রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

বাল্টিমোর দাঙ্গার পেছনে দারিদ্র্য ও বৈষম্য

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৫
  • এনামুল হক

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মেরীল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের বাল্টিমোরে পুলিশ হেফাজতে থাকাকালে ফ্রেডি গ্রে নামে এক কৃষ্ণাঙ্গ কুনকের নিগৃহীত হওয়া ও পরিশেষে মৃত্যুবরণ করাকে কেন্দ্র করে বাল্টিমোর শহর ও এর আশপাশের তল্লাটে রীমিতো তা-ব ঘটে যায়। প্রথমদিকে যা ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, পরবর্তীকালে সেটাই দাঙ্গার রূপ ধারণ করে। কৃষ্ণাঙ্গ জনতার রুদ্ররোষে প্রায় দেড় শ’ যানবাহন আগুনে ভস্মীভূত হয়। বেশ কিছু দোকানপাট ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর হয়। জনাবিশেক পুলিশ অফিসার আহত হয়, প্রায় আড়াই শ’ লোককে গ্রেফতার করা হয়। হাজার হাজার পুলিশ ও সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয় এবং বাল্টিমোর শহর এলাকায় জারি করা হয় কার্ফু ও জরুরী অবস্থা। ঘটনাটা শুধু পুলিশী অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের বহির্প্রকাশমাত্র ছিল না, ওটা ছিল এক অন্যায় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদ যে ব্যবস্থার মর্মমূলে রয়েছে বর্ণবৈষম্য।

১২ এপ্রিল ফ্রেডি গ্রেকে গ্রেফতারের পর সুস্থ অবস্থায় পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়। ঘণ্টাখানেক পর তাকে যখন ভ্যান থেকে নামানো হয় তখন তাঁর চেতনা লুপ্ত এবং স্পাইন্যাল কর্ড প্রায় ছিন্ন হয়ে গেছে। ৭ দিন পর গ্রে মারা যায়। ঘটনাটিকে হত্যাকা- হিসেবে গণ্য করে ৬ জন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে আইনগত অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রে বাহ্যত ছিল এক নিরীহ যুবক।

বাল্টিমোর পুলিশের এই নিষ্ঠুরতা নতুন কিছু নয়। ২০১১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সেখানে শতাধিক লোক পুলিশী নিগ্রহের শিকার হয়েছিল এবং এদের পক্ষ থেকে দায়েরকৃত মামলা-মোকদ্দমা ফয়সালার পেছনে পুলিশকে প্রায় ৬০ লাখ ডলার ব্যয় করতে হয়েছিল।

বাল্টিমোর পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হলেও সেটি একটা সমস্যা ভারাক্রান্ত এলাকা। কৃষ্ণাঙ্গ প্রধান এই অঞ্চলে মাদক ব্যবসার বাইরে অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা খুব একটা নেই। পুলিশের উপর মানুষের যত না আস্থা তার চেয়ে ভয়ভীতির মাত্রাই বেশি। ৬ লাখ লোকের এই নগরীর দরিদ্র এলাকাগুলোর অর্থনীতি স্থবির। শহরতলীর বেকারত্বের হার নগরীর গড় হারের প্রায় দ্বিগুণ। সার্বিকভাবে বলতে গেলে বাল্টিমোর আমেরিকার সেসব নগরীর একটি যেখানে অর্থনৈতিক ও বর্ণগত অসন্তোষ বেশি। তেমনি বেশি অপরাধের হার। এখানকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী যেমন বিশাল তেমনি আবার তাদের কাজকর্মের সুযোগ সুবিধাও কম। এদের শিশুরা চরম দারিদ্র্য ও সঙ্কটের মধ্যে জন্ম নেয় এবং বেড়ে ওঠে। অন্য দিকে নগরীর একাংশে রয়েছে শ্বেতাঙ্গ প্রধান এলাকা যেখানে সম্পদের প্রাচুর্য চোখে পড়ার মতো। এদের আয়, জীবনযাপন ও বিলাস-বৈভব বাল্টিমোরের সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিরাট পার্থক্য রচনা করে।

বাল্টিমোরের পুলিশ বাহিনীর ৪৮ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ। বাকিরা শ্বেতাঙ্গ। পুলিশ বাহিনীর শীর্ষ পদগুলো এদেরই দখলে। কৃষ্ণাঙ্গ পুলিশরা কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকায় থাকে না। ফলে কৃষ্ণাঙ্গ এলাকার সমস্যা তাদের স্পর্শ করে না। তারা তাদের সমগোত্রীয়দের জীবন ও সমস্যাবলী থেকে বিযুক্ত। এরা শ্বেতাঙ্গ পুলিশদের মনমানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনযাপন দ্বারা প্রভাবিত এবং তাদের সঙ্গেই একাত্ম। তাই দেখা যায় বাল্টিমোরের মেয়র ও পুলিশ প্রধান এবং খোদ আমেরকার প্রেসিডেন্ট কৃষ্ণাঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও নিরীহ ফ্রেডি গ্র্রের উপর পুলিশের অমন পৈশাচিক আচরণ ঘটতে পারল।

কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি শ্বেতাঙ্গদের বর্ণঘৃণার আনুষ্ঠানিক অবসান হয়েছে ঠিকই। তবে একেবারে মুছে যায়নি। শ্বেতাঙ্গদের বিভিন্ন আচরণ ও কার্যকলাপে তা অদৃশ্যভাবে বিরাজমান। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্যের ব্যাপারটি তো আছেই। এগুলো কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে জন্ম দিচ্ছে ক্ষোভ, হতাশা, যন্ত্রণা ও বেদনার। দারিদ্র্যের নির্মম কশাঘাত আর বৈষম্যের তীক্ষè দংশন মিলে তাদের মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তাদের প্রচলিত ব্যবস্থার উপর আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়তে ইন্ধন যোগায়। তাই দেখা যায় যে ফ্রেডি গ্রে’র মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তারা তা-বে মেতে ওঠে। যানবাহন ও দোকানপাটে আগুন লাগায়। পুলিশের সঙ্গে মারামারিতে লিপ্ত হয়। বাল্টিমোরের সাম্প্রতিক দাঙ্গার পিছনে এগুলোই কার্যকারণ হিসেবে কাজ করেছে।

সূত্র : টাইম

প্রকাশিত : ১৩ মে ২০১৫

১৩/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: