মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ

নেপালী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ

প্রকাশিত : ১০ মে ২০১৫
নেপালী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ
  • বিপ্লব পার্থ

২৫ এপ্রিল দুপুর দেড়টা। ক্লাস শেষ করে হোস্টেলে এসে ফেসবুকে চ্যাট করছি। হঠাৎ আমার এক বাংলাদেশী বন্ধু বলছে তোমাদের দেশে ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ কথা শুনে যেন আমার হৃৎপি-ে রক্তক্ষরণ শুরু হলো। তাড়াতাড়ি অনলাইনে সার্চ দিয়ে ইউটিউবে বিভিন্ন ভিডিও দেখলাম। ইংরেজী মুভির মতো সব ধুমড়ে-মুচড়ে মাটির ভেতর ঢুকে যাচ্ছে। আমার মাতৃভূমির করুণ এ অবস্থা দেখে হতাশ হলাম। প্রায় কয়েক ঘণ্টা স্তম্ভিত হয়ে রইলাম। কি করব বুঝতে পারছিলাম না।

নেপালের ভূমিকম্পের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে অনেকটা আবেগপ্রবণ হয়ে কথাগুলো বলছিলেন চট্টগ্রাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইউএসটিসি) এমবিবিএস শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী গির বাহাদুর মহরা। কথা বলার সময় দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। হাত দিয়ে চোখের মুছে বার বার লেপটপে থাকা বিধ্বস্ত নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত ছবিগুলো দেখছিলেন।

গির বাহাদুর মহরা বলেন, ‘ঘটনার দিন দেশের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। ভূমিকম্পের কারণে বিধ্বস্ত নেপালের মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বিকেলের দিকে কিরণ নামে আমার এক ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হলো। ফোনে সে কেঁদে কেঁদে বলল, ভাই আমাদের দেশতো শেষ হয়ে গেল। তবে আমাদের পরিবারের সবাই অক্ষত রয়েছে। কিন্তু পরিবারের সবাই অক্ষত থাকলে কি হবে, আমার জন্মভূমিতো ধ্বংস হয়ে গেছে। এ ধকল আমরা কিভাবে কাটিয়ে উঠব, প্রশ্ন করেন গির বাহাদুর।

এমবিবিএস শেষ বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী শিরিষরাজ পান্ডে কেঁদে কেঁদে বলেন, ‘আমার বাড়ি কাঠমান্ডু শহরে। প্রতিবছর হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসু মানুষ আমাদের দেশ ভ্রমণ করত। কারণ হিমালয় কন্যা নেপালের কাঠমান্ডুতে এমন কিছু নান্দনিক স্থাপত্য ছিল, যা বিশ্বাবাসীকে আকৃষ্ট করত। কিন্তু এখন কিছুই নেই। শুধু আছে ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি দেশের অবশিষ্ট অংশটুকু। আকাশে-বাতাসে লাশের গন্ধ। পচা লাশের গন্ধে আকাশ-বাতাস দূষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শ্মশানঘাটে দাউ দাউ করে জ্বলছে চিতার আগুন। দু’মুঠো খাবারের জন্য অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে নেপালবাসীকে। নানা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হচ্ছে আমার গ্রামবাসী। ’

পূর্ব পুরুষের কোন স্মৃতিচিহ্ন অবশিষ্ট নেই উল্লেখ করে শিরিষরাজ বলেন, ‘পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে শুনেছি আমার গ্রামে একটি ঘরও ভাল নেই। ছোট বেলা থেকে যেসব স্থাপনাগুলো দেখেছি, সেগুলো কিছুই নেই। সব ঘর ভেঙ্গে গেছে। এটি আমাকে খুব ব্যথিত করে। সবাই খোলা আকাশের নিচে রাতযাপন করছেন। এমন কোন পরিবার নেই যাদের কেউ মারা যায়নি। বাড়ি থেকে ফোন করে সবাই কান্না করে। এর চেয়েও বড় ভয়ের বিষয় হচ্ছে দিনে ৫-৭ বার ভূমিকম্প আঘাত হানছে নেপালে। এ অবস্থা দেখে খুব খারাপ লাগছে। মনে খুব ব্যথা। কিন্তু প্রকৃতির কাছে আমরা অসহায়।’

নিরা নামে ইউএসটিসির এক শিক্ষার্থীর দুই পা নষ্ট হয়েছে বলে জানিয়ে গির বাহাদুর মহরা বলেন, ‘বড় ভাইয়ের বিয়েতে অংশগ্রহণ করার জন্য গত এক মাস আগে নিরা ভাই নেপাল গিয়েছিল। তার বাড়ি সিন্ধুপদে। যেখানকার লোকজন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিরা ভাই ভূমিকম্পে তার দুই পা হারিয়েছে। তার ভাইয়ের নতুন বউও আহত হয়েছে। তাঁরও পঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যে নিরা ভাই ডাক্তার হয়ে নেপালবাসীকে সেবা করার জন্য দূরদেশে পড়ালেখা করতে এসেছিল, সে এখন হাসপাতালের বেডে। ভূমিকম্পে তার স্বপ্নগুলো ধুমড়ে-মুচড়ে মলিন হয়ে গেছে।’

নেপালের শোনছড়ির বাসিন্দা সুনীল আচার্য বলেন, ‘যে এলাকায় আমার বাড়ি সেটি পাহাড় পর্বতে ঘেরা। ভূমিকম্পের ভয়ে এখানে অনেক মানুষ মাটির নিচে বাড়ি করে থাকে। শুনেছি বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ায় তারা অনেকে সেখানে আটকে ছিল। উদ্ধার কাজও খুব ধীর গতিতে চলছে। স্বজনদের কান্নার আওয়াজ হৃদয়ে তীরের মতো হানা দেয়। ইচ্ছে করে পড়ালেখা বাদ দিয়ে নেপালবাসীর জন্য কাজ করি। ভগবান কেন যে আমাদের সঙ্গে এমন করেছে জানি না। ভগবান আমাদের জন্য একটু সহায় হও।’

বিধ্বস্ত নেপালবাসীর টানে দেশে যেতে ইচ্ছে করছে কিনা এমন প্রশ্নে গির বাহাদুর মহরা বলেন, আমরা শিক্ষার্থী, এখানে পড়ালেখা করতে এসেছি। মন চাইলেও অনেক সময় মনকে বোঝাতে হয়। আমি যদি এখন নেপালে যাই প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকা খরচ হবে। কিন্তু লাভ কি হবে। এর চেয়ে এ টাকাগুলো যদি তাদের কাছে পাঠাতে পারি, তবে কিছু একটা তো হবে। আমরা বাংলাদেশ থেকে নেপালবাসীর জন্য সাহায্য পাঠাচ্ছি।

বাংলাদেশীরা অনেক উদার উল্লেখ করে গির বাহাদুর বলেন, ‘আমি মনে করেছিলাম এখান থেকে তেমন কোন সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারব না। প্রথমদিন নেপালবাসীর জন্য একটি প্রার্থনার আয়োজন করি। সেখানে বাংলাদেশীরা স্বতঃস্ফূর্তভাতে অংশগ্রহণ করে। আমরা ১৩ জন করে দু’টি টিম করে বিভিন্ন স্থান থেকে টাকা ও ওষুধ সংগ্রহ করতে থাকি। পাঁচ দিনের মধ্যে আমরা প্রায় বাংলাদেশী ২ লাখ টাকা এবং অনেকগুলো ওষুধ সংগ্রহ করে দেশে পাঠাতে পেরেছি। যার কাছে গিয়েছি কেউ আমাদের ফিরিয়ে দেননি। সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী সবাই কিছু না কিছু সহযোগিতা করেছে। এজন্য আমরা চিরদিন এদেশের প্রতি ঋণী হয়ে থাকব।’

বিশ্ববাসীকে নেপালের সাহায্যে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে নেপালী শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা সবাই মানুষ। প্রত্যেকটা মানুষই এ বিশ্ব ব্রহ্মা-ের একেকজন সদস্য। আর নেপালও বিশ্ব ব্রহ্মা-ের একটি অংশ। এ ক্ষতিটা শুধু নেপালের নয়, সারা মানব সভ্যতার। কারণ এক দেশের মানুষকে অসুখী রেখে মানবসভ্যতা সুখী হতে পারে না। তাই যার যার অবস্থান থেকে নেপালের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা প্রয়োজন। পৃথিবীতে এমন কোন মানুষ নেই যারা নেপালের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে কাঁদবে না। প্রতিদিন শুধু নিহতের জন্য কান্না করি। কাকে বোঝাব মনের ব্যথা। আমরা কি এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব, প্রশ্ন করেন সুনীল আচার্য।

আলাপ শেষে চলে আসার সময় গির বাহাদুর বলেন, ভাই মিডিয়ার মানুষ চাইলে অনেক কিছু করতে পারে। আপনারা আমাদের দেশের জন্য কিছু একটা করুন। যাতে সকল বাধা অতিক্রম করে হিমালয় কন্যা পুনরায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। আমরা জানি আপনারা অনেক সহযোগিতা করছেন। বাংলাদেশ সরকার চালসহ বিভিন্ন ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে নেপালে। কিন্তু দেশীয় প্রশাসনের উদাসীনতায় অনেক এলাকায় কোন ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাচ্ছে না। তাই আপনারা একটু লিখুন।

শনিবার (২৫ এপ্রিল) নেপাল, বাংলাদেশ ও ভারতে একযোগে আঘাত হানে শক্তিশালী এই ভূমিকম্প। উৎপত্তিস্থলে রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৯। মার্কিন ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল কাঠমান্ডুর অদূরে পোখরার কাছে লামজুং। এতে প্রায় নেপালের ৮০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিহত হয় ১০ হাজারেরও অধিক মানুষ।

প্রকাশিত : ১০ মে ২০১৫

১০/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: