কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৪ ডিসেম্বর ২০১৬, ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

‘কালি-কলম’ বার করলাম

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫
  • শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়

(পূর্ব প্রকাশের পর)

গুরুজনের আদেশ। অবহেলা না করে পড়তে বসলাম।

দশ পাতা পড়ে যেই থেমেছি, বললেন, বেশ পড় তুমি!

নাও, এবার চতুর্থ সর্গ আরম্ভ কর।

বললাম, আমার একটু কাজ ছিল।

-কাজ পরে হবে। রামায়ণ ছেড়ে উঠতে নেই। গোবিন্দ, চা দিয়ে যা।

সর্বনাশ! চতুর্থের পর পঞ্চম, পঞ্চমের পর ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম, দশম।

রাত্রি ন’টা!

এতক্ষণ পরে তিনি দয়া করে বললেন, এবার থাক। তুমি বেশ পড়তে পার। রোজ এমনি একটু করে আমাকে শুনিয়ো।

পরের দিন সকালেই আমহার্স্ট স্ট্রীট থেকে সোজা ভবানীপুর।

কাছেই মামার বাড়ি- সুকিয়া স্ট্রীট। ইচ্ছে করলেই যেতে পারতাম। সেখানেও অবশ্য গুরুজনের ভয়। তবে যোগবাশিষ্ঠ রামায়ণ নয়। সেখানে রোজ একবার করে বলবে, কাজকর্ম কিছু করবে? না এমনি টো-টো করে ঘুরে বেড়ালেই চলবে?

গল্প লিখছি শুনলেই তো হয়েছে! পায়ে হাত দিয়ে প্রতিজ্ঞা করাবে!- বল জীবনে আর কখনও এ অপকর্ম করবো না!

তার চেয়ে অনেক ভাল আমার সেই ভাঙা নড়বড়ে শাঁখারিপাড়ার মেস্।

আমার এক জ্যেঠতুতো ভাই থাকতো সেখানে। এ্যাটর্নি অফিসের কেরানী। সাহিত্যের ধারও ধারে না। কাজেই কি করছি না করছি খবরও নেবে না কোনদিন। মাসের শেষে মেসের টাকাটা কোনরকমে চুকিয়ে দিতে পারলেই বাস্, পরামনন্দে খাও দাও, লেখো আর ঘুমোও।

কিন্তু ঘুম আর হচ্ছে কই!

কেরানীদের মেস্। ন’টার ভেতর খাওয়া-দাওয়া খতম। দশটায় সব ভোঁ-ভাঁ।

ভাবলাম একটু গড়িয়ে নিই, তারপর লিখতে বসবো। এমনি নিরিবিলি জায়গাই চেয়েছিলাম মনে-মনে।

মেঝের ওপর শতরঞ্জি পাতাই ছিল। বালিশ একটা টেনে নিয়ে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু শুতে না শুতেই একি যন্ত্রণা? অজস্র ছারপোকা এসে আক্রমণ করলো। উঠে বসলাম। কিন্তু আশ্চর্য, কখন যে তারা কোনদিক দিয়ে পালালো বুঝতে পারলাম না।

চোখ বুজে শুয়ে আছি, ঘুম আর আসছে না! হঠাৎ অপরিচিত নারীকণ্ঠ!

-ও মা! এ আবার কোত্থেকে এলো। শুনছেন? উঠুন। ঘর ঝাঁট দেবো।

ধড়মড় করে উঠে বসলাম। মেসের ঝি। তাকালাম তার দিকে। কিন্তু চোখ ফেরানো যায় নাÑ এমন চেহারা! গায়ের রং ফরসা নয়, বরং কালোই বলা চলে। কিন্তু যৌবন যেন ফুটে বেরুচ্ছে তার সর্ব অঙ্গ দিয়ে। যেমন যৌবন তার তেমনি স্বাস্থ্য। মাথায় একমাথা মিশমিশে কালো চুল এলো খোঁপা করে বাঁধা, রঙিন শাড়ি আঁটসাঁট করে কোমরে জড়ানো। নিটোল দুটি হাতে মাত্র দু’গাছা কাঁচের রেশমী চুড়ি, কানে দুটো সস্তা লাল পাথর চিক্চিক্্ করছে। সুন্দর মুখে সবচেয়ে আশ্চর্য দুটি ঢলঢলে চোখ। দেখে মনে হলো খুব গরিব, গায়ে জামা পর্যন্ত নেই।

সুমুখের খাটখানা খালি পড়ে ছিল, সেইখানে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।

জিজ্ঞাসা করলাম, কি নাম তোমার?

ঘরের মেঝেয় সে তখন জল ছিটোচ্ছে। আমার দিকে না তাকিয়েই বললে, বাসিনী।

-কতদিন কাজ করছো এখানে?

-তিন মাস।

বললাম, বেশ আনন্দেই আছ তাহলে!

বাসিনী আপন মনেই কাজ করতে লাগল। জবাব দিলে না। আমি চোখ বুজে ঘুমোবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এবার আর ছারপোকার জ্বালায় নয়, বাসিনীর জ্বালায় চোখে ঘুম এলো না। মাঝে মাঝে চোখ চেয়ে দেখছিলাম সে কি করছে। ঝাঁট দেয়া শেষ করে বালতির জলে ঘর মুছছে ন্যাতা দিয়ে। মুছতে মুছতে আমার খাটের কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলে, ও-কথা কেন বললেন বাবু? (চলবে)

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫

০৮/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: