আংশিক মেঘলা, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, মঙ্গলবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

টেকনাফে মানব পাচারকারী পুলিশ বন্দুকযুদ্ধ ॥ সর্বাত্মক অভিযান

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫
  • পুলিশের গুলিতে ৩ পাচারকারী নিহত
  • পাচারকারীদের গুলিতে ৪ পুলিশ আহত

মোয়াজ্জেমুল হক/এইচএম এরশাদ ॥ মানব পাচারকারীর বিরুদ্ধে সরকারী নির্দেশে কঠোর অভিযানে নেমেছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। শুক্রবার ভোরে এমনই একটি অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত ৩ দালাল। এ ঘটনায় আহত হয়েছে টেকনাফ থানার ওসিসহ ৪ পুলিশ সদস্য। বন্দুকযুদ্ধের পর ঘটনাস্থল থেকে ২টি বন্দুক ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছে পুলিশ। ভোর ৪টার দিকে টেকনাফ উপজেলার সৈকতে বিচ হ্যাচারি জোনে বন্দুকযুদ্ধের এ ঘটনা ঘটে। নিহত দালালরা হচ্ছেÑ সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের মূলনায়ক মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নাগরিক (বর্তমানে বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাস) তাজর মুল্লুকের প্রধান সহযোগী শাহপরীরদ্বীপের বাজারপাড়ার সোলতান আহমদের পুত্র ধলু হোসেন (৫৪), সাবরাং খারিয়াখালির কবির আহমদের পুত্র জাফর আহমদ (৩৭) ও কাটাবুনিয়ার আবদুল মাজেদের পুত্র জাহাঙ্গীর আলম (৩৪)। আহত চার পুলিশ সদস্য হলেন- ওসি মোঃ আতাউর রহমান খন্দকার, ওসি (তদন্ত) কবির হোসেন, এসআই মোঃ আবুল কালাম এবং কনস্টেবল আবদুল বারী। নিহত তিন দালালের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে টেকনাফ থানায় মানব পাচার আইনে ১৯টি মামলা রয়েছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত শীর্ষ ইয়াবা ও মানব পাচারকারী ধলু হোসেন ওরফে ধলু মাঝি কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফে নিজ বাড়িতে যায়। এদিকে, বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে পাচার হওয়া নিরীহ মানুষদের নিয়ে গণকবর ও বন্দী শিবিরের সচিত্র প্রতিবেদন দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় ফলাও প্রচার হওয়ার পর কক্সবাজার অঞ্চলে জোরালোভাবে ইয়াবা ও মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছে। আর ইয়াবা ও মানব পাচারের শীর্ষস্থানীয় স্পটগুলো টেকনাফ থেকে কক্সবাজার হয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত। বিভিন্ন সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়ে টেকনাফ পুলিশ বৃহস্পতিবার রাতে টেকনাফের বিভিন্ন পয়েন্টে অভিযান শুরু করে। শুক্রবার ভোরে পুলিশ অভিযান চালায় টেকনাফ সৈকতের বিচ হ্যাচারি জোন এলাকায়। সেখানে ধলু হোসেনের নেতৃত্বে দালালদের অবস্থান ছিল। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পাচারকারীদের পক্ষ থেকে গুলিবর্ষণ শুরু হয়। এ সময় পুলিশও পাল্টা গুলি শুরু করে। উভয়পক্ষের গোলাগুলির মাঝে ওই ৩ দালাল গুলিবিদ্ধ হয়। আহতাবস্থায় এদের স্থানীয় টেকনাফ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলে ডাক্তাররা তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

এদিকে, বিভিন্ন সংস্থার নাম ভাঙ্গিয়ে দাপটের সঙ্গে মানবপাচার কাজে জড়িত যুবদল নেতা উখিয়ার সোনাইছড়ির ইসলাম মিয়ার পুত্র শামসুল আলমকে হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ। শামসুল আলম সমুদ্রপথে মানব পাচারের অন্যতম গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত। তার মাধ্যমে কয়েক শ’ অসহায় মানুষ পাচার হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। যাদের অনেকের খোঁজ মিলছে না। ইতোপূর্বে শামসুল আলম মানব পাচারের মামলায় গ্রেফতার হয়ে জামিনে এসে আরও বেপরোয়াভাবে পাচার কাজে জড়িত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালে কক্সবাজার জেলায় বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে উদ্ধার হয়েছে অবৈধপথে প্রায় ৩ হাজার মালয়েশিয়াগামী। এ সময় বিভিন্ন থানায় মানবপাচার আইনে ৩০৬ মামলায় ১ হাজার ৫৩১ জনকে আসািিম করা হয়েছে। এদের মধ্যে আটক হয়েছে ৪৭৭ জন। সম্প্রতি থাইল্যান্ডে বহু গণকবরে মিয়ানমার ও বাংলাদেশী অসংখ্য লোকজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় সরকারসহ নড়েচড়ে উঠেছে বিভিন্ন মহল।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমেদ জনকণ্ঠকে জানান, ২০১২ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়াগামী ১৩২ জনকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় আটক করা হয় ৮৬ জন পাচারকারীর দলের সদস্যকে। এ ব্যাপারে ১৭৭ জনকে আসামি করে ২৭ টি মামলা লিপিবদ্ধ করা হয়। ২০১৩ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়াগামী ১হাজার ২৮ জনকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় আটক হয়েছে ১১৩ জন পাচারকারী দালাল। এ ব্যাপারে ৮১ টি মামলায় ৪২৭ জনকে আসামি করেছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়াগামী ২৩৫ জনকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ৬৩ জন আটক ও ১৯০ জনকে আসামি করে ৫৮টি মামলা লিপিবদ্ধ করা হয়।

সূত্র জানায়, গত ২ এপ্রিল রাতে মালয়েশিয়াগামীদের উদ্ধার করতে গিয়ে কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের হিমছড়ি পাহাড়ে বন্য হাতির আক্রমণে ১৭ বিজিবির ল্যান্সনায়েক হাবিবুর রহমান নিহত হন। এ বছরের ২৯ জানুয়ারি সকাল ১০টায় বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া চ্যানেলের খোদাইবাড়ি পয়েন্টে দেড় শ’ যাত্রী নিয়ে এফভি ইদ্রিছ নামে একটি ট্রলার ডুবে যায়। সন্ধ্যা নাগাদ ডুবে যাওয়া ট্রলারসহ ৪২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। একদিন পর শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও স্থানীয়রা যৌথ অভিযান চালিয়ে ৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করে। একইদিন বিকেলে ১জনের মৃতদেহ ও পরের দিন আরও ১ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করে মহেশখালী থানা পুলিশ। এ ঘটনায় ১১ দালালের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে মামলা করেছে পুলিশ। তবে নিমজ্জিত ট্রলারের মালিক মানবপাচারের গডফাদার যুবদল নেতা উখিয়ার সেই শামসুল আলম অঢেল টাকা খরচ করে মামলা থেকে বাদ পড়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অবৈধপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে গত বছরের ১৭ নবেম্বর ৬২০ জনকে আটক করে নৌবাহিনী। সেন্টমার্টিন দ্বীপের ৫০ নটিক্যাল মাইল অদূরে মিয়ানমারের পতাকাবাহী একটি ট্রলার থেকে তাদের আটক করা হয়। আটকদের মধ্যে ৫৫৫ পুরুষ, ৩১ নারী, ২৬ শিশুসহ ৬ জন পাচারকারী ও দু’জন দালাল চক্রের সদস্য। এদের মধ্যে ২১ জন মিয়ানমারের নাগরিকও ছিল। এ ঘটনায় নৌবাহিনী দুটি মামলা দায়ের করে।

২০১৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে চকরিয়া পৌরসভার পালাকাটা এলাকা থেকে ১৯ জনকে আটক করে পুলিশ। এ সময় আটককৃতরা জানান, দালালরা তাদের কাছ থেকে মাথাপিছু ১০-১৫ হাজার টাকা করে নিয়ে কক্সবাজার নিয়ে আসে। পরে রাতে সাগরে নিয়ে তাদের দস্যুদের হাতে তুলে দেয়। দস্যুরা তাদের টাকাপয়সা লুট করে ছেড়ে দেয়।

গেল বছরের ১১ জুন ৩১৮ যাত্রী নিয়ে টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে সেন্টমার্টিনের অদূরে বঙ্গোপসাগরে দালালদের নিযুক্ত বিদেশী সন্ত্রাসীর গুলিতে পাঁচজন নিহত হন। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন আরও ৬৩ যাত্রী। পরে কোস্টগার্ডের সদস্যরা সাগর থেকে হতাহত যাত্রীদের উদ্ধার করেছিল। গত বছরের ৪ আগস্ট শহরের নাজিরাটেক উপকূলে শতাধিক যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলার নিমজ্জিত হয়। এতে এক যাত্রীর মৃত্যু হয়। তার আগে গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি কোস্টগার্ড সদস্যরা সেন্টমার্টিন এলাকা থেকে ২১১ যাত্রী বোঝাই দুটি ট্রলার জব্দ করেছিল। এসব যাত্রীর মধ্যে মিয়ানমারের ২০ নারী ও ১৭ শিশু ছিল।

কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি জানান, উদ্ধার হওয়া মালয়েশিয়াগামীরা দালালদের চিনলেও বিভিন্ন কারণে চেনে না বলে জানিয়ে থাকে। এ কারণে আসল দালালদের সহজে চিহ্নিত করা যায় না। কক্সবাজার বিজিবি-১৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুল আলম জানান, মানবপাচারকারী মূল নিয়ন্ত্রককে চিহ্নিত করে গ্রেফতার করতে হবে। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এটি নিয়ন্ত্রণ করছে। তাছাড়া জনপ্রতিনিধি, সামাজিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক ও সমাজের সচেতন ব্যক্তিকে মানবপাচার রোধে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি অফিস সূত্রে জানানো হয়েছে, উপকূলীয় এলাকার থানা পুলিশকে মানব ও ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। কোনভাবেই মিয়ানমার থেকে যাতে ইয়াবার চালান আসতে না পারে এবং দেশ থেকে সমুদ্রপথে মানব পাচার ঘটতে না পারে সেদিকে নজর রাখার বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। একই ধরনের নির্দেশনা পেয়েছে বিজিবি, কোস্টগার্ড সদস্যরাও।

এদিকে, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম থেকে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াগামী ৮ ব্যক্তিকে উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড। একই অভিযানে আটক করা হয় ২ দালালসহ পাচারকারী চক্রের ৪ সদস্যকে। কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের কমান্ডার ক্যাপ্টেন শহীদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, একটি কাঠের নৌকায় ভাসমান অবস্থায় ছিল এই ১২ জন। এক সঙ্গে এত মানুষ ও নৌকাটির গতিবিধি দেখে সন্দেহ হওয়ায় কোস্টগার্ডের টহল দল তল্লাশি চালায়। নৌকাটি থামিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সেখানে অবৈধভাবে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াগামী ৮ জন রয়েছে। বাকি ৪ জনের মধ্যে দু’জন দালাল ও দু’জন পাচারকারী চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাদের পতেঙ্গা থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম থেকে সেন্টমার্টিন উপকূলের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সমুদ্রপথে মানব পাচার অব্যাহত। নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, পুলিশ, বিজিবি সদস্যদের কঠোর নিরাপত্তার ফাঁকে মানব পাচার চলছে। বহির্নোঙ্গরে বৃহস্পতিবার ৮ জন আটকের ঘটনাটি ছিল পাচার কার্যক্রমের সর্বশেষ প্রক্রিয়া।

প্রকাশিত : ৯ মে ২০১৫

০৯/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



ব্রেকিং নিউজ: