কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

নেপালের এই ভূমিকম্প ছিল অবধারিত

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৫

নেপালে ক’দিন আগে ঘটে যাওয়া প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পটি ছিল অবধারিত । বিশেষজ্ঞরা কয়েক বছর ধরে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আসছিলেন যে, একটা বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানবে। তারা বলেননি, আঘাত হানতে পারে। বলেছিলেন, আঘাত হানবেই। তবে কবে কখন সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না। তাই এবারের ৭.৯ মাত্রার ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মোটেই বিস্মিত করেনি। কারণ টেকটোনিক প্লেটের পারস্পরিক ঘর্ষণ ও সংঘর্ষে নেপালের মাটির গভীরে যে বিপুল পরিমাণ এনার্জি জমে উঠেছিল, তা বেরিয়ে আসার জন্য এমন এক ভূমিকম্প অবধারিত ছিল। মার্কিন ভূকম্পন জরিপ দফতরের বিশেষজ্ঞ সুশান হাফ তাই বলেছেন, আমরা এমন একটা ভূমিকম্পের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

৪ থেকে ৫ কোটি বছর আগে দুই বিশাল ভূখ-ের মধ্যে সংঘর্ষে ভূপৃষ্ঠের ওপর জেগে উঠেছিল সুউচ্চ ও সুদীর্ঘ হিমালয় পর্বতমালা। ভূখ- দুটোর একটি আজকের ভারত উপমহাদেশ যা সে সময় ছিল একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ এবং অন্য ভূখ-টির আজকের নাম ইউরেশিয়া যা অতি বিশাল। একদিকে যখন হিমালয় জেগে উঠেছিল সে সময় ওই সংঘর্ষের পরিণতিতে আজকের নেপাল নামক ভূখ-ের অনেক গভীরে সৃষ্টি হয় বড় ধরনের ভূতাত্ত্বিক ক্ষত যাকে সরল বাংলায় বলে চ্যুতি। সেখানে অতি ধীরগতিতে ইন্ডিয়ান প্লেটটি ইউরেশিয়া প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। এতে করে দুই প্লেটের মধ্যে ধাক্কা বা সংঘাত লেগে চলেছে। সেই সংঘাত ও ঘর্ষণ থেকে সৃষ্টি হতে থাকে এনার্জি। ক্রমশ এই এনার্জি পুঞ্জীভূত হতে থাকে। তারপর একদিন প্লেট দুটোর সহসা বড় ধরনের স্থান পরিবর্তনের সময় আগে থেকে পুঞ্জীভূত এনার্জি ভূকম্পন তরঙ্গের আকারে দ্রুত ভূপৃষ্ঠ দিয়ে বেরিয়ে আসে। আর সেই তরঙ্গের গমনপথে যা কিছু পড়ে সবগুলোকে সেটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে দেয়।

বলাবাহুল্য, ইন্ডিয়ান ও ইউরোশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলে রয়েছে নেপাল। সঞ্চরণশীল এই প্লেট দুটি বছরে প্রায় ৪৫ মিলিমিটার বা ১ দশমিক ৮ ইঞ্চি করে একে অপরের দিকে সরে আসছে। প্লেট দুটি পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে চলার ফলে হিমালয় পর্বতমালা যেমন বছরে কয়েক সেন্টিমিটার করে উঁচু হচ্ছে, তেমনি আবার এর নিচে ভূগর্ভে জমে উঠছে বিপুল পরিমাণ এনার্জি। এ কারণেই হিমালয় অঞ্চল ভূমিকম্পের দিক থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক একটি এলাকায় পরিণত হয়েছে। হিমালয় অঞ্চলজুড়ে ভূতাত্ত্বিক চাপ গড়ে উঠছে এবং মাঝেমধ্যে ভূমিকম্পের আকারে সেই চাপকে বের করে দেয়া হচ্ছে।

দুই বর্ধিষ্ণু অর্থনৈতিক পরাশক্তি ভারত ও চীনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে নেপাল। বিশ্বের দরিদ্রতম একটি দেশের বুকে এই ভূমিকম্পের আঘাত অতি বিপর্যয়কর হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশটির ১০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৩ লাখ বাড়িঘর এই ভূমিকম্পে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় পৌনে তিন লাখ ঘরবাড়ি। নিহতের সংখ্যা এ পর্যন্ত ৮ হাজার ছাড়িয়েছে। কাঠমান্ডু ও তার আশপাশের এলাকাই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ দফতরের হিসাবে অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবন, রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৫শ’ কোটি ডলার।

প্রায় পৌনে তিন কোটি লোকের দেশ নেপালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি এমনিতেই মন্থর। দেশটি কৃষি, পর্যটনশিল্প ও প্রবাসীর পাঠানো অর্থের ওপর নির্ভরশীল। সেখানে বেকারত্বের হার ৪০ শতাংশেরও বেশি। এ অবস্থায় ভূমিকম্প বিধ্বস্ত দেশটির অর্থনীতিকে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। এ এক সুবিশাল দায়িত্ব। তবে যে দেশটির অবকাঠামো অতি দুর্বল ও ভঙ্গুরপ্রায় এবং সেখানে বার্ষিক উৎপাদনের অর্ধেকটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, সেখানে এই ভূমিকম্পের অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী না হয়ে পারে না। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই গরিব দেশটি অর্থনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য বিদেশী সাহায্যের ওপর নির্ভর করবে। তবে নেপালকে নিয়ে তার নিকটতম প্রতিবেশী দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তির মধ্যে যেরূপ প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে তাতে করে দেশটি যে এক নাজুক অবস্থায় পড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

চলমান ডেস্ক

সূত্র : টাইম ও অন্যান্য

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৫

১৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: