রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ফেয়ার এক্সচেঞ্জ

প্রকাশিত : ১৫ মে ২০১৫
  • রুথ রেনডেল
  • অনুবাদ : সাযযাদ কাদির

টম ডোরচেসটার-কে খুঁজছো, তাই না? জিজ্ঞেস করে পেনেলোপি।

মাথা নাড়ি, জানলে কি করে?

ওর কথাই জিজ্ঞেস করবে বলে ভাবছিলাম। মানে, এ সম্মেলনে ও সবসময় আসতো আগে। এর নড়চড় হয়নি কখনও। এবারই প্রথম দেখা নেই ওর।

তার মানে... এখানে নেই ও?

ও মারা গেছে।

বলতে যাই ‘না... ও মরতে পারে না’, কিন্তু তা তো হয় না। মরতে পারে যে কেউ। আজ আছি, কাল নেই- এ তো আর কথার কথা নয়। তবে তারপরও কথা থাকে। বেশি তেজি তাগড়া লোককে আমরা বেশি টেকসই ভাবি আমাদের চেয়ে। ভাবি, সন্ত্রাস সহিংসতা বা কোন ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটলেই শুধু টেসে যেতে পারে এসব লোক। আর টম তো... ছিল... অন্যদের চেয়ে কত্ত বেশি প্রাণবন্ত। সব কিছুতে ছিল ওর কত উৎসাহ, কত আগ্রহ! কত তীব্র ছিল ওর প্রেম ও ঘৃণা, বিশেষ করে প্রেম। মনে আছে একবার বলেছিল পাঁচ ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে চায় না ও। জীবনে কত কিছু করার, শেখার, উপভোগের আছে... তাই কোন মানে হয় না ঘুমিয়ে সময় নষ্ট করার। ওই সময় অসুস্থ... খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে ওর বউ ফ্রানসিস। তার বিশেষ ধরনের ক্যানসারের ওষুধ খুঁজতে... বা খোঁজার চেষ্টায় ও নেমে পড়ে ওর অফুরান উদ্যম নিয়ে।

বোকার মতো বলে ফেলি, কিন্তু ফ্রানসিসেরই তো মরার কথা।

পেনেলোপি অদ্ভুত এক দৃষ্টি নিয়ে তাকায় আমার দিকে।

যদি শুনতে চাও বলতে পারি ঘটনাটা। ভারি অদ্ভুত ঘটনা। তবে... আমি তো ঠিক জানি না, তুমি আবার কতখানি কি জানো।

কি জানবো? টমকে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলবো না, যদিও জানি ওকে অনেক বছর ধরেই। জানি ফ্রানসিসকে কত্ত ভালবাসে ও। মানে, আমিও তো আমার বউ মেরিয়ানকে ভালবাসি কত... বুঝেছো কথাটা? কিন্তু টম ভালবাসে তরুণ প্রেমিকের মতো। যদি বলি যে মাটিতে পা ফেলে হেঁটে যায় মেরিয়ান সে মাটিকেও পূজা করে- তাহলে বাড়িয়ে বলা হবে না একটুও।

হাতব্যাগ থেকে সিগারেট বের করে পেনেলোপি, আমার দিকে বাড়িয়ে দেয় প্যাকেট।

ও আমি ছেড়েছি অনেক আগে।

আহা আমিও যদি পারতাম ছাড়তে। কিন্তু আমার ক্ষমতা তো আমি জানি। তা তুমি কি গল্প শুনবে?

মাথা নেড়ে সম্মতি জানাই।

তোমার ভাল লাগবে না শুনতে। যেমন বিটকেল তেমন বিদঘুটে সে ঘটনা। ও আত্মহত্যা করেছে, জানো তো?

কি করেছে? টম ডোরচেসটার?

নিজেকে নিজে খতম করেছে... আত্মহত্যা... তা যা বলো...

কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য ঘটনা হতে পারে তো শুধু একটাই। তাই বলি, মানে... ফ্রানসিস মারা গেছে বলছো তো?

মাথা নাড়ে পেনেলোপি। গ্লাসে একটা হালকা চুমুক দিয়ে বলে, গত বছরের জুন কি জুলাই মাস। সম্মেলনের মাস খানেক পরে। তোমার মনে থাকার কথা, টম ওই সম্মেলনে ছিল মাত্র দু’দিন। ভেবেছিল, ফ্রানসিসকে ছেড়ে এর বেশি সময় থাকা সম্ভব নয় তার পক্ষে। ওদের দুই মেয়ে, দু’জনেরই বিয়ে হয়েছে, বড় মেয়ের আবার তিন ছেলে-মেয়ে। ওই তিনজনের বড়টির বয়স তখন ১২।

বলি, হ্যাঁ... মনে আছে ওই সময়ের কথা। এক ডিনারে ছিলাম টমের সঙ্গে। আরও কয়েকজন ছিল সেখানে। টম বলছিল কি সব তুকতাক চিকিৎসার কথা। ফ্রানসিসের বেলায় নাকি কোন কাজে আসেনি সেগুলো।

ওটা হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের এক ক্লিনিকে। ওরা রোগীকে জলশূন্য করে আখরোট বা ওই জাতীয় কিছু খেতে দেয় শুধু। সেখান থেকে ফ্রানসিস যখন ফিরে আসে একেবারে সঙ্গীন অবস্থায় তখন এক হাতুড়ে চিকিৎসক খুঁজে পায় টম। ওই চিকিৎসক মহিলার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। এক সন্ধ্যায় টমের ওখানে গিয়েছিলাম আমার বর ক্রিস-কে সঙ্গে নিয়ে। গিয়ে দেখি ওই মহিলাকে। খুব অদ্ভুত, খুবই অদ্ভুত সে মহিলা।

অদ্ভুত মানে?

মানে... এ ধরনের চিকিৎসকের কাজকম্ম সম্পর্কে কি ধারণা তোমার? মন্ত্র পড়ে ঝাড়-ফুঁক, মালিশ, জরিবুটি... এসব দিয়ে চিকিৎসা, এই তো? ওই মহিলা ওগুলো কিছু করে না, সে চিকিৎসা করে কথা বলেÑ বলে আর চিন্তা-শক্তি দিয়ে। হ্যাঁ, ওই কথাটাই বলেছিল... চিন্তা-শক্তি। মহিলার নাম দাভিনা তারসিস। বয়স বেশি না, ৪০-এর এদিক-ওদিক। তার পোশাক-আশাক ভারি অদ্ভুত। চক্রাবক্রা হিপি ধরনের, জোববা-আলখেললা, পুঁতি মালা দুল... না, ও সব নয়। মহিলা রোগা লিকলিকে। সে পরে আঁটসাঁট সাদা লেগিং, আর সাদা টিউনিকÑ তার সামনের দিকটায় বিরাট এক কমলা রঙের সূর্যের ছবি। মাথায় লম্বা চুল, গাঢ় রক্তবর্ণে রাঙানো। মেক-আপ নেই কোন। মুখটা ঘষা-মাজা। এক নাকের ফুটোয় একটা আংটি। ঘুণ্টি না, আংটি।

পেনেলোপি বলে, টম ভাবতে থাকে... এ মহিলার ক্ষমতা দারুণ। তার দাবি, ফ্রানসিসের মতো রেডিও-থেরাপি নিয়েছে একই সময়েÑ এমন এক মহিলাকে সারিয়ে তুলেছে সে। তবে ওই মহিলা একেবারেই কথা বলতে চায় না ফ্রানসিসের সঙ্গে। আমার কেন যেন মনে হয়, তাকে পাত্তা দিতে চায় না ফ্রানসিস। মহিলা কথা বলে শুধু টমের সঙ্গে। বলে একান্তে, আমাদের সামনে নয়। আর সে কথা তাদের চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। যেন কোন সাইকো-থেরাপির লাগাম ছাড়া পদ্ধতি। ক্রিস বলে, মহিলা বোধ হয় কোন নাটক জমাবে টমকে নিয়ে। আমি অবশ্য মনে করিনি তা। আমার ধারণা, সে সবকিছু করছে তার বিশ্বাস অনুযায়ী। আর টমও করছে তা। আসলেই ব্যাপারটা ছিল তা-ই। মহিলা তাকে বুঝিয়েছিল, মনপ্রাণ দিয়ে কোন কিছু চাইলে তা অবশ্যই পাওয়া যায়। কথাটা টম তখন বলেনি আমাকে, বলেছে সবকিছু সাঙ্গ হওয়ার পর।

জিজ্ঞেস করি, সবকিছু সাঙ্গ... মানে?

মানে টমের ইচ্ছা পূরণ হলেÑ

সে ইচ্ছা তো ফ্রানসিসের সেরে ওঠা... নাকি?

তা তো বটেই। এক রাতে আমার সঙ্গে কথা বলতে-বলতে ভেঙে পড়ে টম-ক্রিস তখন ছিল বাইরে কোথাওÑ কাঁদতে থাকে কখনও হাউ-মাউ করে, কখনও ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে। জানি আজকাল ব্যাটাছেলেরাও কান্নাকাটি করে, কিন্তু যেভাবে টম কাঁদে অমন করে যে কোন পুরুষ মানুষ কাঁদতে পারে তা ভাবতে পারিনি কখনও। দু’চোখ বেয়ে ওর পানি পড়ে দর-দর করে, কথা বলতে পারে না অনেকক্ষণ, বার বার গলা যায় বুজে। আমি তো ভয় পেয়ে যাই, বুঝতে পারি না কি করবো! ব্রান্ডি খেতে দেই ওকে, কিন্তু খায় মাত্র এক চুমুক। অবশ্য ও তখন গাড়ি চালাচ্ছিল, আর মেয়ে ও নাতনির বাড়ি ফেরার আগেই ফ্রানসিসের কাছে ফেরার তাড়া ছিল ওর। সে নাতনির বয়স ন’ বছর, এমা তার নাম। যা হোক, কিছু পরে ও শান্ত হয়, বলে, ‘ফ্রানসিসকে ছাড়া আমি বাঁচবো না, ওকে ছাড়া আমার জীবন আমি ভাবতেই পারি না, আমি তো আত্মহত্যা করবো...’

আহ্ ... কি কথা!

না, এটা কিছু না। এর সঙ্গে কোন সম্পর্ক নেই সে ঘটনার। ফ্রানসিস হাসপাতালে ফিরে যায় ক’দিন পর। সেখানে এক নতুন ধরনের কেমোথেরাপি দেয়া হয় তাকে। ওগুলোতে কোন বিশ্বাস ছিল না টমের। ওর বিশ্বাস কেবল তারসিসের ওপর। তার সঙ্গে তখন ওর দীর্ঘ টক সেশন চলছে প্রতিদিন। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সারা সকাল কাটায় তারসিসের সঙ্গে কথা বলে। আমি যদ্দুর জানি, ফ্রানসিসের প্রতি-পরিবারের অন্যদের প্রতি ওর আবেগ-অনুভূতি নিয়ে, কিভাবে ফ্রানসিসের সঙ্গে ওর পরিচয়Ñ এসব নিয়ে কথা বলে ও। আমি যদ্দুর জানি, ফ্রানসিসের প্রতি-পরিবারের অন্যদের প্রতি ওর আবেগ-অনুভূতি নিয়ে, কিভাবে ফ্রানসিসের সঙ্গে ওর পরিচয়Ñ এসব নিয়ে কথা বলে ও। তারসিস এসব বিষয়েই বার বার করে বলায় টমকে দিয়ে, আর যতবার টম একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে ততবার তাতে সায় দেয় তারসিস।

পেনেলোপি বলে, ক’দিন পর বাড়িতে ফেরে ফ্রানসিস। খুবই অসুস্থ তখন সে। শুকিয়ে একেবারে হাড় জিরজিরে। খাওয়ার কোন রুচি নেই মুখে। মাথার চুল পড়ে প্রায় সাফ। হাঁটা-চলা করে অতি কষ্টে। কেমো থেকে যে সব বিটকেল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়Ñ বমি-বমি ভাব, মাথা ঘোরা, কানে ঝিঁঝিÑ সবই কাহিল করে ফেলে ফ্রানসিসকে। তারসিস এসে এক নজর দেখে বলে, ‘কেমো দেয়াটা হয়েছে ভুল। তাহলেও পুরো সারিয়ে তোলা সম্ভব।’ এর পরেই আসে সে ব্যাপারটা। তখন এর কিছুই জানতাম না আমি। টম বলে নি আমাকে... বলেছে দু’ কি তিন মাস পর। কিন্তু তারসিস সে কথাই বলেছিল তাকে। ফ্রানসিস ঘুমিয়েছিল তখন। তারসিস বলে, ‘ফ্রানসিসকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কি দেবে তুমি?’ কথাটার মানে কি জানতে চায় টম। সে বলে, ‘ফ্রানসিসের জীবনের বিনিময়ে কার জীবন দেবে তুমি?’ টম বলে, বাজে কথা এ সব... একজনের জীবনের বিনিময়ে অন্য একজনের জীবন দেয়া যায় না কখনও। তারসিস বলে, দেয়া যায়... অবশ্যই দেয়া যায়। চিন্তাশক্তি দ্বারা এ বিনিময় করা যায়। চিন্তাশক্তি চর্চার প্রশিক্ষণ সে দিয়েছে টমকে, এখন তাকে শুধু ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করতে হবে ফ্রানসিসকে বাঁচার জন্য। কেবল টমই পারে ফ্রানসিসের বিনিময় হিসেবে অন্য কাউকে উৎসর্গ করতে।

পেনেলোপি বলে, ওই সময় টম বুঝতে পারে তারসিস আসলে কে। হাতুড়ে বৈদ্য। কিন্তু তার সঙ্গে তো মেতেছে সে-ও। তাই টম ভাবে, ‘দেখি কি করতে পারে তারসিস!’ তাকে প্রতারক বলা তো এক অর্থ আত্মপ্রতারণাও বটে। আসলে তারসিসের ওপর তার বিশ্বাস তখনও রয়েছে আধাআধি। সে চাপ দেয়, ‘বলো... কাকে উৎসর্গ করবে?’ টম হেসে বলে, ‘তোমার পছন্দের যে কাউকে।’ কিন্তু তারসিস সহজভাবে নেয় না ব্যাপারটা। ওই দিনই সে দেখা করে টমের বড় মেয়ে ও নাতনি এমা’র সঙ্গে। এসব কথা আমাকে বলতে নাকি ঘেন্না হয় টমের, কিন্তু আবার বলছিল, ‘আমি এখন এসব বলাবলির ঊর্ধ্বে।’ সে জানায়, দাভিনা তারসিসের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিল এমা। বার বার তাকিয়ে দেখেছে তাকে, তার আঁটো লেগিং আর টিউনিকের সূর্যটাকে দেখেছে বিশেষভাবে, নাক সিঁটকেছেও কিছুটা, তারপর মনে হয় সে বলেছে, তার নানির উপকার হচ্ছে কেমোতে... তারসিসের জন্য নয়। সে ঘটনার গোড়াটা ওখানেই।

পেনেলোপির কথায় বাধা দেই, কি বলতে ঘেন্না হয় টমের...

একটু ধৈর্য ধরো। সে ঘেন্না অহেতুক নয়। এমা ও ওর মা চলে যাওয়ার পর, ফ্রানসিস যখন বিশ্রাম নিচ্ছিল, তখন ওই কথা হয় টম ও তারসিসের মধ্যে। যখন টম বলে ‘তোমার পছন্দের যে কাউকে’ তখন তারসিস বলে, এটা তার পছন্দের ব্যাপার নয়... টমের ইচ্ছার ব্যাপার। তারপরই সে জিজ্ঞেস করে, ‘ওই এমা মেয়েটা হলে কেমন হয়?’ টম বলে, ‘এসব হাস্যকর কথা বলো না।’ কিন্তু গোঁ ধরে থাকে তারসিস। শেষ পর্যন্ত টম বলে, ‘ঠিক আছে... না হয় এমা-ই... সব আজগুবি কাণ্ড!’ আসলে ফ্রানসিসের জীবন বাঁচানো যদি সম্ভব হয় তাহলে যে কাউকে, এমা-কেও, উৎসর্গ করতে রাজি টম।

এরপর দাভিনা তারসিসের ওপর থেকে ওর বিশ্বাস চলে যায়, তাই না?

তা ভাবতে পারো তুমি। তবে অত নিশ্চিত নই আমি। এসব ঘটনা ন’ কি দশ মাস আগের। ফ্রানসিস সেরে উঠতে শুরু করে তখন। হ্যাঁ, সত্যি। না... না... আমার দিকে অমন সরু চোখে তাকাতে হবে না! পুরো ব্যাপারটাই হা হয়ে যাওয়ার মতো! চিকিৎসকরা পর্যন্ত গেলেন হা হয়ে। তবে লোকজন যা-ই বলুক এমন ঘটনা নতুন না, তাজ্জব-ও না। বোঝাই যায় কাজ হয়েছে কেমোতে। যা-যা ঠিকঠাক হওয়ার কথা, তা হতে থাকে ঠিকঠাক। তার ব্লাড কাউন্ট স্বাভাবিক হয়ে আসে, ওজন বাড়ে, ব্যথা-বেদনা দূর হয়, টিউমারগুলো শুকিয়ে যায় কুঁচকে। প্রতিদিনই একটু-একটু করে সেরে ওঠে সে। এটা রোগমুক্তি নয়, পুরোপুরি নিরাময়।

তাহলে তো খুশির অন্ত ছিল না টমের?

মুখ বাঁকায় পেনেলোপি, তা ছিল। কিছুদিন। তারপর মারা যায় এমা মেয়েটা।

কি? কি বললে?

সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়...

সেই ডাইনি দাভিনা তারসিসের কাণ্ড বলতে চাইছো নাকি?

না, তা বলছি না। কেন বলতে যাবো? ওই দুর্ঘটনার সময় তারসিস ও টম ছিল টমের বাড়িতে ফ্রানসিসের কাছে। তাছাড়া ওই দুর্ঘটনায় রহস্যজনক বা অলৌকিক কিছু নেই। ওটা নিছক দুর্ঘটনাই। এতে বিতর্কেরও কিছু নেই। এমা স্কুল বাসে তার সহপাঠীদের সঙ্গে ফিরছিল কোন সফর শেষে। রাস্তায় ছিল বরফ জমে। তাতে চাকা পিছলে বাস যায় উলটে। তুমি পত্রিকায় পড়েছো নিশ্চয় খবরটা। ক’ দিন ধরে মিডিয়া জুড়ে ছিল ওই দুর্ঘটনা নিয়ে নানা খবর।

পড়েছি মনে হয়।

এতে টম ধাক্কা খায় প্রচণ্ড। নাতনির মৃত্যুতে একজন নানা যে রকম কাতর হয় সে রকম না ব্যাপারটা। টম জর্জরিত হয় অপরাধবোধে। তারসিসের ওপর ওর এত প্রবল বিশ্বাস ছিল যে ও ভেবে বসে ওই দুর্ঘটনার জন্য ও-ই দায়ী। ফ্রানসিসের জীবনের বিনিময়ে ও উৎসর্গ করেছে এমার জীবন। আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেÑ ফ্রানসিসের প্রতি ওর প্রেম-ভালবাসা উবে যায় সব। সেই অগাধ গভীর প্রেম, নিবেদনÑ যা ছিল আমাদের সকলের জন্য আদর্শ, হ্যাঁ, সত্যি বলছি, গায়েব হয়ে যায় রাতারাতি। ফ্রানসিসকে তীব্রভাবে অপছন্দ করতে থাকে টম। আমাকে একদিন বলে, ফ্রানসিসের প্রতি আর কোন আবেগ-অনুভূতি নেইÑ এমন নয় ব্যাপারটা, তাকে তীব্রভাবে অপছন্দই করে সে।

পেনেলোপি বলে, এরপর বেঁচে থাকার জন্য আর কিছু থাকে না টমের। ওভাবে, নিজের ও মেয়ের জীবন, ফ্রানসিসের প্রতি ভালবাসাÑ সবই ধ্বংস হয়েছে ওর কারণে। এক রাতে... ফ্রানসিস যখন ঘুমিয়ে, তখন তার চিকিৎসার জন্য কেনা কিন্তু অব্যবহৃত, এক বোতল তরল মরফিয়া খেয়ে ফেলে টম, আরও খায় ২০টি প্যারাসিটামল, কিছু ব্রান্ডি। মনে হয় বেশ তাড়াতাড়িই মারা গেছে ও।

কি কাণ্ড! কি দুঃখজনক ব্যাপার! এ সবের কিচ্ছুই মাথায় আসেনি আমার। আহা বেচারা ফ্রানসিস! তার কথা ভাবলে দুঃখ হয় আরও।

আমার দিকে তাকিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরায় পেনেলোপি। বলে, তার জন্য অত দুঃখ দেখাতে হবে না! সে এখন খুব ভাল আছে, নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছে শিগগিরই। যে ডাক্তার তার ক্যানসার নির্ণয় করে সে বউ হারিয়েছে ওই সময়টাতেই। সামনের মাসে বিয়ে হচ্ছে তার ও ফ্রানসিসের। তাই বলা যায়, সব ভাল যার শেষ ভাল।

পেনেলোপিকে বলি, অত ভাল কথা আসবে না আমার মুখে।

প্রকাশিত : ১৫ মে ২০১৫

১৫/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: