কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সময়ের অগ্রগামী

প্রকাশিত : ১৫ মে ২০১৫
  • মোস্তাফা হাবিব আহসান

“ইসলাম যে একটি ধর্ম, জাতি নয় এ কথা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে বাঙালি মুসলিম তারা জাতিতে মুসলমান এ কথাটাই জোর গলায় প্রচার করেছেন। তারা ‘নেশন’ ও ‘রিলিজিয়ন’-এর একই অর্থ করে বসেছেন।”

আজ থেকে প্রায় ৮৫ বছর আগে ১৯২৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত মাসিক সাহিত্য পত্রিকা সওগাতে ‘বাঙালি’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখে বিদগ্ধ পাঠক সমাজে যিনি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি হচ্ছেন আমার পিতা মরহুম সা’দত আলি আখন্দ।

১৮৯৯ সালের ১ জুলাই বগুড়া শহরের প্রাচীন সংস্কৃতি কেন্দ্র মহাস্থানগড় লাগোয়া চিঙ্গাশপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে সা’দত আলি আখন্দের জন্ম। শিক্ষাজীবন শেষে ১৯২২ সালে তিনি পুলিশ বিভাগে যোগদান করেন। পুলিশ বিভাগে চাকরিকালীন কর্তব্যের খাতিরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অত্যন্ত ঘৃণাভরে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী পতাকাকে স্যালুট করতে হয়েছে। ব্রিটিশপরবর্তী পাকিস্তান আমলেও সরকারের পুলিশ বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করলেও তাঁর একান্ত ইচ্ছা ছিল বাঙালীদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, সেই রাষ্ট্রের গর্বিত পতাকাকে তিনি পরম শ্রদ্ধায় বুক উঁচু করে হাজারবার স্যালুট করবেন। তার স্বপ্ন ছিল অবহেলিত, নিগৃহীত বাঙালীর জন্য সুখী-সমৃদ্ধ ও স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র হবে, যেখানে থাকবে না কোন হিংসা-বিদ্বেষ, সকল বাঙালী ধর্ম বর্ণ, নির্বিশেষে সৌহার্দ্যপূর্ণ ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বসবাস করবে। তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনী দিয়ে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকে সভ্য ও জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাঁর। বাংলাদেশ হানাদার ও দখলদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত হওয়ার আগে ১৯৭১ সালের ১২ মে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ইন্তেকাল করেন। ব্রিটিশ আমলে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দৈনন্দিন কঠিন দায়িত্ব শেষে যে সময়টুকু তিনি পেতেন, সেই সময়টুকু সহকারীদের সঙ্গে আড্ডা না দিয়ে বাসায় ফিরে সাহিত্যসেবা, ছেলেমেয়ের লেখাপড়া এবং তাদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ব্যয় করতেন। সময়ের অভাবে প্রতিদিন রাত সাড়ে তিনটায় ঘুম থেকে উঠে সংগ্রহ করে আনা বই পড়তেন ও লেখালেখি করতেন। সমাজ সচেতনতামূলক প্রবন্ধ ও গ্রন্থ লিখে তৎকালীন পাঠকসমাজে তিনি লেখক ও সাহিত্যিক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে ব্রিটিশ সরকার সমগ্র ভারতের পুলিশ বাহিনীর জন্য ইংরেজী ভাষায় একটি রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। সেই প্রতিযোগিতায় আব্বা অংশগ্রহণ করেছিলেন। আম্মার মুখে শুনেছি আব্বা অফিস থেকে ছুটি নিয়ে প্রায় ৫-৬ দিন দরজা বন্ধ করে প্রচুর মেধা খাটিয়ে ও পরিশ্রম করে লেখাটি সম্পন্ন করে দিল্লীতে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়েছিলেন। এই প্রতিযোগিতায় প্রায় দু’হাজার পুলিশ কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রতিযোগিতার ফল প্রকাশের পর দেখা গেল আব্বা প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে ‘ব্রিটিশ গোল্ড মেডেল’ ও রানী এলিজাবেথের প্রশংসাপত্র লাভ করেছেন।

সত্যিকারার্থেই আব্বার পরিশ্রম, ধৈর্য ও ত্যাগ বৃথা যায়নি। তার বড় ও সেজো ছেলে যথাক্রমে জাতীয় অধ্যাপক ড. মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম ও প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলামিস্ট, সাহিত্যিক, ও চরমপত্রখ্যাত এম আর আখতার মুকুল তাদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে ও দেশের জন্য বিশেষ অবদান রাখায় সরকার সর্বোচ্চ সম্মানীয় পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’-এ ভূষিত করেছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে আজ পর্যন্ত কোন দেশে একই পরিবারে দুই সহোদর ভাইকে সরকার দেশের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেনি।

বাংলা সাহিত্যে বিশেষ অবদান রাখার জন্য বাংলা একাডেমি আব্বার প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত গ্রন্থ, প্রবন্ধ, গল্প, কবিতাসমূহ সংগ্রহ করে ‘সা’দত আলি আখ- রচনাবলী’ নামে এক বিশাল গ্রন্থ ২০০৯ সালে প্রকাশ করে। এছাড়া বাংলা একাডেমি প্রতি বছর ১২ মে আব্বার মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলাদেশের একজন সৃজনশীল সাহিত্যিককে সা’দত আলি আখন্দ পদক, ক্রেস্ট ও প্রশংসাপত্র দিয়ে ভূষিত করে আসছে। ১২ মে ছিল সা’দত আলি আখন্দের ৪৩তম মৃত্যুবার্ষিকী তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি।

প্রকাশিত : ১৫ মে ২০১৫

১৫/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: