কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কৃষি নীতি কি আলমারীতেই থাকবে

প্রকাশিত : ১০ মে ২০১৫
কৃষি নীতি কি আলমারীতেই থাকবে
  • কাওসার রহমান

জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান শতকরা ২০ ভাগের কাছাকাছি। স্বাধীনতার সময় এ হার ছিল শতকরা ৬০ ভাগ। জিডিপিতে কৃষির অবদান শতকরা হারে কমে যাওয়া মানে কৃষি খাতের সঙ্কোচন নয়। এর অর্থ হলো, অন্য খাতের বিপুল প্রসার। স্বাধীনতার পর শিল্প খাত ছিল সঙ্কুচিত। সেবা খাতও তখন তেমন উন্মোচিত হয়নি। অথচ বর্তমান সময়ে সেবা খাত হলো বিরাট প্রসারিত একটি খাত। তেমনি শিল্প খাতে সমৃদ্ধিও উল্লেখ করার মতো। বিশেষ করে পোশাকশিল্পে অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে। বিশ্বে এখন পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। আরও কিছু শিল্পে বাংলাদেশ ক্রমেই এগিয়ে চলছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এসব কারণেই জিডিপিতে কৃষি খাতে অবদান হ্রাস পেয়েছে। তবে আমরা যদি উৎপাদনের পরিমাণ বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাবে, কৃষি খাতে বৈপ্লবিক উন্নতি হয়েছে। আধুনিক ও উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে তিনগুণেরও বেশি সম্প্রসারিত হয়েছে এ খাত।

স্বাধীনতার আগে এবং পরে সাড়ে সাত কোটি মানুষের শতকরা ৬০ ভাগ খাদ্য উৎপাদন হতো দেশে। বাকিটা আমদানি করতে হতো বাইরে থেকে। বর্তমানে দেশের ১৬ কোটি মানুষের সম্পূর্ণ খাদ্য চাহিদা মেটানো হচ্ছে দেশের উৎপাদন থেকেই। এ থেকে বোঝা যায়, কৃষি খাতের উন্নতি কতখানি ব্যাপক। আর এ উন্নতি কোন জাদুকরী কারণে ঘটেনি। এর পেছনে ছিল সঠিক পরিকল্পনা ও কৃষকের বিপুল শ্রম।

হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল পালনে আগের মতো আর প্রাকৃতিক খাদ্য পাওয়া যায় না। গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির জন্য অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদন করতে হচ্ছে। ফলে আবাদি জমির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। সেচ নির্ভরশীলতা কৃষি উৎপাদনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যেতে শুরু করেছে। কখনও কখনও সেচের পানি সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমের শেষার্ধে। সেচের পানি উত্তোলনে বাড়ছে খরচও।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায় ২০১২-১৩ সালে শস্য ও সবজি উপখাতে প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জন না হওয়ায় সার্বিকভাবে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি হ্রাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চলতি মূল্যে কৃষি খাত থেকে দেশজ উৎপাদন বা জিডিপিতে ২০০১-০২ অর্থবছরে আয় হয়েছিল ৪৮ হাজার কোটি টাকা। আর ২০১২-১৩ অর্থবছরে তা ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি দাঁড়িয়েছে। তবে দেশের সার্বিক আয় বৃদ্ধির ফলে জিডিপিতে কৃষি খাতের হিস্যা কমে যাচ্ছে।

বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা অনুযায়ী খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রেখে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনে প্রয়োজন সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। দেশের সীমিত আবাদি জমির উৎপাদনক্ষমতা বজায় রেখে প্রতিবছর যে পরিমাণ খাদ্য উৎপাদন হয়, তা অব্যাহত থাকার পর ভবিষ্যতে দেশের বর্ধিত খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হলে টেকসই বা স্থিতিশীল কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে। এতে ফসল ও ফসলের জাত নির্বাচনে কৃষকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও নির্বাচনের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজন হবে। কারণ বীজ ব্যবসায়ী বা কোম্পানিগুলোর প্রভাবমুক্ত থেকে উপযোগী ফসলের জাত বাছাই ও ফসলি জমির উর্বরা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব স্থিতিশীল কৃষি উৎপাদন-ই ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে।

ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, মিল, কল-কারখানা নির্মাণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য উৎপাদনে মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ কমছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা আরও ১০ কোটি বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের সীমিত আবাদি জমি থেকে প্রতিদিন ২৫ কোটি মানুষের খাদ্য সরবরাহের প্রয়োজন হতে পারে। তখন সারা বছরের খাদ্য উৎপাদনে আবাদি জমির পরিমাণ মাথাপিছু ৮ শতকের নিচে দাঁড়াবে। বর্তমানে এটি ১৩ শতকে চলে এসেছে এবং সত্তরের দশকে ছিল ২৭ শতক। এ স্বল্প জমি অধিক ব্যবহারের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে, বিশেষ করে মাটি ও পানির ওপর।

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান কর্মকা- এবং জীবনীশক্তি। উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি এবং গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বিশাল জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধির জন্য কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। দেশের জিডিপিতে কৃষি খাত (ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ এবং বন) গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এ খাত শ্রম শক্তির প্রায় অর্ধেকের কর্মসংস্থান যোগান এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহ করে। কৃষি সামাজিক কর্মকা-ের এক বিশেষ ক্ষেত্র যা জনগণের খাদ্য ও পুষ্টির নিশ্চয়তা, আয়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য হ্রাসকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এছাড়া, কৃষি বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্যের বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় ভোক্তাদের বাজারের চাহিদাভিত্তিক মালামালের উৎস। তাই গ্রামীণ দারিদ্র হ্রাসকরণে কৃষি ক্ষেত্রের উন্নয়ন এবং এর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা অপরিহার্য। প্রয়োজন সমন্বিত কৃষি নীতি এবং এর কার্যকরী বাস্তবায়ন।

কর্মপদ্ধতি

ট্রেডক্রাফট এক্সচেঞ্জ কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘এলিভিয়েটিং পোভার্টি ইন নর্থ ইস্ট বাংলাদেশ (আপন) এবং অলটারনেটিভ লাইভলিহুড অপশনস (আলো) প্রকল্পের আওতায় এই অবস্থানপত্র (চড়ংরঃরড়হ চধঢ়বৎ) তৈরি করা হয়েছে। অবস্থানপত্রটি তৈরির মেথোডোলজি হচ্ছে- রিপোর্ট অন স্টেকহোল্ডার পলিসি কনসালটেশন শীর্ষক গবেষণা এবং কৃষি খাত নিয়ে বিভিন্ন গবেষণাপত্র পর্যালোচনা। তার ভিত্তিতেই এই অবস্থানপত্রটি তৈরি করা হয়েছে।

যুক্তরাজ্য সরকারের অর্থায়ন সংস্থা ডিপার্টমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (ডিএফআইডি) এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারী উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ট্রেডক্রাফট এক্সচেঞ্জের অর্থায়নে এবং ট্রেডক্রাফট এক্সচেঞ্জ ও ডেভেলপমেন্ট হুইল যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।

নীতি পর্যালোচনা

সরকারের কৃষি, মৎস ও পশুসম্পদ উপখাতে মোট ৫টি নীতি রয়েছে। এগুলো হলো- জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৩, জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতি ২০১২, জাতীয় মৎস্যনীতি ১৯৯৮, জাতীয় পশুসম্পদ উন্নয়ন নীতি ২০০৭ এবং জাতীয় পশুসম্পদ সম্প্রসারণ নীতি ২০১৩। দেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে নীতিগুলো বেশ চমৎকার। সবগুলো নীতিতেই কৃষির উন্নয়নে ভাল ভাল কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিসহ অধিকতর ফসল উৎপাদন এবং কৃষি কার্যক্রম বহুমুখীকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন করা। কিন্তু এসব নীতি বাস্তবায়নে এখন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন প্রয়োজন। প্রয়োজন নীতিগুলো কে বাস্তবায়ন করবে সেই বিষয়টিও যথাযথভাবে নির্ধারণ করা। এখানে বেসরকারী খাতের ভূমিকা কি হবে সেটাও সুনির্দিষ্ট করা দরকার।

আর একটি বিষয় হলোÑ নীতি বাস্তবায়ন করতে হলে অর্থের প্রয়োজন। নীতি বাস্তবায়নের বাজেট কোথা থেকে আসবে, কিভাবে বাজেট বরাদ্দ হবে- সেদিক নির্দেশনাও নীতিতে উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। এসব নীতির আর একটি সমস্যা হলো- সরকারী কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা মিলে এসব নীতি প্রণয়ন করেছেন। পাশাপাশি এসব নীতিতে কৃষকের মতামতের প্রতিফলন থাকা উচিত। নীতিগুলোতে কৃষকের মতামত প্রতিফলিত হলে তাদের চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা সঠিকভাবে উঠে আসবে। সরকারের বাস্তবায়নের সামর্থের বাইরে এমন কিছু নীতিতে না থাকাই ভাল। তবে সুদূরপ্রসারী দিক নির্দেশনা থাকতে পারে।

জাতীয় মৎস্যনীতিতে মিঠা পানিতে দেশীয় জাতের মাছ চাষের বিষয়টি বেশ সুন্দরভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে আরও মনোযোগ দেয়া প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশে মাছ চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে মাছ উৎপাদনে দেশ চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। তবে পশু সম্পদের উন্নয়নের প্রতি জোর দিতে গিয়ে খাদ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সঠিক মনোযোগ পায়নি। ফলে কৃষি নীতির পরও কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মুল্য পাচ্ছে না।

এই নীতিগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নীতিগত সমন্বয়য়ের আরও প্রয়োজন রয়েছে। তবে নীতিগুলো যেহেতু চলমান, তাই সময়ে সময়ে এগুলো যুগপোযোগী করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও করার সুযোগ রয়েছে। পর্যালোচনায় এই তিন উপখাতের নীতিগুলো বেশ পরিকল্পনা মাফিক করা হয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়। এক্ষেত্রে শস্য, মৎস্য ও পশুসম্পদ উন্নয়নের প্রতি যথেষ্ট নজর দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রধান সমস্যা হচ্ছে বাস্তবায়ন। বাংলাদেশে এ সমস্যা অবশ্য সব নীতির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বাংলাদেশে অনেক সুন্দর সুন্দর নীতি হয়, কিন্তু এসব নীতি সব সময় সজতনে আলমিরাতেই থেকে যায়। মাঠে বাস্তবায়নের হার খুব কম। আবার ক্ষেত্র বিশেষে এসব নীতি বাস্তবায়ন করাও কঠিন। কারণ বাস্তবায়ন করতে গেলে যে অবকাঠামো, জনবল ও অর্থের প্রয়োজন, তা সীমিত সম্পদের কারণে সব সময় সরকার বরাদ্দ করতে পারে না।

অন্যদিকে, তৃণমূল পর্যায়ে যারা এই নীতির সেবা দেবে, আর যারা এই সেবা গ্রহণ করবে, তারাও নীতি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়েকেবহাল নয়। তাই নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি কৃষকদের নীতি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। আর কৃষকদের সচেতন করতে হলে তাদের দলবদ্ধ বা সংঘবদ্ধ করতে হবে। কৃষক সংগঠন গড়ে তোলাই তাদের সংগঠিত করার সহজ পথ। আবার যারা কৃষি সেবা দেবেন, তাদেরও নীতি সম্পর্কে সচেতন বা সম্যক ধারণা থাকা উচিত। তাদের প্রশিক্ষিত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতে হবে দায়িত্ব সম্পর্কে।

প্রকাশিত : ১০ মে ২০১৫

১০/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: