কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে ॥ কারিগরি শিক্ষায় নারী

প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৫
  • ইনফরমেশন টেকনোলজিতে মেধার বিকাশ ঘটিয়ে নারী এখন শক্ত অবস্থানে

নারী শিক্ষার হার বেড়েছে। তবে উচ্চ শিক্ষায় নারী এখনও পিছিয়ে। বাংলার নারী হিমালয় চূড়ায় পৌঁছেছে, উড়োজাহাজ চালাচ্ছে, তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তিতে অনেক দূর এগিয়েছে, বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তারপরও প্রকৌশল ও কারিগরি চাকরির ক্ষেত্রে নারীর চেয়ে পুরুষকে প্রাধান্য দেয়া হয় বেশি। এই অবস্থার উত্তরণের সময় এসেছে। নারী এখন প্রতিটি শিক্ষায় এগিয়ে চলার পথে অবস্থান নিয়েছে। তারপরও সমাজের এক শ্রেণীর অভিভাবক এখনও নারীকে শক্ত কাজের (প্রকৌশল কারিগরি) শিক্ষায় যেতে দেন না। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প ও ইনফরমেশন টেকনোলজিতে নারী এখন নেতৃত্বের দিকে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইনফরমেশন টেকনোলজিতে ভারতীয় নারী পাকাপোক্ত আসন করে নিচ্ছে। বাংলাদেশের যে ক’জন নারী ইনফরমেশন টেকনোলজিতে মেধার বিকাশ ঘটিয়ে ভাল ফলাফল করেছে তাদের অনেকেই এখন স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ বিভুঁইয়ে গিয়ে উন্নত পাঠ নিয়ে ভাল অবস্থানে আছেন। একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়, যারা মেধার বিকাশ ঘটিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিএ-৫ পেয়ে উন্নীত হয়, তাদের বাবা-মা ও অভিভাবকের প্রথম আশা থাকে মেয়ে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। এর পর কম্পিউটার সায়েন্স। তারপরের চয়েস বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ও মাস্টার্স। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সুযোগ না পেয়ে কেউ ঝরে পড়লে ধনী ও উচ্চবিত্তের অভিভাবকগণ ভর্তি করে দেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে (বর্তমানে উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারও দুটো ডাল-ভাত খেয়ে মেয়েদের পড়াবার চেষ্টা করেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে)। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিস্টার ফি গগনচুম্বী। যারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঞ্চিত হয় তারা এবং মধ্যবিত্ত ও গরিব পরিবারের টার্গেট থাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিভাভবকগণ চান উচ্চ শিক্ষার লেখাপড়ার পাট শেষ করে ভাল চাকরি করবে। বিসিএস দিয়ে সরকারী চাকরি পাবে। তারপর বিয়ে থা আছে। অনেক ভাবনা থাকে। কিছু ভাবনার বাস্তবায়নও হয়। অনেক ভাবনা ড্রপআউটও হয়ে যায়। যারা জিপিএ-৫ পায় না তদের দুর্ভোগ ওঠে চরমে। সরকারী বেসরকারী কলেজে লেখাপড়ার পর তাদেরও টার্গেট থাকে চাকরি। জেনারেল এডুকেশনে পাশ করার পর চাকরি পাওয়া যে কতটা কঠিন তা বুঝতে পারে তরুণ-তরুণীরা। চাকরি নামের সোনার হরিণ ধরতে গিয়ে কত অভিভাবককে জমি জিরাত হয় বিক্রি না হয় বন্ধক রাখতে হয়েছে, জীবন পাতার সেই খবর চাপাই পড়ে থাকে। এত কিছুর পরও অভিভাবকরা চান না তাদের মেয়ে কারিগরি শিক্ষায় নিজেকে গড়ে তুলুক। নিজ প্রচেষ্টায় বড় কাজ করুক। স্বকর্ম সংস্থান সৃষ্টি করে সম্মানের জীবন বয়ে আনুক। এই বিষয়ে অভিভাবকদের যুক্তিও ফেলে দেয়ার মতো নয়। বর্তমানে দেশের প্রতিটি শহরে এমনকি উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষার নামে ব্যাঙের ছাতার মতো গজে উঠেছে কিছু প্রতিষ্ঠান। এইসব অনেক প্রতিষ্ঠান কথিত সার্টিফিকেটের বাণিজ্য করছে অর্থের বিনিময়ে। এর বাইরে যে সরকারী ও বেসরকারী ভাল প্রতিষ্ঠানও আছে তা জানেন না অনেকেই। কিছু লোভী মানুষের অর্থ বাণিজ্যের কারণে সাধারণের মধ্যে একটা ভ্রান্ত ধারণা জন্ম নিয়েছে, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভালো লেখাপড়া হয় না। সরকারীভাবে যা বন্ধ করার উদ্যোগ চোখে পড়ে না। এদিকে সরকারীভাবে বলা হয়েছে, আগামী ২০২১ সালের সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা হবে। দেশ সেই দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ যে দেশে মাথাপিছু গড় আয় দেড় হাজার মার্কিন ডলার সেই দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২শ’ মার্কিন ডলার। মধ্যম আয়ের দেশকে এগিয়ে নিতে এবং আগামী ২০৪১ সালে দেশকে ধনী দেশে পরিণত করতে হলে সকল শিক্ষায় নারীদের এগিয়ে যেতে হবে। এই বিষয়ে কারিগরি শিক্ষার উদাহরণে বলা হয়েছে, সাধারণ শিক্ষায় ব্যবহার হয় তিন আঙ্গুল অর্থাৎ কাগজে লিখতে কলম ধরতে তিনটি আঙ্গুল দরকার। আর কারিগরি শিক্ষায় ব্যবহার হয় দশটি আঙ্গুল তা কম্পিউটারেই হোক বা কারিগরি অন্য কোন শিক্ষায় হোক। আগামী দিনের এই শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে বিশেষ করে নারীদের কারিগরি শিক্ষাকে দ্রুততায় এগিয়ে নিতে বগুড়ায় সরকারী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (বিআইআইটি সংক্ষেপে বিট)। বাংলাদেশ সরকারের কারিগরি শিক্ষা বোর্ড অধিভুক্ত এই প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা দিচ্ছে দেশী ও বিদেশী সংস্থা। বগুড়ায় বিটের দুইটি বহুতল ক্যাম্পাসে (একটি শেরপুর সড়কের ধারে মফিজ পাগলার মোড়, অপরটি সেউজগাড়ি) কম্পিউটার টেকনোলজির ওপর অধিক গুরুত্ব দিয়ে অটোমোবাইল, মেকানিক্যাল, সিভিল, আর্কিটেক্ট, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, টেলি কমিউনিকেশন, টেক্সটাইল, গার্মেন্টস ডিজাইন এ্যান্ড প্যাাটার্ন মেকিং টেকনোলজিতে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ প্রকৌশলী সাহাবুদ্দিন সৈকত জানালেন, গেল বছর ঢাকায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সপ্তাহে বিটের উদ্ভাবিত তাপ থেকে বিদ্যুত উৎপাদন প্রকল্প সুনাম কুড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্বে কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে অনেক দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ থেকে ধনী দেশে পরিণত করতে হলে স্বকর্মসংস্থান সৃষ্টির কারিগরি শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়া উচিত এবং নারী কারিগরি শিক্ষায় এগিয়ে এলে শিল্পের প্রসারে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। সাহাবুদ্দিন সৈকত জানালেন, তার প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর ৫০ নারী শিক্ষার্থীকে স্কলারশিপ দিয়ে পাঠ দেয়া হয় যাতে তারা প্রতিটি কোর্স সফলতার সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়। বিশেষ করে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি তথা কম্পিউটার টেকনোলজি, আর্কিটেক্ট, গার্মেন্ট ডিজাইন ও প্যাটার্ন মেকিং টেকনোলজিতে নারীদের স্কিলড করে তোলা হয়। তারা যে কোন স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে গিয়ে সম্মান বয়ে আনে এবং দেশের অর্থনীতির ভিতকে আরও মজবুত করে। বিটে অধ্যয়নরত মেয়েরা ইলেকট্রিক্যাল ইলেকট্রনিক্সেও ভাল ফলাফল করছে। সাহাবুদ্দিনে সৈকতের আশা সরকার কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণে সার্বিক সহযোগিতা দিলে ভিশন ২০২১-এর অনেক আগেই মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়ে ধনী দেশ হওয়ার দৌড়েও নির্ধারিত সময়ের আগে লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে

প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৫

১৬/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: