আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

এমন বাংলাদেশকেই তো চাই

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৫
এমন বাংলাদেশকেই তো চাই
  • সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

বাংলাদেশের ক্রিকেট এবং ক্রিকেটাররা এমন কী ক্রিকেটানুরাগী-সমর্থকরাও এখন আনন্দের জোয়ারে ভাসছেন। অবশ্যই ভাসার কথা। এমন সব সাফল্যের পর বিজয়োৎসব, এটাই স্বাভাবিক। বলা যায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্বর্ণযুগের পথে এগোচ্ছি আমরা। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের আন্তর্জাতিক পথচলায় সবচেয়ে সফল সময় পার করছি আমরা। অবশ্য এর আগেও বিশ্বক্রিকেটে সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। সাফল্য দেখিয়ে এর আগেও আমাদের ক্রিকেটাররা গাড়ি-প্লট-ফ্লাট পেয়েছিল। তবে সে সাফল্যের ধারাবাহিকতা ছিল না। বিগত ৪০ বছরে অনেক সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছিল আবার রুদ্ধও হয়েছে। অভিষেক বিশ্বকাপে ২টি জয় দিয়ে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ যাত্রা শুরুও হয়েছিল। যার মধ্যে পাকিস্তানের মতো সাবেক বিশ্বকাপজয়ী দলও ছিল। তবে সে জয়ের ধারাবাহিকতা ছিল না। পরের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ কোন ম্যাচই জিততে পারেনি। আজকে যে বাংলাদেশের প্রশংসায় সবাই গদ্গদ্, দর্শক-পাঠক-সাংবাদিকরা এক বছর আগেও এশিয়া কাপের ফলাফলের পর বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে সমালোচনা আর নিন্দায় মুখর ছিলেন। তখন অনেক বড় নিন্দার ঝড় বয়ে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ওপর দিয়ে। তবে নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট তারপর থেকেই জয়ের ধারায় রয়েছে। বিশ্বকাপের আগে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৫-০ তে সিরিজ জয়, তথা হোয়াইটওয়াশের পর যেন বদলে গেছে বাংলাদেশ। এ যেন এক অন্য এখন বাংলাদেশ। এখন জোর দিয়ে বলতে পারি বাংলাদেশে এখন অপ্রতিরোধ্য দলে পরিণত হয়েছে। ফলে যারা একসময় সমালোচনায় মুখর ছিলেন এখন তারা সব ভুলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্তুতি গাইতে শুরু করেছেন।

২০১৪-এর শেষের দিক থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের যে ফলাফল তাতে করে বাংলাদেশকে অবশ্যই কৃতিত্ব দিতে হবে। এর আগে একটা ম্যাচ বা সিরিজ জিতলে পরের তিনটেতে ফ্লপ করেছে। এখন আর সে বাংলাদেশ দল নেই। এখন বলা যায় অনেকটাই পরীক্ষিত একটি দল বাংলাদেশ। যারা যে কোন জায়গায় যে কোন দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখে। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ড ও জিম্বাবুইয়ের বিরুদ্ধে বড় ব্যবধানে জয় পাবার পর থেকেই বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসটা বেড়েছে। আর সেটার পূর্ণতা পেয়েছে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও আফগানিস্তানের বিপক্ষে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর। ভারতের কাছে অনৈতিকভাবে হারার পর বাংলাদেশের ছেলেদের জিদটা আরও বেড়েছে। ফলে আরও ধারালো, আরও পরিশীলিত হয়েছে বাংলাদেশ দল। যে কারণে বিশ্বকাপে জ্বলে ওঠা টাইগারদের বহ্নিশিখায় আত্মাহুতি দিতে হয়েছে পাকিস্তানীদের। হতে হয়েছে হোয়াইটওয়াশ। শুধু একদিনের ক্রিকেটেই নয়, টি২০ ক্রিকেটের একমাত্র ম্যাচেও পাকিস্তানকে হারিয়ে ওদের সব অহঙ্কার ভেঙ্গেচুরে গুঁড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের দামাল ছেলেরা। পাকিস্তানের মতো দলকে ৩-০ তে হতে হয়েছে হোয়াইটওয়াশ। এমন জয়ের পর বাংলাদেশের এ সাফল্যে উল্লাসের বাঁধ ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক। আর দশজন বাঙালীর মতো বাংলাদেশের এ বিজয়গুলোয় আমিও নিঃসন্দেহে আনন্দিত, আবেগাপ্লুত। তবে অতি উল্লাস করতে ভয় পাই। এ উল্লাসের বাঁধ আবার বালির বাঁধে পরিণত না হয়। অতীতে অনেক বিজয়ানন্দ মিলিয়ে যেতে সময় লাগেনি। ভয় থাকলে ভরসা আছে এবার আর নিরাশার সাগরে ডুবতে হবে না। কেননা এবারের জয়ের ধারাবাহিকতা আছে। সেটা ধরে রাখতে পারলে আর আমাদের নিরাশ হতে হবে না। ম্যাচের আগেই হেরে না বসে জিতুক বা হারুক ফলাফল যাই হোক লড়ে যাক শেষ পর্যন্ত। এমন বাংলাদেশকেই তো চায় এদেশের ১৬ কোটি মানুষ।

আর একটা কথা এবারের জয় কেবলমাত্র জয়েই সীমাবদ্ধ নেই। জয় ছাড়াও বাংলাদেশ পেয়েছে অনেক কিছু। তামিম, মুশফিক, সৌম্যরা বুঝিয়ে দিয়েছে, এখন আর একা সাকিবের ওপর দলকে নির্ভর করে থাকতে হবে না। বিশ্বকাপের হিরো মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ব্যর্থ হলেও ব্যাক টু ব্যাক সেঞ্চুরিতে তামিমের ব্যাট আবার ছন্দ ফিরে পেয়েছে, মুশফিকের ব্যাটও হাসছে যথারীতি। মাঠে আলো ছড়িয়েছেন সৌম্য সরকার-সাব্বিরদের মতো তরুণরা। যার কারণে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্ধকার কেটে গেছে। সাকিব-তামিম-মুশফিকদের অনুপস্থিতিতে যারা দলের হাল ধরতে পারবেন। আর যে বড় কাজটি হয়েছে সেটা হচ্ছে, বাংলাদেশের ছেলেদের ভয় ভেঙ্গে গেছে। এখন আর বাংলাদেশের ছেলেরা কাউকে ভয় করে না। তারা বুঝে গেছে, ‘আমরাও পারি।’ আমাদের ছেলেরা এই আমরাও পারিটা যদি সব সময় ধরে রাখতে পারে তাহলে তাদের অজেয় কোন কিছু থাকবে না।

তবে কথার পরেও কথা থাকে। বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেটে সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ১৯টি প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেলেছে। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুইয়ে, কেনিয়ার মতো দলগুলোকে হোয়াইটওয়াশ করেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের যে দলের বিপক্ষে সিরিজ জিতেছিল সেটা কোন পূর্ণ শক্তির দল ছিল না। দেশের মাটিতে নিউজিল্যান্ডকে সিরিজ হারাতে পারলেও বিশ্বকাপে তাদের কাছে হেরেছে। তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে এ জয়ের আনন্দই আলাদা। বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেট খেলছে সেই ১৯৮৬ সাল থেকে। যদিও আইসিসির সহযোগী সদস্যপদ পায় এরও দশ বছর আগে। আইসিসির পূর্ণ সদস্যপদ না পেয়েও ওয়ানডে ম্যাচ খেলার সুযোগ পাওয়াটাও কম কথা ছিল না। ওয়ানডে স্ট্যাটাস না পেয়েও ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয় এশিয়া কাপে বাংলাদেশ প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশ নেয়ার সুযোগ পায়। তবে সে সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে বাংলাদেশকে ২৩টি ম্যাচ আর ১২টি বছর অপেক্ষা করতে হয়। একযুগ পর ১৯৯৮ সালে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। তবে সেটাও আরেক ওয়ানডে স্ট্যাটাস না পাওয়া কেনিয়ার বিপক্ষে। ভারতের হায়দরাবাদে তিন জাতি ক্রিকেটে বাংলাদেশ দল কেনিয়াকে ৬ উইকেটে হারিয়ে প্রথম ওয়ানডে জয় পায়। এরপর ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ আইসিসি ট্রফি জিতেছে, সে জয়ের সুবাদে বাংলাদেশ ১৯৯৯ সাল থেকে বিশ্বকাপ খেলারও সুযোগ পেয়ে আসছে। ১৯৯৮ সালে পেয়েছে ওয়ানডে স্ট্যাটাস। এরই মধ্যে রোদে-মেঘে কেটে গেছে ২৯ বছর। আর এই ২৯ বছরে বাংলাদেশ খেলে ফেলেছে ৩০৩টি ম্যাচ। এই ৩০৩টি ম্যাচে এখনও বাংলাদেশের জয়ের চেয়ে পরাজয়ের পাল্লাই অনেক বেশি ভারি। ৯১টি মাচে জয় পেলেও হেরেছে ২০৪টি ম্যাচে এবং ফলাফলহীন ম্যাচ ৪টি। যদিও বিশ্বসেরা সব দলগুলোর বিপক্ষে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে সে সংখ্যা আশানুরূপ নয়। বাংলাদেশের ৯১টি জয়ের ৩৪টিই এসেছে জিম্বাবুইয়ের বিপক্ষে। কেনিয়া, নেদারল্যান্ডস, আফগানিস্তান, কানাডা, আয়ারল্যান্ডের মতো নন টেস্ট প্লেয়িং দেশের বিপক্ষে জয়ের পাশাপাশি পরাজয়েরও স্বাদ পেয়েছে। যা কারও কাছেই কাক্সিক্ষত ছিল না।

এবারে আসি টি২০ ক্রিকেট প্রসঙ্গে। বাংলাদেশ ২০০৬ সাল থেকে ক্রিকেটের ক্ষুদ্র সংস্করণ টি২০ ক্রিকেটে অংশ নিয়ে চলেছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ টি২০ ক্রিকেটের ৪২টি ম্যাচ খেলেছে। তাতেও অবস্থা তথৈবচ। এই ৪১ মাচের মধ্যে ১২টিতে জয় পেলেও হেরেছে ২৯ ম্যাচে। বাকি একটি ম্যাচের কোন ফয়সালা হয়নি। এ ফলাফলকে বলা যায় মন্দের ভাল। পাকিস্তানের বিপক্ষেও প্রথম জয় পেল এবারই।

এ তো গেল পরিসংখ্যানের কথা। যদিও পরিসংখ্যান বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলছে না। পরিসংখ্যান আর মাঠের বর্তমান চিত্র কখনও এক হয় না। একটা দেশ ২৯ বছর ওয়ানডে ক্রিকেট খেলছে সে দেশকে তো আর ‘নবীন’ বলা যাবে না। অভিজ্ঞতা অর্জনের দিন শেষ। এখন খেলতে হবে জয়ের জন্যে, প্রতিপক্ষ যেই হোক। বাংলাদেশ এখন যে জয়ের ধারায় রয়েছে সে ধারা যেন অব্যাহত থাকে। পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সিরিজ জিতেছি ঠিক, তবে তাদের বিপক্ষে যে সিরিজগুলো হেরেছি সেগুলোর কথা যেন আমরা ভুলে না যাই। যে ম্যাচটি আমরা জিতেছি সবসময় সেই ম্যাচের কথা ভেবে পুলকিত হই, বারবার আলোচনার সামনে নিয়ে আসি। জয়ের আনন্দে আবার যেন পরাজয়ের পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। এ কথাটা শুধু পাকিস্তান নয়, অন্য বড় দলগুলোর সঙ্গে খেলার সময়ও যেন মনে রাখি। অথচ হওয়া দরকার উল্টোটা। হারা ম্যাচগুলো নিয়ে বারবার আলোচনায় আনা দরকার। যাতে করে সে ম্যাচের ভুলগুলো শুধরে নেয়া যায়। দুঃখজনক হলেও সত্যি, সেটা খুব একটা হয় না। ক্রিকেটকে সবসময় পরিসংখ্যান দিয়ে সবকিছু বিচার করা যায় না। প্রমাণ করতে হয় মাঠে। প্রতিদিনের প্রমাণ প্রতিদিন দিতে হবে। কালকের জয়ের কথা মনে না রেখে কালকের ভুলগুলো শুধরাতে হয়।

বাংলাদেশের জয়ের নেপথ্য রূপকারটির কথা বলতেই হয়। তিনি নিঃসন্দেহে দলের শ্রীলঙ্কান কোচ চান্দিকা হাতুরাসিংহে। বিশেষ করে তিনি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ দল আমূল বদলে গেছে। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। সঙ্গে মাশরাফির নেতৃত্বকেও।

সব শেষে যেটা বলতে চাই, সবকিছুর জন্য চাই পরিকল্পনা। বাংলাদেশকে এখনই একটা পরিকল্পনার ছক করতে হবে আগামী বিশ্বকাপে আমাদের টার্গেট কী। আর সে পরিকল্পনা অনুযায়ী এখন থেকে কাজ শুরু করতে হবে। ঘনঘন দল বদল না করে এখন যে দল করা হবে তাদের লক্ষ্য থাকবে ৪ বছর পরের বিশ্বকাপ। আমরা গাছ লাগানোর আগেই ফল খেতে চাই। গাছ লাগালেই হবে না। তাকে উপযুক্ত পরিচর্যাও তো করতে হবে, ফল ধরার সময় দিতে হবে; তবেই না ফল।

লেখক : ক্রীড়ালেখক, কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য সংগঠক

e-mail : syedmayharulparvey@gmail.com

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৫

১৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: