কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জ্বালানি সঙ্কট সমাধানের প্রচেষ্টা ॥ ত্রিদেশীয় পাইপ লাইনে যুক্ত হওয়ার চিন্তা

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫
  • মিয়ানমার থেকে ত্রিপুরা হয়ে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে কলকাতা পর্যন্ত পাইপলাইন হবে

রশিদ মামুন ॥ ত্রিদেশীয় পাইপ লাইনে যুক্ত হয়ে দেশের জ্বালানি সঙ্কট সমাধানের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। মিয়ানমার থেকে ত্রিপুরা হয়ে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে কলকাতা পর্যন্ত এই পাইপলাইন নির্মাণের চিন্তা করা হচ্ছে। মিয়ানমারও দ্বিপাক্ষিকভাবে বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যুত জ্বালানি খাতে সহায়তা বৃদ্ধিতে সম্মত রয়েছে। আলাচনার জন্য চলতি মাসে মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। পূর্ব ভারতজুড়ে গ্যাস গ্রিড নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ডাক দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাংলাদেশ ওই পাইপলাইনে নিজেদের সম্পৃক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও ভারতের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়নি।

যদিও বিদ্যুত বিভাগ বলছে মার্চের শেষ দিকে দিল্লীতে একটি জ্বালানি সম্মেলনে যোগ দেন বিদ্যুত জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে একই মঞ্চে বসে দুই দেশের জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে পারস্পরিক সহায়তা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন নসরুল হামিদ। ওই সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদি ছাড়াও ভারতের পেট্রোলিয়ামমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের সঙ্গে দু’দেশের জ্বালানি-সহযোগিতা নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেন তিনি।

ওই বৈঠকের পর দিল্লীতে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বলতে পারেন আমরাও এই গ্যাস-গ্রিডে আসতে চাই। যেমন ধরুন, ভবিষ্যতে মিয়ানমার থেকে ভারতে যদি গ্যাস সরবরাহ করা হয় বাংলাদেশও তার একটা অংশ নিতে পারে।

তিনি আরও জানান, রিলায়েন্স বা আদানির মতো ভারতের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীও বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করছে। আমদানি কয়লা খাতে একটি কোল টার্মিনাল গড়ে তুলতে চাইছে, রিলায়েন্স চাইছে এলএনজি ব্যবহার করে বিদ্যুত উৎপাদন করতে। বাংলাদেশের খুলনা অঞ্চলে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে তারা ভারতের হিরানন্দানি শিল্পগোষ্ঠীর একটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চিন্তা করছে। পশ্চিমবঙ্গের দীঘা উপকূলের কাছের সমুদ্রে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ করছে হিরানন্দানি। এখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে খুলনা এলাকায় গ্যাস আমদানির চিন্তা করছে।

এর আগে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই গ্যাস-গ্রিডের পরিকল্পনা ঘোষণা করে বলেন, পূর্ব ভারতের শিল্প-সম্ভাবনা বিকশিত করতে হলে সেখানে গ্যাস গ্রিড নেটওয়ার্ক বা জ্বালানির প্রয়োজন হবেই। মোদি বলেন, ‘বিহারের পাটনা বা অন্য যে কোন শহরে, কিংবা আসাম-পশ্চিমবঙ্গে যেখানেই গ্যাস পাইপলাইন বসবে, সেখানেই শিল্প আসতে বাধ্য। আর এ কারণেই আমরা গ্যাস গ্রিড বা পাইপলাইনের এক সুবিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতের সহযোগিতা জোরদার করতে চাইছে। গত মাসে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী মিয়ানমার সফরে যান। ওই সফরে জ্বালানি সহায়তার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হলেও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি। মিয়ানমারও বাংলাদেশে জ্বালানি সরবরাহ করতে এখনও সম্মত হয়নি।

জানতে চাইলে জ্বালানি সচিব আবু বক্কর সিদ্দিক এ প্রসঙ্গে জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা চেষ্টা করছি মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের। চলতি মাসে মিয়ানমারের একটি প্রতিনিধি দলের এ বিষয়ে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। তবে এখনও ওই সফরের দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়নি। বিষয়টি সমন্বয় করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকে গ্যাস আমদানির বিষয় উত্থাপন করা হবে। তবে এখনও আলোচনার বিষয়বস্তু সুনির্দিষ্ট করা হয়নি।

প্রসঙ্গত এর আগে ২০১২ সালে চার দেশীয় পাইপলাইনে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা করে বাংলাদেশ। ওই সময় তুর্কমেনিস্তান থেকে আফগানিস্তান, পাকিস্তান হয়ে ভারত পর্যন্ত চার দেশীয় গ্যাস পাইপলাইনে (টাপি প্রকল্প) বাংলাদেশের সংযুক্তির প্রাথমিক প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে এ বিষয়ে স্টিয়ারিং কমিটি।

ওই সময় এডিবির পরিচালক রুনি স্ট্রোম অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপ-সচিব নেছার আহমেদকে পাঠানো এক চিঠিতে জানান প্রকল্পে সংযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আগে তুর্কমেনিস্তানের কাছে গ্যাস কেনার প্রস্তাব দিতে হবে। জ্বালানি বিভাগ ওই প্রস্তাব পাঠায়। তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারত নিয়ে চার দেশীয় গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই সঞ্চালন লাইনকে সংক্ষেপে টাপি পাইপলাইন বলা হয়। দীর্ঘ আলোচনার পর ২০০৫ সালে চার দেশীয় গ্যাস সঞ্চালন লাইনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ফল প্রকাশ করে এডিবি। এই পাইপলাইন নির্মাণ করছে সেন্ট্রাল এশিয়া গ্যাস পাইপলাইন লিমিটেড, যা সেন্টগ্যাস কনসোর্টিয়াম হিসেবে পরিচিত। এই কনসোর্টিয়ামের নেতৃত্ব দিচ্ছে মার্কিন কোম্পানি ইউনোকল। এক হাজার ৭৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ৫৬ ইঞ্চি ব্যাসের এই গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণে ব্যয় হবে সাত দশমিক ছয় বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এডিবির অর্থায়নে ২০১৭ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তুর্কমেনিস্তান থেকে গ্যাস কেনার জন্য ১৯৯৫ সালে পাকিস্তান চুক্তি করে। পরবর্তীতে ২০০২ সালে আফগানিস্তানের আগ্রহে তুর্কমেনিস্তান যৌথভাবে পাকিস্তান এবং আফগানিস্তনের সঙ্গে চুক্তি করে। ভারতও পরবর্তী সময়ে এই প্রকল্পে নিজেদের নাম লেখায়। কিন্তু পাইপলাইনের বিশাল নির্মাণ ব্যায়ের কারণেই বাংলাদেশ বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। যদিও দীর্ঘ মেয়াদী জ্বালানি সঙ্কট সমাধানে বিষয়টিকে উপযোগী বলে মনে করছিলেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এবার মিয়ানমার-ভারত-বাংলাদেশের এই প্রকল্পকে আশাব্যঞ্জক বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫

০৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: