মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বোরো মৌসুম শেষের আগেই ॥ রেকর্ড উৎপাদন

প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৫
বোরো মৌসুম শেষের আগেই ॥ রেকর্ড উৎপাদন
  • লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬৫ হাজার ৫১ হেক্টর বেশি জমিতে আবাদ
  • গতবারের তুলনায় উৎপাদন ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৩২ মেট্রিক টন বেশি
  • চাল আমদানির ওপর ১% শুল্ক আরোপে ধানের দাম বাড়বে, উপকৃত হবে চাষী

এমদাদুল হক তুহিন ॥ সারা দেশে চলতি বোরো মৌসুমের ধান ঘরে তোলার উৎসব প্রায় শেষ পর্যায়ে। শেষ হয়েছে ৬৪ শতাংশ জমির ধান। কিছু কিছু অঞ্চলে কাটা হলেও হাওড়ে শেষ হয়েছে কয়েক সপ্তাহ আগেই। বোরো কাটা শেষ না হলেও গত বছরের তুলনায় ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৩২ মেট্রিক টন ধান বেশি উৎপন্ন হয়েছে। সব ধান ঘরে তোলার আগেই উৎপাদন ক্ষেত্রে গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এখন বাম্পার ফলনের নতুন রেকর্ড দেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশ! তবে, মৌসুমের শুরুতে ধানের উপযুক্ত দাম পাচ্ছিল না কৃষক। ফলে টনকনড়ে সরকারের। চাল আমদানির ক্ষেত্রে শূন্য কোটা বন্ধ করে দেয়া হয়। আরোপিত হয় ১০ শতাংশ কোটা। কৃষিবিদ ও অর্থনীতিবিদদের ধারণা, শূন্য শুল্কের পরিবর্তে কোটা আরোপ করায় মাঠ পর্যায়ে ধানের দাম বৃদ্ধি পাবে। উপকৃত হবেন কৃষক। মাঠেও ধানের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে একাধিক খবরে বলা হয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পূর্বাভাস মতে, এ বছর বোরোতে ১ কোটি ৯০ লাখ টন ধান উৎপন্ন হওয়ার কথা রয়েছে, যা হবে ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন একটি রেকর্ড। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্তা ব্যক্তিরাও অনুরূপ কথা বলছেন। সবমিলিয়ে বলা হচ্ছে, দেশের কৃষি খাতের জন্য আরও একটি সুখবর অপেক্ষা করছে।

মৌসুমের শেষ সময়ে ফসল ঘরে তুলতে কৃষকের ব্যস্ততা কিছুটা কমেছে। অল্প ক’দিন আগে দম ফেলার ফুসরত না থাকলেও এখন খোশগল্পে জমে উঠছেন তারা। কাঠফাটা রোদ উপেক্ষা করে চলমান উৎসবে লেগেছে শেষ সময়ের হাওয়া। দ্রুততম সময়ে চলছে ধান কর্তন ও মাড়াই। ধানের দাম বাড়তে পারে এমন আভাসে কৃষক ফেলছেন স্বস্তির নিশ্বাস। কৃষি সংশ্লিষ্টরা এই মুহূর্তে অপেক্ষার প্রহর গুনছেন ধান উৎপাদনে নতুন রেকর্ড দেখার।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, হাওড় এলাকার সাতটি জেলায় শেষ হয়েছে বোরোর কর্তন, শতাংশের হিসাবে তা ৯৯ শতাংশ। সর্বশেষ ১৩ মে ২০১৫-এর তথ্যমতে, হাওড় এলাকায় কর্তিত বোরো ২৫ লাখ ৭১ হাজার ৪৪ মেট্রিক টন ধান উৎপন্ন হয়েছে। এরমধ্যে হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় জাতের একাধিক ধানও রয়েছে। হাওড়ে চলতি বোরো মৌসুমে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৬৩ হেক্টর। সরকারী নানমুখী ইতিবাচক কর্মকা-ে আবাদ হয়েছে ৪ লাখ ২৩ হাজার ৩০৫ হেক্টর। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় তা ৮ হাজার ৮৪২ হেক্টর পরিমাণ বেশি। আবাদের ক্ষেত্রে অর্জিত জমির পরিমাণ ১০২.১৩ শতাংশ। হাওড় এলাকার ওই জেলাগুলো হচ্ছে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ। ৭০ উপজেলার মধ্যে হাওড়ের আওতাধীন উপজেলা ৫৫। গত কয়েক বছরের তুলনায় হাওড়ে বোরো উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে। এলাকবাসীও বলছেন, এবার হাওড়ে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে।

সূত্র জানায়, হাওড় এলাকার ৯০ ভাগ মানুষ বোরো ফসল উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল। বোরো মৌসুমে উৎপন্ন ধান তাদের নিজস্ব চাহিদা পূরণ করে দেশের জাতীয় অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। হাওড় এলাকায় এবারের বাম্পার ফলনে তাদের চোখে মুখে খুশি। কথাতেও বেশ স্বস্তির সুর। সরকারী নানা পৃষ্ঠপোষকতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করছেন বিভিন্ন এলাকার কৃষক। কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার হরশী গ্রামের কৃষক হিমেল জনকণ্ঠকে বলেন, ঝড়-বৃষ্টিতে ফসলের কিছুটা ক্ষতি করেছে, তবে এ বছর বাম্পার ফলনই হয়েছে। ইতোমধ্যে আমাদের এলাকার বোরো ফসলের অর্ধেক ঘরে তোলা হয়েছে। মৌসুমকে কেন্দ্র করে এলাকায় অন্য রকম উৎসবের পরিবেশ বিরাজ করছে।

মাঠ পর্যায়ে কৃষি সংশ্লিষ্ট একাধিক সমস্যা থাকলেও সব সমস্যাকে ছাপিয়ে শ্রমিকের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। কোন কোন এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি কৃষি শ্রমিক। পাওয়া গেলেও দিতে হয়েছে অধিক পারিশ্রমিক। মাঠে এখনও সেই প্রভাব রয়েছে বলে জানা যায়। তবে মৌসুম শেষ সময়ে এসে কমেছে শ্রমিকের দাম। কৃষকরা জানান, মণপ্রতি ধানের দাম ৫৫০ টাকা, অপরদিকে দিনে গড় প্রতি শ্রমিকের দামও ৫৫০ টাকা। প্রতিকাঠায় ধান কাটাতে (মাড়াই) শ্রমিকেরা ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা নিচ্ছেন। কৃষকদের দাবিমতে, শ্রমিকের মূল্য ও কৃষি সংশ্লিষ্ট নানা উপকরণের ব্যয় মিটিয়ে তাদের তেমন একটা লাভ হয়নি। জমি পতিত না রেখে খাবারের নিজস্ব চাহিদা মেটাতে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। আর কৃষিবিদরা বলছেন, কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাফল্য সরাসরি দেখা যায় না। এর সুফল ধীরে ধীরে ভোগ করতে হয়। প্রতিবছর উৎপাদন ব্যয়ে যে খরচ হয়, গড়ে লাভ তার চেয়ে অনেক বেশি।

নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার চন্দনপুর গ্রামের কৃষক মোঃ শহীদুল্লাহ জনকণ্ঠকে বলেন, এবার উৎপাদন খুব ভাল হলেও শিলা বৃষ্টির কারণে মাঠে কয়েকটি ধানের খুব ক্ষতি হয়েছে। ২৮ ধানের ফলন খুব ভাল হয়েছে। কিন্তু শিলাতে ২৯ ধানের কিছুটা ক্ষতি হয়েছিল। এ এলাকায় ৪৮ কেজিতে মণ ধরা হয়। মনপ্রতি ধানের দাম ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। সব মিলিয়ে বাম্পার ফলন হওয়ার পরও আমরা হতাশ।

কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, শ্রমিকের মজুরি কমিয়ে কৃষককে উপকৃত করার কোন সুযোগ নেই। কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা কোন সমস্যা নয়। শ্রমিকের মূল্য কমানোর কোন পন্থাও নেই, চাহিদা ও যোগানের উপরই তা নির্ভর করে। কৃষি শ্রমিক সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, এটা আমাদের বিবেচনা করতে হবে। গ্রামেগঞ্জে কাজের বহু ক্ষেত্র তৈরি হওয়ায় কৃষি ক্ষেত্রে শ্রমিকের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষক যাতে ফসলের সঠিক মূল্য পায়, তা নিশ্চিত করলে অন্য কোন সমস্যা থাকবে না।

অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে সারাদেশে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৭ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর। আবাদ হয়েছে ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার ৫১০ হাজার হেক্টর পরিমাণ জমিতে, যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৬৫ হাজার ৫১০ হেক্টর বেশি। পুরো দেশে কর্তনকৃত জমির পরিমাণ ৩১ লাখ ৪ হাজার ৪৯৮ হেক্টর, যা মোট আবাদী জমির ৬৪.০৭ শতাংশ। এখন পর্যন্ত ঘরে ওঠা ধানের পরিমাণ ১ কোটি ৯১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৪২ মেট্রিক টন। আর গত বছর উৎপন্ন হয়েছিল ১ কোটি ৯০ লাখ ৭ হাজার ২০৬ মেট্রিক টন। পুরো কর্তন শেষ না হলেও গত বছরের তুলনায় ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৩২ মেট্রিক টন ধান বেশি উৎপাদিত হয়েছে। ধান ঘরে তোলার পূর্বেই উৎপাদন ক্ষেত্রে গত বছরের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এখন বাম্পার ফলনের নতুন রেকর্ড দেখার অপেক্ষায় বাংলাদেশ! কৃষি ক্ষেত্র নতুন এই অর্জনে কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠবে বলে সবার ধারণা।

ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার একাধিক কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই এলাকায় বোরো ধান ঘরে তোলা শেষ। গত কয়েক বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে ধানের উৎপাদন। শিলা বৃষ্টিতে ফসলের কিছুটা ক্ষতি হলেও সব এলাকার মতো ওই এলাকায়ও তেমন একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। গফরগাঁও উপজেলার মাইজবাড়ী গ্রামে কৃষির সঙ্গে সরাসরি জড়িত সুলতান সরদার। তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, শ্রমিকের মজুরি বেশি থাকায় কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে, তবে যে কোন বছরের তুলনায় এবার বোরো ধানের উৎপাদন বেড়েছে। কৃষকরা এবার খুব খুশি।

কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি ও সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, দেশে প্রতিবছরই ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা সমাজের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। প্রতিবছর এমন করে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে যা সকলের প্রত্যাশা। এমন করে দেশে নতুন যুগের সূচনা হবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করেন এ অর্থনীতিবিদ।

চাল আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করায় ধানের দাম বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুল্ক আরোপ করায় চালের আমদানি কমবে। ফলে দেশীয় বাজারে চালের দাম বাড়বে। চালের দাম ও ধানের দাম একই সূত্রে গাঁথা। সরকার গৃহীত শুল্ক আরোপ সম্পর্কিত নতুন এ সিদ্ধান্তের কারণে বাজারে ধানের দাম বাড়বে, উপকৃত হবেন কৃষক। তবে কেউ কেউ বলছেন শেষ সময়ে এসে শুল্ক আরোপ করায় ধানের দাম বাড়লেও বহু কৃষক এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। তবে খোঁজ নিয়ে পাওয়া গেছে ভিন্ন কথা। জানা যায়, ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে ধানের দাম বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস)-এর সিনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ জনকণ্ঠকে বলেন, কৃষকরা যাতে ফসলের উপযুক্ত মূল্য পায় সে লক্ষ্যে চালের উপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ধানের দাম বৃদ্ধিতে শুল্ক আরোপের প্রভাব পড়বে। তবে দাম বৃদ্ধি পেলেও কৃষক খুব একটা উপকৃত হবেন না। ইতোমধ্যে অনেক কৃষকই তাদের ধান বিক্রি করেছেন। এক্ষেত্রে উপকৃত হবেন মিলার ও ব্যবসায়ীরা। তবে যেসব কৃষক ধান বিক্রি করেননি তারা শুল্ক আরোপের ফলে দাম বৃদ্ধি পাওয়ার সুবিধা ভোগ করবেন।

কৃষি শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মহাপরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জনকণ্ঠকে বলেন, আমাদের দেশে কৃষি খাতের উৎপাদশীলতা কম বা পিছিয়ে। শ্রমিকের চাহিদামূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা নেতিবাচক নয়। উৎপাদন ব্যয় কমাতে কৃষককে প্রযুক্তির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সেচ ব্যবস্থায় পানির প্রচুর অপচয় হয়, তা কমিয়ে ব্যয় কমানোর সুযোগ রয়েছে। এছাড়া আবহাওয়া সংক্রান্ত পূর্বাভাস উন্নয়ন করেও কৃষকের ব্যয় কমানো যেতে পারে। কৃষি শ্রমিকের মূল্য বৃদ্ধি প্রসঙ্গে অনুরূপ কথা বলেন কৃষি অর্থনীতিবিদ সমিতির সভাপতি ও সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য ড. শামসুল আলমও।

প্রকাশিত : ১৬ মে ২০১৫

১৬/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: