আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সাগরে ভাসছে হাজার হাজার অভিবাসী

প্রকাশিত : ১৪ মে ২০১৫
সাগরে ভাসছে হাজার হাজার অভিবাসী
  • চার দেশের জলসীমায় টহল জোরদার
  • অনাহার-অর্ধাহারে এরা বস্তুত মৃত্যুমুখী
  • এ বছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ উপকূল থেকে পাচার হয়েছে ২৫ হাজার লোক

মোয়াজ্জেমুল হক/এইচএম এরশাদ ॥ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে মানবপাচারের রাহুগ্রাস জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ে কর্মরত সংশ্লিষ্ট সংস্থাসমূহের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়তি আয়ের স্বপ্নে চাকরির সন্ধানে শুধু নয়, ধর্মীয় উন্মাদনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জঙ্গীপনায় যোগ দিতেও এক দেশ থেকে অন্য দেশে অবিরাম ঝুঁকিপূর্ণ পথে পাড়ি দেয়ার ঘটনা ঘটছে। পাড়ি দেয়ার এ সব রুট এতই দুর্গম যে, দুর্যোগ দুর্বিপাকে পড়ে এবং পাচারকারীদের পূর্বপরিকল্পিত নীলনক্সার শিকার হয়ে অনেকের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সমুদ্র পথে জীবনকে হাতে নিয়ে স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়া যাওয়ার যে ভয়াবহ ঘটনা আবিষ্কার হয়েছে তা বিশ্বজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। কখনও সামান্য অর্থের বিনিময়ে, কখনও বিনা অর্থে এদেরকে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বন্দী বা দাস শিবিরে আটকে রাখা হচ্ছে। মুক্তিপণের বিনিময়ে অজানা গন্তব্যে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। আবার অনেকে মুক্তিপণ দিতে ব্যর্থ হওয়ার জের হিসেবে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এদের শেষ ঠিকানা হচ্ছে গণকবরে।

ভূমধ্যাসাগর, আরব সাগর, লোহিত সাগর, ভারত মহাসাগর, বঙ্গোপসাগরসহ সমুদ্রপথে মানবপাচারের ভয়াল প্রতিযোগিতা ঘটেই চলেছে। সাগরপাড়ি দিয়ে ভয়ানক ঝুঁকিতে গত এপ্রিল মাসে আফ্রিকা থেকে ইউরোপে ইঞ্জিন নৌকাযোগে যাওয়ার পথে ডুবে গিয়ে বহু লোকের সলিল সমাধি ঘটেছে। ভূমধ্যাসাগরে অভিবাসীসহ নৌকাডুবির এ ঘটনাটি ঘটেছে গত ১৯ এপ্রিল লিবিয়ার সমুদ্র উপকূল থেকে সতের মাইল দূরে। এ ঘটনায় ওই নৌকার ক্যাপ্টেন ও ক্রুদের গ্রেফতার করা হয়। ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী গেল বছর উত্তর আফ্রিকা থেকে ইতালিতে প্রায় অর্ধলক্ষ অবৈধ অভিবাসী ঢুকেছে। ভূমধ্যাসাগরে এপ্রিল পর্যন্ত দেড় সহস্রাধিক অবৈধ অভিবাসীর মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করেছে জাতিসংঘ। আর গত এপ্রিল মাসে মাত্র এক সপ্তাহ সময়ে ওই সাগরে ১৩ হাজারেরও বেশি অবৈধ অভিবাসীকে ইঞ্জিনচালিত বোট থেকে উদ্ধার করেছে সে দেশের কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী।

এ সব ঘটনা শুধু ইউরোপ আফ্রিকায় নয়, চীন, জাপান, কোরিয়া, ফিলিপাইন, ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অহরহ ঘটে চলেছে। দুর্ঘটনা ঘটলে সর্বত্র হৈ চৈ পড়ে যায়।

জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআর-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়Ñ ২০১৩ সালের জুন থেকে ’১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত বঙ্গোসাগর দিয়ে অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় ৮৭ হাজার মানুষের পাচার হওয়ার তথ্য দেয়া হয়েছে। যা এর আগের বছর ছিল ৫৩ হাজার। অভিবাসন ও মানবপাচার বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি এ্যান্ড মাইগ্রেটিং মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট বা বামরুর মতে, মানবপাচারের বর্তমান ঘটনা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বামরুর বক্তব্য অনুযায়ী, মানবপাচারের কাজে ইউরোপ, আফ্রিকা, চীন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্যের মতো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় দালাল চক্র নিয়ে গড়ে উঠেছে একাধিক সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের লোলুপ দৃষ্টি পড়েছে এখন বাংলাদেশের হতদরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং মিয়ানমারের নিপীড়ন নির্যাতনে নিষ্পেষিত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজন। এ চার দেশের মধ্যে মালয়েশিয়ায় আর্থিকভাবে বাড়তি রোজগারের সুযোগ-সুবিধা দেখিয়ে নানা প্রলোভনে ফেলে এ সব হতভাগ্য নরনারীদের জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনছে।

এদিকে, কক্সবাজারের বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের মানবপাচারকারী চক্র দীর্ঘ প্রায় ৭ বছর ধরে বাংলাদেশে উপকূল ব্যবহার করে অন্তত ৩ লক্ষাধিক বাংলাদেশী ও মিয়ানমার নাগরিককে পাচার করেছে মালয়েশিয়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে লাগাতার অবরোধ ও হরতালের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নজরদারিকে ফাঁকি দিয়ে মানবপাচারকারী চক্র ঢালাওভাবে কক্সবাজার সমুদ্রপথে মানবপাচার কাজ চালিয়ে গেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের একটি রিপোর্টেও উঠে এসেছে। ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ৩ মাসে সমুদ্রপথে মানবপাচার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়। ওই সময়ে বাংলাদেশ উপকূল থেকে ২৫ হাজারের মতো অভিবাসী পাচার হয়ে গেছে। তন্মধ্যে অন্তত ৩ শতাধিক অভিবাসী সাগরে সলিল সমাধি ঘটেছে। বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় ইউএনএইচসি-আরের প্রতিনিধিরা মিয়ানমার বাসিন্দাদের মালয়েশিয়ায় কার্ড বিতরণ করছে। ওই কার্ড দেখলে সে দেশের প্রশাসন তাদের গ্রেফতার করে না। এ সুযোগে মিয়ানমার থেকে অহরহ রোহিঙ্গা মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে। এদেশের দালাল চক্র বাংলাদেশ থেকেও হাজার হাজার মানুষকে মালয়েশিয়ায় ইউএনইচসিআরের কার্ড পাইয়ে দেয়ার এবং ভাল চাকরির প্রলোভনে ফেলে মৃত্যু ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথে ইঞ্জিন বোট ও ট্রলারে করে পাচার অব্যাহত রাখে।

উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী শিবির এলাকার বাসিন্দা আওয়ামী লীগ নেতা মৌলভী বক্তেয়ার আহমদ জনকণ্ঠকে বুধবার জানিয়েছেন, কুতুপালং ক্যাম্পের মানবপাচারকারী জহির আহমদ, খায়রুল আমিন, নুর মোহাম্মদ, আরেফা বেগম (কারাগারে), নুর বেগম প্রকাশ খুইল্যা বুবু, ছৈয়দুল হক ও আয়ুব মাঝি রোহিঙ্গা ছাড়াও বিভিন্ন প্রলোভনে ফেলে স্থানীয় বেকার যুবকদের মালয়েশিয়ায় পাচার করে চলছে দীর্ঘদিন ধরে। কুতুপালং এলাকার জালাল আহমদ ড্রাইভারের পুত্র জিয়া উদ্দিনকে মুক্তিপণ দিতে বিলম্ব হওয়ায় থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গুলি করে খুন করেছে দালাল চক্র। তিনি আরও জানান, মালয়েশিয়ায় অফিস খুলে ইউএনএইচসিআরের পক্ষে কুয়ালালামপুরে অবস্থানরত বর্মী দালাল হাসিম উল্লাহর নেতৃত্বে রোহিঙ্গা মাস্টার সাদেক, হাশেম ও কবির কার্ড বিলি করার খবর বাংলাদেশে ছড়ানো হলে স্থানীয়রা মালয়েশিয়া যেতে মরিয়া হয়ে উঠে। সেখানে অবস্থানরত বৈধ-অবৈধ শরণার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির খবরে এবং আইওএম এর এক শ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়ে মালয়েশিয়ায় আদম পাচার বৃদ্ধি পেয়েছে বলে কক্সবাজারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে।

হেল্প কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক আবুল কাশেম বুধবার জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে গিয়ে নিখোঁজ যুবক-কিশোরদের তালিকা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানবপাচার রোধে এবং মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসা অসহায় ব্যক্তিদের নিয়ে গত এক বছর ধরে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় আমেরিকাভিত্তিক এনজিও রিলিফ ইন্টারন্যাশনালের সহযোগিতায় কক্সবাজারে হেল্প এনজিওর প্রতিনিধিরা ব্যাপক জরিপ চালিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে মালয়েশিয়া থেকে ফিরে আসা ৭০জনকে স্বাবলম্বী করে তোলার পাশাপাশি আরও ৫ উপজাতিসহ ১৮জন নিখোঁজ থাকার তথ্য তাদের হাতে রয়েছে। তারা হচ্ছেন Ñউখিয়ার পাইন্যাসিয়া গ্রামের কিশোর আবুল হোসেন, আলা উদ্দিন, কফিল উদ্দিন, জালাল উদ্দিন, মামুন, কুলালপাড়ার এনামুল হক, দক্ষিণ নিদানিয়ার মোঃ এমরান, উত্তর সোনাইছড়ির এনামুল হক, মধ্যম হলদিয়ার হামিদুল হক, খোরশেদ আলম, মোজাম্মেল হক, পিঞ্জিরকুলের ফজল আহমদ, রাজাপালংয়ের ফরিদ আলম, তেলখোলার চেট্টো চাকমা, বাঙ্কমং, তোয়াচাং, কেউলাচিং ও লেটং চাকমা। সোনারপাড়ার মানব পাচারের গডফাদার জামিনে মুক্ত নুরুল কবির, শীর্ষ মহিলা দালাল রেজিয়া আক্তার রেবি, শামসুল আালম, ফয়েজ সিকদার, জাফর মাঝি (বন্দুকযুদ্ধে নিহত), উত্তর সোনাইছড়ির শাহজাহান, সোনারপাড়ার আলা উদ্দিন, সালাহ উদ্দিন ও জালাল প্রকাশ শাহজালালের হাত ধরে ওইসব যুবক-কিশোর মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমালেও এখন পর্যন্ত তাদের কোন সন্ধান মেলেনি বলে নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনরা জানিয়েছেন। অথচ নিখোঁজ ব্যক্তির অভিভাবকদের কাছ থেকে ওইসব দালাল মাথাপিছু দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা হারে হাতিয়ে নিয়েছে। সূত্র আরও জানিয়েছে, মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী উখিয়ার সোনারপাড়ার কানপুইজ্যার পুত্র বাপ্পু দালাল ও হাসিম উল্লাহর কাছে গত এক বছরে অন্তত অর্ধ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী লোক পাঠিয়েছে উল্লেখিত মানব পাচারকারী চক্র।

সমুদ্রের দুর্গম পথের এ অভিযাত্রায় এবং থাইল্যান্ডের গণকবরে কত পরিমাণ লাশ উদ্ধার হয়েছে তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান এখনও সঠিকভাবে নির্ণয় না হলেও তা হাজারের কাছাকাছি পৌঁছবে বলে বেসরকারী বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে। এছাড়া থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকার জঙ্গলগুলোতে বন্দীশিবিরে আটকে আছে হাজার হাজার অবৈধ অভিবাসী। থাইল্যান্ড সরকার গত ১ মে থেকে যে জোরালো অভিযান শুরু করেছে তাতে গণকবর ও বন্দীশিবিরের আবিষ্কারের ঘটনা বিশ্ব বিবেককে কাঁপিয়েছে। যে কারণে এ দুই দেশের সমুদ্র এলাকায় কঠোর নজরদারি বলবৎ করায় এখন ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে ধরা পড়ছে অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে বিভিন্ন জাতের ইঞ্জিন নৌকা ও ট্রলার। ইন্দোনেশিয়ায় ইতোমধ্যে অসংখ্য অভিবাসী উদ্ধার হয়েছে, যাদের মধ্যে অসংখ্য বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক। এদের মানবিক কারণে খাদ্য ও চিকিৎসা সুবিধা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু ইতোমধ্যে এ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যারা মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড পৌঁছতে পারেনি তারা ইন্দোনেশিয়ার মালাক্কা প্রণালী থেকে ফিরে আসার পথে বাংলাদেশের জলসীমা অতিক্রমে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এদেশের কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী। এরইমধ্যে গত মঙ্গল ও বুধবার দুই ইঞ্জিনচালিত নৌকা বোঝাই পাচারকৃত ৭ শতাধিক অভিবাসীর মধ্যে ১১৬ জন সেন্টমার্টিন থেকে উদ্ধার হয়ে টেকনাফ থানায় হস্তান্তর হয়েছে। বুধবার ভোরে ঐ ১১৬ জনকে দুটি ইঞ্জিন বোটযোগে কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশন জেটিতে নিয়ে আসে; যারা বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের নাগরিক বলে কোস্টগার্ড সূত্রে জানানো হয়েছে।

বুধবার উদ্ধার হওয়া মালয়েশিয়াগামী উখিয়া মরিচ্যা এলাকার নুরুল হাকিম জানান, ২০ দিন আগে সাবরাং নোয়াপড়ার খতিজা বেগম ও নাইট্যংপাড়ার হাসিনা বেগম তাকে ফাঁদে ফেলে নৌকায় তুলে দেয়। ঈদগাও এলাকার সাদ্দাম হোসেন বলেন, টেকনাফ বেড়াতে আসার পর তাকে সাবরাং নোয়াপাড়ার ১ দালালকে বিক্রি করে দেয় তার এক আত্মীয়। সে দালাল তাকে নৌকায় সাগরে নিয়ে যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জীবন নামের উদ্ধার পাওয়া মোল্লা জানান, দু’মাস পূর্বে ইনানীর নুরুল কবির ও তার স্ত্রী রেবি দালালের মাধ্যমে নৌকায় তাকে তুলে দেয়া হয়। তাদের বোটে ৩ মাস আগে উঠেছে এরকমের বহু লোকও ছিল। ওই ইঞ্জিনবোট থেকে অসুস্থ হওয়ায় তার চোখের সামনে দালালচক্র সাগরে ফেলে দেয় ৫ জনকে। সাগরে ভাসমান অবস্থায় একাধিক ট্রলারে আরও ৬ থেকে ৮ হাজার লোক রয়েছে বলে উদ্ধারপ্রাপ্তদের অনেকে বুধবার টেকনাফে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তারা জানায়, উদ্ধারের ব্যবস্থা না হলে ওদের সকলের সাগরেই মৃত্যু হবে। উদ্ধার হওয়া হামিদুল জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ায় কুয়ালালামপুরে অবস্থানরত মিয়ানমার বড় দালাল হাসিম উল্লাহ সেখানে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়াভিত্তিক মানবপাচার কার্যক্রম। তিনি আরও জানান, টেকনাফের মিস্ত্রিপাড়ার মৌলভী কলিম উল্লাহ, রশিদ আহমদ, শরিফ হোছন প্রকাশ সরহোছন, ডাঙ্গাপাড়ার দেলোয়ার হোসেন ও হাবিরছড়ার মোঃ হোছাইনসহ অনেক দালাল ওই বর্মী হাসিম উল্লাহর কাছে লোকজন পাঠিয়ে থাকে হরহামেশা।

কোস্টগার্ড টেকনাফ স্টেশনের কমান্ডার হাজি ফরিদুজ্জামান জানান, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের টেকনাফ থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। সেন্টমার্টিন স্টেশনের কমান্ডার ডিকসন চৌধুরী জানান, উদ্ধার হওয়া যাত্রীরা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

মালয়েশিয়াগামী আরও ১১ উদ্ধার ॥ টেকনাফ ৪২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের শাহ পরীরদ্বীপ বিওপির বিজিবি সদস্যরা গোলাপাড়া চর এলাকায় অভিযান চালিয়ে বুধবার ভোরে মালয়েশিয়াগামী আরও ১১ জনকে আটক করেছে। এদের মধ্যে রয়েছেÑমহেশখালি ইউনুসখালির মোঃ মামুন মিয়া, মোঃ হেলাল মিয়া, চকরিয়ার ঈদবুনিঘোনার মোঃ নুরুল আলম, বাঁশকালির জলদীর মোঃ আমিনুর রহমান, মোঃ হায়দার আলী, মোঃ মহিন উদ্দিন, আশকারিয়াপাড়ার মোঃ জসিম উদ্দিন, মাদারীপুর এলাকার মোঃ মামুন, বাবুল মোল্লা, মোঃ রেজাউল ও সুনামগঞ্জের মোঃ শামীম আহমদ।

ইন্দোনেশিয়ায় দুই বোট বোঝাই ৬শ’ বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা উদ্ধার ॥ এদিকে, ইন্দোনেশিয়ার উত্তর উপকূলে আচেহ প্রদেশে ভাসমান দুই কাঠের বোট বোঝাই নৌকা থেকে যে ৬শ’ অবৈধ অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে এরা সকলেই বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক। গত রবিবার বোট দুটিতে তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় তারা অকূল সাগরে ভাসছিল। এদের মধ্যে শতাধিক নারী ও শিশু রয়েছে। উদ্ধারকৃত সকলেই মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টায় ছিল বলে জানানো হয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার পক্ষ থেকে।

বাংলাদেশী-রোহিঙ্গা বোঝাই বোট ফিরিয়ে দিয়েছে ইন্দোনেশিয়া ॥ ইন্দোনেশিয়ার জলসীমা থেকে অবৈধ অভিবাসী বোঝাই একটি নৌকা ফেরত পাঠিয়েছে সে দেশের নৌবাহিনী। নৌকাটিতে কয়েক শ’ বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা নাগরিক রয়েছে। তবে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী নৌকাটিকে ফেরত পাঠানোর আগে তাদের সামান্য খাবার ও পানি সরবরাহ করেছে। আইএমও’র খবর অনুযায়ী গত মার্চ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ছোট ছোট ইঞ্জিনবোট ও বড় ট্রলারে অগণন মালয়েশিয়াগামী ভাসছে। এদের অধিকাংশ বাংলাদেশ ও মিয়ানামরের রোহিঙ্গা নাগরিক। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকারের কাছে এসব অভিবাসীকে পুনঃফেরত না পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। থাইল্যান্ডের জলসীমায় আরও প্রায় ৮ হাজার অবৈধ অভিবাসী ইঞ্জিনবোট বা ট্রলারে ভাসছে। তারা না যেতে পারছে থাইল্যান্ডে, মালয়েশিয়ায়, ইন্দোনেশিয়ায়, না পারছে ফিরে আসতে। অনাহার-অর্ধাহারে এরা অনেকটা মৃত্যুমুখী বলে আইএমও’র বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম সূত্রে বলা হচ্ছে।

অপরদিকে, মালয়েশিয়া সরকারী সূত্রে বলা হয়েছে, ১০১৮ বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক সে দেশের লাংঙ্কাউই দ্বীপে প্রবেশ করেছে। লাংঙ্কাউই পুলিশ জানিয়েছে, গত সোমবার ভোর রাতে দ্বীপের অগভীর পানিতে তিনটি ইঞ্জিন নৌকাযোগে এসব অবৈধ অভিবাসী পৌঁছেছে। এদের মধ্যে ৫৫৫ বাংলাদেশী এবং ৪৬৩ রোহিঙ্গা ছাড়াও ৯৯ নারী ও ৫৪ শিশু রয়েছে। ঐ এলাকা দিয়ে আরও অবৈধ অভিবাসী আসার আশঙ্কায় মালয়েশিয়া সরকার সে অঞ্চলে নজরদারি জোরদার করেছে। এ অবস্থায় মালয়েশিয়াগামী বিভিন্ন ছোট-বড় ইঞ্জিন নৌকা ও ট্রলার এখন বঙ্গোপসাগর, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সাগরে ভাসছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদের সংখ্যা ৮ হাজারেরও বেশি বলে বিভিন্ন সূত্রে জানানো হয়েছে।

উদ্ধারকৃত বাংলাদেশীদের ফিরিয়ে আনা হবে ॥ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বুধবার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে বাংলাদেশী হিসেবে শনাক্ত যারা হচ্ছে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে সে সব দেশের সঙ্গে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছে। মানব পাচার বন্ধে তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশী জলসীমায় নিরাপত্তা ইতোমধ্যে জোরদার করা হয়েছে এবং তা আরও বাড়ানো হবে। এছাড়া গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে। মন্ত্রী রোহিঙ্গা ইস্যুতে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানিয়েছেন। এছাড়া কক্সবাজারের টেকনাফ, মহেশখালি, চট্টগ্রামসহ সমুদ্রপথে এবং সীমান্ত এলাকাসমূহে ঝুঁকিপূর্ণ মানব পাচার ঠেকাতে বিজিবির টহল জোরদার করা হয়েছে।

প্রকাশিত : ১৪ মে ২০১৫

১৪/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: