কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৫ ডিসেম্বর ২০১৬, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বিনা খরচে অভাবী মানুষের মামলা নিষ্পত্তির সুযোগ

প্রকাশিত : ১৫ মে ২০১৫
  • আইনগত সহায়তা কেন্দ্র
  • গত ছয় বছরে এক লাখের বেশি মানুষ সরকারী এ সেবা পেয়েছেন
  • নিষ্পত্তি হয়েছে ২৩ হাজার ৮৯৫ মামলা

আরাফাত মুন্না ॥ সুশীল চন্দ্র সেন। নীলফামারীর খোকসাবাড়ীতে তার বসবাস। তার বৈষয়িক সম্পত্তি বেদখল হয়ে গেছে। সহায়সম্বলহীন মানুষটির পক্ষে নিজের খাবারটুকু সংগ্রহ করা এখন অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল অর্থের অভাবে তিনি মামলা করে অধিকার আদায় করতে পারছিলেন না। আইনজীবীদের কাছে এসেছিলেন তাঁর প্রাপ্য হিস্যা আদায়ে পরামর্শের জন্য, কিন্তু টাকা-পয়সা না হলে কি আর মামলা হয়? অবশেষে তিনি বাংলাদেশ সরকারের আইনগত সহায়তা কেন্দ্রে যান আইনী পরামর্শের জন্য। পরে তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আইনগত সহায়তা কেন্দ্র থেকে মামলাটি চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

শুধু সুশীল নয়, তার মতো অনেকেই এখন সরকারী আইনী সহায়তা সেবা নিচ্ছেন কোন টাকা পয়সা ছাড়াই। সরকারী আইনী সহায়তা সেবা গ্রহীতার সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর্থিকভাবে সচ্ছল নয় এমন ব্যক্তিরা দেওয়ানী ও ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তির পাশাপাশি শ্রমিকরাও ক্ষতিপূরণ আদায়, চাকরিতে পুনর্বহাল, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও সাময়িক বরখাস্তের আদেশ বাতিলসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইনী সেবা নিচ্ছেন। জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থার তথ্য মতে, গত ছয় বছরে ১ লাখেরও বেশি মানুষ সরকারী এ সেবা গ্রহণ করেছেন। এর মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে ২৩ হাজার ৮৯৫টি মামলা। যার মধ্যে ১৫ হাজার ৭৩৬টি ফৌজদারি ও ৮ হাজার ১৫৯টি দেওয়ানী মামলা রয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলায় গঠিত লিগ্যাল এইড কমিটির দেয়া আইনী সহায়তায় এই মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে।

সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়-সম্বলহীন এবং নানাবিধ আর্থ-সামাজিক কারণে বিচার প্রাপ্তিতে অসমর্থ বিচারপ্রার্থী জনগণকে আইনী সহায়তা দিতে এ সংক্রান্ত আইন করে সরকার। ২০০০ সালে প্রণীত এই আইনের মাধ্যমে গঠিত হয় জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা। এই সংস্থা দেশের ৬৪টি জেলায় লিগ্যাল এইড কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির মাধ্যমে গত ৬ বছরে মামলা নিষ্পত্তিতে আইনী সহায়তা পেয়েছেন ৯৩ হাজার ২২০ জন ব্যক্তি। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৯,১৬০ জন, ২০১০ সালে ১১,২৬৬ জন, ২০১১ সালে ১২,৫৬৮ জন, ২০১২ সালে ১৫,৪৫০ জন, ২০১৩ সালে ১৯,৪৯৩ জন ও ২০১৪ সালে ২৫,২৮৩ জন। আইনী সহায়তা গ্রহণকারীদের মধ্যে ৪৭ হাজার ৬৩৩ জন নারী, ৪৫ হাজার ২৯৩ জন পুরুষ ও ২৯৪ জন শিশু। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে জেল আপীল নিষ্পত্তি হয়েছে ১২১৮টি।

আইনী সহায়তা ছাড়াও আইনগত পরামর্শ দেয়া হয়েছে এই সংস্থা থেকে। লিগ্যাল এইড অফিসারদের মাধ্যমে গত এক বছরে ১৮টি জেলার ১০ হাজার ৭০১ জন ব্যক্তি আইনগত পরামর্শ নিয়েছেন। এর মধ্যে ৬,২৪৯ জন নারী ও ৪,৪৫২ জন পুরুষ। মোহরানা-খোরপোষ, নাবালকের অভিভাবকত্ব, বিবাহ-বিচ্ছেদ, পারিবারিক কলহ, নারী ও শিশু নির্যাতন, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, অপহরণ, ধর্ষণ, ভূমি বিরোধ, দলিল জালিয়াতি, ভুল রেকর্ড সংশোধন বিষয়ে এই পরামর্শ নেয়া হয়েছে।

এছাড়া লিগ্যাল এইড হটলাইনের মাধ্যমে গত তিন বছরে আইনগত তথ্য সেবা গ্রহণ করেছেন ১০ হাজার ৬২৫ জন। এর মধ্যে নারী ৫,৮৫৪ ও পুরুষ ৪,৭৭১ জন। এছাড়া গত দুই বছরে ২১৯৪ জন শ্রমিক আইনী সহায়তা গ্রহণ করেছেন। চাকরি ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলার ক্ষেত্রে এই সহায়তা দিয়েছে এই জাতীয় সংস্থাটি।

এ বিষয়ে সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক ও আইন বিশেষজ্ঞ শ ম রেজাউল কমির জনকণ্ঠকে বলেন, সরকারী খরচে আইনী সহায়তার ব্যবস্থা করা নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তবে এই সেবা সম্পর্কে জনগণকে আরও সচেতন করা দরকার। কারণ অনেক অসচ্ছল ও সহায় সম্বলহীন ব্যক্তি এই সেবা সম্পর্কে জানেন না। তিনি বলেন, এজন্য সরকারকে আরও বেশি করে প্রচারণামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার। এছাড়া মামালাজট কমাতে সরকারের এই কর্মসূচী সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।

আইনগত সহায়তা প্রদানের যাত্রা ॥ অসহায় ও দরিদ্র মানুষকে সরকারী খরচে আইনী সহায়তা দিতে ২০০০ সালে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০’ নামে একটি আইন পাস করে। ২০০০ সালে এ আইনটি পাস হওয়ার পরে ২০০১ সাল থেকে তা কার্যকর হয়। এ আইনের মাধ্যমে অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের সরকারী খরচে আইনী সহায়তা দিতে সংস্থার অধীনে ৬৪ জেলায় ‘জেলা আইনগত সহায়তা কমিটি’ করা হয়। এ কমিটি সরকারী খরচে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের মামলা পরিচালনা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কোন ব্যক্তির মামলা করার প্রয়োজন হলে সরকারী খরচে মামলা দায়েরের ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। এ ছাড়া দেওয়ানি, ফৌজদারি, পারিবারিকসহ প্রায় সব ধরনের মামলায় আইনগত সহায়তা দেয় এই কমিটি। নারী, পুরুষ ও শিশু কেউ যদি টাকার অভাবে মামলা না করতে পারে অথবা বিনা বিচারে কারাগারে আটক থাকে, তাহলে সরকারী খরচে আইনগত সহায়তা দেয়া হয় তাদের।

২০০১ সাল আইনটি কার্যকরের পর পরবর্তীতে সরকারের পরিবর্তন আসায় কার্যক্রম গতি না পাওয়া, বরাদ্দকৃত অর্থ অব্যয়িত থাকা, পৃথক অফিস না করাসহ অন্যান্য উদ্যোগ কম থাকায় ২০০৮ সাল পর্যন্ত এর তেমন প্রচার ছিল না। ২০০৯ সাল থেকে আবার শুরু হয় আইনী সহায়তা দেয়ার কার্যক্রম। ১ ডিসেম্বর, ২০১১ তারিখে আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) আইন, ২০১১ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এ পরিবর্তন এসেছে, যাতে জাতীয় পরিচালনা বোর্ড গঠনে সদস্যদের মধ্যে পরিবর্তন আনা হয়েছে।

সরকারী খরচে আইনী সহায়তা কারা পাচ্ছে ॥ দরিদ্র, অসহায় এবং যারা মামলা পরিচালনা করতে অক্ষম, এসব ব্যক্তির মধ্যে কর্মক্ষম নন, আংশিক কর্মক্ষম, কর্মহীন বা বার্ষিক ৭৫ হাজার টাকার উর্ধে আয় করতে অক্ষম এমন মুক্তিযোদ্ধা, বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন এমন কোন ব্যক্তি, ভিজিডি কার্ডধারী দুস্থ মাতা, পাচারের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত নারী বা শিশু, দুর্বৃত্ত দ্বারা এ্যাসিডদগ্ধ নারী বা শিশু, আদর্শগ্রামে গৃহ বা ভূমি বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি, অসচ্ছল বিধবা, স্বামীপরিত্যক্ত ও দুস্থ মহিলা, উপার্জনে অক্ষম এবং সহায়সম্বলহীন প্রতিবন্ধী, আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আদালতে অধিকার প্রতিষ্ঠা বা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে অসমর্থ ব্যক্তি, বিনা বিচারে আটক এমন ব্যক্তি, যিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে আর্থিকভাবে অসচ্ছল, আদালত কর্তৃক আর্থিকভাবে অসহায় বা অসচ্ছল বলে বিবেচিত ব্যক্তি, জেল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আর্থিকভাবে অসহায় বা অসচ্ছল বলে সুপারিশকৃত বা বিবেচিত ব্যক্তি, আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এর উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সংস্থা কর্তৃক সময় সময় চিহ্নিত আর্থিকভাবে অসচ্ছল, সহায়সম্বলহীন, নানাবিধ আর্থ-সামাজিক এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি, যিনি আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠার মামলা পরিচালনায় অসমর্থ তারাই আইনগত সহায়তা পাওয়ার উপযোগী। অসচ্ছল বা আর্থিকভাবে অসচ্ছল ব্যক্তি বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝাবে, যাদের বার্ষিক গড় আয় ৫০ হাজার টাকার বেশি নয়।

আইনগত সহায়তার জন্য আবেদন কোথায় ॥ প্রতিটি জেলা জজকোর্টে অবস্থিত ‘লিগ্যাল এইড অফিস’ (আইনগত সহায়তা অফিস), জেলখানা বা কারাগারের কর্মকর্তাদের কাছে, জেলা বা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদকের কার্যালয়, জেলা কমিটির সহায়ক কর্মকর্তা এবং অফিস সহকারীর কাছে; জেলা আদালতগুলোর বেঞ্চ সহকারীর কাছে; জাতীয় মহিলা সংস্থার জেলা ও উপজেলা কার্যালয়ে এই সেবা পাওয়া যাবে। যিনি দরখাস্তকারী তিনি নিজে বা তার মামলা তদারককারী বা তদবিরকারী লিগ্যাল এইড অফিসে সরাসরি আবেদন জমা দিতে বা দাখিল করতে পারেন। তা ছাড়া কারাগার কর্তৃপক্ষ, ইউনিয়ন/ পৌরসভার চেয়ারম্যান বা মেয়র, কমিশনার, সমাজসেবা কর্মকর্তা বা বিভিন্ন এনজিওর কর্মকর্তার মাধ্যমেও আইনগত সহায়তার আবেদনপত্র লিগ্যাল এইড অফিসে পাঠানো যায়।

প্রকাশিত : ১৫ মে ২০১৫

১৫/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



ব্রেকিং নিউজ: