কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রবীন্দ্রনাথ ॥ পদ্মা আমার প্রেয়সী

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫
  • মাহবুব রেজা

দিন যত যাচ্ছে বাঙালি জীবনে অপরিহার্য হয়ে উঠছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা অন্তপ্রাণ তাঁর সমস্ত কর্মকা-ে, চিন্তায়, ভাবনায়, চেতনায়, রচনায় চিত্রকলা বাংলার সীমাহীন রূপ-মাধুর্যে মোহাবিষ্ট ছিলেন। শুধু মোহাবিষ্ট নয় ষোলআনা নিমজ্জিতও ছিলেন বলা যায়। তাঁর লেখায়, গানে, চিত্রকলা, চিঠিপত্রে, দৈনন্দিন জীবনাচরণে বাংলার প্রকৃতি আর সৌন্দর্য ছিল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গ্রামবাংলার নিঝুম দুুপুর, রৌদ্রভরা সকাল, পূর্ণিমা রাত, বর্ষার দু’কূল প্লাবী সৌন্দর্য, গাছপালার মিতালি সবকিছুতে রবীন্দ্রনাথ যারপর নাই মুগ্ধ ছিলেন। এই মুগ্ধতার যেন কোন শেষ নেই। তাঁর জীবনব্যাপী এ মুগ্ধতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বাংলার জাদুকরী রূপবিভায় কবি নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন পুরোপুরি। বাংলার প্রকৃতি তাঁকে নানাভাবে বিভোর রেখেছে তাঁর বহুমাত্রিক রূপবৈচিত্র্যে।

তাঁর কলকাতার দম বন্ধ হওয়া জীবন ছিল একদম অপছন্দ। চারদিকে যান্ত্রিক কোলাহলÑ তাতে জীবনের দেখা নেই। তাই শিলাইদহ, সাজাদপুর, পতিসর, পদ্মাতীরÑ সব মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজে পরিপূর্ণ হয়েছেন। পরিপূর্ণ থেকেছেনও। পতিসর থেকে ১৮৯৪ সালে তিনি লিখছেন, “পাড়াগাঁয়ে মধ্যাহ্নের এই হাঁসের ডাক, পাখির ডাক, নৌকো চলা, জলের ছলছল ধ্বনি এবং আপনার মনের ভেতরকার একটা উদাম আলস্যপূর্ণ স্বগত সঙ্গীতস্বর কলকাতার চৌকি-টেবিল-সমাকীর্ণ বর্ণবৈচিত্র্যবিহীন নিত্যনৈমিত্তিকতার মধ্যে কল্পনাও করতে পারি নে।” মধ্যাহ্ন প্রকৃতি কবিকে নানাভাবে আকর্ষণ করত দুুপুর বেলাকার নিস্তব্ধতা কবির ভেতরে এক অন্য ধরনের ব্যঞ্জনা তৈরি করত। তার প্রমাণ দেখি কবির উচ্চারণে, “মধ্যাহ্ন প্রকৃতির নানারকম অনির্দিষ্ট ধ্বনিÑ দুয়েকটা পাখির ডাক, মৌমাছির গুনগুনÑসব শুধু একটা করুণ ঘুমপাড়ানি গান।”

১৮৯১ সালে কবি একই রকম আরেকটি চিত্র এঁকেছেন তাতে তিনি লিখছেন, “রৌদ্রে চারদিক বেশ নিঃঝুম হয়ে থাকে। মনটা ভারি উড়ুউড়ু করে, বই হাতে নিয়ে আর পড়তে ইচ্ছে করে না।... এক রকম ঘামের গন্ধ এবং থেকে থেকে পৃথিবীর একটা গরম ভাপ পায়ের ওপরে এসে লাগতে থাকে। মনে হয় এই জীবন্ত উত্তপ্ত ধরণী আমার খুব নিকটে থেকে নিঃশ্বাস ফেলছে, বোধ করি আমারও নিঃশ্বাস তার গায়ে লাগছে।”

কবির সমস্ত জীবন ছিল বহুমুখী কর্ম পদচারণায় মুখর। জীবনের শুরু থেকে নানা রকম ভিন্ন চিন্তায়, ভিন্ন কর্মকা-ে তিনি তাঁর আশপাশে মানুষজনকে প্রভাবিত করেছেন। তাঁর চিন্তার সঙ্গে অন্যদের সংযুক্ত করেছেনÑ স্বপ্নের সঙ্গে একীভূত করেছেন। গ্রামবাংলার বাস্তবতা, প্রান্তিক মানুষ, কৃষি ব্যবস্থা, সমবায় চিন্তা, গ্রাম উন্নয়ন, কৃষক মুক্তির উপায়, নারী স্বাধীনতা, সমাজচিন্তা, অর্থনৈতিক সংস্কার, বিশ্বের সমকালীন বাস্তবতা, শিক্ষাচিন্তা, প্রগতিশীলতা সব বিষয়ে নিজস্ব অবস্থান ও যুক্তি তুলে ধরেছেন। সময়ের চেয়ে অগ্রবর্তী থাকা ছিল তাঁর নিত্যসাধনা। অগ্রসর চিন্তার ডালপালা তাঁর নিজের ভেতরে প্রোথিত হতো এবং সেসব তিনি অকাতরে বিলিয়ে দিতেন চারদিকে। নিজের জ্ঞানকে, ভিন্ন চিন্তাকে দশদিগন্তে ছড়িয়ে দিয়েছেন অকৃপণভাবে।

পদ্মা নানাভাবে কবিকে ঋণী করেছে। এ কথা কবিও কবুল করেছেন বারবার তাঁর বিভিন্ন রচনায়। পদ্মা-ইছামতি-নাগর নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশ কবিকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছিল। নাগরিক কবির জীবনে পদ্মা তার সীমাহীন প্রভাব রেখেছিল। পদ্মী তীরের বিচিত্র প্রকৃতি রবীন্দ্রনাথের লেখায় উঠে এসেছে। তিনি লিখছেন, “প্রকা- চর-ধুধু করছেÑ কোথাও শেষ দেখা যায় না। কেবল মাঝে মাঝে নদীর রেখাÑ গ্রাম নেই। লোক নেই, তরু নেই, তৃণ নেইÑ ওপরে অনন্ত নীলিমা আর নিচে অনন্ত পা-ুরতা, আকাশ শূন্য ধরণীও শূন্য, নিচে দরিদ্র শুষ্ক কঠিন শূন্যতা। হঠাৎ পশ্চিমে দেখা যায় স্রোতহীন ছোটে নদীর কোল, ওপারে উঁচু পাড়, গাছপালা, কুটির সন্ধ্যাসূর্যালোকে আশ্চর্য স্বপ্নের মতো। ঠিক যেন একপাড়ে সৃষ্টি এবং আর এক পাড়ে প্রলয়।”

পদ্মা তীরবর্তী মানুষের দুঃখগাথা আর এর সন্ধ্যা প্রকৃতিও তাঁকে অসম্ভব মুগ্ধ করে রাখত। খেড়ো ঘর, মাঝেমধ্যে চালশূন্য মাটির দেয়াল, দুএকটা খড়ের স্তূপ, কুলগাছ, আমগাছ, বটগাছ এবং বাঁশের ঝাড় নিয়ে পদ্মাপাড়ের গ্রাম তাঁর রচনায় জীবন্ত হয়ে উঠত। পদ্মায় পুরোপুরি আচ্ছন্ন থেকেছেন তিনি।,’... পদ্মার আতিথ্য নিয়েছি, বৈশাখের খররৌদ্রতাপে, শ্রাবণের মুষলধারা বর্ষণে। পরপারে ছিল ছায়াঘন পল্লীর শ্যামশ্রী, এপারে ছিল বালুচরের পা-ুবর্ণ জনহীনতা, মাঝখানে পদ্মার চলমান স্রোতের পটে বুলিয়ে এসেছে দ্যুলোকের শিল্পী প্রহরে প্রহরে নানাবর্ণের আলোছায়ার তুলি। এইখানে নির্জন-সজনের নিত্য সংগ্রাম চলেছিল আমার জীবনে। অহরহ সুখ-দুঃখের বাণী নিয়ে মানুষের জীবনধারার বিচিত্র কলরব এসে পৌঁচ্ছিল আমার হৃদয়ে। কিন্তু এই সঙ্গে আপন সুখ-দুঃখের মুহূর্তগুলোও মিশে যাচ্ছিল বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবলোকের মধ্যে নিত্যসচল অভিজ্ঞতার প্রবর্তনায়।”

জমিদারি দেখাশোনা করতে এসে রবীন্দ্রনাথ পদ্মাপাড়ের জীবনকে নিজের মধ্যে একাকার করে নিয়েছিলেন। এখানকার মানুষের দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনাকে নিজের করে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে পদ্মাপাড়ের কৃষকদের দুঃখ-কষ্ট কবিকে খুব কষ্ট দিতÑ তিনি তাদের কষ্টের ভাগীদার হওয়ার বাসনা পুষেছিলেন। বৃষ্টি পানি, দ্রুত নদীর জল বেড়ে ওঠায় কাঁচা ধানের জন্য কৃষকদের খুব দুঃখ-দুর্দশায় পড়তে হতো। রবীন্দ্রনাথ দেখতে পেতেন, চাষিরা কাঁচা ধান কেটে নৌকো বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছে। এই যে নৌকো বোঝাই করে কৃষকরা তাদের কাঁচা ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে তিনি যেন কৃষকদের বুকের ভেতরের হাহাকার শুনতে পাচ্ছেন। কবি অনুভব করতে পারেন আর ক’টা দিন ধানগুলো মাঠে থাকতে পারলেই পেকে যেত কিন্তু আগাম বর্ষা, কিংবা নদীর জল বেড়ে যাওয়ায় ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ার কষ্ট কৃষকের চেয়ে কবিকেও কম কষ্ট দিত না। কৃষকের কষ্টের সমভাগীদার হতে কবি নিজেই ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘নৈতিক দুঃখ এক, আর পাকা ধান ডুবে যাওয়ার দুঃখ আর।”

শিলাইদহ-সাজাদপুর-পতিসর রবীন্দ্র রচনায় এক স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে। এখানকার জীবনযাত্রা, প্রান্তিক মানুষের হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনা তাঁকে সবচেয়ে বেশি টেনেছে। আকর্ষণ করেছে। পদ্মাপাড়ের জীবনবোধ কবিকে ভিন্ন স্বাতন্ত্রে দাঁড় করাতে প্রেরণা জুগিয়েছিল। তা না হলে তিনি পদ্মাকে কেন্দ্র করে অমন বিস্ময় জাগানিয়া রচনা তৈরি করতে পারতেন না। পদ্মাপাড়ে অবস্থান করার সময় রবীন্দ্রনাথের মনে হয়েছে ‘সাধনা’ পত্রিকার জন্য ভারি ভারি কথার প্রবন্ধ তৈরির চেয়ে দেখা জীবনের গল্প অনেক শ্রেয়। শিলাইদহে এক জুনে (১৮৯৪) তিনি বলছেন, “যাদের কথা লিখব তারা আমার দিনরাত্রির সমস্ত অবসর একেবারে ভরে রেখে দেবে, আমার একলা মনের সঙ্গী হবে, বর্ষার সময় আমার বদ্ধ ঘরের বিরহ দূর করবে এবং রৌদ্রের সময় পদ্মাতীরের উজ্জ্বল দৃশ্যের মধ্যে আমার চোখের পরে বেড়িয়ে বেড়াবে।” সাজাদপুরে বসেও রবীন্দ্রনাথ ৫ সেপ্টেম্বর ১৮৯৪তে একই কথার প্রতিধ্বনি তুলে বলছেন, “.... এখানকার দুপুর বেলাকার মধ্যে বড় একটি নিবিড় মোহ আছে। রৌদ্রের উত্তাপ, নিস্তব্ধতা, নির্জনতা, পাখিদের বিশেষত কাকের ডাক এবং সুদীর্ঘ সুন্দর অবসর-আমাকে ভারি উদাস এবং আকুল করে।... আমার এই সাজাদপুরের দুপুরবেলা গল্পের দুপুরবেলা।”

রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাসে পদ্মপাড়ের প্রান্তিক, খেটে খাওয়া সংগ্রামী মানুষের জীবনচিত্র প্রতিভাত হয়েছে নানাভাবে। রবীন্দ্রনাথের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতায় এসব বিশদ উঠে এসেছে। এসবের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন তাঁর দার্শনিক ও তাত্ত্বিক চিন্তার প্রকাশ পেয়েছে অন্যদিকে জীবন ও ঘটনাভিত্তিক বাস্তবতার প্রকাশও ঘটেছে। এই দুই অভিজ্ঞতা তাঁর রচনার ছত্রে ছত্রে উন্মোচিত হয়েছে। চোখে দেখা বাস্তব জীবনের সত্য ঘটনা তা-ই মেলে ধরেছেন। কবি বর্ষা ও বর্ষণে বিপর্যস্ত পদ্মাপাড়ের জীবনের প্রতি তাঁর আত্মীয়তা প্রকাশিত হয়। এসব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের তীক্ষè অনুভূতি প্রকাশ পায়,“এক একটি কুঁড়েঘর স্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার চারিপার্শ্বের সমস্ত প্রাঙ্গণ জলমগ্ন।... তারই মধ্যে লতাপাতা গুল্ম পচতে থাকে, গোয়ালঘর এবং মানবগৃহের আবর্জনা চারদিকে ভাসতে থাকে, পাট-পচা দুর্গন্ধে জলের রঙ নীল হয়ে ওঠে, উলঙ্গ পেটমোটা পা-সরু রুগ্ন ছেলেমেয়েগুলো জলে কাদায় মাখামাখি, ঝাঁপাঝাঁপি করতে থাকে, মশার ঝাঁক স্থির পচা জলের ওপর একটি বাষ্পস্তরের মতো ঝাঁক বেঁধে ভন ভন করতে থাকে। গৃহন্থের মেয়েরা ভিজে শাড়ি গায়ে জড়িয়ে বাদলার ঠা-া হাওয়া বৃষ্টির জলে ভিজতে ভিজতে হাঁটুর ওপর কাপড় তুলে জল ঠেলে ঠেলে সহিষ্ণু জন্তুর মতো ঘরকন্নার নিত্যকর্ম করছেÑ তখন সে দৃশ্য কিছুতেই ভাল লাগে না।”

শিলাইদহের মানুষ এবং প্রকৃতি-এই দুইয়ে নানাভাবে আচ্ছন্ন থেকেছেন রবীন্দ্রনাথ। পদ্মাতীরের অসহনীয় নৈসর্গিক দৃশ্যাবলী কবিকে বশীভূত করে রেখেছে। শিলাইদহের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে কবি লিখেছেন, “বেলায় উঠে দেখলুম চমৎকার রোদদুর উঠেছে এবং শরতের পরিপূর্ণ নদীর জল তল-তল থৈ-থৈ করছে। নদীর জল এবং তীর প্রায় সমতল, ধানের ক্ষেত সুন্দর সবুজ, গ্রামের গাছপালা সতেজ এবং নিবিড় হয়ে উঠেছে। এমন সুন্দর লাগল সে আর কী বলব। বিকেলে পদ্মার ধারে নারকেল বনের মধ্যে সূর্যাস্ত হলো।... দূরে আমবাগানে সন্ধ্যার ছায়া পড়ে আসছে। নারকেল গাছগুলোর পেছনে আকাশ সোনায় সোনালি হয়ে উঠেছে। পৃথিবী যে কী আশ্চর্য সুন্দরী তা এইখানে না এলে মনে পড়ে না।... যখন সন্ধ্যাবেলা জল স্তব্ধ থাকে, তীর আবছায়া হয়ে আসে এবং আকাশের প্রান্তে সূর্যাস্তের দীপ্তি ক্রমে ম্লান হয়ে যায়, তখন আমার সর্বাঙ্গে নিস্তব্ধ প্রকৃতির কী একটা বৃহৎ, উদার, বাক্যহীন স্পর্শ অনুভব করি”।

শিলাইদহে এক বৈশাখী সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথ নিজেকে আবিষ্কার করেন এক ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, “আর কি কখনও এমন প্রশান্ত সন্ধ্যাবেলায়, এই নিস্তব্ধ গড়াই নদীটির ওপর বাংলাদেশের এই সুন্দর একটি কোণে এমন নিশ্চিন্ত মুগ্ধ মনে জলিবোটের ওপর বিছানা পেতে পড়ে থাকতে পাব। হয়ত আর কোন জন্মে এমন একটি সন্ধ্যাবেলা আর কখনও ফিরে পাব না।... সে সন্ধ্যা এমন নিস্তব্ধভাবে তার সমস্ত কেশপাশ ছড়িয়ে দিয়ে আমার বুকের ওপরে এত সুগভীর ভালবাসার সঙ্গে পড়ে থাকবে না।”

রবীন্দ্রনাথ পদ্মাকে ‘প্রেয়সী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাংলার মাটি, প্রকৃতি ও গ্রামীণ মানুষ-জনপদের এক অদৃশ্য বন্ধনে তিনি আটকা পড়েছিলেন। শিলাইদহ থেকে তাঁর বিদায়ের ক্ষণটিও ছিল বেদনাবিধূর। শিলাইদহে শেষ পুণ্যাহের বিষণœ দিনে সে কথার উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৮৯৫ সালের ৪ অক্টোবর এক আবেগঘন চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বিষয়টিকে তুলে ধরেছিলেন, “একটা ব্যাঘাতের সম্ভাবনা আসন্ন হওয়াতেই আজকের এই নিভৃত নিস্তব্ধ উপভোগটি মনের মধ্যে এমন নিবিড়তর হয়ে এসেছে। যেন আমার কাছে আমার এই অভিমানী প্রবাসঙ্গিনী করুণ অনিমেষ পেলে বিদায় নিতে এসেছে, আমাকে যেন বলছে, ‘কিসের তোমার ঘরকরনা এবং আত্মীয়তার বন্ধন। আমি যে তোমার চিরদিনের সাধনা... অসংখ্য খ- পরিচয়ের মধ্যে তোমার একমাত্র চিরপরিচিতা।’ কিন্তু বর্তমানে কর্মক্ষেত্রে প্রত্যেক সংসারে এসব কথা অলিক শোনাবে। যা হোক, এই শরতের অপর্যাপ্ত শান্তির মধ্যে আমার আত্মাকে স্তরে স্তরে সিক্ত করে নেয়া আমার পক্ষে কম ব্যাপার নয়। এ জীবনে আমার যা কিছু গভীরতম তৃপ্তি ও প্রীতি সে কেবল এই রকম নির্জন, সুন্দর মুহূর্তে পুঞ্জীভূতভাবে আমার কাছে ধরা দেয়।”

তরুণ বয়স থেকে জীবনের শেষ অবধি পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ ছিলেন পদ্মায়। পদ্মার সঙ্গে কবির ব্যক্তিগত সখ্য ছিল সর্বজনবিদিত। রবীন্দ্র সমালোচকরা কেউ কেউ বলেন পদ্মার সঙ্গে নাকি কবির মন দেয়া-নেয়ার সম্পর্ক ছিল। এর প্রমাণও মেলে ছিন্নপত্রাবলীতে।

কবি পদ্মাকে যে প্রেয়সী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন তার যথার্থতা মেলে তাঁর নানা সময়ের লেখায়, রেখায়, গানেও কবিতায়। পদ্মার অপার ভালবাসায় সিক্ত হয়েছেন কবি। ভালবাসার পদ্মাকে হারানোর চিন্তাই করতে পারতেন না তিনি, ‘প্রতিবার এই পদ্মার উপর আসবার আগে ভয় হয়, আমার পদ্মা বোধ হয় পুরনো হয়ে গেছে। কিন্তু যখনই বোট ভাসিয়ে দিই, চারিদিকে জল কুলকুল করে ওঠে, চারিদিকে একটা স্পন্দন, কম্পন, মৃদু কলধ্বনি, বর্ণ এবং নৃত্য এবং সঙ্গীত এবং সৌন্দর্যের একটি নিত্য উৎসব উদঘাটিত হয়ে যায়, তখন আবার নতুন করে আমার হৃদয় অভিভূত হয়ে যায়।’

রবীন্দ্র সাহিত্যে পদ্মা তার দু’কূল প্লাবী সৌন্দর্য নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল, ফেলেছিল ভালবাসার দীর্ঘ ছায়া।

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫

০৮/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: