মূলত পরিষ্কার, তাপমাত্রা ২১.১ °C
 
১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

ঘুরে এলাম কানাডা

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫
  • মোমেনা হোসাইন

সময়টা ছিল ৮ মার্চ,২০১২। বিশ্ব নারী দিবস। ওই দিবসেই ‘গালফ ফেয়ার’ বাহরাইনের উদ্দেশে বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ভোর চারটায় বাহরাইন এসে পৌঁছে। ঘণ্টা দুই সেখানে অবস্থান করে ফ্লাইটটি লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হয়। সেখানে পৌঁছে ঘন্টা তিনেক থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজে যাত্রা শুরু হয় কানাডার উদ্দেশ্যে। টরেন্টো বিমানবন্দরে নামার সঙ্গে সঙ্গেই আমি ও আমার ভ্রমনসঙ্গী সায়েন্স ল্যাবরেটরির সাবেক পরিচালক মো. এনায়েক উল্লাহ সাহেব এবং তাঁর স্ত্রী মাহমুদা বেগম এক পশলা বৃষ্টির মধ্যে পড়ে যাই। তুষার বৃষ্টি। এটি আমার জীবনে প্রথম দেখা। যাই হোক, মেয়ে, জামাই, নাতি, নাতনিসহ আরো অনেকে আমাদের নিতে এসেছিল। তাদের সঙ্গে গাড়িতে করে চলে গেলাম বাসায়।

তখন ওখানে হালকা শীত। শীতের শেষে কোন গাছেই ফুল, ফল, পাতা ছিল না। প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে একটা করে কাঠের গাছ, তারপর একখ- জমি ফুলের বাগানের জন্য, সঙ্গে খোলা বারান্দায় বড় দোলনায় যেখানে বিকেলে আমার মেয়ে দোল খায় এবং চা পান করে। অনেক বড় বাড়ি সব বাড়ির মাঝখানে পাটিশন। দু’পাশে দুই ফ্যামিলি। বাড়ির ওপরে কাঠের চালা, ফ্লোরে কাঠের পাটাতন। সব বাড়ির সামনে অন্তত একটি করে গাছ লাগানো। পাড়ায়-পাড়ায় মুসলিমদের জন্য রয়েছে মসজিদ। মসজিদে মহিলাদের এবাদতের জন্য আলাদা ব্যবস্থা। তেমনি সব পাড়ায় পার্ক। বিকেল হলেই পার্কে সময় কাটাতাম। পাশেই চীনা মার্কেট। তেমনি স্কুল পাশাপাশি। নাতনি ওই ইংলিশ স্কুলে ওয়ানে পড়ে, নাতি ফ্রেঞ্চ স্কুল থ্রিতে। প্রায় সময় হাঁটার উদ্দেশে ওদের স্কুল থেকে নিয়ে আসতাম।

কানাডায় যেতে না যেতে শুধু বাংলাদেশীদের বাড়িতে দাওয়াত আর দাওয়াত। মেয়ের রাশিয়ান বান্ধবী নুর এবং চায়নার অভি, ওদের বাসা দিয়ে শুরু হয়। তারপর জামাইয়ের বান্ধবী পাকিস্তানী ‘সাদাব’, বাংলাদেশী সিয়ারপি, গ্রুপ, নীলা, সুহাদ, ডেইজি, মিঠু, বোরহান, ফাগুন। মেয়ের হিতাকাক্সক্ষী, শাথানা, মনি, নাজনীন, শিমু, অনিক সবার মধ্যে যেন একটা স্বতঃস্ফূর্ততা আর যে যার বাড়ি দাওয়াতে যাবে, সেখানে একটা খাবার নেবে। বিরিয়ানি মাংস বা অন্য কিছু হতে পারে এবং সঙ্গে গিফটও।

একদিন গেলাম লারন সাফারি পার্কে। হাজার হাজার মাইল নিয়ে এ পার্ক । কোন বেড়া বা ওয়াল নেই। খোলা মাঠে গাড়ি ছাড়া যাওয়া যায় না। সামনে একটা গেট, গেটে একটা মাত্র মেয়ে গার্ড। তারপর মাঠের মধ্যে মনোরম দৃশ্য, জিরাফ, জেব্রা, হাজারও হরিণ ছানা, ভাল্লুক, সিংহ। উঁচু করা পিলারের ওপর বিরাট সিংহ নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিল। হরিণের বাচ্চাগুলো গাড়ির পাশে এসে মাথা উঁচু করে তাকাচ্ছিল। জিরাফ এসে গাড়ির সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াল। মনে হলো যেন আমাদের সংবর্ধনা জানাচ্ছে। কত যে নাম জানা-অজানা পশু-পাখির ঢল। আকাশে দুটো প্লেন চক্কর দিতে থাকে। কেউ আবার কাউকে আক্রমণ করেছে কিনা দেখার জন্য।

দুপুর গড়াতে না গড়াতে এলাম বাধা পশু-পাখির দৃশ্য দেখতে। ময়না, টিয়া, মাছ রাঙা, ভুতুম পেঁচা সব পাখির জন্য রয়েছে আলাদা আলাদা রুম । একটা কাকাতুয়া পাখি একটা বিল্ডিং-এর রুমে দেখতে দেখতে মনে পড়ে গেল যে, একটা পাখির জন্য ১টা রুম। বাংলাদেশে ওই রুমে চার জন বসবাস করে। ছাগল ছানাগুলোকে আমার নাতিরা ওখানকার খাবার খাওয়াল। এতক্ষণ হেঁটে এবং গাড়িতে ঘুরে দেখছিলাম। এরপর ট্রেনে চড়ে আশপাশের এলাকা দেখলাম। ষাঁড়ের লড়াই উপভোগ করেছি।

এরপর একদিন গেলাম নায়েগ্রাফলস দেখতে। কী যে অপরূপ দৃশ্য, না দেখলে বোঝানো যাবে না। হাজার হাজার মাইল ধরে মাঠের মধ্যে পানি। সেই পানির মধ্যে কোথাও বা রয়েছে ব্রিজ, একপাশে আমেরিকার পতাকা। ওপার থেকে আসছে স্পিডবোটে ফল দেখতে অনেক লোকজন। তিন দিক থেকে উঁচু ওয়ালের ওপর দিয়ে নিচে নদীর মধ্যে গর্জন করে পড়তে থাকে পানি। সন্ধ্যা হলে লাইটিং করে এগুলোকে বিভিন্ন রঙে মাখিয়ে অনিন্দ্য সুন্দর করা হয়।

একদিন গেলাম স্ট্রবেরি এবং বিওব্যারি ফার্মে। ফার্মে ঢোকার আগে একটা অফিস ঘর। একজন মাত্র মহিলা ডিউটি করছেন। সেখান থেকে ঝুড়ি এবং ডালা নিতে হয়, তা নিয়ে ফার্মে ঢুকলাম। মাঠের মধ্যে স্ট্রবেরি। ইচ্ছামতো নাতি-নাতনিরা,জামাই-মেয়েসহ আমরা সবাই মিলে ওগুলো তুললাম। আশপাশে আছে জবের ক্ষেত। ফাঁকে ছবি তুলছিল ওরা। ফেরার পথে ঝুড়ি ডালা জমা দিলে কেজি প্রতি ৭৮ কুইন করে রাখল ওরা ফলের দাম হিসেবে। তারপরে ঐ দিনই ফেরার পথে দেখলাম গৃহপালিত পশু-পাখির ফার্ম। বিরাট রাজহাঁস গলা উঁচু করে এগিয়ে এলো আমাদের কাছে। দেশী হাঁস-মুরগিও অনেক। এরা ছাউনি ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় ডিম পেড়ে রেখেছে । কেউ নেই ধরার মতো।

কানাডায় বারো মাস ছিলাম। সেখানে কত কিছূই না করেছি। কত জায়গায় না গেছি। দেখেছি প্রকৃতির অপরুপ শোভা। দেখেছি সেখানকার মানুষের বিচিত্র জীবনযাত্রা। অনেক কিছুই শিখেছি সেখানে গিয়ে। বিশেষ করে ওখানকার মানুষের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, যা আমাদের দেশে বড়ই অভাব। সবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। সত্যি যেন স্বপ্নের দেশ। সে স্বপ্নের দেশ ছেড়ে আবার ফিরে এলাম নিজ মাতৃভূমে। তবু মনে রয়ে গেছে সে রেশ।

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫

০৮/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: