রৌদ্রজ্জ্বল, তাপমাত্রা ২৩.৯ °C
 
৮ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

আগুনমুখা দ্বীপে ববিতার ঘুম ভাঙ্গে মোরগের ডাকে

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫

পনেরো বছরের বালিকাবধূ ববিতার জীবন অনেকটাই ছকে বাঁধা। কোলে দেড় বছরের শিশুপুত্র নিয়ে দিনের শুরু হয় সাত সকালে মোরগের ডাকে। পুরো দিনটাই কাটে ক্ষেত-খামার, নদী, গরু আর ঘর গেরস্তির কাজে। মাঝে স্বামী, সন্তান, শ্বশুর-শাশুড়ির সেবাযতœ থেকে শুরু করে রান্নাবান্নার কাজতো আছেই। সংসারের সব কাজ সেরে ফুরসত মেলে কেবল রাতের আঁধারে। যদিও এ জীবন নিয়ে তার আক্ষেপ আছে। দুঃখ আছে। তবুও নিরুপায়ের মতো সবকিছু নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়ে মেনে নিয়েছে জীবন।

ববিতার সঙ্গে দেখা আগুনমুখা দ্বীপে। আগুনমুখা নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয় দ্বীপ আগুনমুখায়। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের নয়নাভিরাম এ দ্বীপের হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি পরিবারের সামান্য কিছু জমি আছে। বাকিরা ভূমিহীন। অধিকাংশের পেশা নদী-সাগরে মাছ ধরা আর ক্ষেত-খামার, ঘরবাড়িতে দিনমজুরি। এমনই ভূমিহীন পরিবারের বালিকাবধূ ববিতা। হিসাব করে দেখা গেল তার বয়স বড়জোর পনেরো। অথচ এতটুকু বয়সেই তার কোলে দেড় বছরের শিশুপুত্র জিহাদ। বৈশাখের তপ্ত দুপুরে জিহাদকে কোলে নিয়ে কথায় কথায় জানাল, চরটিতে সব মিলে দু’-আড়াই শ’ মানুষের বাস। এরমধ্যে শিশুর সংখ্যা ৬০-৭০। দ্বীপে কোন স্কুল নেই। তাই অন্য শিশুদের মতো সেও কোনদিন স্কুলে যায়নি। নিজের নামটিও লিখতে জানে না। যদিও তার স্বপ্ন ছিল মাথার চুলে লাল ঝুমকা গুঁজে, কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে যাওয়ার। কিন্তু সে স্বপ্ন অধরা রয়ে গেছে।

বাবা মোজাফফর আর মা রাহেলা বেগমের সংসারে ববিতা সবার বড়। মোজাফফর জানান, দ্বীপটিতে তিনি কুড়ি বছর ধরে আছেন। আগে বাড়ি ছিল ভোলায়। অল্প বয়সে ববিতার বিয়ে দেয়ার কারণ সম্পর্কে জানান, বাল্যবিয়ে এ চরটিতে অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বীপের সকলেই মনে করেন, দশ-বারো বছরেই মেয়েদের বিয়ে দিতে হয়। তাদের মতে, এ বয়সের মেয়েদের ওপর বখাটে আর জমির মালিক-মহাজনদের নজর পড়ে। রাতে চোর-ডাকাত, জলদস্যুদের হাতে আক্রান্তের আশঙ্কা থাকে। এ বয়সে তেমন যৌতুকও দিতে হয় না। বয়স যত বাড়ে, যৌতুকের পরিমাণ তত বাড়ে। তাই দশ-বারোতেই বিয়ে।

ববিতার স্বামী এ দ্বীপেরই ছেলে আবু সালেহ। বাড়ি খানিকটা দূরে। বনের কাছে। আবু সালেহর বয়স ১৭-১৮ বছরের বেশি হবে না। বছরের ৬-৭ মাস কাটে মহাজনের নৌকায় মাছ ধরে। বাকি সময়টা দিনমজুরি। বাবা-মা, ছোট দুটি বোন, স্ত্রী ববিতা আর সন্তান জিহাদকে নিয়ে আবু সালেহর সংসার। মাছ ধরা কিংবা দিনমজুরি কোনটাতেই সংসার চলে না। অভাব-অনটন লেগে আছে। তাই বালিকাবধূ ববিতাকেও সংসারের জন্য খাটতে হয়।

দিনযাপনের ফিরিস্তি দিয়ে ববিতা জানায়, ভোরে তার ঘুম ভাঙ্গে মোরগের ডাকে। জিহাদকে কোলে নিয়ে নামতে হয় উঠানে, যেখানে রাতে বাঁধা থাকে মহাজনের দেয়া ৬টি গরু। সেগুলোকে নিয়ে যেতে হয় দূরের জমিতে, যেখানে ঘাস মেলে। ফেরার পথে গোবর কুড়িয়ে আনতে হয় ঘুঁটে দেয়ার জন্য। বাড়ি ফিরে স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়িসহ সবাইকে নিয়ে ভরপেট পান্তা খেয়ে সকাল ৭টা-সাড়ে ৭টার মধ্যে আবার কাজে নামতে হয়। কোনদিন ছোট জাল নিয়ে নদী-খালে মাছ ধরতে যেতে হয়। আবার কোনদিন যেতে হয় বনের পাশের জঙ্গলে শাক লতাপাতা তুলতে, যা দিয়ে হবে দুপুরের খাবার। এগারোটার মধ্যে বাড়ি ফিরে শুরু হয় রান্না, যা শেষ হতেই আবার যেতে হয় মাঠে। যেখানে বাঁধা আছে গরুগুলো। বাড়ি ফিরে দু’টো মুখে দিয়েই বসে পড়তে হয় ঘুঁটে দেয়ার কাজে। শেষবেলায় আবার গরুগুলোকে নিয়ে আসতে হয় বাড়ি। সন্ধ্যায় ফেরে স্বামী। তাকেসহ অন্যদের খাইয়ে-দাইয়ে রাত নামতেই বিছানায়। এমন ছকে বাঁধা জীবনের মাঝেও ববিতার আছে অতৃপ্তি। আছে অনেক না পাওয়ার বেদনা।

ববিতা জানায়, যখন তার বিয়ে হয়, তখন স্বামী-সন্তান, ঘর-সংসারের বিষয়ে কোন ধারণাই ছিল না। বাবা-মা জোর করেই দ্বীপের মৌলভী ডেকে আবু সালেহর হাতে তুলে দিয়েছিল। লালপেড়ে সুতির শাড়ি পরে সে এসেছিল স্বামীর বাড়িতে। প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হতো। একা হলেই কাঁদত। সে কান্নার শব্দ কেউ শুনতে পেত না। যখন গর্ভে জিহাদ এলো, তখন ধীরে ধীরে সব মেনে নিল। সন্তান প্রসবে তার খুব কষ্ট হয়েছিল। ববিতা জানায়, দ্বীপের দাই দিয়ে সন্তান প্রসবের চেষ্টা হয়েছিল। চারদিন খুব ধকল গেছে। প্রসব বেদনায় ঘরের মাটির মেঝেতে শুধু গড়াগড়ি খেয়েছে। শেষ পর্যন্ত নৌকায় করে তাকে আগুনমুখা নদী পাড়ি দিয়ে বোয়ালিয়া গ্রামে নিয়ে যেতে হয়েছে। সেখানে তার সন্তান প্রসব হয়। আর এসব করতে গিয়ে মহাজনের একটি গরু বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। এজন্য মহাজন এখনও প্রায়শ এসে নানা হুমকি-ধমকি দিয়ে যায়। সন্তান জন্মের পর তার ভাগ্যে ভালো খাবার দূরের কথা, চিকিৎসার কোন ধরনের সুযোগও মেলেনি। যে কারণে এখন শরীরে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। বেশি হাঁটাচলা বা কাজ করলে মাথা ঘোরে। বুক ধড়ফড় করে। হাত কাঁপে। চোখেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। মাথার চুল অনেক পড়ে গেছে। এমন আরও নানা সমস্যায় আক্রান্ত সে।

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে ববিতা বলল, ‘আর যেন কোন মাইয়ার ছোডকালে বিয়া না হয়। ছোডকালে বিয়া হইলে যে কত কষড, যার না হইছে, হে বুঝবে না। হ্যার চাইতে মইরা যাওয়া অনেক ভাল।’

Ñশংকর লাল দাশ, গলাচিপা থেকে

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫

০৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: