মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১১ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

পিতার অসমাপ্ত কাজ শেষ করলেন কন্যা

প্রকাশিত : ১১ মে ২০১৫
  • আবদুল মান্নান

কাজটি শুরু করেছিলেন একজন পিতা সেই ৪১ বছর আগে, ১৯৭৪ সালে। জাতির দুর্ভাগ্য, তিনি কাজটির শেষ দেখে যেতে পারেননি। তিনি শুধু তাঁর সন্তানদের পিতাই নন, তিনি বাঙালী জাতির পিতা শেখ মুজিব। বাংলার মানুষ দেশের জন্য তাঁর ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেছিল। সেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে দিল্লীতে রাষ্ট্রীয় সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান সীমান্ত সংক্রান্ত সমস্যা নিরসনকল্পে একটি চুক্তি করেছিলেন। যাতে বলা হয়েছিল, এক দেশের ভেতর যে অন্য দেশের ছিটমহল আছে তার একটি স্থায়ী সমাধান হওয়া উচিত। এই ছিটমহলজনিত সমস্যা সৃষ্টি করে গিয়েছিলেন ইংরেজ সাহেব সিরিলি রেডক্লিফ সেই ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময়। তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল ভারতবর্ষকে ফালি ফালি করে দেয়ার। তা নির্দয়ভাবে করেছিলেন তিনি। রেডক্লিফ কখনও বোঝার চেষ্টা করেননি তিনি যে হাজার বছরের শাশ্বত বাংলাকে পাকিস্তান আর ভারতের মধ্যে ভাগ করছেন তাতে বাঙালীদের কী কী মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারে। ঠিক তাই ঘটেছিল। শুধু পরিবারই বিভক্ত হয়নি এক দেশের স্থলভূমি অন্যদেশে রয়ে গিয়েছিল। এর ফলে সেই ১৯৪৭ সাল থেকে এই ভূমি বা ছিটমহলের বাসিন্দারা মানবেতর জীবন যাপন করছিল। তারা যেন নিজে দেশ পরবাসী। তাদের পক্ষে এই দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখা সম্ভব ছিল না। শিক্ষা স্বাস্থ্যের মৌলিক চাহিদা হতে তারা ১৯৪৭ সাল থেকে বঞ্চিত ছিল।

দেশভাগ হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মালিক ফিরোজ খান নুন আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু এক বৈঠকে এই সমস্যার একটি বাস্তবমুখী সমাধানের অঙ্গীকার করেছিলেন কিন্তু তার কাজ আর বেশি দূর এগোয়নি। ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু আর ইন্দিরা গান্ধী এই চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন যে নুন-নেহেরুর চুক্তির ধারাবাহিকতায় দুই দেশের মধ্যে এই ছিটমহলজনিত সমস্যার ত্বরিত সমাধান প্রয়োজন। যেহেতু বিষয়টি জমির অদল-বদল সংক্রান্ত সেহেতু এই ধরনের চুক্তি বাস্তবায়নে সংবিধানের বাধ্যবাধকতার কারণে সংসদে তা পাস করিয়ে নিতে হয়। বাংলাদেশ কোন সময় নষ্ট না করে বিষয়টি আমাদের জাতীয় সংসদেই নিষ্পত্তি করে বেরুবাড়ি আর আঙ্গরপোতা ভারতের কাছে হস্তান্তর করে। এটি বঙ্গবন্ধুর উদারতার পরিচয়। কিন্তু ভারত এই দীর্ঘ সময় ধরে তা করতে ব্যর্থ হয়। এই চুক্তি সম্পাদন হওয়ার পরই বঙ্গবন্ধু আর ইন্দিরা গান্ধী ঘাতকদের হাতে নিহত হন। তারপর দীর্ঘ বিরতি।

২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর শেখ হাসিনা চেষ্টা শুরু করেন দু’দেশের মধ্যে অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানের, যার মধ্যে এই ছিটমহল বিনিময় অন্যতম। শুরুতে কিছুটা সুবিধা ছিল কারণ ভারতের কেন্দ্রে ছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার আর পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট। ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস এবং বাম ফ্রন্টকে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বিধিবাম, ২০১০ সালের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বাম ফ্রন্টের ভরাডুবি ঘটে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস বিজয় লাভ করে। তারপরও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করেছিলেন দুটি প্রধান সমস্যার সমাধান করার কিন্তু কেন্দ্রে ইউপিএ সরকার হতে তৃণমূল ও সিপিএম ইতোপূর্বে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নিলে কেন্দ্র সরকারও নড়বড়ে হয়ে পড়ে। দু’দেশের মধ্যে বিরাজমান সমস্যা সমাধানের বিষয়টা অনেকটা হিমাগারে চলে যায়। তারপরও ভারতের কেন্দ্র সরকার চেষ্টা করেছিল অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধান করতে, যার মধ্যে ছিল এই ছিটমহল বিনিময়জনিত সমস্যা আর তিস্তার পানি বণ্টন। বাংলাদেশ লাগোয়া ভারতের অন্য রাজ্যগুলো এই সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান প্রত্যাশা করলেও বাদ সাধেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি ঘোষণা করেন এই চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন হলে তার রাজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একটি সস্তা রাজনৈতিক চাল। এমনকি ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরে এলে শেষ মুহূর্তে মমতা তাঁর সফরসঙ্গী হতে অস্বীকার করেন। সেই যাত্রায় বহু প্রত্যাশিত এই দুটি সমস্যা নিয়ে আর কোন অগ্রগতি হয়নি।

২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি হয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এসে নরেন্দ্র মোদি সরকার গঠন করলে পুরো বিষয়টা নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বিজেপিকে একটি হিন্দুত্ববাদী দল হিসেবে দেখা হয় এবং মনে করা হয়েছিল যেহেতু আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার কংগ্রেসের বন্ধু ছিল সেহেতু বিজেপি আওয়ামী লীগের শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হবে। এতে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ বিরোধী মহল বেশ উৎফুল্লই হয়েছিল। কিন্তু গত দু’বছরের কার্যকলাপে নরেন্দ্র মোদি প্রমাণ করেছেন তিনি জাত রাজনীতিবিদ। দলের উর্ধে উঠে দেশের স্বার্থকে বড় করে দেখতে জানেন। উপলব্ধি করেছেন ভারত এখন আর ষাটের দশকে নেই। দেশটি এখন একটি উদীয়মান পরাশক্তি। জাতিসংঘে স্থায়ী পদের জন্য চেষ্টা করছে। তার জন্য এই অঞ্চলের সব দেশেরই সমর্থন চাই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এলেন ভারতে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দু’দেশের মধ্যে বিরাজমান শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হলো। মোদি ক’দিন পর যাবেন চীনে। বললেন, বাংলাদেশে আসছি তবে খালি হাতে নয়। কিছু সমস্যার সমাধান তো করতেই হবে। মমতাকে নানা কৌশলে বাগে আনলেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সমুদ্রসীমা চিহ্নিতকরণ সমস্যাটি আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সমাধান হয়েছে। মমতা জানিয়ে দিলেন তিনি ছিটমহল বিনিময় অথবা স্থলসীমান্ত সীমানা চিহ্নিতকরণ চুক্তি পার্লামেন্টে উত্থাপন অথবা তা পাস করানোতে বাদ সাধবেন না। কিছুটা মিন মিন করে আপত্তি জানাল অহম বিজেপি। বলেন, চুক্তি থেকে আসামকে বাদ দিতে হবে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ বললেন, এই চুক্তিতে অবশ্যই আসামকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শেষতক বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ্র মৃদু ধমকে রাজ্যের বিজেপি চুপসে গেল।

বুধবার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় বিলটি উত্থাপিত হলে তা বিনা বাধায় গৃহীত হয়। পরদিন তা লোকসভায় উত্থাপিত হয় এবং অভূতপূর্বভাবে কোন বিরোধিতা ছাড়া ৩৩১ ভোটে দীর্ঘ ৬৮ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সর্বসম্মতভাবে বিলটি পাস হয়। আরও একবার প্রমাণিত হলো যদি দুটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব থাকেন তা হলে তাদের মধ্যে অনেক কঠিন সমস্যারই সহজ সমাধান সম্ভব। ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি পাসের ফলে দু’দেশে আটকেপড়া প্রায় পনেরো হাজার জনগণের দীর্ঘদিনের দুর্দশার লাঘব হবে। ভারতের রাজ্যসভা ও লোকসভায় এই বিলটি পাস হওয়ার জন্য দুদেশের কূটনীতিকে অবশ্যই বাহবা দিতে হবে। ভারতের নরেন্দ্র মোদি, কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাষ্ট্রনায়কোচিত মনের পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধৈর্য ধরে এবং ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ বজায় রেখে প্রমাণ করেছেন শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করলে তার ভাল ফল পাওয়া যেতে পারে। এখন বাকি রইল তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি। কিছুদিন আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশ সফরে এলে শেখ হাসিনাও সাংবাদিকদের বলেছেন এই ব্যাপারে তাঁর ওপর আস্থা রাখতে। আস্থা অবশ্যই আছে। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত সরকারকে বুঝতে হবে বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলে তাদেরই লাভ বেশি। ইতোপূর্বে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বাংলাদেশ সরকারের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ মদদে এই অঞ্চলে নিয়মিত সন্ত্রাসী কর্মকা- চালাত। শেখ হাসিনা সরকার গঠন করলে তা পুরোপুরি বন্ধ করা হয়। অদূর ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দরকে ভারত একটি ট্রানজিট বন্দর হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এতে লাভ ভারতেরই বেশি। এটি তাদের উপলব্ধি করতে হবে।

স্থল সীমান্ত সমস্যাটির সমাধান হওয়ার কারণে দু’দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের পারদ অনেক ওপরে উঠে গেছে। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি হয়ে গেলে দু’দেশের সম্ভাবনার অনেক স্বর্ণ দুয়ার খুলে যাবে। বঙ্গবন্ধুর রেখে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ তার কন্যার আমলেই শেষ হলো। এমন আরও যে সব কাজ আছে, তাও দ্রুত শেষ হবে বলে প্রত্যাশা করছি। সকল পক্ষকেই উষ্ণ অভিনন্দন।

৯ মে, ২০১৫

লেখক : গবেষক ও বিশ্লেষক

প্রকাশিত : ১১ মে ২০১৫

১১/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: