর সেখানে বারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি শক্তিশালী কিন্তু সদাচারি ও বিবেচক বার সব সময় বেঞ্চের সর্বোত্তম বন্ধু। এখন পর্যন্ত বিচার বিভাগের ওপর আমাদের সমাজের একটি শ্রদ্ধার জায়গা রয়েছে এবং আস্থা অক্ষুণœ আছে, এ ধারা অব্যাহত রাখতে বার ও বেঞ্চের যৌথ প্রচেষ্টা দরকার।

প্রধান বিচারপতি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, মিডিয়ার সঙ্গে বিচার বিভাগে ভুল বোঝাবুঝি হয়। বিচার বিভাগ স্পর্শকাতর বিভাগ। আগে একজন সাংবাদিক বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে লিখতেন, এখন লেখেন না। আমাদের পীড়া দেয়। আপনারা লিখেন, অবশ্যই লিখবেন। তবে প্রশ্ন হলো যে বিষয়ে লিখবেন, সে বিষয়ে আপনাকে লেখাপড়া করতে হবে। না জেনে পা-িত্য দেখাবেন না। বিচার বিভাগের প্রতি জনগণের যে অবস্থা সেটাকে বিলীন করবেন না। আমাদের বিচার বিভাগও সমালোচনার বাইরে নয়। কিছু বিচারকের ত্রুটি থাকতে পারে। আমি নিজেও সমালোচনার উর্ধে নই। বাংলাদেশে যত প্রতিষ্ঠান আছে তার মধ্যে একমাত্র বিচার বিভাগেই গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি। যদি বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা না থাকত তা হলে এত লোক আদালতে আসত না। এক সাংবাদিককে বাধ্য হয়ে ৬ মাসের জেল দিয়েছিলাম। তিনি প্রধান বিচারপতির নাম পর্যন্ত সমালোচনা করেছিলেন।

বিচার বিভাগে মামলাজট নিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বিচার বিভাগ সব সময় চাপের মধ্যে থাকে। নিম্ন আদালতে ২৮ লাখ ৩০ হাজার মামলার জট রয়েছে। নিম্ন আদালতসহ ৩০ লাখ মামলার ভার আমাদের বহন করতে হচ্ছে। এ মামলা থেকে উত্তরণের জন্য দরকার বিচারকদেরও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা। বিচার বিভাগের চাহিদা তুলে ধরলেই অনেক জায়গা থেকে বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়। কিন্তু সবাই আইনের শাসন চায়। ট্রেনিংয়ের জায়গা অপ্রতুল হওয়ায় বিচারকদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা যাচ্ছে না। প্রধান বিচারপতি বলেন, মাসদার হোসেন মামলার বারোটি পয়েন্ট উপস্থাপন হয়েছে। এর মধ্যে মেইন একটা বিষয় হলো ‘অনুচ্ছেদ ১০৯’। হাইকোর্ট বিভাগের অধীনে যদি এ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও কন্ট্রোল থাকে আবার নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলার বিষয়টি যদি সরকারের হাতে থাকে, তাহলে ক্ষমতা হাইকোর্টের থাকল না। মাসদার হোসেন মামলার ১৪ বছর পার হয়ে গেলেও কি পেলাম আমরা। বিচার বিভাগের এবং বিচারকদের প্রকৃতপক্ষে যদি স্বাধীনতা দিতে চাই তাহলে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে যা আছে তা পুনঃস্থাপন করতে হবে। না হলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোনদিনই থাকবে না।

স্বাগত বক্তব্যে এইচআরপিবির প্রেসিডেন্ট এ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বার ও বেঞ্চের একক দৃষ্টিভঙ্গি খুবই জরুরী, কারণ বিভিন্নভাবে বিচার ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করার ষড়যন্ত্র চলছে। কখনও বিচারকদের আবার কখনও বিচারের উপর অনাস্থা দেয়ার প্রয়াস চলে। যার মাধ্যমে মানুষের মনে বিচারের প্রতি আস্থা দুর্বল করতে ভূমিকা রাখা হয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এ ধরনের ঘটনা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, তাই আইনজীবী ও বিচারকদের পরস্পর এগিয়ে আসতে হবে। বার ও বেঞ্চের সমন্বয় একটি গতিশীল বিচার ব্যবস্থা অক্ষুণœ রাখা সম্ভব কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের সে রকম কোন সমন্বয় দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ বারে রাজনৈতিক বিভক্তি। আর বারের বিভক্তি বেঞ্চে যে প্রভাব ফেলবে না তা নিশ্চিত করা বলা যায় না।

প্রকাশিত : ১৭ মে ২০১৫

১৭/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: