মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

জয় হোক সকল মায়ের

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫
  • মেধা নম্রতা

অনেকেই প্রশ্ন করে আলাদা করে আবার মা দিবস পালনের কি হলো, প্রতিটা দিনই তো মা ময়। মাকে ছাড়া কি একটি দিনও কাটে! মায়ের স্মৃতি সারা জীবন ঘিরে থাকে সন্তানকে। সন্তানের কাছে মা কি ভুলে যাওয়ার মতো কোন ব্যক্তি বা মানুষ? মা তো এক অনন্ত আশ্রয়। কাছেই থাকুন বা সঙ্গেই থাকুন, দূরে অথবা অন্যলোকে থাকলেও মা আছে, থাকবে, হারাবে না কোনদিন।

ঠিক এরকম ভাবনা থেকেই মায়ের জন্য শুধু একটি দিনকে একটু বিশেষ করে রাঙ্গিয়ে দিতে এই মা দিবস। একটিবারের জন্য সন্তানের একটু বিশেষ চোখের চাহনি, একটু বিশেষ সুরে মাকে আগের দিনের চেয়ে বেশিবার ডাকা, একতোড়া ফুল, প্রিয় বই, কেক অথবা অন্য কোন উপহার দিয়ে পুরনো মাকে নতুন করে ভালবাসা জানানোর জন্যই এই মা দিবস। নতুন করে মাকে পাওয়ার এক অপূর্ব মুহূর্ত।

মাতৃত্ব এক অনন্য অনুভূতি। কিন্তু সন্তান জন্মের প্রক্রিয়াটি একজন নারীকে সম্পূর্ণ একাই সম্পন্ন করতে হয়। মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে একটি সন্তানের জন্ম দেয় একজন মা। কত মায়ের মৃত্যু হয়, আর কত সন্তান হারায় তার মাকে। যারা মা হারিয়েছে শুধু সেই সন্তানরাই জানে মায়ের কত অভাব তাদের জীবনে। মা নেই তো কিছু নেই। এক অনন্ত হাহাকার কুরে খায়। বিপদে আপদে, সুখে দুঃখে, কোন পরামর্শ নিতে মায়ের চেয়ে বড় নিঃস্বার্থ বন্ধু, স্বজন আর কে আছে এই পৃথিবীতে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে মা দিবস পালন করা হয়। যদিও বেশিরভাগ দেশই মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে মা দিবস উপলক্ষে পালন করে থাকে। ইংল্যান্ড, আমেরিকা, মেক্সিকো আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ ছাড়াও রোমানিয়া, গ্রীস, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, বলিভিয়া, ভিয়েতনাম, নেপালেও মাকে বিশেষ সম্মান দেয়ার অনুষ্ঠান অনেক আগে থেকেই পৃথিবীতে প্রচলিত ছিল। এমনকি হযরত মুহাম্মদ (সা) এর প্রিয় কন্যা হাসান-হোসেনের মাতা হযরত ফাতিমা (আঃ) এর জন্মদিন স্মরণে ইরানে মা দিবস পালন করা হতো। প্রাচীন পৃথিবীর বহু গোত্র, সমাজে মায়ের ভূমিকাকে বড় করে দেখা হতো। গুরুজনকে মান্য করার নৈতিকতার শিক্ষা এই মা বাবাকে সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই করা হতো। হিন্দু ধর্মমতে পালন করা হয় ‘মাতা তীর্থ অনুসি’ বা ‘একপক্ষব্যাপী মাতৃ তীর্থ যাত্রা’ অনুষ্ঠান। কিংবদন্তি আছে যে, কৃষ্ণের মাতা দেবী দেবকী স্মরণে এই অনুষ্ঠান পালন করা হয়। আবার অনেকে বলেন, এই দিন মৃত মায়ের আত্মাকে স্মরণ করে জীবিত এবং মৃত মায়েদের সম্মান করা হয়। খ্রীস্টান ধর্মমতে ভার্জিন মা মেরী বা মরিয়মকে সম্মান প্রদর্শন করে এই মা দিবস পালন করা হয়। কথিত আছে, ইসলামের মহানবী মাতৃহারা হযরত মুহাম্মদ (সা) পালিতা মাতাকে দূর থেকে আসতে দেখলে নিজে উঠে দাঁড়িয়ে সসম্মানে আসন বিছিয়ে দিতেন। তিনি বলেছিলেন, সন্তানের বেহেস্ত মায়ের পদতলে। অর্থাৎ যে সন্তান পিতামাতাকে শ্রদ্ধা, ভক্তি, যতœ, সম্মান করে তার বেহেস্ত এই পৃথিবীতেই লাভ হয়ে যায়।

মাকে সম্মান করার ইতিহাস অনেক প্রাচীন। প্রায় সব দেশেই সন্তানবতী মাকে বিশেষ যতœ করার প্রচলন রয়েছে। তবে কেবল সন্তান জন্মদান করেই কি মায়ের দায়িত্ব শেষ হয়? তাকে লালন পালন, নৈতিক শিক্ষা দেয়া, ভাল মন্দ, ন্যায় অন্যায় শেখানোও মায়ের বড় দায়িত্ব। মা কেবল স্নেহের আধার হলে যেমন সন্তান ভাল হয় না, তেমনি তাকে প্রয়োজনে শাসন করার যোগ্যতাও রাখতে হয়। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই মুহূর্তে বিশ্বে আলোড়ন তুলেছে। বাল্টিমরে দাঙ্গাবাজদের সঙ্গে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি ঢিল ছুঁড়ে মারছিল টোয়া গ্রাহামের একমাত্র ছেলে। টোয়া একজন সিংগল মা। ছেলে যদিও মুখোশের আড়ালে ঢেকে রেখেছিল মুখ। তাতে কি, মা টোয়া গ্রাহাম কিন্তু ঠিক চিনে ফেলে ছেলেকে। দাঙ্গাবাজদের সঙ্গ থেকে টেনে হিঁচড়ে চড় মারতে মারতে ছেলেকে নিয়ে আসে সাধারণ মানুষের কাতারে। সমস্ত পৃথিবী দেখেছে এই সাহসী মাকে। এরকম শাসনই পারে সন্তানকে অপরাধ জগত থেকে ফিরিয়ে আনতে। মার্কিন সরকার প্রশংসা করে ‘মাদার অব দি ইয়ার’ উপাধি দিয়েছে টোয়া গ্রাহামকে। আর বিশ্বের মাসহ সকলে দেখেছে, একজন সাহসী মায়ের অন্যরকম এক মনোভাবের অনন্য প্রকাশ। সন্তানের জন্য প্রতিটি মায়ের বাৎসল্য থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু অন্ধ বাৎসল্য সন্তানের জীবনকে ছারখার করে দিতে পারে। আর তাই টোয়া গ্রাহাম সন্তানের হাতে সেই শিক্ষা তুলে দিল, যা তার সন্তানকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখাবে। টোয়ার কথায়, তার সন্তান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে না পারলে কি করে রাষ্ট্রের একজন সুনাগরিক হয়ে উঠবে?

একটি সন্তান জন্মের পরে মা বাবাই হয়ে ওঠে তার শিক্ষক। তার জীবনের প্রাথমিক পাঠশালা। আর এক্ষেত্রে মায়ের দায়িত্ব বাবার চাইতে অনেক বেশি। মাতৃত্বের যেমন অহঙ্কার আছে, তেমনি দায় কম নয়। এবার বর্ষবরণ উৎসবে কিছু কুসন্তান নারীদের শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে। প্রতিদিন তাদের ছবি ছাপা হচ্ছে পত্রপত্রিকা ও ফেসবুকে। এদের মা বাবা ভাই বোন আত্মীয়রা ঠিক দেখে চিনতে পেরেছে। কিন্তু কই, টোয়ার মতো একজনও সাহসী মা তো এখনও আমাদের সমাজ থেকে বেরিয়ে এলো না? অথচ এই সন্তানদের পূর্বপুরুষরা একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদারদের সঙ্গে লড়াই করেছিল। লাখ লাখ মা বোনের ওপর করা যৌন নির্যাতনের প্রতিশোধ নিয়েছিল।

নারী এক পূর্ণ শক্তির অধিকারী, যারা সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে পৃথিবীতে মানুষ জাতির ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করে চলেছে। তাই সকল মাকে সম্মান প্রদর্শনের জন্যই বছরের তিন শ’ পঁয়ষট্টি দিনের মধ্যে একটি দিনকে নির্দিষ্ট করে নেয়া হয়েছে। সতেরো শতকে মার্কিন সমাজকর্মী জুলিয়া ওয়াটসন মার্কিন গৃহযুদ্ধ এবং ফ্রাংকো প্রুশীয় যুদ্ধের প্রতিবাদ হিসেবে প্রথম মা দিবস উদযাপনের সূত্রপাত করেন। ১৮৭০ সালে জুলিয়া মা দিবস উপলক্ষে একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেন। তার ঘোষণাপত্রটি ছিল একটি শান্তিকামী প্রচেষ্টা। একজন নারীবাদী হিসেবে তিনি বিশ্বাস করতেন যে, মা হিসেবে নারীদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সেই সময় কেবলমাত্র মায়ের জন্য উপহার কেনা আর মাকে সঙ্গ দেয়াই ছিল দিনটির কর্মসূচী। পরবর্তীতে আমেরিকার পশ্চিম ভার্জিনিয়ায় প্রথম মা দিবস পালন করা হয়। প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন সর্বপ্রথম মা দিবসকে সরকারী ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেন। তখনকার এই দিনে সকলেই সাদা কার্নেশন ফুল দিয়ে মা দিবস উদযাপন করত। ১৯১৪ সালের মে মার্কিন কংগ্রেস মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে ‘মা দিবস’ হিসেবে উদযাপনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করে। মূলত তখন থেকেই দেশে দেশে মা দিবস উৎসব পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৪৬টি দেশে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার মাকে সম্মান করে পালিত হয় মা দিবস।

বাংলাদেশেও অত্যন্ত ঘটা করে দিনটি পালিত হয়। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং বিভিন্ন সংবাদপত্র, টিভি, রেডিও ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকেও অনেকে তাদের জীবিত অথবা মৃত মাকে স্মরণ করে। অনেক ছেলেমেয়ে এই দিন মাকে নানা রকম উপহার দেয়। মায়ের কাছে এইদিন দূরে থাকা সন্তানদের ফোন আসে। এই দিন বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহ নানা রকম উপহার সামগ্রী বাজারজাত করে। ছাড়মূল্য ধার্য করা হয় বিভিন্ন দ্রব্য সামগ্রীর ওপর।

এসব কিছুর পরেও যে অনুভূতিটি কাজ করে এই দিনের সারা বেলা জুড়ে তা হলো, মায়ের প্রতি সন্তানের ভালবাসার এক দুর্লভ প্রকাশ। আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, ‘আমি যা কিছু পেয়েছি, যা কিছু হয়েছি অথবা যা হতে আশা করি তার জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী।’ রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, প্রতিটি শিশু ইচ্ছা হয়ে থাকে মায়ের মনের মাঝে। নজরুল বলেছেন, চিরদুখিনী বন্দিনী মায়ের শিকল ভাঙ্গাই সন্তানের লক্ষ্য। আর আজকের বরিশালের বীরেন, যে কিনা ঝুড়িতে করে মাকে নিজ কাঁধে বহন করে ফিরছে, তার ভাষায়, ‘মোর মাই মোর পৃথিবী’। মায়ের মতো নিঃস্বার্থ ভালবাসা আর কে দিতে পারে এই জীবনে? তাই যত বিতর্কই থাকুক, আলাদা করে এই একটি দিন শুধু মা ও সন্তানের জন্য থাকুক। শত ব্যস্ততার বাইরে একটি অনুভূতি মাকে ভালবাসার কথা বলে যাক। জয় হোক পৃথিবীর সকল মায়ের।

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫

০৮/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: