মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

সৌম্য-ব্যাটিং বিনোদন

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৫
সৌম্য-ব্যাটিং বিনোদন
  • জাহিদ রহমান

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন সব প্রতিভার আগমন ঘটছে। সিনিয়রদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নবাগতরা। ব্যাট-বলের যুদ্ধে তারাও উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলছে, দেখে যাও বিশ্ববাসী বাংলাদেশ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে। সেই মিছিলে সম্প্রতি যোগ হয়েছে এই সময়ের মন জয় করা তরুণ সৌম্য শান্ত সরকারের নাম। ক্রিকেটের নতুন সৌন্দর্য। নতুন সৌরভের এক ফুলবাগান। সাকিব, তামিম, মুশফিকের নামের পাশে সৌম্য নামটাও এখন উজ্জ্বল। ক্যারিয়ারের বিচারে সাকিব, তামিম, মুশফিকদের তুলনায় তাঁর খেলা ম্যাচের সংখ্যা মোটেও উল্লেখযোগ্য নয়। কিন্তু নৈপুণ্যে সৌম্য সবার মন জয় করে নিয়েছেন। ক্রীড়ামোদীদের আলোচনায় তিনি এখন অন্যতম একজন। তাঁর পারফর্মেন্স এতটাই মুগ্ধ করেছে যেন এমন এক তরুণের অপেক্ষাতেই ছিলেন সবাই।

মূলত এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সময় সৌম্য নামটা আলোচনায় উঠে আসে। সে সময়ই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর হাতের মধ্যে জাদু লুকিয়ে আছে। সময়-সুযোগ পেলেই তিনি সেই জাদু প্রদর্শনে সক্ষম হবেন। সত্যিই হাতের মাঝে লুকিয়ে থাকা সেই জাদু তিনি উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছেন পাকিস্তানের সঙ্গে সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজে। স্বল্প ক্যারিয়ারেই এ তরুণ বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি একজন জাত ক্রিকেটার। তাঁর ঝুলিতে গোলাবারুদের শেষ নেই। ব্যাটিং বিনোদন দিতে তিনি পারঙ্গম। আগে থেকেই অবশ্য সৌম্য সেই ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। চমক দেখানো তাঁর পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। কিন্তু ভাগ্যের সহায়তা না থাকার কারণে তাঁর হাত থেকে একপর্যায়ে সবকিছু ফসকে যাচ্ছিল। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে ওয়ানডে সিরিজের শেষ দিনে তাঁকে আর কেউ অবরুদ্ধ করে রাখতে পারেনি। ২২ এপ্রিল তাই সৌম্য হয়ে উঠেছিলেন অদম্য। সেদিন বাংলার মানুষ প্রাণভরে দেখেছে পাকিস্তানের বিপক্ষে একজন বাঙালীর সাহসী ক্রিকেট। দেখেছে তাঁর ব্যটিং সৌন্দর্য। পাকিস্তানের সব কলাকৌশলকে পরাস্ত করে সৌম্য ১১০ বলে ১২৭ রানের এক ঝকঝকে অপরাজিত ইনিংস খেলে সবার মন ভরিয়ে দেন। রাতটাকে বড় বেশি আলোকিত করেন তিনি। এখানেই গল্প শেষ নয়। ১৩টি চার আর ছয় ছয়টা ছক্কায় তাঁর ইনিংসকে করে আরও উজ্জ্বলতর। আবার স্ট্রাইক রেটটাও ছিল সবার থেকে বেশি ১১৫.৪৫।

সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন, আমাদের ক্রিকেটে এই সময়ে এক অনন্য নাম হয়ে উঠেছেন সৌম্য। এই তরুণের পুরো নাম সৌম্য শান্ত সরকার। এই সময়ে যেসব উদীয়মান তারকা সবার নজর কাড়তে সক্ষম হয়েছেন, সৌম্য তাদের মাঝে অন্যতম একজন। এই ক্ষুদে বয়সেই মাঠে বিশ্বস্ততার ছাপ রেখে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। এতদিন ধরে যেসব ক্রীড়ামোদীর চোখ ঘুরপাক খেত সাকিব, তামিম, মুশফিক বা মাশরাফিকে ঘিরে, সেসব চোখের নিশানাতে এখন সৌম্যও অনিবার্য। কয়েক দিন আগেও সৌম্য ছিলেন একেবারেই অজানা, অচেনা। কিন্তু সেই সৌম্যই এখন সবার চেনা। প্রিয়ও হয়ে উঠেছেন বেশ। সৌম্য সাতক্ষীরার তরুণ। একেবারে গাঁওগ্রামের সন্তান। সাতক্ষীরাতেই বড় হয়েছেন। ক্রিকেটের হাতেখড়িও ওখানে। এরপর এক সময় বিকেএসপিতে ভর্তি হন। বিকেএসপি থেকেই ঘরোয়া ক্রিকেটে তাঁর অভিষেক।

জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পাওয়ার আগেই সৌম্য ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের পারফর্মেন্স দিয়ে বুঝিয়ে দেন আগামী দিনে তাঁকে কেউ রুখতে পারবে না। ঘরোয়া ক্রিকেটের প্রথম শ্রেণীর আসরে তিনি খেলেন রাজশাহী বিভাগের হয়ে। প্রিমিয়ার ক্রিকেটে খেলেন ভিক্টোরিয়ার পক্ষে। গত বছরের জুনে কুয়ালালামপুরে অনুর্ধ-১৯ এশিয়া কাপে কাতারের বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি করে নিজ প্রতিভাকে উন্মোচিত করেন। ২০৯ রানের একটি বিস্ফোরক ইনিংস খেলেছিলেন মাত্র ১৩৫ বলে, যাতে ছিল ২৭টি বাউন্ডারি ও আটটি ওভার বাউন্ডারি। সৌম্য এ পর্যন্ত প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলেছেন ৩২টি। ৬০টি ইনিংসে তাঁর রান ১৫৬৮। একদিনের ক্রিকেট তাঁর ডেবুও কিন্তু বেশিদিন নয়। গত বছরের পহেলা ডিসেম্বর। জিম্বাবুয়ে বাংলাদেশ সফরে এলে পঞ্চম ম্যাচে তিনি খেলার সুযোগ পান। সে ম্যাচে ১৮ বলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ রান করেছিলেন সত্য, তবে চারটি চার মেরে নিজেকে খানিকটা রহস্যময় করে রেখেছিলেন। ছোট্ট ওই ইনিংসে স্ট্রাইক রেট ছিল ১১১.১১। এরপর বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ডাক পান নিজের অবিশ্বাসকে পরাজিত করে। মাঝখানে ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে তাঁর ব্যাট থেকে উল্লেখযোগ্য রান এলে সৌম্য নির্বাচকদের নজরে পড়েন। বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ঠাঁই হয় তাঁর। নবাগত হিসেবে বিশ্বকাপে তিনি ভালই নিজেকে তুলে ধরেন। ১৩ মার্চ হ্যামিল্টনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে একটি আধা সেঞ্চুরি করার সাহস দেখান। তখন থেকেই তাঁকে নিয়ে শুরু হয় ফিসফিস। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের পাতায় তাঁকে নড়াচড়া শুরু করে ক্রিকেটামোদীরা। সৌম্য শান্ত সরকার নিতান্তই আমাদের সাধারণ পরিবারের এক ধীরস্থির সন্তান। দেখেই বোঝা যায়, আভিজাত্য কোনদিনও তাঁর পরিবারে ছিল না। লড়াই-সংগ্রাম আর সঙ্গে একমুঠো স্বপ্নকে ধরেই কেবল এগোতে হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক আভিজাত্য না থাকলেও ক্রিকেট আভিজাত্যের দিকে ছুটে চলেছেন এই তরুণ। ম্যাচ খেলছেন আর বিশ্বস্ততার প্রতীক হয়ে উঠছেন। এই সময়ে কোচ চান্দিকা হাতুরেসিংহের সবচেয়ে আস্থাভাজন তিনি। চান্দিকা যেন তাঁকে দিয়েই সবাইকে ঘায়েল করতে চান।

আসলে বাংলাদেশের মানুষ ঠিক কিছুদিন আগেও এভাবে ভাবেনি যে, আমাদের তরুণরা মাঠে নেমেই সাহস দেখাতে পারে। হাত খুলে পেটাতে পারে। কিন্তু আমরা এখন সেটা দেখতে পাচ্ছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ক্রিকেট অনেক বদলে গেছে, অনেক এগিয়ে গেছে তা যে কেউ স্বীকার করবেন। সে প্রসঙ্গেই বলছিলেন সাবেক ক্রিকেটার দীপু রায় চৌধুরী। তাঁর মতে, আরও সৌম্য বেরিয়ে এলে দেশের ক্রিকেট আরও সমৃদ্ধ হবে। সৌম্যরাই এগিয়ে নিয়ে যাবে এ দেশের ক্রিকেটকে। সৌম্যরাই এ দেশের ক্রিকেটকে করবে আরও সৌন্দর্যময়।

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৫

১৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: