মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘দেবযানী’ অস্তিত্ববাদী নারীর পথিকৃৎ

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫
  • মাহফুজা হিলালী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নারী চরিত্র অঙ্কনে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন। যে সময় গল্প-উপন্যাস-নাটকে পুরুষের চরিত্রেই অধিকারসচেতনতা অনুপস্থিত, সে সময় রবীন্দ্রনাথ নারীকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছেন। তাঁর ‘বিদায় অভিশাপ’ নাটকে দেবযানী নিজের অধিকারের কথা সরবে বলেছে।

বিদায়-অভিশাপ নাটকে দেবযানী একমাত্র নারী চরিত্র। সহস্রবর্ষের সাধনায় আচার্যের কাছে বিদ্যা লাভ করে দেবযানীকে ফেলে কচ স্বর্গে চলে যাচ্ছে। কিন্তু দেবযানী নিজের ভালোবাসা ভুলতে পারে না। কচকে জিজ্ঞাসা করে মনের ক্ষুদ্র কোণে কুশের অঙ্কুরসম ‘আর কিছু কামনা’ আছে কি-না। কিন্তু কচ বলে তার জীবন পূর্ণÑ কোনো দৈন্য কোনো শূন্য নাই। এ কথা শুনে দেবযানী কচকে ব্যঙ্গ করে অন্তর্জ্বালা মিটিয়েছে। সে বলেছে, সে কচকে যথাসাধ্য পূজা করেছে, কিন্তু স্বর্গসুখ দিতে পারেনি; এমনকি সুরললনার অনিন্দিত মুখও নেই এখানে। এটা তার অপরাধ। এই অপরাধের ক্ষমা চায় দেবযানী। ভালোবাসার মানুষকে এর চেয়ে বড়ো ব্যঙ্গ বাংলাসাহিত্যে নেই। দেবযানী দুঃখ-যন্ত্রণায় কাতর হয়ে ভেঙে পড়েনি, অভিমানে বাক্যহীন-নির্লিপ্ত থাকেনি কিংবা আত্মহননের পথ বেছে নেয়নি। চেষ্টা করেছে কচকে ফিরিয়ে নিজের কাছে রাখতে। দেবযানী-ই তার পিতাকে বলে পিতার কাছে কচের বিদ্যা শেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। দৈত্যরা ঈর্ষাভরে কচকে বধ করেছিল, দেবযানী প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে। এসব কারণে কচ দেবযানীকে কৃতজ্ঞতা জানায়। এতে দেবযানীর কষ্ট আরো বাড়ে। কৃতজ্ঞতার কথায় তার নিজেকে অপমানিত মনে হয়, কারণ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে প্রয়োজনের সম্পর্ক, আর সুখের সঙ্গে মনের আবেগের সম্পর্ক। কোনো উপায় না পেয়ে দেবযানী সরাসরিই কচকে বলে স্বর্গে ফিরে না গিয়ে মর্ত্যলোকেই স্বর্গলোক রচনা করতে। তার যুক্তি : জগতে শুধু বিদ্যার জন্যই দুঃখ সহে না, রমণীর জন্যও মহাতপ সহ্য করে পুরুষ। অবশেষে দেবযানী কচের কাছে কৈফিয়ত চায় : কেন অধ্যয়নশালা ছেড়ে বন বনান্তর খুঁজে ফুলের মালা গেঁথে এনে দিতো, প্রভাতে কুসুমরাশিতে করতো পূজা, অপরাহ্ণে জলসেচের জন্য তুলে দিতো জল, পালন করতো দেবযানীর মৃগশিশুটিকে, স্বর্গের সঙ্গীত শুনাতো। তবে কি এ সব শুধু দেবযানীকে বশ করে তার পিতার কাছে বিদ্যা শেখার জন্য? এরপর কচ বলেছে কর্তব্যের কাছে কচের প্রেম পরাজয় স্বীকার করেছে। স্পষ্টভাষী দেবযানীর পরিষ্কার কথা : কচ সগৌরবে স্বর্গলোকে চলে যাবে, নিজের কর্তব্য পালনে; কিন্তু দেবযানীর জীবনে কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। দেবযানীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের মর্যাদা না দিয়ে কচ প্রতারণা করতে উদ্যত হয়েছে। তাই অপমানে-দুঃখে-যন্ত্রণায়- রাগে দেবযানী কচকে অভিশাপ দেয় : “যে বিদ্যার তরে/ মোরে কর অবহেলা, সে বিদ্যা তোমার/ সম্পূর্ণ হবে না বশ Ñ তুমি শুধু তার/ ভারবাহী হয়ে রবে, করিবে না ভোগ;/ শিখাইবে, পারিবে না করিতে প্রয়োগ।”

যুগে যুগে দেবতারা নিজের প্রয়োজনের সময় নারী-সঙ্গ লাভ করে সুখী হয়েছেন। এরপর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে সেই নারীকেই দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়ে চলে গেছেন। দেবতাদের সেই প্রতারণা-প্রথার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ দেবযানীকে দিয়ে প্রতিবাদ করিয়েছেন। দেবযানীর নারীজীবনের অভিনবত্ব এবং সার্থকতা এখানেই। দেবযানীর কাছে প্রেম মহৎ এবং দুর্লভ। তাঁর প্রেমÑ নিজের মনের আবেগ। এ আবেগকে সে আড়াল করতে চায়নি। এক্ষেত্রে চরিত্রটি সর্বাঙ্গীণ আধুনিক। পুরাণযুগে দেবতার সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে নারীরা কষ্ট পেয়েছে, বর্তমান কালেও মেয়েরা ভাগ্যকে মেনে নেয়। কিন্তু দেবযানী দেবতার নির্ধারিত কর্তব্যকে অস্বীকার করে নিজের অধিকারের কথা বলেছে। এ অধিকার নিজের অস্তিত্ব, সম্মান, আমিত্ব প্রকাশের ঘোষণা। ‘মেনে নেওয়া’র যুগে মেনে না নিয়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং নিজের অধিকারের কথা বলা দুঃসাহসের। প্রমথনাথ বিশী যথার্থই বলেছেন, “দেবযানী প্রাচীনতম মডার্ন উওম্যান।”

রবীন্দ্রসাহিত্যে দেবযানীর মতো চরিত্র একটিও নেই। কুমুদিনী অনেক প্রতিবাদ করেছে, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ফিরে গেছে স্বামীর ঘরে। চিত্রাঙ্গদাও দেবযানীর মতো বেপরোয়া নয়। দেবযানী বাংলাসাহিত্যের অনন্য চরিত্র। অন্তরে সে প্রেমময়ী, অধিকার আদায়ে বলিষ্ঠ, সত্য উচ্চারণে অবিচল। সমাজে নারীর মেনে নেওয়া, নিজের কষ্টের কথা না বলা ইত্যাদি বিষয়গুলো নারীকে অবলারূপে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নারীও একজন মানুষ। মানুষের সমস্ত অধিকারই তাঁর অধিকার। পুরুষপ্রতিষ্ঠিত ধারায় চলে সে সমাজের বাহবা পায় ঠিকই, কিন্তু নিজে থাকে দুঃখের সাগরে নিমজ্জিত। দেবযানী চেষ্টা করেছে দুঃখে নিমজ্জিত না হয়ে সুখে ভাসতে। তবে সে সফল হতে পারে নি, কচকে আটকে রাখতে পারে নি নিজের কাছে। তাই সে কচকে অভিশাপ দিয়েছে। এটা তার গতানুগতিক প্রথার বিরুদ্ধে দৃপ্ত বিদ্রোহ, যা তাকে সাধারণ নারীর পর্যায় থেকে দৃঢ়চেতা-অস্তিত্ববাদী মানুষের পর্যায়ে উন্নীত করেছে। সে হয়েছে আজকের অস্তিত্ববাদী নারীর পথিকৃৎ।

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫

০৮/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: