কুয়াশাচ্ছন্ন, তাপমাত্রা ২২.২ °C
 
৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩, শনিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
শীর্ষ সংবাদ

রবীন্দ্রনাথ আমাদের কে?

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫
  • স্বদেশ রায়

শেষের কবিতার কেটি’র (কেতকি) এনামেল করা মুখের পাশাপাশি এক নিরাভরণ লাবণ্যলতা। আধুনিক শিক্ষা দু’জনকেই ছুঁয়েছে। লাবণ্য কখনও কাঁদেনি। সহ্য করেছে, উপলব্ধি করেছে। কেটি’র এনামেল করা মুখের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে চোখের জল। এই দুই বাঙালী নারীই আমাদের। কার হাত ধরে এ দুই নারী প্রবেশ করল বাঙালী জীবনে? যদি বলা হয় শুধু রবীন্দ্রনাথের হাত ধরে তা ঠিক হবে না। একটি সময় ও একটি যুগের হাত ধরে। আর ওই যুগের এক চূড়ান্ত সময়ে নেতৃত্ব নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ তার বলিষ্ঠ হাতে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর এই কেতকির সংখ্যা যত বেড়েছে লাবণ্য’র সংখ্যা তত বাড়েনি। তবে লাবণ্যরা আছেন, অনেক আছেন। আর তাদের ভেতর আছেন রবীন্দ্রনাথ সচেতন বা অবচেতনভাবে। নিরাভরণ লাবণ্যর রূপটি তার অন্তরে, তার বোধে। যেখানে সভ্যতার দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় রবীন্দ্রনাথও অনেক বেশি উপস্থিত।

মনে হতে পারে, কেতকির প্রতি শেষের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যেন একটু অবিচার করেছেন, মনোযোগী ছিলেন তিনি বেশি লাবণ্যকে সৃষ্টিতে। রবীন্দ্রনাথ কি নিজেই জানতেন না, লাবণ্য কখনও গণতন্ত্রের ভোটের যুদ্ধে জিততে পারবেন না। কারণ, তার সংখ্যা সব সময়ই কম থাকবে। তাকে পাওয়ার জন্য আকুতি থাকবে মাত্র কয়েকজনের। বহু’র নয়। তারপরেও রবীন্দ্রনাথ কেন বেশি মনোযোগী হলেন লাবণ্যকে ঘিরে? সে কি রবীন্দ্রনাথের নিজের সৃষ্টির প্রয়োজনে না আমাদের প্রয়োজনে? এমনকি অমিতেও। যেখানে শোভনলালকে রবীন্দ্রনাথ অত বেশি সময় দেননি। কেন তাঁর সৃষ্টির এই খেলা? সে কি তার নিজের জন্যে, না আমাদের জন্যে? আসলে তা কি আমাদের জন্যে নয়? কারণ, শুধু ইউরোপ নয়, ভারতবর্ষ নয়, এমনকি শুধু রবীন্দ্রনাথের বাঙালীর জীবনে নয়; সবখানে উনবিংশ শতাব্দী এক নতুন আধুনিকতা এনে দেয়, যা হাজার বছরের আধুনিকতার থেকে পৃথক। তারপরে তার সঙ্গে যোগ হয় দুরন্তগতির প্রযুক্তি। এই দুই মিলে তপ্ত সংগ্রামের এক পৃথিবীতে পা রাখে মানুষ। সভ্যতার উষালগ্নে পৃথিবীর গলিত লাভা ছিল অনেক বেশি তপ্ত কিন্তু মানুষের সংগ্রামের বোধটিকে এত তপ্ত পথে আর কখনও পা ফেলতে হয়নি, যে পা ফেলার পথে নিয়ে যায় উনবিংশ শতাব্দীর প্রযুক্তি আর নতুন বোধরেখা। বোধিরেখা বললেও মনে হয় ভুল হয় না। এই তপ্ত পথে ক্লান্তি নামে, যেমন ক্লান্তি নামে গ্রামের দীর্ঘ পথে গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে। তখন প্রয়োজন পড়ে একটু ছায়ার, একটু জিরিয়ে নেয়ার। এই ছায়াটুকু গোটা মরুভূমিতে ছুটে বেড়ালে কখনই জুটবে না। এর জন্যে কোন না কোন একটি ছায়াসুনিবিড় বৃক্ষের প্রয়োজন পড়ে। সভ্যতার সুন্দর আবার দারুণ তপ্ত পথে লাবণ্য আর অমিত কি একে অপরের সেই ছায়াবৃক্ষ নয়? রবীন্দ্রনাথ কি আমাদের সেই ছায়াটুকু এনে দিলেন? না, এ ছায়া সৃষ্টি হয়েছে সভ্যতার আপন গতিতে, রবীন্দ্রনাথ আমাদের শুধু হাত ধরে ওই ছায়ায় নিয়ে গেলেন।

সভ্যতার পথে বেশি ছুটবে যন্ত্র, কিছু ছুটবে মানুষ। এই সভ্যতার রীতি। যা রবীন্দ্রনাথের কথায় এক শ্রেণীর মানুষ কাঁধে করে প্রদীপ বইবে, আরেক শ্রেণী ওই প্রদীপের আলোয় আলোকিত হবে। সভ্যতার এই রীতি চিরন্তন। কিন্তু ওই যারা আলোকিত হয়, ক্লান্তিও তাদের নামে। তাই তাদের পরস্পরের জন্যে প্রয়োজন হয় ছায়ার। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গান, তাঁর নাচ, তাঁর নাটক, তাঁর কবিতা সবকিছু দিয়ে কি লাবণ্য আর অমিতের মতো দুটি ছায়া আমাদের সভ্যতার পথে তৈরি করতে সাহায্য করে যাননি? তাই সভ্যতার পথে সারাক্ষণ কোন অমিত রায়ের কোন লাবণ্য রেখার প্রয়োজন পড়ে না ঠিক, তেমনি লাবণ্য রেখারও অমিত রায়ের। অথচ এই দু’জন ছাড়া সভ্যতা এগোয় না। প্রযুক্তি ও বোধের চরম উৎকর্ষের এই আধুনিক সময়ে এছাড়া অন্য কোন গতি নেই। আর তাই লাবণ্য আর অমিতকে রবীন্দ্রনাথ আমাদের ভেতর দিয়ে গেলেন, এক অন্য সুর-রেখায়। যেখানে সারাক্ষণের ছায়াপাত নয়, রবং রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘কূজনে দুজনে তৃপ্ত’। দুরন্তগতির চাকা আর অর্থনীতির তীব্র তাড়নের মাঝে, আরেকটি বহতা নদীকে পুষ্ট করা, চিনিয়ে দেয়ার কাজটি যিনি করে গেলেন, তিনিই কি আমাদের রবীন্দ্রনাথ? কিন্তু লাবণ্যও ছুটছে তীব্রগতিতে, স্থির নয় সে, সেও আধুনিক সভ্যতার একটি গতিবল, অমিতও তাই। একখানে স্থির নয় কেউ। একখানে সব যেন পাচ্ছে না কেউ। এই গতি, এই না পাওয়ার তীব্রতা- এই কি জীবন? তাহলে জীবন কোথায় যাবে? কোথায় পাবে আবার একটু ছায়া, একটু শক্তি সঞ্চয়ের সময়, যেখান থেকে সে আবার পাবে তার পাখার বেগ। সে কি ‘হেথা নয়, হেথা নয়, আর কোন্খানে!’

এই গতিবেগ চঞ্চল একটি জীবনপথ যেন অচলায়তনের ঠাকুরদার হাত ধরে আমাদের জীবনের আধুনিক বোধে রবীন্দ্রনাথ নিয়ে আসেন। তাই দর্ভকদের মতো আমরা মাঝে মাঝেই তীব্র বেগে ভেঙ্গে ফেলি একটার পর একটা অচলায়তন। কিন্তু সেখানে রবীন্দ্রনাথ আমাদের দেখিয়ে দেন, অচলায়তনের দেয়াল ভেঙ্গে যায়, আলো আসে। নতুন আলো। নতুন আলোয় আলোকিত সেই সময়েও যথানিয়মে থেকে যায় মহাপঞ্চক, যিনি ছিলেন সকল অন্ধকারের মূল নিয়ামক। মানুষের জীবনের, সভ্যতার এই এক চরম সঙ্কট। যেখানে অন্ধকারের মূল নিয়ামককে নিশ্চিহ্ন করা যায় না আবার আলোর জন্যে দেয়াল ভাঙ্গতে হয়, খুলে দিতে হয় সহস্র বছরের বদ্ধ জানালা। কোথায় এ সঙ্কট, এ সঙ্কট কি সভ্যতার ভেতরে না মানুষের ভেতরে? ঘরে-বাইরের বিমলা বিপ্লবের জন্যে, দেশের জন্যে সব দিতে গিয়ে কখনও কখনও পরাজিত হয় নারীর জৈবিকতার কাছে। বদ্ধ জানালা খোলার কাজ কিছু সময় হলেও বন্ধ হয়ে যায় বিমলার জন্যে। সভ্যতার, বিপ্লবের এই চরম সত্যটি কি শিখিয়ে দেয়ার জন্যে আমাদের রবীন্দ্রনাথ?

আধুনিক বাঙালীর সৃষ্টি সেরা মহাকাব্য মুক্তিযুদ্ধের সবখানে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেদিনের প্রেরণায়, কণ্ঠে, গানে, সমরাস্ত্রে কোথায় ছিলেন না তিনি! আমরা অচলায়তন ভেঙ্গে ফেললাম। অচলায়তনে আসা আলোটুকুও যেমন আনতে ও চিনতে রবীন্দ্রনাথ আমাদের পাশে থাকলেন, তেমনি তাঁর দেয়া চোখ দিয়ে আমরা দেখতে পাই, দেয়াল ভাঙ্গা হলেও অচলায়তনে ঠিকই থেকে গেল মহাপঞ্চক; বিমলার মতো আমাদের মুক্তিযোদ্ধারাও হেরে যেতে লাগল জৈবিকতার দুর্দমনীয় একের পর এক আকর্ষণের কাছে। আবার পরের প্রজন্মে এসে আলোর নেশায় সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন বিমলা, যা আমরা সাধক কবি কবীরের কবিতায় পাই- সচেতন বা অবচেতন মন একটা বাঁক নেবেই। কবিরের এই বাঁকই সত্য। এই বাঁকে আলো থাকুক আর অন্ধকার থাকুক সেই সত্যই জীবন। আরও সত্য এর পরে আছে আরেকটি বাঁক- আর এমনিভাবে ক্রমবহমান আমরা।

swadeshroy@gmail.com

প্রকাশিত : ৮ মে ২০১৫

০৮/০৫/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


ব্রেকিং নিউজ: