হালকা কুয়াশা, তাপমাত্রা ১৮.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘কালি-কলম’ বার করলাম

প্রকাশিত : ১৫ মে ২০১৫
  • শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়

(পূর্ব প্রকাশের পর)

-কি কথা?

-ওই যে আনন্দে থাকার কথা।

বললাম, ও কিছু না। এমনি।

বাসিনী বললে, বুঝেছি।

জিজ্ঞাসা করলাম, কি বুঝেছো? আমি খারাপ কিছু বলিনি।

এতক্ষণ পরে বাসিনী সোজা আমার মুখের দিকে তাকালে। বললে, ব্যাটাছেলের মেস্্...

বললাম, হ্যাঁ। এখানে মরতে কি জন্য এসেছ?

বাসিনী মুখ টিপে হাসলে। হেসে আবার আপনমনেই কাজ করতে লাগল। খানিক পরে কাজ করতে করতে বললে আপনি নতুন এসেছেন তাই জানেন না। বাসিনীকে সবাই চেনে।

বাসিনীর কাজ তখনও শেষ হয়নি। মোটা লাঠিটি হাতে নিয়ে দোরে এসে দাঁড়াল গোকুল।

জানি সে আসবে। কিন্তু এত সকাল-সকাল ঠিক এই সময়টিতে এসে হাজির হবে তা ভাবিনি।

গোকুল থাকে চিড়িয়াখানায়। চিড়িয়াখানার ভেতর চমৎকার বাংলো। জু-সুপারিনটেন্ডেন্ট গোকুলের মামা।

খাটের ওপর ভাল করে চেপে বসলো গোকুল। ঘরের এদিক-ওদিক ভাল করে একবার তাকিয়ে দেখলে। তারপর পকেট থেকে তার সিগারেট-কেস্টি বের করে একটি সিগারেট ধরিয়ে বললে, নাও, সিগ্রেট খাও, খেয়ে ওঠো। দুপুরে ঘুমুতে নেই।

বললাম, ঘুমোইনি।

Ñতা তো বুঝতেই পারছি। সাবিত্রী নাকি?

উঠে বসতে হলো। বললাম, না ভাই, সতীশের মতো ভাগ্য নিয়ে জন্মাইনি। তবে সাবিত্রী না হোক, সতী নিশ্চয়ই।

গোকুল বললে, অনেকগুলি শিব এখানে তপস্যা করছে। সতী বেচারা আগেই না দেহত্যাগ করে!

এমনি আরও কি যেন সব কথা হয়েছিল এখন আর মনে নেই।

বাসিনীর কথা এখানে অবান্তর মনে হতে পারে, কিন্তু অবান্তর সে নয়। বাসিনীর মতো মেয়ে জীবনে আমি খুব কমই দেখেছি। শাখারিপাড়ার মেসে আমি অনেকদিন ছিলাম। পরে তার কথা আবার বলবো।

ঘরে তালা বন্ধ করে গোকুলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। ঘরের চাবি থাকে বুড়ো নিবারণ চাকরের কাছে। পাশেই ধোবি মহল্লা টেনিয়া গোপানাব ঘরে দুপুরে কাপড় ইস্ত্রি করে নিবারণ। নিবারণকে ডেকে চাবিটা দিয়ে এলাম।

ভবানীপুর থেকে যাব পটুয়াটোলায়, অথচ প্রেমেন সঙ্গে থাকবে না, হতেই পারে না।

অচিন্ত্য না হয় কলেজ থেকে সোজা চলে যাবে কল্লোল-অফিসে, কিন্তু প্রেমেন আমাকে খুঁজতে এসে দেখা পাবে না; তার চেয়ে গোকুলকে বললাম, চল, প্রেমেনকে ডেকে নেয়া যাক।

গোকুল বললে, তাহলে এসো তোমরা নিউমার্কেটের ফুলের দোকানে। আমি সেইখানেই থাকবো।

নিউমার্কেটে গোকুলের মামার ফুলের স্টল। সেখানে তাকে রোজ একবার করে যেতে হয়। গোকুলকে ট্রামে চড়িয়ে দিয়ে আমি চললাম মিত্র ইনস্টিটিউশনের দিকে।

মুরলীদা (মুরলীধর বসু) তখন মিত্র ইনস্টিটিউশনের টিচার। মুরলীদাকে খবরটা দিয়ে আমি যাব হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রীটে। প্রেমেনের বাড়ি।

প্রেমেনকে প্রথম যেদিন খুঁজে বের করি, সেদিনও ঠিক এমনি করে এই পথ দিয়েই গিয়েছিলাম। তাও এক ভারি মজার ঘটনা।

মুরলীদার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়টাও ভারি মজার। আমি তখন বীরভূমের রূপসীপুর গ্রামে। মনের আনন্দে লিখবো বলে চলে গেছি বীরভূমের এই অখ্যাত গ্রামটিতে। বীরভূমের একেবারে পশ্চিম-প্রান্ত-সীমায়, সাঁওতাল পরগনার গাঁয়ে। ছোট্ট গ্রাম, উঁচু-নিচু ঢেউ খেলানো মাটি দক্ষিণে শাল তাল তমাল মহুয়া আর হরীতকীর জঙ্গল, দেখতেও ভাল, নামটিও ভাল। রূপসীপুর। কিন্তু রূপসীর দেখা কদাচিৎ মেলে।

সেখান থেকে গল্প পাঠাই, কলকাতার পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়, কেউ-বা কিঞ্চিৎ দক্ষিণা দেন, কেউ-বা দেন না। গ্রামে পোস্টাপিস নেই। জঙ্গল পার হয়ে ক্রোশ-দুই দূরে পোস্টাপিস। সেখান থেকে পিওন আসে সপ্তাহে দুদিন। কাজেই লেখা পাঠাবার জন্য মাঝে মাঝে নিজেকেই যেতে হয় পোস্টাপিস্ েনা গেলে মানিঅর্ডার পেতে পেতে দু’তিন হপ্তা দেরি হয়ে যায়। ভাল ভাল পত্রিকাগুলো তো পাওয়াই যায় না। আবার সেখানেও এক বিপদ। বুড়ো এক ভদ্রলোক তখন পোস্ট-মাস্টার। সব সময়েই দেরি দরজা বন্ধ। ঘরে খিল বন্ধ করে কাজ করেন। সরকারী কাজ। ভুল হবার জো নেই। জানালার পথে কিছু বললেই খেঁকিয়ে ওঠেন। বলেন, কাজের সময় বিরক্ত করো না। সড়াও।

আধঘণ্টার আগে কোনদিন তিনি দরজা খুলেছেন বলে তো মনে পড়ে না।

দুপুরে এই, বিকেলে আর এক ঝঞ্ঝাট! প্রায়ই দেখি দোরে তালা বন্ধ করে তিনি কোনদিন যান ছাগল খুঁজতে, আবার কোনদিন বা দেখি থানাব দারোগার সঙ্গে বসে বসে গল্প করছেন। দয়া করে একবার আসুন, বলবার উপায় নেই। তৎক্ষণাৎ জবাবে দেবেন- আমি কারও বাবার চাকর নই!

প্রায়ই যাই, মুখ চেনা হয়ে গেছে। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি দেখে আসেন শেষ পর্যন্ত। দোর খুলে দিয়ে বলেন, খাটের তলায় আছে, নিয়ে যা। দেখিস যেন আর কারও চিঠি মেরে দিস্্ না।

দেরি করবার উপায় নেই। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ। বাঘের ভয় না থাকলেও বুনো শুয়োরের ভয় আছে।

এই পোস্টাপিসের জ্বালায় গ্রাম ছেড়ে পালাই পালাই করছি। এমন দিনে অপরিচিত এক ভদ্রলোকের একখানি খামের চিঠি পেলাম- আমার লেখা সব গল্পই তিনি পড়েছেন। তাঁর খুব ভাল লাগছে। (চলবে)

প্রকাশিত : ১৫ মে ২০১৫

১৫/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: