আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৭ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

কেমন আছে বালিকা বধূরা?

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫
  • গরিব ঘরের সুন্দর মেয়েকে অভিভাবকরা সাততাড়াতাড়ি বিদায় করতে চান

নোলক পরা ঘোমটা টানা ছোট্ট এক বালিকা বধূ হয়ে যাচ্ছে দূরের কোন গাঁয়ে। এই দৃশ্য গেল শতকের ’৮০-এর দশকেও দেখা গেছে। দৃশ্যপট দুই, বগুড়ার কাহালু নন্দীগ্রাম এলাকায় ’৬০-এর দশকের শেষ ভাগেও পরিবারের উভয়পক্ষের সম্মতিতে কোলের শিশুর বিয়ে দেয়া হয়েছে। এই বিয়ের নাম ছিল কোলে কোলে বিয়ে। ’৯০-এর দশকের শেষের দিকেও বেশিরভাগ গ্রামে বালিকাদের বধূ হওয়ার খবর মিলেছে। কেউ বাধা দেয়নি। একবিংশ শতকের শুরুতে এই দৃশ্য একটু করে পাল্টাতে শুরু করে। গ্রামে বাল্যবিয়ের খবর প্রশাসনের কানে পৌঁছলে তা বাধা দেয়ার জন্য আইন দ্রুত সক্রিয় হয়ে বালিকা বধূ হওয়ার আগেই শিকল টেনেছিঁড়ে ফেলার পালা শুরু হয়। এভাবে আইন এগিয়ে যাচ্ছে। তারপরও সচেতনতার অভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে আজও কোন না কোন গ্রামে বালিকার বধূ হওয়ার খবর মিলছে। এ ক্ষেত্রে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দায়ী অভিভাবকগণ। দায়ী অবশ্যই করতে হয় যিনি বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন তাকে। তবে তারও হাত-পা বাঁধা হয়ে যায় কয়েকটি কারনেÑ ১. ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা থেকে যে জন্মসনদ আনা হয় (বয়স বাড়িয়ে) তা তাকে মানতেই হয়। ২. এলাকার মাতব্বর প্রবীণ ব্যক্তি ও প্রভাবশালী যখন কাজীকে বিয়ে পড়াতে ও লিখতে বাধ্য করেন তখন অপরাগতা প্রকাশ করতে পারেন না। কারণ ওই গ্রামেই তাকে থাকতে হয়। ৩. উপঢৌকন পুরস্কার ও নগদ অর্থ অর্থাৎ ‘ঘুষ’ নামের বিষয়টি এখানে কার্যকর হয়।

বাল্যবিয়ের বিষয়ে অভিভাবক থেকে শুরু করে উল্লিখিত প্রতিটি ক্ষেত্রই শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বর্তমানে প্রচলিত আইনে বিয়ের বয়স আইনগতভাবে নির্ধারণ করা আছে মেয়ের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের বেশি। ছেলের ক্ষেত্রে ২১ বছরের বেশি। অনেক গ্রামে বিশেষ নদী তীরের চরগ্রামে বাল্যবিয়ের প্রবণতা কিছুটা বেশি। এর অন্যতম কারণ ভৌগলিক অবস্থান। চর এলাকা নদীর ভেতরে হওয়ায় নিরাপত্তার বিষয়টি প্রথমে আসে। চরের কোন সুন্দরী মেয়ে থাকলে তার ওপর দৃষ্টি পড়ে ‘অনেকের’ (ছেলেদের তো পড়েই বয়সীরাও বাদ যায় না)। এই সুন্দর মেয়ে যদি মধ্যম ও গরিব ঘরের হয় তাহলে অভিভাবকের চিন্তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। কেস স্টাডিতে দেখা গেছে এই অভিভাবক কোন রকমের রোজগেরে ছেলে মিললেই বিয়ে দেয়। তখন ছেলেমেয়ে কারও বয়স দেখা হয় না। বিষয়টি হয়ে দাঁড়ায় এমনইÑ মেয়েকে কোন রকমে ঘর থেকে বিদায় করতে পারলেই বোধকরি অভিভাবকের চিন্তা দূর হয় (তা কি হয়!)। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে বালিকা বধূর পরবর্তী জীবনে নেমে আসে একের পর এক দুঃখগাথা ঘটনা। সারা জীবনের জন্য চোখের জল ঝরতে থাকে। এত কিছুর মধ্যে বর্তমানের একটি পজিটিভ দিকÑ যে এলাকায় শিক্ষিত নারী বেশি সেই এলাকায় বাল্যবিয়ের হার অনেক কম। অর্থাৎ নারী শিক্ষিত হলে সে বুঝতে শেখে কম বয়সে বিয়ের নেগেটিভ দিক কত হতে পারে। কোন নারী যখন বুঝতে শেখে যাকে নিয়ে সারা জীবন কাটাতে হবে তাকে একটু দেখেশুনে যাচাই করে নেয়াই ভাল, তখনই কম বয়সে বিয়ের ভাবনাটা একবারে কমে আসে। তারপরও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাল্যবিয়ের যে তথ্য দিয়েছে তা উদ্বেগজনক।

বাল্যবিয়ের হার এখনও সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে বলা হয়, দেশের মোট জনসংখ্যা ১৫ কোটি ৭০ লাখ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস ১ হাজার ২০ জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ। ১৮ বছর বয়স হওয়ার আগেই ৬০ শতাংশ নারীর বিয়ে হয়। গ্রামে এই হার বেশি। চাইল্ড ম্যারেজ ইন বাংলাদেশ শিরোনামে প্রকাশিত এক জরিপে বলা হয়, ১৮ বছরের কম বয়সী বিয়ে হওয়া নারীদের ৮৬ শতাংশই নিরক্ষর (!)। তবে এই বিষয়ে মতপার্থক্য আছে। বর্তমানে গ্রামে ও শহরে মেয়েদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তির হার ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। ড্রপ আউটের হার নেই বললেই চলে। ১৮ বছরের কম বয়সী মেয়েদের যে বিয়ে হচ্ছে তা কোন না কোনভাবে অভিভাবকের সম্মতিতে হচ্ছে।

মাঠ পর্যায়ের একটি কেস স্টাডি, বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ গ্রামে বছর কয়েক আগে বিয়ে হয় হাসনা বানুর সঙ্গে একই গ্রামের মোহসিন আলীর (সামাজিক নিরাপত্তায় প্রকৃত নাম গোপন রাখা হলো)। চার বছরে তিন সন্তানের জন্ম দেয় হাসনা বানু। ইউটেরাসে মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ায় মানসিকভাবেও সে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। দিনের পর দিন এই অবস্থা চলে। একপর্যায়ে সে জটিল মেয়েলিরোগে আক্রান্ত হয়, তার চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হয় না। করুণ পরিণতির দিকে যাওয়ার পথে মোহসিন স্ত্রীকে না জানিয়ে পুনরায় বিয়ের পিঁড়িতে বসে। এর পরের অধ্যায়...। বগুড়ার ধুনটের এক গ্রাম গোসাইবাড়ি। বালিকা গুলজানকে অভিভভাবকের চাপে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। একপর্যায়ে স্বামীর নানা আচরণে ও পরিবারের লোকদের অন্তর্মুখী ব্যবহারে সে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। পরিণাম শুভ হয় না। নির্যাতনকে চাপা দেয়ার মাশুল দিতে হয় তালাকপত্রে। এই দুই কেস স্টাডি নারীর জীবন বাঁচিয়ে রেখেছে হয়ত। সুখ কি পেয়েছে তারা! অনেক ঘটনা আছে যার পরিণতি মৃত্যু পর্যন্ত গড়ায়। সামাজিক অঘটনের পাশাপশি চিকিৎসা বিজ্ঞান কি বলে এবার তা দেখা যাকÑ বাল্যবিয়েতে প্রজনন অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। দেশ স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) ছিল ছয় দশমিক তিন। অর্থাৎ একজন মা বছরে গড়ে ছয়জনেরও বেশি শিশুর জন্ম দিত। ১৯৯৩ সালে এই হার দাঁড়ায় তিন দশমিক চার। বর্তমানে এই হার নেমে এসেছে দুই দশমিক একে। বিশেষজ্ঞের মতে যা এখনও ‘এ্যালার্মিং’। এই অবস্থার অন্যতম কারণ হলো বালিকা বা কিশোরীদের মা হওয়া। অথাৎ এই হিসাবেও দেখা যায় দেশে বাল্যবিয়ের হার এখনও কমেনি। জাতিসংঘ ঘোষিত এক ঘোষণায় বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাল্যবিয়ের হার কমিয়ে আনতে হবে। অনেক উন্নত দেশে মেয়েদের বিয়ের বয়স ২০ বছরে বাড়িয়ে দেয়ার ভাবনা হচ্ছে। ভারতেও এই ভাবনায় মেয়েদের বিয়ের বয়স ২০ বছরে করার চিন্তা ভাবনা হচ্ছে সূত্র এমনটিই জানায়। এর একটি উদাহারণ দেখা যায়, ভারতীয় টিভির একটি বিজ্ঞাপনে। যেখানে বাবা যখন মেয়েকে বিয়ের কথা বলছে, তখন মেয়ে রাজি না হওয়ায় বাবার মন খারাপ। কিছুক্ষণ পরই মেয়ে বাবাকে গিয়ে বলছে, সে বিয়ে করবে। বাবার মুখে হাসি। মেয়ে তখনই বলে ওঠে ‘তবে তিন বছর পর বিয়ে করবে, স্বাবলম্বী হয়ে এবং ছেলেকে চিনে।’এভাবে সেই দেশে বাল্যবিয়ের বয়স বাড়ানোর ভাবনায় প্রোমোশনাল কাজ হচ্ছে। আর বাংলাদেশে কিছুদিন হয় এক ধরনের সেমিনারে বলাবলি হচ্ছিল বাল্যবিয়ের হার কমিয়ে আনতে বিয়ের বয়স ১৬ বছর করা হোক। কি সাংঘাতিক যুক্তি! পরে অবশ্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বয়সের এই মাত্রা থেকে সরে এসেছে। মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ বছর বহাল আছে। এই বিষয়ে একজন গাইনিকোলজিস্ট জানান, ১৮ বছরর আগে কোন মেয়ে সন্তান ধারণ করলে ঝুঁকি এতটাই বেড়ে যায় যে মৃত্যুর আশঙ্কা তো থাকেই কোনভাবে সন্তান প্রসব হওয়ার পর সারা জীবনের জন্য তার দেহে নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়। এত কিছুর পর এখনও বালিকা বধূদের সংসার বসছে।

Ñসমুদ্র হক, বগুড়া থেকে

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫

০৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: